শনিবার, ০৯ নভেম্বর ২০১৯, ০৭:৩০ পূর্বাহ্ন

৭২ বছর পর নৌপথে ঢাকা-কলকাতা ভ্রমণ

নৌপথে ঢাকা-কলকাতা। ফাইল ছবি

ফরিদ আহম্মদ বাঙ্গালী:: নৌপথে ঢাকা-কলকাতা-ঢাকা যাতায়াত। অবাক হওয়ারই কথা। তবে এটি ৭২ বছর পূর্বের ইতিহাস। ব্রিটিশ শাসনামলে আসাম থেকে ঢাকা-চাঁদপুর-বরিশাল হয়ে কলকাতা চলত স্টিমার। সময় লাগত ১০ দিন। দেশভাগের পর এই সার্ভিস বন্ধ হয়ে যায়। ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশরা চলে যাওয়ার সময় এই উপমহাদেশকে ধর্মের ভিত্তিতে দু’ভাগ করে দিয়ে গেছে।

ধর্মের ভিত্তিতে দেশভাগ পৃথিবীর ইতিহাসে বিরল ঘটনা বটে। একই ভাষা, একই সংস্কৃতি, একই চিন্তা-ভাবনার মানুষ; অথচ ভিসা-পাসপোর্টের বেড়াজালে আটকে গেল উপমহাদেশের অত্যন্ত অভিজাত ও গুরুত্বপূর্ণ ঢাকা-কলকাতা এই দুই শহর।

৭২ বছরে পৃথিবীতে অনেক ঘটনা ঘটে গেছে। ইতিমধ্যে দুই দেশের মানুষজন প্লেনে, ট্রেনে বা বাসে চড়েই ঢাকা-কলকাতা যাওয়া-আসা করছে। প্রতিবছর এই তিনটি পথে মোট ১৫ লাখ যাত্রী ঢাকা-কলকাতা যাওয়া-আসা করে। এদিকে নৌপথে পণ্য পরিবহন চালু থাকলেও সাধারণ যাত্রীদের চলাচলের সুযোগ ছিল না। নৌপথে ভ্রমণের সেই সুযোগটা এনে দিয়েছে বাংলাদেশ ও ভারত সরকার।

‘এমভি মধুমতি’ নামের জাহাজ চলতি বছরের ২৯ মার্চ ঢাকা ত্যাগ করে কলকাতা বন্দরের উদ্দেশে। আমি বড়ই সৌভাগ্যবান- দেশের বাইরে আমার জীবনের প্রথম ভ্রমণ, ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে সেই প্রমোদতরীতে করে। ঢাকা-কলকাতার ঐতিহাসিক সেই ৬৪ ঘণ্টার জাহাজ ভ্রমণের অভিজ্ঞতা আমার ও সহযাত্রীদের মনে গেঁথে থাকবে বহুকাল।

ব্রিটিশ শাসনামলে উভয় বাংলার মধ্যে নৌপথে মানুষ ও পণ্যের ছিল অবাধ যাতায়াত। দেশভাগের পর তৎকালীন পাকিস্তান শাসনামলে দু’দেশের মধ্যে জলপথে পণ্য পরিবহন হলেও বন্ধ হয়ে যায় যাত্রী পরিবহন। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭১ সালে দু’দেশের মধ্যে নৌ-প্রটোকল স্বাক্ষরিত হয়।

তবে ১৯৮০ সালের ৪ অক্টোবর দু’দেশের মধ্যে বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষরের পর থেকে নৌ-প্রটোকলটি বাণিজ্য চুক্তির অংশ হিসেবে পরিচালিত হয়ে আসছে। এরপর ২০১৫ সালের ১৬ নভেম্বর বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে যাত্রী ও ক্রুজ সার্ভিস চালুর জন্য সমঝোতা স্মারক সই হয়।

২০১৮ সালের ২৫ অক্টোবর এই বিষয়ে স্ট্যান্ডার্ড অপারেটর প্রসিডিউর (এসওপি) সই করার মাধ্যমে স্মারক ও এসওপি অনুযায়ী বাংলাদেশি ক্রুজশিপ এমভি মধুমতি ২৯ মার্চ ঢাকা থেকে কলকাতার উদ্দেশে আনুষ্ঠানিকভাবে রওনা করে। অন্যদিকে, ভারতের ক্রুজশিপ আরভি বেঙ্গল গঙ্গা কলকাতা থেকে একইদিন রওনা করেছিল ঢাকার পথে।

মূলত শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকার ক্ষমতায় আসার পর বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে যোগাযোগ ব্যবস্থা ব্যাপক বিস্তৃতি লাভ করেছে। ১৯৯৯ সালে চালু হয়েছে ঢাকা-কলকাতা আন্তঃদেশীয় বাস সার্ভিস। ২০০৮ সালে আন্তঃদেশীয় যাত্রীবাহী ট্রেন ‘মৈত্রী এক্সপ্রেস’ চলাচল শুরু করে। এ ধারাবাহিকতায় ২০১৭ সালে চালু হয়েছে খুলনা-কলকাতার মধ্যে ‘বন্ধন এক্সপ্রেস’।

বর্তমানে ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে সপ্তাহে প্রায় ১০০টি ফ্লাইট চলাচল করছে; যা নয়াদিল্লি, কলকাতা, মুম্বাই ও চেন্নাইকে ঢাকা এবং চট্টগ্রামের সঙ্গে সংযুক্ত করেছে। এমভি মধুমতির যাত্রী ধারণক্ষমতা হল ৭৫০ জন। জাহাজটিতে আছে ৬০টি কেবিন। এর মধ্যে ৪টি ভিআইপি কেবিন। দোতলার মধ্যখানে আছে বেশ বড় লবি।

ডেক ও তিনতলায় রয়েছে অনেকটা খোলা জায়গা। বিশাল এ জাহাজে আমরা ছিলাম মাত্র ১৩৮ জন। এর মধ্যে যাত্রী ছিলাম ৮০ জন। বাদবাকিদের মধ্যে ছিলেন জাতীয় সংসদ সদস্য, সাংবাদিক ও রাজনৈতিক ব্যক্তি।

ঢাকার পাগলা থেকে যাত্রা শুরুর পর গান, আড্ডা ও গল্পের মধ্য দিয়ে চাঁদপুর হয়ে গভীর রাতে বরিশাল লঞ্চঘাট ও কীর্তনখোলার রাতের সৌন্দর্য ছিল ভীষণ উপভোগ্য। গাবখান চ্যানেল হয়ে আমরা যখন মোড়েলগঞ্জ পৌঁছলাম তখন সকাল সাড়ে ১০টা কিংবা ১১টা। সেখানে ছিল প্রায় আধঘণ্টার যাত্রাবিরতি।

ছোট-বড় নদী পেরিয়ে ১২ নটিকেল মাইলবেগে ছুটে চলেছে জাহাজ মোংলা বন্দরের পাশ দিয়ে; রামপাল হয়ে ঘষিয়াখালী চ্যানেল ধরে। শিবসা নদী হয়ে জাহাজ প্রবেশ করল রয়েল বেঙ্গল টাইগারের রাজ্য সুন্দরবনের ভেতরে। ঘন সবুজ বন দেখতে দেখতেই সন্ধ্যা ৬টায় পৌঁছে গেলাম আংটিহারা সেখবাড়িয়া নদীতে।

এটি সাতক্ষীরা জেলায় অবস্থিত একেবারে সীমান্ত জনপদ শ্যামনগর উপজেলায়। নোঙর ফেলল মধুমতি। ৩০ মার্চ রাত ৯টার মধ্যেই শেষ হল আমাদের বাংলাদেশ ইমিগ্রেশনের কাজ। প্রায় ১২ ঘণ্টার যাত্রাবিরতি শেষে ভোর ৬টায় আবারও যাত্রা শুরু। যাত্রাবিরতির কারণ হিসেবে জানা গেল, সুন্দরবনের ভেতর আঁকাবাঁকা সরু নদীপথটি আমাদের নাবিকদের জন্য ছিল একেবারেই নতুন।

রায়মঙ্গল সুন্দরবনের ভেতর দিয়ে প্রবাহিত একটি দীর্ঘ নদী; যার সম্পর্ক একেবারে বঙ্গোপসাগরের সঙ্গে। এর একটি অংশ বাংলাদেশে, আরেকটি ভারতে। আংটিহারা থেকে যাত্রা করে প্রায় ৪ ঘণ্টার পানিপথ পাড়ি দিয়ে আমরা ভারতীয় অংশের নামখানা-হেমনগরে পৌঁছলাম ৩১ মার্চ বেলা ১১টার দিকে। বাংলাদেশ আর ভারতের নদী সীমান্তে ছিল শুধু একটি বয়া।

সেখানে নেই কাঁটাতারের বেড়া; একই নদী, একই পানি, আছে জোয়ার-ভাটা। মাঝনদীতেই নোঙর ফেলল মধুমতি। আমাদের অদূরেই নোঙর ফেলেছিল কলকাতা থেকে আসা এমভি বেঙ্গল গঙ্গা। সেটিও মধুমতির পাশ দিয়ে একই সময়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করল। কলকাতার কাস্টমস অফিসার ও বিএসএফের অফিসাররা হাসিমুখে আমাদের বরণ করে নিলেন। প্রায় ৬ ঘণ্টা লাগল কাস্টমসের কাজ শেষ হতে।

বিকাল ৫টার কিছু পর ভারতীয় পতাকাবাহী দুটি ছোট জাহাজ এমভি দরকেশ্বর ও এমভি কোয়েল এসকর্ট করে ৫ নটিকেল মাইল গতিতে আমাদের নিয়ে যায় কলকাতার পথে। বাংলাদেশের সুন্দরবন শেষে শুরু হয় কলকাতার সুন্দরবনের অংশ। সেটি পুরোটাই অতিক্রম করতে হয়েছে।

বলা যায়, বাংলাদেশের প্রায় ৬ হাজার বর্গমাইল আর ভারতের প্রায় ৪ হাজার বর্গমাইল মিলে ১০ হাজার বর্গমাইলের সুন্দরবন এপাশ থেকে ওপাশ পুরোটাই অতিক্রম করতে হয়েছে। ৩১ মার্চ বিকাল ৫টা থেকে একটানা চলে এমভি মধুমতি। ১ এপ্রিল দুপুর সাড়ে ১২টায় পৌঁছে কলকাতা ইনল্যান্ড পোর্টে। তারপর স্বল্পসময়ের মধ্যেই সম্পন্ন হয় ইমিগ্রেশন। আর এর মধ্য দিয়েই শেষ হয় আমাদের ৬৪ ঘণ্টার অসাধারণ এক জাহাজ যাত্রা।

আমাদের ভ্রমণটি ছিল পরীক্ষামূলক। পথটি ছিল অচেনা। বিরতি দিতে হয়েছে প্রায় ২০ ঘণ্টা। ভবিষ্যতে ৩৮-৪০ ঘণ্টার বেশি লাগবে না ঢাকা থেকে কলকাতা পৌঁছতে। নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, ৮টি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান এই পথে জাহাজ চালাতে আবেদন করেছে।

পরবর্তী পদক্ষেপ নিয়ে এখনও সিদ্ধান্ত হয়নি। নদীমাতৃক বাংলার দুই অংশের এই যোগাযোগ এখন থেকে নিয়মিত হোক। বাংলাদেশ নদীবিধৌত ব-দ্বীপ। বাংলার প্রকৃতি অবলোকন করতে হলে, সুন্দরবনের অপার সৌন্দর্য উপভোগ করতে হলে এ পথে নৌভ্রমণের বিকল্প নেই। মধুমতি আর গঙ্গা নামের দুটি ক্রুজশিপ উভয় বাংলার সৌন্দর্যপিপাসু মানুষের জন্য সৌন্দর্য আস্বাদনের বড় একটি দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।

ঢাকা


© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত মৃদুভাষণ - ২০১৪
Design & Developed BY ThemesBazar.Com