শুক্রবার, ১৭ অগাস্ট ২০১৮, ০৭:৩৮ অপরাহ্ন

শ্রীনগর থেকে সোনামার্গ

নার্গিস জাহান :: বরফের হীরকোজ্জল গহনা পরা কাশ্মীর আমার দেখা হয়নি তাই বলে গ্রীষ্মের সবুজ শ্যামল প্রকৃতি যেখানে টিউলিপ থেকে শুরু করে বসে বাহারি রঙের ফুলের জলসাবসে,লাল নীল পোষাকের প্রজাপতির ফুলে ফুলে উড়ে মধু পান,কত নাম না জানা পাখীর গান,ঝর্ণা আর নদীর কুলকুল সুরে বয়ে চলা এটাও কোন অংশে কম নয়।আর এর সাথে যদি থাকে বরফ শোভিত পাহাড় তবে তা ষোল আনায় আঠারো আনা মানে সোনায় সোহাগা। না আমি গায়ে পরার সোনার কথা বলছি না বলছিলা সোনামার্গের জিরো পয়েন্টের কথা।যেখানে শীত এবং গ্রীষ্ম দুই ঋতুতেই ঠান্ডা আর বরফের আমেজ পাওয়া যায়। এমনসব রূপে মুগ্ধ হয়েই মোঘল সম্রাট জাহাঙ্গীর এই মাটিতে মৃত্যুর স্বাদ নিতে চেয়েছিলেন,বলেছিলেন পৃথিবীতে যদি কোন স্বর্গ থেকে থাকে তবে তা এখানে।শীত এবংগ্রীষ্ম দুই ঋতুতেই শীত এবং বরফের স্পর্শ উপভোগ করা যায়। কাশ্মীর ঘুরবো অথচ সোনামার্গ যাবোনা তা কি আর হয়?তো শুরু হয়ে গেল মিশন সোনামার্গ,জিরো পয়েন্ট।

সোনামার্গের অবস্হান হচ্ছে শ্রীনগর-লাদাখ মহা সড়কের পাশে।সমুদ্রপৃষ্ট থেকে এর উচ্চতা হচ্ছে৯৩০০ফুট।শ্রীনগর থেকে সোনামার্গ প্রায় আড়াই ঘন্টার পথ।সোনামার্গের মূল আকর্ষণ হচ্ছে থাজিওয়াস হিমবাহ।এছাড়াও রয়েছে গঙ্গাবাল,কিশানসার,নারা লেক, বালতাল ইত্যাদি।

কাশ্মীরে একটা প্রবাদ আছে যে,কাশ্মীরের মৌসুম,বোম্বের ফ্যাশন আর বউ এর মুড -এ তিন জিনিসের উপর কোন ভরসা নেই।আবহাওয়ার কথাটা একেবারে মিথ্যা নয়।সারাদিন রৌদ্রজ্জ্বল পরিবেশে ঘুরাঘুরি করলাম হঠাৎ দেখা বিকেল হতেই আকাশের মন খারাপ হয়ে গেল।বাতাসও সাথে ঠান্ডা ছড়াতে লাগলো।গুড়িগুড়ি বৃষ্টির মধ্যেই সন্ধ্যার পর শিকারে চড়ে কম্বল গায়ে দিয়ে করে ডাল লেক ঘুরতে বেরুলাম।ফিরে এসে সকালের মিশনের জন্য ঘুমিয়ে পড়লাম।বৃষ্টি ঠান্ডা তার উপর ভোর বেলা কম্বলের নীচ থেকে বের হতে কার এত ভাল লাগে তাপরও উঠতে হলো,কারণ সব কিছুই যে রুটিন মধ্যে।হাতে গুণা দিন,ঘড়ির কাটায় সময়।তা না মানলে যে অনেক কিছুই মিস হয়ে যাবে।

রাস্তার দুপাশে প্রকৃতির হৃদয় ছোঁয়া অভ্যর্থনার মধ্য দিয়ে আমাদের যাত্রা শুরু হলো।তারসাথে চলছে ক্যামেরার ক্লীক ক্লীক্।গাড়ীতে কখনো পান্জাবী, কখনো হিন্দি গান বেজে চলেছে।হঠাৎ ড্রাইভার ” ঝুম দূরে দূরে উড়ে উড়ে ” গান বাজিয়ে আমাদের চমকে দিলেন।বলেছিলামনা কাশ্মীরের মানুষ বাংলাদেশের মানুষকে খুব পছন্দ করে আর তাই বাংলাদেশের হিট গানের খবরও হয়তো রাখে।বৃষ্টি আর গানের সুরে তাল মিলিয়ে আমাদের গাড়ীও ছুটে চললো।মাঝপথে একটা ধাবায় নেমে আমরা সকালের নাস্তা সারলাম।নাস্তা খেতে খেতে কাঁচের দেয়ালের বাহিরে পাহাড়ের গায়ে মেঘ,ঝিরি ঝিরি বৃষ্টি দেখতে বেশ লাগছিল।

দেখতে দেখতে একসময় নদীর পাশে না নেমে পারলাম না।কেমন করে যে এতসব ক্যামেরায় ধরে রাখবো(আসলে কি ধরা যায়?)এক পাহাড়ের গায়ে পূজো পূজো মেঘ তো অন্য পাহাড়ে ঝর্ণা বয়ে চলেছে কেইবা বরফের রাজাই গায়ে দিয়ে ঘুমিয়ে আছে।এসব পাহাড় শুধু ট্রেকারদের জন্যই না পর্যটকদের প্রশান্তিতেভরে দিতে নিজেদের সৌন্দর্য্য নিঃস্বার্থভাবে মেলে ধরেছে।

সোনামার্গ যাওয়ার পথে জাজিলা পাসের সাইনবোর্ড নজরে পড়ে।জাজিলা পাসই কাশ্মীর আর লাদাখকে একসাথে যুক্ত করেছে।সোনামার্গ থেকে ১৫কিঃমিঃ দূরে বালতাল হচ্ছে অমরনাথ যাত্রার বেস ক্যাম্প।দূর থেকে ক্যাম্পের হেলিকপ্টারগুলো চোখে পড়লো।

আমরা যখন সোনামার্গের নির্দিষ্ট স্হানে পৌঁছালাম সেখান থেকে জিরো পয়েন্ট যেতে অন্য গাড়ী বা ঘোড়া ভাড়ানিতে হয়।পেহেলগামের এডভেঞ্চারের রেশ(ভয়টা গোপনই থাক) তখনো আমার কেটে যায়নি।বোট হাউজে থাকতেই ছেলেমেয়েদের কাছে জানতে চেয়েছি যে, আজোও কি আমাদের ঘোড়ায় চড়তে হবে।তখনই ওরা গাড়ী চড়ার আশ্বাস দিয়েছিল।তাছাড়া একেতো বৃষ্টি তার উপর জিরো পয়েন্ট মানে, ওখানে তাপমাত্রা জিরোও হতে পারে মাইনাসও হতে পারে।ঘোড়া ও গাড়ীর গতিবেগটাও মাথায় রাখতে হয়।গাড়ী ভাড়া নিয়ে বেশ মুলামুলি করতে হয়।গাড়ী ভাড়ার সাথে জ্যাকেট আর বুট ফ্রী(হা হা হা) দরকষাকষি শেষ করে জোব্বা আর বুট পরে মনে হলো নিজের ওজন একমণ! বেড়ে গেছে।ঠান্ডা থেকে বাঁচতে তাড়াতাড়ি গাড়ীতে চড়ে বসলাম।

জিরো পয়েন্টের রাস্তা পাহাড় কেটে করা।আর পাহাড়ি রাস্তাগুলো সবসময় আঁকাবাঁকা সর্পিল মনে হয়।গাড়ী যতই উপরে উঠছে সাথে সাথে ঠান্ডা বেড়েই চলেছে।ভাগ্যিস গাড়ীতে হিটার ছিল।রাস্তার এক বাম পাশে আকাশছোঁয়া পাহাড়ের দেয়াল তো অন্য পাশে কিছু-ই নাই।অন্য দিকে গভীর খাদ বা জংগল।আমাদের রাস্তার বিপরীত দিক থেকে আসা বড় বড় মালবাহি গাড়ি আমাদের পাশ কেটে যাওয়ার সময় মনে হচ্ছিল এই বুঝি নীচে পড়ে যাব।তাছাড়া বৃষ্টি জন্য রাস্তাও ছিল ভিজা কর্দমাক্ত।উপরে যেতে যেতে হঠাৎ গাড়ী থমকে দাঁড়ালো।সামনে তাকিয়ে দেখলাম পাহাড়ের গা থেকে গড়িয়ে গড়িয়ে ছোট ছোট পাথর পড়ছে।পাশে বড় বড় পাথরও পড়ে থাকতে দেখলাম।মনে পড়ে গেল আমাদের দেশের পাহাড় ধ্বসের করুন চিত্র।

যাচ্ছিতো যাচ্ছি জিরো পয়েন্ট যেনো আর আসে না অবশেষে জিরো পয়েন্টের দেখা মিললো।গাড়ী থেকে নেমে মনে হলো এক দৌড় দেই, কিন্তু একেতো গায়ে বোঝা সাথে বৃষ্টি ভেজা পিচ্ছিল বরফ।একজন ইতিমধ্যে ধপাস।এত ঠান্ডা মনে হচ্ছিল হাড় শক্ত হয়ে যাচ্ছে আর মুখ দিয়ে ধোয়া বের হচ্ছিল।শরীর গরম করতে খাবারের দোকান বসলাম।ওরা টিনের ভিতর আগুন জ্বলে রেখেছিল।আগুনের ধূয়া আর মুখের ধূয়া মিলেমিশে একাকার হয়ে গেল।লক্ষ্য করলাম পর্যটন এলাকার সব্টা দোকানে নুডুলস বেশ জনপ্রিয়।এত ঠান্ডা যে গরম নডুলস মুখে দিতে দিতে ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছিল।
এবার খান সাহেবের হাত ধরে বরফের উপর হাঁটতে শুরু করলাম।দেখলাম কেউবা স্লেজ কেউবা স্নো রাইডারে চড়ে বরফের চূড়ায় ঘুরে আসছে। কিছুদূর যেতেই ঠান্ডা আমাকে কুপোকাত করে ফেললো। এরই মধ্যে আমাকে ধরার সুযোগ না দিয়ে হাত গলে স্লিপারের মত একজন বরফে শুয়ে পড়লেন।ন্যাংড়ালুলা হওয়ার ভয়ে আর উপরে যাওয়ার সাহস হলো না।ঠান্ডায় মনে হচ্ছিল নীচে নামতে নামতে বুঝি হার্ট বন্ধ হয়ে যাবে।ইতিমধ্যে ছেলেমেয়েরা দৃষ্টিসীমার বাহিরে চলে গেছে।নীচে নেমে কিছুক্ষণ ছবি তুলে তাড়াতাড়ি গাড়ীতে চড়ে বসলাম।বাকীরা আসলে আবারও ঝুঁকিপূর্ণ রাস্তায় ফিরতে শুরু করলাম।শেষ হতে লাগলো ঢালু রাস্তা সেইসাথে শেষ হয়ে আসছিল ছেলেদের ছুটি। কাশ্মীর ছেড়ে যাব ভাবতেই মনটা খারাপ লাগছিল।কখন যে কাশ্মীরকে ভালবেসে ফেলেছি বুঝতেই পারিনি।ভূস্বর্গের কিছু দেখা হয়েছে,অনেক কিছুই দেখা হয়নি। আহা!যদি ইবনে বতুতা হতে পারতাম।আসলে অল্প কিছুদিনে কখনোই একটা দেশ দেখা হয়না।অনেক কিছু দেখা হয়েছে দেখা হয়নি ১৯৭১এ জন্ম নেয়া বাংলাদেশ নামের সেই ছোট্ট গ্রামটি।ঘোড়ার পিঠে চড়া হয়েছে চড়া হয়নি নুব্রা ভ্যালির দুকুজ বিশিষ্ট উট।

নীচে নেমে এসেও কারো মন চাইছিলনা গাড়ীতে উঠি।বৃষ্টিতে নেয়ে উঠা এত এত এত সুন্দর প্রকৃতি,মেঘ,বৃষ্টি, সবুজ পাহাড়,,মেঘলা আকাশ-কারিগরের এমন সৃষ্টি না আঁকা সম্ভব না ক্যামেরা বন্দী করা সম্ভব।প্রকৃতিতে মগ্ন থেকে কেটে গেল আরো কিছুক্ষণ।ফিস ফিডিং-এ গিয়ে মনে হলো আমাদেরওতো অনেক কিছু আছে আমরা কেন বিদেশীদের কাছে তুলে ধরতে পারিনা। বাহিরের ড্রাইভার পর্যন্ত চেষ্টা করে কিভাবে একজন পর্যটকের কাছে নিজের দেশের সব কিছু তুলে ধরবে।আর আমরা?

সুখ দুঃখের দোলাচলে ভাসতে ভাসতে শ্রীনগরের পথে চলতে লাগলাম।সারাদিন ঘুরাঘুরির পর সন্ধ্যায় শিকারে চড়ে ডাল লেকে কিছুক্ষণ ভেসে বেড়ালাম।রাতেই সব গোছগাছ করে ঘুমুতে গেলাম।কারণ ভোরে উঠে আবারো উড়াল দিতে হবে অন্য কোঁথাও অন্য কোনখানে। চলবে..

পেহেলগাম জয়ের গল্প

ভূ-স্বর্গ কাশ্মীরের পথে প্রান্তরে

শ্রীনগর থেকে সোনামার্গ

মেঘ বালিকার দেশে


© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত মৃদুভাষণ - ২০১৪
Design & Developed BY ThemesBazar.Com