1. ahmedshuvo@gmail.com : admi2018 :
  2. mridubhashan@gmail.com : Mridubhashan .Com : Mridubhashan .Com

রবিবার, ০৮ ডিসেম্বর ২০১৯, ০৫:১০ পূর্বাহ্ন

মিনারা এখন সর্বহারা

শুধু গৃহবধূ মিনারার নয়, ঘূর্ণিঝড় বুলবুল তছনছ করেছে ভোলার চরফ্যাসন এলাকার বহু সংসার - ছবি সংগৃহিত

মৃদুভাষণ ডেস্ক :: ডোলবোঝাই চাল, আসবাবসহ ঘরভর্তি মালামাল- এসব নিয়েই বছরের অন্যদিনের মতো রাতে খেয়ে দুই শিশুকন্যাকে নিয়ে ঘুমিয়ে পড়েছিলেন মিনারা। মধ্যরাতে যখন ঘুম ভাঙে, তখন চারচালা টিনের ঘর, আসবাব, মালামাল কিছুই নেই। ঘূর্ণিঝড় বুলবুলের ছোবলে সবই উড়ে গেছে। শূন্যভিটা আর দুমড়েমুচড়ে রেখে যাওয়া ঘরের বেড়াসহ কিছু মালামাল ভিটিতে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে চারদিকে। এ যেন এক বিভীষিকাময় অবস্থা। বুকে চেপে ধরে আছেন দুই মেয়ে নীলিমা আর লাবণীকে। ঝড়ের আঘাত আর বৃষ্টির পানিতে ভিজে কাঁপছে সন্তান আর বৃদ্ধ শ্বশুর-শাশুড়ি। কী করবেন, কোথায় যাবেন ভেবে পাচ্ছেন না। ঘরে কোনো কাপড় নেই সন্তান আর শ্বশুর-শাশুড়ির গায়ে জড়ানোর মতো। পাশের ঘরের দিকে চেয়ে দেখেন, শূন্যভিটায় দাঁড়িয়ে চিৎকার করে বিলাপ করছেন প্রতিবেশী খলিল মাঝির পরিবারের লোকজন।

শনিবার মধ্যরাতে ঘূর্ণিঝড় বুলবুলের ছোবলে সর্বস্ব হারানোর বর্ণনা এভাবে দিলেন চরফ্যাসনের চরকলমি ইউনিয়নের দক্ষিণ চরমঙ্গল গ্রামের নির্মাণ শ্রমিক হাসানের স্ত্রী মিনারা বেগম। তার স্বামী হাসান নির্মাণ শ্রমিকের কাজ করেন ঢাকায়। ঝড়ের রাতে দুই মেয়ে আর শ্বশুর শহিদুল ইসলাম ও শাশুড়ি নিলুফা বেগমকে নিয়ে ঘরে ঘুমিয়ে ছিলেন। ঝড়ের আগাম বার্তা পেলেও ওই এলাকার কেউ আশ্রয়কেন্দ্রে না যাওয়ায় যাননি তিনিও। মিনারা জানান, এমন করে আঘাত হানার কোনো লক্ষণই ছিল না। স্বাভাবিক ছিল সবই। তা ছাড়া দুই বছর আগে নির্মাণ করা মিনারার চারচালা টিনের ঘরটি বেশ শক্তপোক্ত ছিল। ওই ঘরের ওপর ভরসা ছিল তার পরিবারের। কিন্তু বুলবুলের ছোবল ছিল মিনারার বিশ্বাসের চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী আর হিংস্র।

ঝড়ের পরদিন শেষ বিকেলে সরেজমিন দক্ষিণ চরমঙ্গল গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, মিনারার শূন্যভিটায় চার-পাঁচজন মানুষ যেন কী গুছিয়ে নেওয়ার কাজে ব্যস্ত। সাংবাদিকদের উপস্থিতি টের পেয়ে আশপাশ থেকে বেশ কিছু মানুষ জড়ো হয়েছে। কারা এলো, সেদিকে তেমন একটা খেয়াল নেই মিনারা ও তার শাশুড়ি নিলুফা বেগমের। বিকেল ঘনিয়ে সন্ধ্যা। দিনভর বৃষ্টির পর একটু বিরতি পেয়ে ভিটির চারপাশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা মালামাল কুড়িয়ে কুড়িয়ে শূন্যভিটায় জড়ো করছেন বউ-শাশুড়ি। দুমড়েমুচড়ে যাওয়া টিন, ভেঙে টুকরো টুকরো কাঠগুলো জড়ো করতে ব্যস্ত সদ্য গৃহহারা দু’জন, যেন ভেঙে যাওয়া স্বপ্নগুলো জোড়া দেওয়ার আপ্রাণ চেষ্টা। কাছে গিয়ে কেমন আছেন জানতে চাইলে চোখ ভিজে ওঠে এ গৃহকর্ত্রীর। নিজেকে সামলিয়ে নিয়ে বলেন, ‘আল্লাহ সব লইয়া গ্যাছে। অহন কী করমু? ভাঙা ভাগ্যে জোড়াতালি দিই। ভাঙাচোরাগুলো এক জায়গায় রাখি। আর কোনো কামে না লাগুক, চুলা তো ধরাইতে পারমু।’ কথা আটকে যায় মিনারার। দুঃখকষ্টগুলো জোর করে চাপিয়ে রাখার আপ্রাণ চেষ্টা তার। তবে নিজের অজান্তেই বেরিয়ে আসছে কষ্টগুলো। অন্ধকারে আকাশ ঢেকে রাত নেমে আসে, মিনারা শূন্যভিটায় বসে পুরোনো স্মৃতিচারণ করতে থাকেন। জানতে চাইলে বলেন, ‘রাইত মাইনষ্যের (অন্যের) বাড়িত থাকত অইব। নিজের ঘর তো নাই।’ বড় মেয়েকে পাশের বিলে পাঠিয়েছেন হাঁসগুলো খুঁজে আনতে। হাঁস ও মেয়ের অপেক্ষা করছেন তিনি।

মিনারার বাড়িটি নতুন। কবে এখানে ঘর তুলেছেন- জানতে চাইলে আলো-অন্ধকারে দাঁড়িয়ে থাকা মিনারার মুখ থেকে বেরিয়ে আসে মাথা গোঁজার জন্য একে একে গড়ে তোলা টিনের ঘরটির গল্প। বলেন, ‘আগে আমরা গাঙের পাড়ে (তেঁতুলিয়া নদীর পাড়) বেড়ির ঢালে থাকতাম। সেখানে ছোট্ট একটি ঘরে শ্বশুর-শাশুড়ি, সন্তানদের নিয়ে অনেক কষ্ট হতো। নদী সেই ভিটাও গিলে খেয়েছে। বিয়ের পর থেকেই স্বপ্ন দেখতে শুরু করি একটি বড় টিনের ঘর করার। বড় ঘর না থাকলে ভবিষ্যতে মেয়েদের ভালো জায়গায় বিয়ে হবে না। এ স্বপ্ন থেকেই কয়েক বছর আগে এ জমিটুকু কিনি। স্বামী ঢাকায় কাজ করেন। তার পাঠানো টাকায় সংসারে ব্যয়ের পরে কিছু সঞ্চয় করি। বৃদ্ধ শ্বশুরও বাড়তি কিছু আয় করতেন। বাপ-ছেলের অনেক কষ্টে জমানো টাকা দিয়ে দুই বছর আগে এই ঘর করেছিলাম। যোগাযোগ বন্ধ থাকায় স্বামী ঢাকা থেকে বাড়ি ফিরতে পারেনি। যান চলাচল শুরু হলে আসবে।’

মিনারার বড় মেয়ে নীলিমা স্থানীয় একটি স্কুলে পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ে, আর পাঁচ বছর বয়সী ছোট মেয়ে লাবণী স্কুলে যায় না এখনও।

মিনারার প্রতিবেশী আকবর হাওলাদারের বাড়িতে গত দু’রাত কাটিয়েছেন। কবে নাগাদ তার নতুন ঘর হবে, জানেন না। অনেকটা অনিশ্চয়তার মধ্যে চলছে তাদের জীবন। ঝড়ের পর তাৎক্ষণিক ২০ কেজি চাল ও শুকনো খাবার পেয়েছেন। ঝড়ের রাতে নিজের ঘরের চার মণ চাল ভিজে নষ্ট হয়ে যায়। কিন্তু ঘর নেই, রান্নার চুলা নেই, চাল দিয়ে কী করবেন? প্রতিবেশীদের দেওয়া খাবারই এখন তার ভরসা। সমকাল


© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত মৃদুভাষণ - ২০১৪
Design & Developed BY ThemesBazar.Com