1. ahmedshuvo@gmail.com : admi2018 :
  2. mridubhashan@gmail.com : Mridubhashan .Com : Mridubhashan .Com

শুক্রবার, ০৬ ডিসেম্বর ২০১৯, ১০:৫৫ অপরাহ্ন

ছোট ছিলাম একাত্তরে-৩

সাব্বিরুল হক :: প্রচুর বৃষ্টি নামল সিলেট জুড়ে।কিন্তু আকাশের কোণে যুদ্ধ-বিমানের কান ছেঁড়া আওয়াজ আর দূর থেকে আসা বিষ্ফোরণের শব্দ চলতে থাকল সমানে।

নানার বাসায় আয়োজন চলছিল শহর থেকে গ্রামের বাড়িতে চলে যাওয়ার। যতদূর মনে পড়ে বিষয়টা সহজ ছিল না। সমস্যা হচ্ছিল আম্মাকে নিয়ে। ছোটদের অনেককে নিয়ে।

এমনই এক রাতে হন্তদন্ত হয়ে নানার বাসায় আসেন আমাদের এক বড় ভাই, ফকরুল ইসলাম।এসেই জানান প্রচন্ড ক্ষিধে পেয়েছে উনার।গায়ে চাদর, মুখে দাঁড়ি-গোঁফ, মনে পড়ে ভয়ই পেয়েছিলাম ফকরুল ভাইকে দেখে। খালারা বসিয়ে খাইয়ে দিলেন তাকে পেট ভরে।

খেয়ে আর মোটেও অপেক্ষা করলেন না। জানালেন আসামের গৌহাটিতে যাচ্ছেন ট্রেনিং নিতে। সে রাতেই। নানা দোয়া-দুরূদ পড়ে ফুঁ দিয়ে দিলেন ফকরুল ভাইকে। রাতের অন্ধকারে চাদর গায়ে জড়িয়ে বেরিয়ে পড়লেন তিনি।

অনেক পরে বুঝেছি আমার দেখা প্রথম মুক্তিযোদ্ধাই ছিলেন সেই ফকরুল ভাই।

চাল-ডালের প্রয়োজন দেখা দিলো নতুন করে। বহু লোকজন জমেছে নানার বাসায়। নানাকে বলতে শুনলাম রেশন দোকানের একজন পরিচিত লোকের খোঁজ নিতে, যার বাসা ছিল কুমার পাড়া, ঝরনার পাড়। নানার ডাকে ভয়ে ভয়ে এসে হাজির হয়েছিল সে।

দুই মামা মিলে তাকে নিয়ে বেড়িয়ে যান বন্দর বাজারের চাল-ডালের রেশন দোকানের উদ্দেশ্যে। অবাক করে কিছুক্ষণের ভেতরে ফিরেও আসেন চাল-ডাল-তেল-নুনের টিন, বস্তা নিয়ে। খানিক উল্লাস শোনা গেল নানার বাসায়।

তবে দিনের যাত্রা শুরুর আগে-আগেই শুরু হয়ে হল শেলিং-বোম্বিং আর আকাশ জুড়ে গোলাগুলির আওয়াজ। নিমিষে সারা বাসার মানুষ আশ্রয় নিলেন উঠোনে খোঁড়া বাঙ্কারের ভেতরে। বাঙ্কারের মুখ গাছের ডাল-পালা দিয়ে বন্ধ করে দিয়ে মামারা সরে গেছিলেন অন্যদিকে।

অন্ধকার খোপের ভেতর পোকা কামড় দিচ্ছিল টের পাচ্ছিলাম। আর বন্ধ হয়ে আসছিল দম। বেশিক্ষণ সেই কবর গাঁয় থাকতে পারিনি। কেঁদেই ফেলেছিলাম ভয়ে।

ফকরুল ভাই যাওয়ার আগে জানিয়েছিলেন রাতের আঁধারে নৌকো নিয়ে নদীপথে ভারতে যাবেন। বাঙ্কারের গ্যাস চেম্বারে আটকে বসে আমার মনে হয়েছিল ফকরুল ভাইয়ের সঙ্গে যেতে পারলেই ভাল হত। সুরমা-কুশিয়ারা-সারি-পিয়াইন দিয়ে নৌকায় করে চলে যেতাম দূর দেশে!

কোথায় কি ঘটছে বুঝতে না পারলেও টের পাচ্ছিলাম যুদ্ধের আওয়াজ। চারদিকের মাটি কেঁপে উঠছিল, বিস্ফোরণে ভূমিকম্পের মতো কেঁপে-কেঁপে যাচ্ছিল বাঙ্কারের দেয়ালের মাটি আর ছাদ।

মা-র ধমকে কান্না থামালেও আমার মনে হয়েছিল আমি বোধহয় কোনদিনই বের হতে পারব না সেই ভয়াবহ নরক থেকে।

 

ছোট ছিলাম একাত্তরে-১

ছোট ছিলাম একাত্তরে – ২


© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত মৃদুভাষণ - ২০১৪
Design & Developed BY ThemesBazar.Com