মঙ্গলবার, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ০৪:০৫ অপরাহ্ন

নোয়াখালীর ঠিকানায় পাসপোর্ট, তুরস্ক যেতে চেয়েছিল ৩ রোহিঙ্গা

মৃদুভাষণ ডেস্ক :: নোয়াখালীর সেনবাগ উপজেলার ঠিকানা ব্যবহার করে বাংলাদেশি জাতীয় পরিচয় পত্র এবং পাসপোর্ট নিয়েছিল মিয়ানমারে মংডু জেলার অংচি গ্রামের আলী আহমদের ছেলে মো. ইউসুফ (২৩) ও তার ভাই মো. মুসা (২০)।

বৃহস্পতিবার রাতে বাংলাদেশি পাসপোর্ট ব্যবহার করে তুরস্কের ভিসা সংগ্রহের জন্য ঢাকা যাওয়ার পথে চট্টগ্রাম নগরীর আকবর শাহ থানার ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে মীর সিএনজি স্টেশনের সামনে থেকে তারা পুলিশের হাতে আটক হন।

এ সময় মো. আজিজ (২১) নামে মিয়ানমারের আরও এক নাগরিককে আটক হয়।

এদিন চট্টগ্রাম বিভাগীয় পাসপোর্ট অফিসে পাসপোর্ট সংগ্রহ করতে গিয়ে আটক হন আরও একজন।

টাকার বিনিময়ে দালালের মাধ্যমে এসব রোহিঙ্গা এনআইডি ও পাসপোর্ট সংগ্রহ করছে বলে জানা গেছে। একটি চক্র এর পেছনে রয়েছে। এই চক্রের মাধ্যমে পাসপোর্ট নিয়ে বিদেশে গিয়ে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়াচ্ছে রোহিঙ্গারা। এতে বাংলাদেশের সুনাম ক্ষুণ হচ্ছে।

এদিকে নজরদারিতে থাকা চট্টগ্রামের ৭৩টি জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) নিয়ে তদন্ত শুরু করেছে নির্বাচন কমিশনের একটি টিম। বৃহস্পতিবার থেকে টিমের সদস্যরা এসব এনআইডি নিয়ে কাজ শুরু করেছে।

আকবর শাহ থানার ওসি মো. মোস্তাফিজুর রহমান চৌধুরী যুগান্তরকে বলেন, ‘আটক মো. ইউসুফ ও তার ভাই মো. মুসা মিয়ানমারের নাগরিক পরিচয় আড়াল করে নোয়াখালীর সেনবাগ উপজেলার ঠিকানা ব্যবহার করে জাতীয় পরিচয়পত্র নেয়। নোয়াখালী জেলা পাসপোর্ট ও ভিসা অফিস থেকে তারা বাংলাদেশী পাসপোর্টও সংগ্রহ করে। পাসপোর্ট আবেদনে জন্ম নিবন্ধনসহ ইউপি চেয়ারম্যানের জাতীয়তার সনদ ব্যবহার করা হয়েছে। এ ঘটনায় মামলা দায়ের করা হয়েছে। এ বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করতে তাদেরকে ৫ দিনের রিমান্ড আবেদন করা হয়েছে।’

ওসি আরও জানান, ২০১৭ সালের আগস্টে মিয়ানমারে সহিংসতা শুরুর পর ইউসুফ ও মুসা পরিবারসহ পালিয়ে কক্সবাজার সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করে। ইউসুফ ও মুসার পরিবার কক্সবাজারের উখিয়া উপজেলার থাইংখালী এলাকায় ১৪ নম্বর ক্যাম্পের ব্লক-বি-২ এ থাকে।

গত ১ সেপ্টেম্বর টেকনাফ পুলিশের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে নিহত রোহিঙ্গা ডাকাত নুর আলম ওরফে নুর মোহাম্মদের কাছেও পাওয়া গেছে জাতীয় পরিচয়পত্র বা স্মার্টকার্ড। নুর মোহাম্মদ ২০১৭ সালের ২৩ জানুয়ারি চট্টগ্রাম নগরীর বায়েজিদ থানার হিলভিউ আবাসিক এলাকার ঠিকানায় বাংলাদেশি জাতীয় পরিচয়পত্র বা স্মার্টকার্ড তৈরি করেছিলেন। সেই কার্ডে নিজের নামকরণ করেছিলেন নুর আলম।

এর আগে ১৮ আগস্ট চট্টগ্রামে জাতীয় পরিচয়পত্রসহ গ্রেফতার হয়েছিলেন এক রোহিঙ্গা নারী। রমজান বিবি নামের ২৭ বছর বয়সী ওই নারী ‘লাকী’ নাম নিয়ে হাটহাজারী উপজেলার মীর্জাপুর ইউনিয়নের একটি ভুয়া ঠিকানা দিয়ে জাল জাতীয় পরিচয়পত্র তৈরি করান। তার পাসপোর্ট আবেদনের তথ্য যাচাই করতে গিয়ে ‘লাকী’ নামের কাউকে ওই ঠিকানায় না পাওয়ায় পুলিশের সন্দেহ হয়।

এরপর রমজান বিবি ওরফে ‘লাকী’ এবং তার ভাই হিসেবে পরিচয় দেয়া আজিজকে পুলিশ আটক করে। পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে তারা রোহিঙ্গা বলে স্বীকার করে। তাদের বিরুদ্ধে একটি মামলা দায়ের করেন হাটহাজারী উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তা মো. আরিফুল ইসলাম।

আটকের পর রমজান বিবির দেয়া তথ্যে ১ সেপ্টেম্বর বিদেশে পাড়ি দেয়ার সময় নজির আহমেদ নামে এক ব্যক্তিকে আটক করে ঢাকায় ইমিগ্রেশন পুলিশ। পরের দিন ২ সেপ্টেম্বর তাকে চট্টগ্রামে এনে আদালতে তোলা হলে ৫ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করে কোতোয়ালী থানা পুলিশের হেফাজতে রাখা হয়েছিল।

পুলিশের দেয়া তথ্য অনুযায়ী, নজিরের বাড়ি মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের মংডুতে। ১৯৯০ সালে কিশোর বয়সে তিনি পরিবারের সঙ্গে বাংলাদেশে এসেছিলেন। তিনি আশ্রয় নিয়েছিলেন টেকনাফের মোচনি শরণার্থী শিবিরে। তার শরণার্থী কার্ড (এমআরসি) নম্বর ৬০১১৩।

২০১০ সালে নজির রোহিঙ্গা পরিচয় গোপন করে নজির চট্টগ্রাম নগরীর পতেঙ্গা এলাকার বাসিন্দা হিসেবে পাসপোর্ট করেছিলেন এবং ২০১২ সালে তিনি সৌদি আরব চলে যান। সেখানে তার পাসপোর্ট হারিয়ে গেছে উল্লেখ করে ২০১৫ সালে এমআরপি পাসপোর্টও সংগ্রহ করেন। নজির সৌদি আরবে বসবাসের পাশাপাশি দেশে ব্যবসা পরিচালনা করতেন।

কোতোয়ালী থানার ওসি মো. মহসীন যুগান্তরকে জানান, এ ঘটনায় নজিরের বিরুদ্ধে পুলিশ বাদী হয়ে মামলা দায়ের করে। এ মামলার তদন্তভার যাচ্ছে সিআইডির কাছে।

পাসপোর্ট অফিসে দুই রোহিঙ্গা আটক: এদিকে ভুয়া ঠিকানায় পাসপোর্টের আবেদন করতে গিয়ে এক সপ্তাহের ব্যবধানে দুই রোহিঙ্গাকে আটক করে পুলিশে দিয়েছে চট্টগ্রাম বিভাগীয় পাসপোর্ট অফিসের কর্মকর্তারা।

পাসপোর্ট অফিসের কর্মকর্তারা জানান, বৃহস্পতিবার শফিউল হাইর নামে এক লোক ১ নম্বর কাউন্টারে পাসপোর্টের আবেদন জমা দিতে আসে। আবেদন গ্রহনকারী কর্মকর্তার সন্দেহ হলে তাকে পরিচালকের কক্ষে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। আবেদনে তার বাংলাদেশি ঠিকানা দেখানো হয়েছে, পিতার নাম বজলুর রহমান, মাতার নাম মাহমুদা খাতুন, গ্রাম আবদুল্লাহপুর, ডাক-ফতেপুর থানা- ফটিকছড়ি।

পাসপোর্ট অফিসের কর্মকর্তাদের জিজ্ঞাসাবাদে সে স্বীকার করে বাংলাদেশে ভুয়া ঠিকানা ব্যবহার করে পাসপোর্ট নিতে চেষ্টা করেছিলেন শফিউল। তার বাড়ি মিয়ানমারের মংডু জেলার বলিবাজার এলাকায়। ২০১৪ সালে স্বপরিবারে বাংলাদেশে আসে। বর্তমানে তার পরিবারের অন্যসদস্যরা রোহিঙ্গা ক্যাম্পে অবস্থান করছে বলে সে জানায়। পরে তাকে ডবলমুরিং থানা পুলিশের কাছে সোপর্দ করা হয়।

এর আগে ২৮ আগস্ট ভুয়া নাম-ঠিকানায় পাসপোর্ট করতে এসে মোহাম্মদ ফয়সাল নামে অপর এক রোহিঙ্গাকে আটক হয়।

চট্টগ্রাম বিভাগীয় পাসপোর্ট অফিসের পরিচালক আবু সাইদ  জানান, কেউ পাসপোর্ট করতে এলে ইমিগ্রেশন ও পাসপোর্ট অধিদফতর কর্তৃক সরবরাহকৃত রোহিঙ্গাদের ফিঙ্গার প্রিন্টের সংরক্ষিত ডাটাবেজ অনুযায়ী আঙ্গুলের ছাপ যাচাই-বাচাই করে রোহিঙ্গা হিসেবে সনাক্ত করা যায়। এছাড়া পাসপোর্ট করতে আসা ব্যক্তির কথা-বার্তায় সন্দেহ হলে তখন তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করলেও প্রকৃত তথ্য উঠে আসে।

নজর দারিতে ৭৩ এনআইডি: নজরদারিতে থাকা ৭৩টি জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) তথ্য অধিকতর যাচাই-বাছাই শুরু হয়েছে। এসব এনআইডি রোহিঙ্গাদের হাতে থাকার অভিযোগ উঠেছে। এ বিষযে গঠিত তদন্ত টিম বৃহস্পতিবার থেকে চট্টগ্রামে কার্যক্রম শুরু করেছে।

এ প্রসঙ্গে জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা মো. মুনির হোসাইন খান জানান, নজরদারিতে থাকা জাতীয় পরিচয় পত্রের তথ্য যাচাই-বাছাই শুরু করেছে ঢাকা থেকে আসা একটি টিম। প্রাথমিক তদন্তে যে ৭৩টি এনআইডির তথ্যে গরমিল পাওয়া গেছে সেসব এনআইডির তথ্য যাচাই-বাছাই করবেন তারা।

সিএমপির উপ কমিশনার (বিশেষ শাখা) আব্দুল ওয়ারিশ যুগান্তরকে বলেন, ‘রোহিঙ্গা নাগরিক নুর আলমসহ কয়েকজনের স্মার্টকার্ড বানানোর বিষয়টি আমাদের নজরে এসেছে। রোহিঙ্গারা যদি পাসপোর্ট বানাতে পারে সেই দায় সরাসরি আমাদের পুলিশের। কিন্তু এনআইডি বানানোর দায়টা স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও নির্বাচন কমিশনের। এখন তদন্ত করে বের করতে হবে এ কাজে কে কে জড়িত আছে।’-যুগান্তরক


© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত মৃদুভাষণ - ২০১৪
Design & Developed BY ThemesBazar.Com