সোমবার, ১৮ নভেম্বর ২০১৯, ১২:৫৮ পূর্বাহ্ন

ডক্টর আবুল ফতেহ ফাত্তাহকে নিয়ে একপ্রস্থ

ডক্টর আবুল ফতেহ ফাত্তাহ

আবিদ ফায়সাল :: আজ ১ অক্টোবর। ১৯৮৬ সালের এই দিনে কবি, লোকগবেষক, শিক্ষাপ্রশাসক ডক্টর আবুল ফতেহ ফাত্তাহ মদনমোহন কলেজে প্রভাষক হিশেবে যোগদান করেছিলেন। এবং ষাট বর্ষপূর্ণ করে ২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর এই কলেজের অধ্যক্ষ পদ থেকে অবসরগ্রহণ করেন। এইসূত্রে তিনি একটি সোনালি অধ্যায় রচনা করে আমাদের সম্ভ্রম অর্জন করেছেন। কিন্তু দুর্ভাগ্য আমরা এই সম্ভ্রম আয়ত্ত করতে পারিনি। তাঁর জীবন ও কর্মের কিঞ্চিৎ বিবরণ এখানে পেশ করতে চাই।

হবিগঞ্জ জেলার নবীগঞ্জ উপজেলার গহরপুর গ্রামে ১৯৫৮ সালের ১ ডিসেম্বর তিনি জন্মগ্রহণ করেন। মরমিকবি নূর মোহাম্মদের উত্তরপুরুষ মো. দরস মিয়ার পুত্র ফাত্তাহ। মা বেগম ফরিদুন্নেসা। দুইভাই একবোনের মধ্যে তিনি দ্বিতীয়। তিনি নবীগঞ্জ জে কে হাইস্কুল, মদনমোহন কলেজ, মুরারিচাঁদ কলেজ এবং চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেন। ১৯৮৪ সালে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন। ২০০৩ সালে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ‘ সিলেট-গীতিকার বৈচিত্র‌্য : সমাজ ও সংস্কৃতির নিরিখে ‘ শীর্ষক অভিসন্দর্ভ রচনা করে তিনি পিএইচ.ডি ডিগ্রি অর্জন করেন। উল্লেখ্য যে, ফোকলোর বিষয়ে সিলেট বিভাগের মধ্যে তিনিই প্রথম এ ডিগ্রিধারী।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত নবীগঞ্জ উপজেলার শিক্ষার্থীরা ১৯৮৪ সালে নবীগঞ্জ কলেজ প্রতিষ্ঠার যে উদ্যোগ গ্রহণ করেন আবুল ফতেহ ফাত্তাহ সেই উদ্যোগের অন্যতম সদস্য ছিলেন। একই সঙ্গে বাংলা বিভাগের প্রভাষক নিযুক্তর পর অধ্যক্ষ (ভারপ্রাপ্ত) হিশেবে তাঁর কর্মজীবন শুরু। ১৯৮৬ সালের ১অক্টোবর মদনমোহন কলেজের বাংলা বিভাগের প্রভাষক পদে যোগ দেন। ১৯৯৭ সালে সহযোগী অধ্যাপক এবং ১৯৯৮ সালে এই কলেজে বাংলা বিভাগে অনার্স কোর্স প্রবর্তনের শুরু থেকে বিভাগীয় প্রধান ও ২০০৯ সালের ১জুন অধ্যাপক পদে পদোন্নতি লাভ করেন। ২০১১ সালের ১১ সেপটেম্বর শিক্ষকতার ২৭ বছর পর তিনি মদনমোহন কলেজের উপাধ্যক্ষ পদে আসীন হন। ২০১৩ সালের ৭ এপ্রিল থেকে তিনি একই কলেজের অধ্যক্ষ পদে দায়িত্ব পালন করেন। ২৮ নভেম্বর ২০১৮ এ পদ থেকে অবসর গ্রহণ করেন।

মদনমোহন কলেজে অধ্যাপনাকালে তিনি শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা বিষয়ের খণ্ডকালীন শিক্ষক হিশেবে ২০০০ থেকে ২০০২ পর্যন্ত এবং লিডিং ইউনিভার্সিটিতে ইংরেজি বিভাগের শিক্ষার্থীদের বাংলা কোর্সে ২০০৪ থেকে বিভিন্ন সেমিস্টারে পাঠদান করেন।
শিক্ষকতার পাশাপাশি তিনি বিভিন্ন বিষয়ে প্রশিক্ষণ গ্রহণসহ জাতীয়-আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সেমিনারে যোগদান করে অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করেন। জাতীয় শিক্ষাসপ্তাহ ২০১৬ উপলক্ষে আবুল ফতেহ ফাত্তাহ সিলেট সদর উপজেলা, সিলেট জেলা এবং সিলেট বিভাগীয় পর্যায়ে শ্রেষ্ঠ প্রতিষ্ঠান-প্রধান নির্বাচিত হন। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় আয়োজিত কলেজ রেংর্কিং ২০১৫-এ মদনমোহন কলেজ বিভাগীয় পর্যায়ে পঞ্চম স্থান এবং জাতীয়ভাবে ৬৫তম স্থান লাভ করে। ২০১৬ সালের ২১ জানুয়ারি মদনমোহন কলেজের ৭৫ বছরপূর্তি উপলক্ষে প্ল্যাটিনাম জুবিলি উৎসবে তিনি ছিলেন সভাপতি। তাঁর নেতৃত্বে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রী ধরণিকন্যা শেখ হাসিনা প্রধান অতিথি হিশেবে আগমন করেন। অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতের জীবন ও কর্মভিত্তিক গ্রন্থ ‘প্রজ্ঞাদীপ মুহিতমানস (২০১৬) ও প্ল্যাটিনাম জুবিলি স্মারক-সংকলন ‘ স্মৃতিঝরনার কলতান’ (২০১৬) সম্পাদনা করেন। মদনমোহন কলেজ সাহিত্যপরিষদে রয়েছে তাঁর অবিস্মরণীয় অবদান। তাঁরই প্রচেষ্টায় বের হয়েছে সিলেট চরিতকথার চোদ্দোটি গ্রন্থ। মো. আলি আজম প্রণীত মিহিরকান্তি অনূদিত লাইফ অব মৌবলি আবদুল করিম, রসময় মোহান্তর মহাকবি শরচ্চন্দ্র চৌধুরী, বিজিতকুমার দে প্রণীত ‘দিশারি বিচিন্তাস্রোতসহ আরও গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ ও সংকলন।

অধ্যাপক ডক্টর আবুল ফতেহ ফাত্তাহ যখন মদনমোহন কলেজের অধ্যক্ষ হিশেবে দায়িত্বভার গ্রহণ করেন, তখন দশ লাখ টাকা ব্যাংকঋণের মাধ্যমে শিক্ষক-কর্মকর্তা-কর্মচারীর মাসিক সম্মানী পরিশোধ করেন। কিন্তু এই অর্থনৈতিক দীনতা কাটিয়ে তিনি প্রায় সাড়ে সাত কোটি টাকা কলেজে তহবিলে বিভিন্ন ব্যাংকে রেখে অবসরগ্রহণ করেন। এটি তাঁর দক্ষ শিক্ষাপ্রশাসক হিশেবে বিরল কৃতিত্ব। এবং সততার অনন্য নজির।


© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত মৃদুভাষণ - ২০১৪
Design & Developed BY ThemesBazar.Com