সোমবার, ২১ অক্টোবর ২০১৯, ০৬:৩৮ পূর্বাহ্ন

বিশ্ব নদী দিবস ও সুতাং নদ

এলিজা বিনতে এলাহী ::  পত্রিকার পাতায় বিশ্ব নদী দিবসের কথা দেখে মনে পড়লো হবিগঞ্জ জেলার সুতাং নদকে । ৬৪ জেলার হেরিটেজ ভ্রমনে পরিচিত হয়েছিলাম বাংলাদেশের অনেক নদ-নদীর সাথে । সেরকম ভাবেই জানা ও দেখা সুতাং নদকে । হবিগঞ্জ থেকে মৌলভীবাজার যাচ্ছি । হঠাৎ পথিমধ্যে একটি ব্রিজের কাছাকাছি আসতেই বিকট একটি গন্ধ আমাদের যাত্রা থামিয়ে দিল । কৌতূহল বসত নেমে দেখতে ইচ্ছে হোল এত সুন্দর ব্রিজের কাছে কেন গন্ধ । নেমে দেখলাম গন্ধ আসছে ব্রিজের নিচের পানি থেকে ।

আমাদেরকে দেখে কিছু উৎসুক জনতা এগিয়ে আসলো । আমাদের হাতে ক্যামেরা দেখে মনে করলো আমরা সাংবাদিক । কিন্ত তাদেরকে বললাম আমরা দেশ ঘুরছি । জানতে চাইলাম এখানকার গন্ধের উৎস । প্রথমে অবাক হলাম এটি একটি নদী শুনে । আমার কাছে সেটিকে খাল সমেতও মনে হচ্ছিল না ।

এলাকায় কিছু লোকজনের সাথে কথা হোল । তাদের ভিডিও নিলাম । কিন্ত তারা অনুরোধ করলো ভিডিওতে যেন তাদের ছবি দেখানো না হয় আর তাদের নামও যাতে কোথাও ব্যবহার করা না হয় । তাই তাদের কথা গুলো ভিন্ন নাম ব্যবহার করে লিখছি ।

কথা বলে যা জানা গেল – এক সময় প্রচুর মাছ পাওয়া যেত এ নদে । এখন আর কোন মাছ নেই। এতে হুমকিতে পড়েছে কয়েক হাজার জেলের জীবন-জীবিকা। কৃষকরা সেচের কাজেও ব্যবহার করতে পারছেন না সুতাংয়ের পানি। গভীর নলকূপের মাধ্যমে সেচ দিতে গিয়ে তাদের খরচ বেড়ে যাচ্ছে। নদীপাড়ের মানুষ এক সময় ব্যাপকহারে হাঁস পালন করলেও এখন আর পারছেন না। নদীর পানির বিষক্রিয়ায় মারা যাচ্ছে হাঁস । এমনকি গোসলের কাজেও ব্যবহার করা যাচ্ছে না এ নদের পানি । পানি শরীরে লাগলে চুলকানি হচ্ছে । এলাকার গরুও সেই পানি পান করতে পারছে না । এর কারন হলো শিল্পবর্জ্য ফেলা হচ্ছে সুতাং নদে । সেই দূষণের প্রভাবে সুতাং ছাড়াও অন্যান্য নদী ও খালের পানিও দূষিত হচ্ছে। সুতাং নদীর দূষণের বিষয়ে জানতে চাইলে তারা বলেন, প্রাণ-আরএফএল ও স্কয়ার গ্রুপ একাধিক শিল্প-প্রতিষ্ঠান স্থাপন করেছে। এসব প্রতিষ্ঠানের বর্জ্য ফেলা হচ্ছে সুতাং নদীতে। স্থানীয় বাসিন্দা রফিক ( ছ্বদ্ম নাম ) বলেন, তিন-চার বছর ধরেই নদীর পানির রঙ বদলে গেছে । কারখানার বিষাক্ত বর্জ্যের কারণে আশপাশের ৪০-৫০টি গ্রামের মানুষ দুর্ভোগে আছে।

সেই সময় শুধু মনে হচ্ছিল আর কত নিজেদের দেশ ও পরিবেশকে আমরা অবহেলা করবো । ধ্বংসের দ্বার প্রান্তে এসে পৌঁছেছি । শুধু সুতাং কেন কত শত নদী এরকম শুকিয়ে মরে যাচ্ছে । আমার সবথেকে হাস্যকর লাগে আমরা দেশকে ব্রান্ডিং করার সময় বলি “নদীমাতৃক বাংলাদেশ” ।অথচ সেই দেশের মানুষ বিশুদ্ধ পানির জন্য বোতল জাত করা পানি কিনে খায় । এত নদী থাকার পরও এই আধুনিক সময়ে বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা করতে পারিনি , পারিনি নদী পথে যোগাযোগ ব্যবস্থা ও যাতায়াতের উন্নতি করতে । হয়নি পর্যটন শিল্পে নদীর কার্যকরি ব্যবহার ।

বিশ্বের অন্যান্য দেশের মত আমাদের দেশেও পালিত হয় বিশ্ব নদী দিবস । ব্রিটিশ কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সেই তরুণ শিক্ষক এবং নদীপ্রেমিক মার্ক অ্যাঞ্জেলোর মত কেউ হয়তো হবিগঞ্জের সুতাং নদের পরিচ্ছনতার অভিযান চালাবে , দূর করবে সুতাং এর দুঃখ । নিশ্চয়ই সুদিন আসবে ।


© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত মৃদুভাষণ - ২০১৪
Design & Developed BY ThemesBazar.Com