সোমবার, ১৭ ডিসেম্বর ২০১৮, ০৩:০০ অপরাহ্ন

গিনি

সাব্বিরুল হক

সাব্বিরুল হক :: যার কথা বলতে যাচ্ছি সে হচ্ছে গিনি, আমার বিশ্ববিদ্যালয়ের সহপাঠি, বান্ধবী; বাড়ির এক মেয়ে, বাবা বিশাল ব্যাংকার, দেশের নামকরা বাণিজ্যিক ব্যাংকের প্রধান নির্বাহি, ব্যবস্থাপনা পরিচালক; যদিও সে ধরনের পার্থক্য আমাদের মধ্যে নেই, বান্ধবীর পরিবার সচছলের চেয়েও অনেক বেশি, অকল্পনীয় আয় ওর বাবার, পরিমান কিছুটা শুনেছিলাম ওর মুখেই একদিন; অবাক হয়েছি বেতনের অংক শোনে! বাংলাদেশে বসবাস করে ওদের ফ্ল্যাট বাড়ির অবস্থা আর সেখানে চলাফেরা উন্নত দেশের মতোই, কম কিছু না, গিনি চলাচল করে সব জায়গায়, প্রায় সবার সঙ্গে মিশতে পারে আমার চেয়ে ভাল, ক্লাসে ওর সহযোগী মনোভাবের জন্য সুখ্যাত। এমনিতে বোঝার উপায় নেই ঠিক কতটা অবস্থাপন্ন পরিবারের মেয়ে ও, শুরু থেকেই আমরা সহপাঠি, বোঝাপড়াটা শক্ত; আমাকে না জানিয়ে কোনো বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়না, চার বছরের পরিচয়ে এতটুকু ঘাটতি দেখা যায়নি সম্পর্কের মধ্যে, ঠিক জানিনা কিভাবে এতোটা কাছাকাছি হয়ে গেছি কখন গিনির সঙ্গে ! আমার গানের নেশা আর ঘোরাঘুরির অভ্যেস পছন্দ করে ও, সায় দেয় প্রায় সব কাজেই।
– চাকরি পাবো মনেহয় গিনি? জিজ্ঞেস করি ওকে।
– পাবেনা কেন? পাবে।
– কোথায় পাব? কে দেবে চাকরি?
– কেন, আব্বু আছে না?
– ততদিন কি তোমার আব্বু থাকবেন চাকরিতে?
– আব্বুর অবসরে যেতে দেরি আছে অনেক। এমবিএ শেষ করে নাও দেখব তারপর।
– ব্যাংকে চাকরি পাওয়া কি এতো সোজা গিনি?
একথায় বিরক্ত হয়, মুখ ফিরিয়ে রাখে অন্যদিকে, আমাকে ঘুরে যেতে হয় ওর দিকে। ঝগড়া আমাদের হয় ঠিক, তবে একমত হয়ে যাই দু’জনেই সব ঝগড়ার শেষদিকে এসে।
– রাগ করলে নাকি গিনি?
– না রাগ করিনি। বিরক্ত হয়েছি। তোমার বাস্তববুদ্ধির অভাব দেখে।
– বুঝলাম না।
– প্রাইভেট সেক্টরে চাকরি কেমন করে হয় জানোনা তুমি?
– পরিচিত মালিক, ব্যবস্থাপকরা থাকলে সুপারিশ করে। তাহলেই হয়ে যায়।
– পরিচালকদের কথায় সব চলে। এদেরই একজন ব্যবস্থাপনা পরিচালক। সুতরাং বুঝতেই পারছ চাকরির রহস্য কোথায়? আবার বিখ্যাত বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবী ছাত্রের জন্য ব্যতিক্রম আছে জানি।
– আমি তো গিনি প্রাইভেট ভার্সিটির ছাত্র। বিখ্যাত দূরের কথা, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়েই পড়িনি। তাহলে আমার কি হবে? চাকরি হবে ?
– সেভাবে এগোতে হবে। ধরতে হবে।
পড়ালেখা শেষে চাকরি, তার শেষে কি, ভাবতে গেলে আমি গিনির কথায় আশ্বাস পাই অনেক। কিন্তু সময়টা যে বদলে যায়, যেকোনো সময়ে; আনমনা হয়ে পড়ি গিনির পাশে বসেই। সামনের দিকে তাকাতে গিয়ে ব্যথা পাই কিসে যেন, আমাকে নামতে হবে জীবন জীবিকার খোঁজে, কাজ করে চলতে হবে কিছু একটা মানি, কিন্তু তা যদি হয় ৯টা-৫টার অফিস, তাহলে তো গেছি। গিনির দিকে তাকিয়ে অনেকদূরের ভবিষ্যত কিছুটা হলেও দেখতে পাই, তবে ভাবনা চিন্তা থেমে আসে কিছুটা; তার চেয়ে বিদেশে চলে গেলে কেমন হয়? গভীর রাতের একা আকাশ দেখার নেশা পেয়ে বসে আমাকে, দিনদুপুরে, আমি চলে যাই আরেক মনে, আরো অন্যকোথাও, অচেনা কোনখানে। আমি ভাবতে চাই, সারারাত জেগে যদি আকাশটাকে দেখতে থাকি তাহলে কি সময় কাটবে না আমার আরেকটু ভাল?

বুঝতে পারি, গিনির কথাবার্তায় পরিবর্তন এসেছে, বদলে যাচ্ছে বলব না, ঘুরেফিরে আছে আগের মতোই, থাকলেও, পার্থক্য লক্ষ্য করছি কথা বলার সুরে, কথা বলার সুর বলতে বোঝাতে চাচ্ছি আকার-ইঙ্গিতকে। গিনিদের আর্থিক অবস্থা আরো বেশি সচ্ছল হচ্ছে আগের চেয়ে, ব্যাংক থেকে গাড়ি পেয়েছেন গিনির বাবা নতুন মডেলের দুুটো, দাম জিজ্ঞেস করেছি একদিন, গিনি জানিয়েছে লেটেস্ট মডেলের ফোর হুইল গাড়ির দাম পঞ্চাশ লাখ, অন্যটা সিডান, দাম নিজেই জানে না ও। দ্বিতীয় মেয়াদে ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের দায়িত্ব পাওয়ার পর বেতন-ভাতাদি বেড়ে হয়েছে দ্বিগুন, এধরণের রদ-বদল বুঝতে চেষ্টা করা লাগে না, গিনি এখন কথা বলার পরিমাণ আর হাসা-হাসির মাত্রা কমিয়ে ফেলেছে, তাই বলে এতোটা কমায়নি যেখানে আমার সংশ্লিষ্ট হওয়ার সুযোগ নেই। এমবিএ প্রোগ্রামের শুরু থেকে এপর্যন্ত এসেছি একসাথে, এখন শেষের দিকে, কাছাকাছি আসাটা বাড়ছে, একদিন ক্লাসে না গেলে হয়ত কিছু না, পরপর দু’দিন হলে তো ফোন করে অস্থির করে ফেলবে । কেন যাইনি এই প্রশ্নের উত্তর দিতে-দিতে শেষ হয়ে যায় দম, সন্তোষজনক উত্তর আমাকে দিতেই হয়, গিনির কাছে সহজে কিছু লুকোনোর অভ্যেস হয়নি এ কয়টা বছরে। মাঝে মাঝে পরীক্ষার ফি জমা দিতে ভুলে যাই, কিন্তু ভুলে যায়না সে, জমা দিয়ে জানিয়ে দেয় পরীক্ষার সময়সূচী।

গিনি বললো,‘সহজে বললে মাথায় ঢুকেনা তোমার কোনকিছুই।’
– না না, এইটা আবার বেশি বলে ফেললে । ভুলে যেওনা, বিজনেস ম্যাথ আর মার্কেটিং ম্যানেজমেন্টে হায়েস্ট নম্বর কিন্তু আমাকেই দেওয়া হয়েছিল।
– ভুলে যাইনি বেশি নম্বর পেয়েছিলে তুমিই । আমার পাশেই সীট পড়েছিল সেটাও ভুলে যাওনি নিশ্চয়?
– তুমি কি বলতে চাও তোমার নকল করে পাশ করেছি?
– বলছি নাকি নকল করেছ। বলতে চাচ্ছি সুবিধা পেয়েছ অনেকখানি।
– শোনো গিনি, ওইসব পড়া পরীক্ষা কোনো ব্যপার না। আসলে আমি তো সিরিয়াস হই না। নইলে দেখতে সব পেপারেই সর্বোচ্চ গ্রেড পেতাম।
– এটা কেমন কথা হলো ! তাহলে ইচ্ছা করেই পরীক্ষার খাতায় কম নম্বর নিচ্ছ নাকি? অবাক।
– খুব বেশি নম্বর পেলেও কি লাভ হবে কোনো। চাকরি কি হয়ে যাবে বেশ কয়েকটা ?

গেল কয়েকদিন ধরে চিন্তা করছি মা-কে নিয়ে, চিন্তাটা স্বাভাবিক না, দুশ্চিন্তা নিয়ে থাকি না পারতপক্ষে। আমার অভ্যাস না এটা, কিন্তু মা-র ভাব-সাব, কথাবার্তা বেকায়দায় ফেলে দিয়েছে আমাকে। অন্য কারো সঙ্গে না বললেও গিনিকে বলতে হবে এসব কথা। বলতে হবে সঠিক বুদ্ধি পরামর্শ নিতে হয় যদি। পারিবারিক জটিলতা আমার চাইতে গিনি বুঝে অনেক বেশি ।
আমি বললাম,‘মা যে কি কারণে বললেন কথাগুলো বুঝতে পারিনি।’
– সেটা তোমার দুর্বলতা। বুঝতে চাইলে বুঝিয়ে দিতেন ঠিকই।
– তাহলে অনেককিছুই বুঝতে লাগতো আমার।
– উনি কি তোমার বাবাকে বলেছেন কিছু?
– না। বাবা তো বিদেশেই অনেক বছর।
– উনি কিন্তু কথা বলতে চাচ্ছিলেন তোমার বাবার সঙ্গেই তাই না?
– স্বাভাবিক ।
– তাহলে তোমাকে বলতে গেলেন কেনো একথা?
– তা তো জানিনা ।
– তোমার সাথে উনার ব্যক্তিগত আলাপ নিয়মিত হয়?
– আরে না। কবে জানতে চেয়েছে তোমার ব্যাপারে মনেই নেই। তাছাড়া আমার সঙ্গে কি!
একথা গিনিকে ভাবাতে পাওে না মোটেও, ভাবনা চিন্তা শুরু করতে অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে তাকায় অভ্যেস মতো, গিনির মুখ দেখে মনেহয় কোনো কথাই শুনেনি; ব্যাপারটা অনেকদিন ধরে অজানা আমার, গভীর একটা ভাবনা আছে ওর ভেতওে, যে চিন্তাটা মন চেপে ধরে প্রায় সময়ে, বেমানান গম্ভীর হয়ে পড়ে ও, খুব কাছের চেনা বান্ধবী হলেও তখনকার গিনি যেন আমার ঠিক পরিচিত নয়।
– আমার প্রশ্ন হচ্ছে, আমাদের বিষয়ে আগ্রহ কেনো উনার ?’
– মা খুব সহজ কোনো মানুষ না। চট করে উনার সম্বন্ধে কেউ কিছু বলতে সাহস পায় না। কারণ আছে অনেক গুলো বলেছি আগেও।
– আসলে তোমার সমস্যা মনে, গিনি বলতে শুরু করে,‘এমন লোক কমই আছে, যারা মুখ গুঁজে থাকে আর ফ্যামিলির কথা উঠলে হতবম্ভ দেখায় তাদের সবসময়। কারণ নিজের পরিবারের ভেতরের বিষয়ে ভয় ওদের ভীষণ!
– এটা আবার বেশি বলে ফেললে গিনি।’ আতœপক্ষ সমর্থনের চেষ্টা চালাই আমি। তাতে খুব একটা লাভ হবে না জেনেও।
– আমার কথা কি বললেন খালাম্মা?
– তেমন কিছু না।
– বলোনি যে পড়াশোনা করছি এখনো ?
– সে রকম কিছু জানতে চাননি তো?
– মানে?
– উনি শুধু জানতে চেয়েছেন কে, কি সম্পর্ক।
– আমার ব্যাপারে? তোমার সঙ্গে?
– হ্যাঁ।
– তুমি তখন কি বলেছো ?
– আমি কি বলবো ?
– কিছুই বলোনি ?
– না।
– বিভ্রান্ত করোনা তো !’ বিরক্ত হতে শুরু করে গিনি,‘এমন কথা ভুলেও আমার আব্বুর সামনে বলোনা কখনো।’
– আসলে কি বলবো গিনি। মার সঙ্গে কথা বলতে গেলে ভয় লাগে।
– এটা কেমন কথা!
– অবাক হচ্ছো গিনি ?
– নাহলে কি? পাঁচ-পাঁচটা বোন তোমার! ওদের বিয়েতে কথা বলবে কে তাহলে?
– আমি কি স্থানীয় অভিভাবক নাকি ? আমার বড় তিনবান আছে …
– আমতা-আমতা করছো কেনো ? কি বলতে চাও, বোনদের বিয়ে-শাদী তোমার বোঝার বিষয় না?
– বাবা আছেন। মা তো আছেনই । আর আমি তো সবার বড় না বাড়িতে।
– মানে বুঝলাম না।
– মানে বিয়ে টিয়ের বিষয় বুঝি না ভাল ।
– অন্য বিষয় ভাল বুঝ তাই না? বলোা কি বিষয়টা ভাল বুঝ? গান বাজনা?
– ঠাট্টা করছো নাকি গিনি?
– না না ঠাট্টা কেন করবো। বিয়ের কথাবার্তা কি হালকা নাকি?
– কিন্তু আমি তো মাকে কিচ্ছু বলিনি। কারণ উনিই বলেছেন কথা বললে বাবার সঙ্গেই বলবেন।
মুখ ঘুরিয়ে আবার অন্যদিকে তাকায় গিনি, আবার ওকে অচেনা লাগতে শুরু করে, আমার পাশে বসে চলে যায় যেনো অন্য কোথাও, বুঝতে চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়ে যাই, ধরতে পারি না কি চিন্তা কাজ করছে গিনির মধ্যে, আমি গিনির পাশে চেপে আসি, সরে আসি আরেকটু ধারে-কাছে, গিনির স্বান্নিধ্য উষ্ণ সব সময়, গিনিও সম্ভবত আমার ছোঁয়া পছন্দ করে। মুখ ঘুরিয়ে তাকায় ও আমার দিকে। প্রায় অপরিচিত এবং দূরবর্তী দেখায় ওকে।
গিনি বলে,‘আমাদের বিয়ের ব্যাপারে তাহলে কথা বলবে কে?’


গিনির বাবার ক্ছ থেকে ডাক পেলাম কিছুদিনের মধ্যেই, এ নিয়ে তিনবার হয়ে গেছে ডাকা-ডাকির, আমি গুরুত্ব দিচ্ছিনা, বলতে ভুল হল, গা করছি না, বিবেচনা করতে চাচ্ছি না, গিনি আমার শুধু বান্ধবী না, ঘনিষ্ঠতম একজন, সব ধরণের কথা-বার্তার সঙ্গে একমাত্র গিনিই সংশ্লিষ্ট, ওর সবকিছু আমি নিয়ে থাকি বিশেষ গুরুত্বে, গোপন বলে তেমন কিছু নেই এখন আর আমার আর গিনির ভেতর, ওর সাথে কথা বলার সুবিধে অনেক, আমার বোনদের থেকেও স্বাচ্ছন্দ বেশি পাই গিনির কাছে; ব্যক্তিগত কি আর পারিবারিক হোক, বিষয় যত জটিল কঠিন পড়াশোনারই হোক আমাদের বোঝাপড়া অন্যদের কাছে অবিশ্বাস্য, সেই গিনির কাছে একটা কথাই জট খোলে না আমার; ওর বাবার বিষয়! নিজেকে আমার কাছে দূরবর্তী মানুষই মনে হয়, বিশিষ্ট ব্যাংকার বলে ওর বাবা হয়ত সমীহ করার মতো কেউ, কিন্তু গিনি কখনো এরকম কোনো ভূমিকা আনেনি আমার সামনে, প্রয়োজন পড়েনি হয়ত, আমি ভাল করে বুঝতে পারি ব্যবধানটা কোথায়, কে বুঝতে পারে আমার থেকে বেশি, আর্থিক অবস্থা নিয়ে পার্থক্য দেখানোর মেয়ে কিন্তু সে নয়, ভার্সিটিতে আলাদা গ্রহণযোগ্যতা গড়ে উঠতে এই একটা কারণই যথেষ্ঠ ছিলো গিনির।
আমতা-আমতা করে বলি,‘ঊনি তো ডাকেননি গিনি?’
আমার কথায় বিরক্ত হয়না গিনি, অসহিষ্ণু হয়ে পড়ে কিছুটা,‘কে ডাকেননি তোমাকে?’
– ব্যাংকার সাহেব।
– তাহলে কে ডেকেছেন?
– আমার মনে হচ্ছে তুমিই ডেকেছো।
– ফাজলামো করছো নাকি?
– তোমার কি মনেহয় ?
– তোমাকে ডাকা হচ্ছে কেনো শুনতে হবেনা একবারও?
– তোমার মুখ থেকে শুনলে হয়না?
– কি!
– আমার শোনা কি খুব জরুরি? কি এমন কথা বলোনা একটু?
– আমি কি করে বলবো!’ অবাক হতে গিয়ে ব্যর্থ হয় গিনি, আমার নির্বিকার মুখের দিকে তাকিয়ে।
সাগরের ঢেউয়ের মতো মনেহয় গিনিকে আমার, যেন ছুটে আসছে অনেকদূর দিয়ে, আছড়ে পড়ছে চারপাশে, শব্দহীন ঢেউ, তবে বাতাসের হলকা আছে সঙ্গে, থাকলেও ঝড়ের পূর্বাভাস নয় মোটেও; গিনি আমার হাত ধওে, বেশ শক্ত করেই, এতে অবশ্য আমি অভ্যস্থ, অনেকদিন ধরে একসঙ্গে চলাফেরা করার কারণে, আমার জানা আছে এবার সহজে হাত ছাড়বে না গিনি, জেদ বেশি ওর অনেক, আতœবিশ্বাসের কমতি দেখিনি ওর মধ্যে, মন শক্ত করে ধরা জেদের বেলায় একেবারে হার না মানা সে, এমবিএ ক্লাসের সবচেয়ে শক্ত বিষয়গুলো যেভাবে আয়ত্বে আনে, দেখার মতো। আমি যে কারণে পুরোপুরি নির্ভর করে আসছি ওর পরামর্শে, ব্যতিক্রম করতে গেলেই বিপদ ঘনিয়ে আসবে আমার, সে ব্যাপারে সচেতন থেকেছি বরাবর।
গিনি ওর বাবা সম্বন্ধে খুব বেশি ধারণা দিতে চায়না, সবার কাছে তো না-ই, দামি গাড়ি নিয়ে ভার্সিটিতে আসতে দেখেনি কেউ ওকে, আমার মনে হয়েছে প্রকৃত আর্থিক অবস্থা কৌশলে লুকিয়ে রাখে সে, লুকিয়ে কি রাখা যায় এতো সহজে? কেউ না কেউ বের করে ফেলে গুমোর, সুযোগ পেলে চেপে ধরে এটা-ওটা খাওয়ানোর জন্য, সহপাঠিদের পেছনে খরচ অবশ্য অত্যধিক করে গিনি, বিশেষ কেউ হয়ে উঠতে পেরেছে মূলত এ কারণে, আর ওর বন্ধুত্বসূলভ ব্যবহারের কথা তো আগেও বলেছি, তবে এটাও ঠিক, বাবার উচুঁ পদের বেসরকারি চাকরিটাই ওকে আলাদা করে ফেলেছে সবার মধ্যে, ব্যাপারটায় ভাল সচেতন ও। গিনির বাবা আমাকে ডাকার কারণ নিয়ে দুশ্চিন্তা হয় না, গিনি থাকতে আমার কোনো সমস্যা হবে না, এটুকু নিশ্চয়তা চোখ বুঁজে পাই; তাই অনিচ্ছা থাকলেও ওর সাথে রওয়ানা হয়ে যেতে আপত্তি থাকে না।
গিনির বাবা রাশভারি, আমাকে দেখে চেহারা গম্ভীর হয়ে গেল, হয়ে গেল ঠিক না, শক্ত করে তুললেন; এ আমার পরিচিত দৃশ্য, উঁচু পর্যায়ের লোকজনের দূরত্ব বজায় রাখতে হয় সাধারণের সঙ্গে, আমাদের বয়েসি কেউ হলে তো দূরত্বটা রাখতে হবে নিরাপদ; বহু অনুরোধ-উপরোধ শুনতে হয় ব্যবস্থাপনা পরিচালক মহোদয়কে, আমি ধারণা করি, প্রতিদিনই। কিন্তু আমি তো কোনো তদবির-সুপারিশের সুযোগ নিতে যাচ্ছি না, আসতে চাইনি, ডেকে এনেছেন ঊনিই। আমার সাহস ফিরে আসে, স্বাভাবিকভাবে আমি সালাম করি গিনির বাবাকে। পেশাদারি ভঙ্গিতে বসতে ইশারা করেন আমাকে।
– কি খবর তোমাদের?’ ভারি গলায় জানতে চান,‘পড়াশোনা চলছে কেমন?’
এগুলো প্রশ্ন হিসেবে নেহাতই সবাই করে থাকে। আমাকে বিচলিত করতে পারার কারণ নেই । মনে ফিরে আসা সাহসকে ধরেই থাকি আমি। তবে বজায় রাখতে হয় আচরণ। আগেই সাবধান করে নিয়েছে গিনি।
– জ্বি পড়াশোনা চলছে ঠিক মতো।
– এমবিএ প্রোগ্রাম শেষ হতে কেমন আর?
– মাত্র এক সেমিষ্টার বাকি আছে।
বিশাল বিত্তবহুল বাড়ি-ঘরে যাতায়াতের অভ্যেস, অভিজ্ঞতা আছে আমার, বাণিজ্য আর সংস্কৃতি দু’ জগতের সাথে জড়িত অনেক বড়লোকদের সাথে আমার রয়েছে ব্যক্তিগত পরিচয়, তাই বলে তাদের সঙ্গে মিলাতে পারি না গিনির বাবাকে; সম্পর্কের ভিন্নতা কাজ করতে শুরু করে দিয়েছে মনে-মনে টের পাচ্ছিলাম, দামি-দামি আসবাবে ভর্তি ড্রইংরুমে বসে ঘেমে যাওয়ার কথা না আমার সঙ্গত কারণেই, আগের অভিজ্ঞতার জোরে।
– কি ভাবছো ?
– জ্বি আপাতত তেমন কিছু ভাবছি না।
– মাস্টার্স শেষ করে চাকরি করবে?
– জ্বি ঠিক করিনি এখনো।
– ঠিক করোনি মানে? কি করতে চাও তাহলে?
গিনির মা এসে যোগ দিয়েছেন দেখলাম, গিনিকে পাশে নিয়ে মনোযোগ দিয়ে পর্যবেক্ষণ চালিয়ে দিয়েছেন ইতোমধ্যে।
– ও তো আবার গান-টান গায়। তাই না? কি যেনো নামটা তোমার?
আমার অস্বস্তি দেখা দেয় গিনির মায়ের কথায়, কথা না বাড়ানোর প্রয়োজন টের পাই, অবশ্য গিনি রয়েছে আশে-পাশে ভেবে কাটাতে চাই পরিবেশ ।
– জ্বি আমার নাম তানভির মাসুদ।
– জানিতো বাবা। গিনি বলেছে আমাকে। তোমার বাড়ির সবার নামই আমার জানা আছে। তোমার বোনদের সঙ্গেও তো কথাও হয় মাঝে-মাঝে।
– জ্বি বুঝতে পারছি।
– অমন অস্থির দেখাচ্ছে কেনো তোমাকে বলো তো!
– না অস্থির না খালাম্মা। আমার কাজ আছে তো একটু তাই।
– কি কাজ তোমার?’ গিনি বাধা দেয়,‘আজকে ছূটির দিন ভুলে গেলে নাকি?
– ফরেন এনজিওর প্রোগ্রাম আছে একটা।
– অজুহাত দিচ্ছো কেনো?’ আবারও শক্ত অবস্থান নেয় গিনি, বিপর্যয় দেখতে পাই আমি।
গিনির বাবা উঠে দাঁড়ান,‘কাজ আছে, ওকে যেতে দিতে হবে। তবে আমার মনেহয় অহেতুক বেশিদিন সময় নষ্ট করবে না ও। কি বলো তানভির মাসুদ?’
চলে যান গিনির বাবা, ড্রইংরুম ভর্তি উচ্চবিত্ত খাবার আমাকে আর আকর্ষণ করতে পারে না, গিনির বাবার বক্তব্যটা বুঝতে দেরি হয়নি; ঠিকই আছে, বাস্তবতাটা সামনে নিয়ে এসেছেন, নিজের অবস্থান শনাক্ত করার চেষ্টা করি, সমাধান পাই না খুঁজে।
– তোমার তো বেশ কয়েকটা বোন আছে বিয়ের বাকি, তাই না ?’ গিনির মা বলেন,‘বিয়ে দিয়ে দিচ্ছো না কেনো ওদের ?’
মুখ বন্ধ করে, দম না নিয়ে শুনতে থাকি কথাগুলো, ভেবে পাই না কি বলতে পারি। কি বলা সঙ্গত হয় আমার। আমি বলি,‘জ্বি খালাম্মা, আমার বড় তিন বোন বিয়ের বাকি।’
– দুশ্চিন্তায় ফেলে দিলে তো বাবা। ওদের বিয়ে না দিয়ে তুমিও করতে পারবে না কোনোকিছু !


এক মাস পরেই গিনির বাবার ফোন দিলেন আবার, জানতে চাইলেন কেমন আছি; পরিবারের ভালমন্দ জানার আগ্রহও লক্ষ্য করলাম গিনির বাবার কথায়, কথা সংক্ষেপে করতেই অভ্যস্ত বলেই জানি ব্যবস্থাপনা পরিচালক সাহেবকে, এবার কিন্তু বেশ লম্বা করলেন, অবাক হলাম ঠিকই সাথে একটা দুশ্চিন্তাও, কারণ কি?
– তারপর তোমার খবর বল মাসুদ। চাকরি করবে।
– সিদ্ধান্ত নিতে পারিনি আঙ্কেল। তবে নিয়ে ফেলব শিগগীরই।
– এখনো সিদ্ধান্ত নিতে বাকী? বলো কি! অবাক করছ তুমি।
– কিছু সমস্যায় আছি তো, এজন্য।
– ওগুলো তোমার মিথ্যা অজুহাত বুঝলে। কোনো সমস্যা আসলে সমস্যা না। আর অযথা ঘুরে বেড়ানোর নেশা আশাকরি নামিয়েছ মাথা থেকে?
– আমি এখন ঘুরাঘুরি করি না।
– খুশী হলাম শোনে। এসব পাগলামি তোমাকে মানায় না। ভালই করেছ । এখন চাকরির পেছনে ছুটো।
– আমি নিরুত্তর থাকি গিনির বাবার মন্তব্য শুনে, কি করতে পারি, কোথায় ঘুরাঘুরি আর কোথায় চাকরি।
– অনেক্ষণ নিরব রয়েছি বলে গিনির বাবা বেশ জোরে বললেন,‘ কি হল কি ভাবছ ? ও হ্যাঁ, তোমাকে তো বলা হয়নি । সুখবর আছে একটা।
– জি, বলেন কি সুখবর।
– শুনে নিশ্চয়ই খুশী হবে, গিনির এডমিশন হয়ে গেছে, চলতি মাসেই চলে যাবে অস্ট্রেলিয়া। তোমাকে আগেই বলা উচিত ছিল, দুঃখিত, ভুলে গেছিলাম।

গিনি চলে গেল বিদেশে পড়াশোনা করতে, মাস্টার্স শেষ করতে হল নিজে-নিজে একাই। সমস্যা হলেও মানিয়ে নিয়েছি একা চলাকে, এখন আর কাউকে নিয়ে আলাদা করে ভাবার সময় আমার হাতে পাই না।
আমার ব্যস্ততা এখন মা-র ডাক্তার-চিকিৎসা নিয়ে, কিছুদিন পর-পর দিতে হয় কেমো থেরাপি, নিয়ে যেতে হয় বিশেষায়িত হাসপাতালে; মরণরোগ ক্যান্সার ধরা পড়েছে মায়ের। একটা শখের বাইক ছিল,বিক্রি করে দিয়েছি মায়ের ডাক্তার খরচ চালিয়ে যেতে গিয়ে। বাসার ফেলে রাখা সেলাই মেশিনটা চালু হয়েছে, আশ-পাশের বাসা-বাড়ির মেয়েদের পোষাক সেলাই করে দেয় বোনেরা, রাতদিন চালিয়ে আয় করে কিছু, বাড়ির খরচের কাজে দেয় সেই রোজগার।

কেটে যায় আরো কিছুদিন, একরকম বাধ্য হয়ে চাকরি নেই সেই প্রাইভেট ইউনিভার্সিতে, যেখান থেকে এমবিএ করেছিলাম; আমার অবস্থা বুঝে বদান্যতা দেখান ভার্সিটি কর্র্তৃপক্ষ। গিনির বাবার কাছে চাকরি চাইতে যাইনি শেষপর্যন্ত। কেন যেন মনে হয়েছে গিনির বাবা আসলে আমাকে চাকরি দেবেননা , কেন দেবেন না তার কারণও কিছুটা অনুমান করতে পেরেছি আগে-ভাগেই। দুঃসময় আমাকে বোকা আর অসহায় বানিয়ে চলেছে, তবে হতবুদ্ধি বানাতে পারেনি এখনো। আতœীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধবরা কেউ এখন আর আসে না, আর মায়ের জন্য নিয়মিত সেবা-শুশ্রুষা চালিয়ে নিতে হলে খুব সম্ভব বাড়িটাও বিক্রি করে দিতে হবে আমাকে। বাড়ি বেচে দিয়ে কোথায় যাবো জানি না। গিনির ই-মেইল পাই মাঝে মধ্যে, জানতে চায় পড়াশোনার খবর, চাকরি করছি কি-না, কি চাকরি সেটা, বেতনই বা কেমন; আর বিশেষ করে এ খবর জানার চেষ্টা করে যে বোনদের বিয়ে দিতে পারলাম নাকি, কিংবা আমি তানভির মাসুদ, বিয়ে-থা করতে পেরেছি কি শেষ পর্যন্ত।

লেখকের অন্য পড়তে ক্লিক করুন-

ছোট ছিলাম একাত্তরে-১

ছোট ছিলাম একাত্তরে – ২

ছোট ছিলাম একাত্তরে-৩

ছোট ছিলাম একাত্তরে – ৪

অপ্রাকৃতিক

গিনি

সত্য গল্প : কলিগ

জ ন শূ ন্য

 


© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত মৃদুভাষণ - ২০১৪
Design & Developed BY ThemesBazar.Com