রবিবার, ২০ অক্টোবর ২০১৯, ০১:১১ পূর্বাহ্ন

চট্টগ্রাম মেডিকেল ‌‌‌’সরঞ্জাম কেনায় দুর্নীতি’, বালিশ কভারের দাম ২৮ হাজার টাকা!

মৃদুভাষণ ডেস্ক :: চট্টগ্রাম মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য বিভিন্ন চিকিৎসা সরঞ্জাম ও যন্ত্রপাতির দামে অস্বাভাবিক প্রস্তাব দিয়েছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। অস্বাভাবিক দাম প্রস্তাব দেখে প্রস্তাবটি ফেরত পাঠিয়েছে পরিকল্পনা কমিশন।

এক্ষেত্রে একটি বালিশ কভারের দাম প্রস্তাব করা হয়েছে ২৮ হাজার টাকা। অথচ এর বাজার দাম মাত্র ৫শ’ থেকে সাতশ’ টাকা। একটি রেক্সিনের দাম প্রস্তাব করা হয়েছে ৮৪ হাজার টাকা। অথচ এর বাজার মূল্য ৩০০-৫০০ টাকা। এভাবে ১২ ধরনের সরঞ্জামের বাজার দরের সঙ্গে একটি তুলনামূলক ছক তৈরি করে সম্প্রতি প্রস্তাবটি ফেরত পাঠিয়েছে পরিকল্পনা কমিশন।

বালিশ কভার ও রেক্সিন ছাড়া স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় অন্য যেসব সরঞ্জাম ও যন্ত্রপাতি কেনার প্রস্তাব করেছে, সেগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল- সার্জিক্যাল ক্যাপ ও মাস্কের দাম প্রস্তাব করা হয়েছে ৮৪ হাজার টাকা। যার সম্ভাব্য বাজার মূল্য ১০০ থেকে ২০০ টাকা। বালিশের দাম ২৭ হাজার ৭২০ টাকা যারা সম্ভাব্য বাজার মূল্য ৭৫০ থেকে ২০০০ টাকা। স্টেরাইল হ্যান্ড গ্লোভস ৩৫ হাজার টাকা (২০-৫০ টাকা), কটন তাওয়েল ৫ হাজার ৮৮০ টাকা (২৫০-১০০০ টাকা), ৫ এমএল সাইজের টেস্টটিউব-গ্লাস মেডের মূল্য ৫৬ হাজার টাকা (১৫-৫০ টাকা), থ্রিপিন ফ্লাট ও রাউন্ড প্লাগযুক্ত মাল্টিপ্লাগ উইথ এক্সটেনশন কড ৬,৩০০ টাকা (২৫০-৫০০টাকা), রাবার ক্লথ ১০ হাজার টাকা (৫০০-৭০০ টাকা), হোয়াইট গাউন ৪৯ হাজার টাকা (১-২ হাজার টাকা), ডিসপোজাল সু কভার সাড়ে ১৭ হাজার টাকা (২০-৫০ টাকা)।

শুধু তাই নয়, সম্ভাব্যতা যাচাই করা বাধ্যতামূলক হলেও এ প্রকল্প তৈরিতে সেটি অনুসরণ করা হয়নি।

এ বিষয়ে পরিকল্পনা কমিশন লিখিতভাবে মন্ত্রণালয়কে বলেছে, একটি বিভাগের ১২টি আইটেমের প্রস্তাবিত মূল্যের সঙ্গে আনুমানিক বাজার মূল্যের পার্থক্য ব্যাপক।

এ প্রকল্পের আওতায় কেনার জন্য প্রস্তাবিত সব যন্ত্রপাতি বা চিকিৎসা সরঞ্জাম পর্যালোচনা করলে দামের অসামঞ্জস্য আরও অনেক বেশি হবে। এ ধরনের ব্যয় প্রাক্কলন কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।

এজন্য যারা এ প্রকল্পের প্রস্তাব তৈরির সঙ্গে যুক্ত তাদের অনুসন্ধান করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে।

বারবার এ ধরনের অস্বাভাবিক প্রস্তাব দেয়ার পেছনে অবশ্যই কেউ না কেউ জড়িত। অবৈধ সম্পদ অর্জনই তাদের উদ্দেশ্য বলে মন্তব্য করেছেন বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, নানা প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেই প্রকল্প প্রস্তাব দেয়া হয় পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ে।

সুতরাং ভুল বলে সংশ্লিষ্টদের দায় এড়ানোর কোনো সুযোগ নেই। এদের খুঁজে বের করে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া জরুরি। কারণ ‘অঙ্কুরেই দুর্নীতির বীজ’ বপন করছেন তারা। এই দুর্নীতিবাজদের মূল উৎপাটন করা না গেলে প্রশাসনে দুর্নীতি আরও বিস্তৃত হবে।

জানতে চাইলে স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবার কল্যাণ বিভাগের সচিব শেখ ইউসুফ হারুন মঙ্গলবার সন্ধ্যায় টেলিফোনে যুগান্তরকে বলেন, ইতোমধ্যেই আমরা প্রস্তাবটি ফেরত পেয়েছি।

মন্ত্রণালয়ের যারা এগুলো নিয়ে কাজ করেছেন, তারা সঠিকভাবে তা করেননি। এ ধরনের ব্যয় প্রাক্কলন চুরি করার ক্ষেত্র তৈরি করে। আমি দুঃখিত।

কি করে এ ধরনের প্রকল্প প্রস্তাব আমাদের মাঝ থেকে বেরিয়ে যায়? বিস্ময় প্রকাশ করে তিনি আরও বলেন, উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) তৈরির সময় বিভিন্ন সরঞ্জামের ব্যয় নির্ধারণ সংক্রান্ত কমিটির সভাপতি হচ্ছেন ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর। তিনি এত অভিজ্ঞ চিকিৎসক। তারা কিভাবে এ ধরনের প্রাক্কলন করেন? তার কাছে ব্যাখ্যা চাওয়া হবে।

অর্থনীতিবিদ ও বিশ্বব্যাংক ঢাকা অফিসের সাবেক লিড ইকোনমিস্ট ড. জাহিদ হোসেন বলেন, এটাকে অনিয়ম, দুর্নীতি না বললে আর কোনটাকে বলা যাবে। অবশ্যই এটা এক ধরনের দুর্নীতি। এসব বিষয় মন্ত্রণালয় থেকে বাইরে আসে কি করে?

সেখানেই তো অনেক ধাপ পেরিয়ে পরিকল্পনা কমিশন পর্যন্ত আসতে হয়। যে যার মতো পণ্যের দান নির্ধারণ করছে। এক ধরনের বিশৃঙ্খলা চলছে। এতে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রম নিয়েও তো প্রশ্নের সৃষ্টি হয়।

অবৈধ সম্পদ আহরণের অসৎ উদ্দেশ্যে যারা এ রকম কর্মকাণ্ড করছেন, তাদের শাস্তি নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান। তিনি বলেন, এ ধরনের অসামঞ্জস্য ব্যয় ধরার উদ্দেশ্যই হচ্ছে প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত কোনো কোনো অংশের সরকারি খাতের অর্থে নিজেদের সম্পদের বিকাশ ঘটানো।

সূত্র জানায়, চট্টগ্রাম মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন প্রকল্পটি বাস্তবায়নে মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ২ হাজার ৮শ’ কোটি টাকা। সম্পূর্ণ সরকারি তহবিলের অর্থে এটি বাস্তবায়ন করার কথা স্বাস্থ্য অধিদফতরের।

প্রক্রিয়াকরণ শেষে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় অনুমোদন পেলে চলতি বছর থেকে ২০২২ সালের জুনের মধ্যে বাস্তবায়নের লক্ষ্য ধরা হয়েছে।

প্রস্তাবিত প্রকল্পটি নিয়ে ২ সেপ্টেম্বর পরিকল্পনা কমিশনে অনুষ্ঠিত হয় প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির (পিইসি) সভা। সেখানেই বিভিন্ন সরঞ্জামের দামে অস্বাভাবিক প্রস্তাবের বিষয়টি চিহ্নিত হয়।

প্রকল্পটি প্রক্রিয়াকরণের দায়িত্বপ্রাপ্ত পরিকল্পনা কমিশনের আর্থ-সামাজিক অবকাঠামো বিভাগের সদস্য আবুল কালাম আজাদ বলেন, এ ধরনের অসামঞ্জস্য ব্যয় ধরা পড়ায় প্রকল্পটি অনুমোদন প্রক্রিয়া বন্ধ রেখে বেশকিছু সুপারিশ দিয়ে ফেরত পাঠানো হয়েছে।


© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত মৃদুভাষণ - ২০১৪
Design & Developed BY ThemesBazar.Com