রবিবার, ২৫ অগাস্ট ২০১৯, ০৫:২০ পূর্বাহ্ন

ছোট ছিলাম একাত্তরে – ২

সাব্বিরুল হক :: আবছা থেকে যতটুকু মনে পড়ে পুরোই স্পষ্ট । ওই সময় সিলেটের সব খবর পাওয়া কঠিন ছিল খুবই । আব্বাকে অবশ্য রেডিওর খবর শুনতে দেখতাম । ছোট আকারের রেডিও । তবে খবরটা শুনতেন আড়ালে । আওয়াজ কমিয়ে দিয়ে ।

রেডিওতে বাজতে শুনেছি এমন একটা গানের কথা মনে পড়ছে,’ বিশ্ব কবির সোনার বাংলা । নজরুলের বাংলাদেশ । জীবনানন্দের রূপসী বাংলা …’

আর থেকে-থেকে শোনা যেতো এক বজ্রকণ্ঠের আওয়াজ !

মামাদের সঙ্গে বসে আব্বারা ঠিক করলেন শহরে আর ঠিক হবেনা, এবার চলে যেতে হবে একেবারে গ্রামের বাড়ি । সিলেট শহরের পরিস্থিতি বিপজ্জনক হয়ে উঠছিল । ছোটদের চলাফেরায় চরম নিয়ন্ত্রণ । কথায়-কথায় দৌঁড়ে গিয়ে ঢুকতে হয় বাংকারে । ‘মিলিটারি এই চলে আসলো’ ধরণের গুজব শোনা যেতো এখন-তখন !

আম্মাদের চলাফেরা দেখতাম শুকনো মুখে । ডালে- চালে খিচুড়ি রান্না হতো দু’বেলা । নানাজানের কথাবার্তা প্রায় বন্ধই হয়ে গেলো । আব্বাকে চিন্তিত মনে হতো খুব বেশি । প্রয়োজন ছাড়া কথা বলতেন না উনিও !

মাঠের খেলা-ধুলো চলে গেলো মাটিতে খোঁড়া বাংকারে । আধ-অন্ধকারে খোপের ভেতরে খেলতাম রান্নাবাটি । ছুটে বেড়াতে গেলেই ধমক দিয়ে উঠতেন খালারা ।

একদিন হঠাৎ করে মেজো মামা এসে সবাইকে লুকোতে বললেন বাংকারে । ছড়িয়ে পড়ল আতঙ্ক । মা-খালারা ভয়ার্ত স্বরে আল্লাহ-খোদাকে ডাকতে লাগলেন । আমরা দুই ভাই ভয়ে লুকিয়ে পড়েছি ততক্ষণে আম্মার আঁচলের তলায় ।

আম্মার হাতের নিচ থেকে ছাড়া পেয়ে যখন বাইরে আসার সুযোগ পেলাম তখন বিকেল । দেখলাম মামা আর নানা পানির জগ গ্লাস নিয়ে ছুটছেন বাড়ির বাইরের বৈঠকখানায় । আম্মাকে বলা হলো চা বানিয়ে পাঠাতে ।

চায়ের সঙ্গে সেমাই বানিয়ে ফেললেন আম্মা । কিন্তু পাঠাবেন কাকে দিয়ে ? আমার সুযোগ এসে গেলো । আমাদের দুই ভাইকে ডেকে চা-নাস্তা নিয়ে যেতে বললেন । দিয়ে আসতে বাইরের মেহমানদের ।

মেহমান দেখে ভয়ে উল্টে পড়ার অবস্থা আমার । বড় ভাই ছিলেন দুই বছরের বড় । অভয় দিয়ে বললেন,
‘ ডরাইছনা ‘। মাথায় পাগড়িওয়ালা সৈন্যদের একটা দলকে দেখে কি পরিমাণ ভয় পেয়েছিলাম মনে নেই । তবে মামা-নানার সঙ্গে ওদের হেসে কথা বলতে দেখেও সাহস পাইনি দাঁড়ানোর ।

শিখ মিলিশিয়া নামটা শুনেছি আব্বার মুখে । বিশাল লম্বা চওড়া একেকজন । চা-পানি খেয়ে বিদেয় নিয়েছিল ওরা । হেসে করমর্দন আর কুশল বিনিময়ের সময় আব্বার পেছনে দাঁড়িয়ে অবাক হয়ে তাকিয়েছিলাম । তাই দেখে সৈন্যদের একজন হেসে তাকিয়ে কি যেনো জানতে চাইলো । আব্বা জানালেন, ভয় পাওয়া ছেলেটা তাঁর ছোটছেলে । জবাবে হেসে উঠেছিল শিখ সেনা । যাওয়ার আগে চোখ টিপে দিয়েছিল আমার দিকে চেয়ে ।

এরপরেই গ্রামে বাড়িতে চলে যাওয়ার প্রস্তুতি শুরু হল । শিখ মিলিশিয়া সৈন্য দেখার পরে কয়েকদিন শান্ত মনে হলো চারদিক । নানা বাড়ির সবাই মিলে গোছ-গাছ শুরু করলেন গ্রাম যাত্রার । মনে হচ্ছিল সিলেট শহরে আর ফিরে আসতে যাচ্ছেন না কেউ, গ্রামের বাড়ি বালাগঞ্জের পারকূল, কুরুয়া বাজারে যেতে পারলে একবার ।

আম্মার শরীর খারাপ হয়ে গেলো তখনই ।
জানালেন এতো পথ হেঁটে এতোদূর গ্রামে যাওয়া বোধহয় সম্ভব হবেনা উনার পক্ষে । নানা সহ সবাই পড়ে গেলেন গভীর দুশ্চিন্তায় । আব্বা তখন চরম উদ্বিগ্ন ।

ওই সময় বুঝতে পারিনি আম্মার অসুস্থ্য হয়ে পড়ার কারণ । কিছুটা বুঝেছি যখন যুদ্ধের শেষের দিকে, দেশ স্বাধীনের আগে-আগেই আম্মার কোল জুড়ে জন্ম নিলো আমার ছোট্ট একটা ভাই ।

(চলমান )

ছোট ছিলাম একাত্তরে-১


© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত মৃদুভাষণ - ২০১৪
Design & Developed BY ThemesBazar.Com