মঙ্গলবার, ১২ নভেম্বর ২০১৯, ০৪:০৬ অপরাহ্ন

সিলেটে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ: শতবর্ষের আত্মীয়তার প্রেক্ষাপট

সৈয়দ জগলুল পাশা :: কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সিলেট এসেছিলেন নভেম্বর ১৯১৯ সালে। উনার প্রায় সপ্তাহকালীন সিলেট সফর সম্পর্কে ইতোমধ্যে আমরা অবগত হয়ে গিয়েছি। সিলেট বাসীরা কবিগুরুর আগমনের শতবর্ষে পদার্পণের সপ্তাহ জুড়ে উৎসব আয়োজনে আনন্দিত ও উৎফুল্ল হয়ে উঠেছেন। সকলের মনেই একজন আত্মীয়কে বরনের অনুভূতি বহমান। কবিগুরু স্বর্গ থেকে হয়তো অনুধাবন করবেন তার বিখ্যাত কবিতার চরণ “আজি হতে শতবর্ষ পরে’’।

তিনি আমাদের কাছে এসেছিলেন পরিণত বয়সে – নোবেল পুরস্কার প্রাপ্তির ৬ বছর পর। সিলেট আসা-যাওয়া জনিত যোগাযোগের অব্যবস্থা থাকলেও কবিগুরু পূর্বে কেন সিলেট আসেননি তা জানার আগ্রহ রয়েছে আমাদের। সিলেটে উনার সফল সফরটি ছিল সবদিক থেকে অতুলনীয়। প্রথমত: আয়োজনটা ছিল সার্বজনীন। ইতিহাস ঘাঁটলে এ আগমন নিয়ে কোন বিরোধ পাওয়া যাবে না। দ্বিতীয়ত: স্বাগত: জানানোর কায়দাটা ছিল ভিন্নতর। অগ্রবর্তী দল কুলাউড়া গিয়ে উনাকে স্বাগত: জানান। কুলাউড়ার পূর্বেও সিলেটভূক্ত বদরপুর, করিমগঞ্জ এলাকার মানুষও কবি বরনে সম্পৃক্ত হয়ে যান। কুলাউড়ায় ট্রেন স্টেশনে রাত্রিযাপন করে পথিমধ্যে বরমচাল, ফেঞ্চুগঞ্জ, মাইজগাও স্টেশনে উৎসুক জনতার সংবর্ধনা বরন করে কবি পৌঁছেছিলেন ও সিলেট। তৃতীয়ত: কবিগুরু এসেছিলেন পুত্র ও পুত্রবধু সহকারে। চতুর্থত: সংবর্ধনার আয়োজন ছিল বহুমুখী। সুরমা নদী পার হলেন – বোট ও বজরাতে করে- চাদনী ঘাট এলাকা দিয়ে। কবিগুরু অপছন্দ করলেও হৃদয়ের আবেগে কিশোর শিক্ষার্থীরা টেনে নিয়েছিল উনাকে বহনকারী গাড়ী। স্লোগানে ছিল – বন্দে মাতরম ,রবীন্দ্রনাথ কি জয় ও আল্লাহু আকবর ধ্বনির বৈচিত্র্য। মানপত্র দেয়া হয়েছিল, অর্ধ শতাব্দীপূর্ব মনিপুরী কারুকাজের সামিয়ানা ছিল। এমনকি উর্দূতে বক্তৃতা দিয়েছিলেন ও আসামের সাবেক সিলেটী শিক্ষামন্ত্রী সৈয়দ আব্দুল মজিদ কাপ্তান মিয়া। খৃস্টিয়ান পাদ্রী কবিগুরুর সম্মানার্থে তার বাংলো ছেড়ে দিয়েছিলেন থাকার জন্য। সিলেটের মহিলারা কবিগুরুকে ললাটে চন্দনফোটা দিয়ে বরন করায় তিনি মুগ্ধ হয়েছিলেন। ভোজনের সময় সিলেটের মমতাময়ী রমনীরা তত্ত্বাবধান করেছিলেন স্বযত্নে। স্কুল, কলেজ ও বিভিন্ন পাড়া ছিল উৎসব মুখর।

সিলেটবাসীকে আত্মীয়তার সেতুবন্ধনে ধাবন করে নিয়েছিলেন তিনি। কবি টাউন হলের ” বাঙালীর সাধনা”, এম.সি কলেজের ”আকাঙ্ক্ষা” ভাষণ, শ্রীভূমি কবিতা দিয়ে আমাদের আলিঙ্গন করেছিলেন। ব্রহ্ম সমাজের প্রার্থনা ঘরে গুরুদেব প্রার্থনা করেছিলেন। রবীন্দ্রনাথ হয়ে উঠেন সিলেটবাসী হিন্দু, মুসলমান, ব্রাহ্ম, মনিপুরী, খৃস্টানসহ সহ অন্যান্য সকল সম্প্রদায়ের আপনজন। বয়সের ব্যবধান গুছিয়ে কিশোর, নারী, ছাত্র, যুবক, প্রৌঢ়, বৃদ্ধ সকলের কাছে সমাদৃত হন। উচ্চ ও নিম্নবর্নেরও কোন ব্যবধান আসেনি তাঁর সফরকালীন সিলেটে। তাঁর নিরাপত্তা নিশ্চিত করেছিলেন স্বেচ্ছাসেবকগন। পুত্র রবীন্দ্রনাথ ও বউমা প্রতিমাদেবীও খুশী হয়েছিলেন এ সফরের আন্তরিকতা দেখে। কবিগুরু জানলেন হাছন রাজা সম্পর্কে। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ এর ভাষায় Ñ সিলেট শ্রীভূমি।

মাছিমপুরের মণিপুরী বালক বালিকাদের নৃত্য দেখেই শান্তিনিকেতনে মণিপুরী নৃত্য-শিক্ষা প্রবর্তনের সংকল্প রবীন্দ্রনাথের মনে জাগে, তিনি প্রথমে মাছিমপুর থেকেই মণিপুরী নৃত্য-শিক্ষক নেবার ইচ্ছা প্রকাশ করেন। মনিপুরী সম্প্রদায় তাদের হস্তশিল্প ও নৃত্যে মুগ্ধ করেছিল কবিগুরুকে।১৩৪১ বাংলাতে গুরুদেব প্রভাতচন্দ্র গুপ্ত মহাশয়কে সিলেটে পাঠিয়েছিলেন মণিপুরী নাচের শিক্ষক সংগ্রহ করতে। কিন্তু মাছিমপুরের মণিপুরীরা শান্তিনিকেতনের মত দূরবর্তী স্থানে যেতে রাজি না হওয়ায় তিনি ত্রিপুরা রাজ্যের অধিবাসী মণিপুরীদের মধ্য থেকে শান্তিনিকেতনে নৃত্য শিক্ষক নিয়েছিলেন বলে জানা যায়। নীলেশ্বর নামক সিলেটের আরেকজন মণিপুরী নাচের শিক্ষক শান্তিনিকেতনে বছর দুয়েক নাচ শিক্ষা দিয়েছেন ।

কবিগুরু পুত্র রথীন্দ্রনাথের সংস্কৃত শেখার জন্য সিলেটী পণ্ডিত শিবনাথ বিদ্যার্ণবকেও শান্তিনিকেতনে নিয়ে যান। পরে সিলেটের বিখ্যাত সংস্কৃত পণ্ডিত ড. সুখময় সপ্ত-তীর্থকেও তিনি তথায় নিয়ে আসেন। শান্তিনিকেতনে কৃতি ছাত্র অনিল কুমার চন্দ, অপূর্ব কুমার চন্দ, অনাদি কুমার দস্তিদার ও সৈয়দ মুজতবা আলী। পরবর্তীতে অশোক বিজয় রাহা, ভূদেব চৌধুরী, বীরেন্দ্রনাথ পালিত বিশ্বভারতীর কিংবদন্তিময় শিক্ষক ছিলেন।

কবিগুরুর এম সি কলেজে প্রদত্ত আকাঙ্ক্ষা ভাষণের প্রেক্ষিতে তাকে পত্র লেখেন লেখক সৈয়দ মুজতবা আলী , জবাবও এল। অত:পর ১৯২১ সালের জুনে শান্তিনিকেতনের পাড়ী দেন তিনি। শান্তিনিকেতনের প্রথম মুসলিম ছাত্র সৈয়দ মুজতবা আলী দীর্ঘ ৫ বছর রবীন্দ্রনাথের কাছে শিক্ষা লাভ করেছিলেন। তিনি বিশ্বভারতীর কলেজ বিভাগের প্রথম বাইরের ছাত্রও ছিলেন । রবীন্দ্র সান্নিধ্যের আলোকবর্তিকা তাঁর জীবনে ভিন্ন মাত্রা এনে দেয়। স্বয়ং গুরুদেব তাঁকে অনেক কিছু শেখার পরামর্শ দিয়েছিলেন। তিনি যখন কাবুল শিক্ষা বিভাগে কাজ নেন তখন গুরুদেবের সান্নিধ্য ও শান্তিনিকেতনে অর্জিত বিদেশী ভাষা দক্ষতার জন্য তাঁর বেতন হয়ে যায় তুলনামূলক ভাবে ইর্ষনীয়। বরোদায় অধ্যাপনা পর্যায়ে গুরুদেবকে দেখতে গেলে কবিগুরু তাঁকে বরোদার মহারাজা বলে আদরে সম্বোধন করেন।

রবীন্দ্র সান্নিধ্যের পর সিলেটে বাংলা সাহিত্য তথা কবিতা, নাটক, গদ্য, রচনা ইত্যাদি বিকশিত হতে থাকে। আমাদের অগ্রজ সিলেটী শ্রী সতিশ চন্দ্র রায় এর লেখা থেকে পাওয়া যায় তাঁরা ‘বিশ্বভারতী’ এর আদলে ‘শ্রীহট্ট ভারতী’ গড়ে তোলার চেষ্টা করেছিলেন এবং রবীন্দ্রনাথের আশীর্বাদ কামনা করেছিলেন। পরবর্তীতে সিলেটে এরই ধারাবাহিকতায় সিলেট কালচারাল এসোসিয়েশন ও শ্রীহট্ট সাহিত্য পরিষদেরও উৎপত্তি হয়। এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৩৯ সালের দিকে ‘বানীচক্র’ সাহিত্য সংগঠন প্রতিষ্ঠিত হয় সিলেট। তারাও সংযোগ রক্ষা করেন শান্তিনিকেতনের সাথে।

আজকের শতবর্ষের ধারায় আমাদের সিলেটকে লক্ষ্য করলে দেখা যায় আমরা বাঙালি সংস্কৃতি, সাহিত্য ও মননশীলতার মূলধারা থেকে বিচ্ছিন্ন হইনি। সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক জাতীয় অগ্রগতির ধারায় আমাদের স্বকীয় সক্রিয় অংশগ্রহণ বিশ্বজুড়ে বিস্তৃত। রবীন্দ্র প্রভায় বহতা নদীর মত মানবতার কল্যাণে রাষ্ট্রীয় ও অঞ্চলগত ভাবেই আমরা নিরন্তর এগিয়ে চলেছি। সমকালীন সিলেটে রবীন্দ্র সংগীত, নৃত্য ও নাট্যকলায় আমরা অগ্রণী। শত শত তরুণেরা এগিয়ে এসেছেন। বর্তমান সময়ে রবীন্দ্রনাথ আগমনের যে স্মরনোৎসব আমরা করতে যাচ্ছি তা আঙ্গিক, আয়োজন ও পরিকল্পনায় অনন্য হতে চলেছে। সিলেটীদের উদারনৈতিকতা, বাংলার অকৃত্রিম সংযোগ, অসাম্প্রদায়িক চেতনা ও সম্প্রীতির বিস্তারে তা অনন্য। কেবল রবীন্দ্রনাথকে স্মরণ নয়, একে কেন্দ্র করে বাঙলা সংস্কৃতির বিস্তার জাতীয় ভাবধারার বিকাশ, বাংলা সাহিত্য চর্চা ও মানবিক মূল্যবোধের অগ্রসরতা আমাদের নূতন উচ্চতায় নিয়ে যাবে।

আমাদের উৎসাহ দিতে গুণীজন ও রবীন্দ্রানূরাগীরা সমবেত। বাংলাদেশের মাননীয় প্রধানমন্ত্রীও অংশ নেবেন।মাননীয় প্রধানমন্ত্রী যেভাবে শান্তিনিকেতনে ”বাংলাদেশ ভবন” উপহার দিয়েছেন- তেমনি ভাবে রবীন্দ্র প্রভায় মাননীয় প্রধানমন্ত্রী সিলেট কালচারাল একাডেমী ও ভবন উপহার দিলে আমরা অনুপ্রাণিত হব।
শতবর্ষ আগে সিলেটে এসে মুরারীচাদ কলেজে ”আকাঙ্ক্ষা” ভাষণে কবিগুরু বলেছিলেন-” মনুষ্যত্বের শিক্ষাটাই চরম শিক্ষা আর সমস্তই তার অধীনে। এই মনুষ্যত্ব হচ্ছে ”আকাঙ্ক্ষা” ঔদার্য, আকাক্সক্ষার দুঃসাধ্য অধ্যবসায়, মহৎ সংকল্পের দূর্জ্জয়তা।”

শতবর্ষের আত্মীয়কে তাঁর সৃষ্টি, আশীর্বানী এবং বাঙালী সংস্কৃতি ও সাহিত্য বিকাশের মহৎ সংকল্পের দূর্জ্জয়তাকে সাধনার ধারায় আমরা বরন ও স্মরণ করবো।

লেখক: সৈয়দ জগলুল পাশা, লেখক , সাবেক যুগ্ম সচিব ও জালালাবাদ এসোসিয়েশনের সাবেক সাধারণ সম্পাদক।

 


© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত মৃদুভাষণ - ২০১৪
Design & Developed BY ThemesBazar.Com