সোমবার, ২০ অগাস্ট ২০১৮, ০১:৩১ পূর্বাহ্ন

ফলোআপ : বড়লেখায় সাপের কামড়ে মৃত ছাত্রীর সৎকার হয়নি ৩ দিনেও, ঝাড়ফুঁক নিয়ে এলাকায় চাঞ্চল্য

লিটন শরীফ, বড়লেখা (মৌলভীবাজার) প্রতিনিধি :: মৌলভীবাজারের বড়লেখায় সাপের দংশনে মারা যাওয়ার ৩ দিনেও সৎকার (মৃতদেহ দাহ করবার কাজ) হয়নি কলেজ শিক্ষার্থী শিবানী রানী দাস (২৫) এর লাশ। গত তিনি ধরে মৃত শিবানীকে জীবিত করার আশ্বাস দিয়ে ওই শিক্ষার্থীর পরিবারের সাথে রীতিমত খেলায় মেতে উঠেছে ওঝাঁরা। চিকিৎসকরা গত (০৬ আগস্ট) সোমবার সকালে শিবানীকে মৃত ঘোষণার পর পরিবার তাঁর লাশ বাড়িতে আনা হয়। বৃহস্পতিবার (০৮ আগস্ট) রাত সাড়ে ৯টায় এ সংবাদ লেখা পর্যন্ত লাশের সৎকার (মৃতদেহ দাহ করবার কাজ) নিয়ে সিদ্ধান্তহীনতায় রয়েছে শিবানী দাসের পরিবার।

শিবানী রানী দাস উপজেলার দাসেরবাজার ইউনিয়নের সুনামপুর গ্রামের মনোরঞ্জন দাসের মেয়ে। তিনি সিলেট এমসি কলেজের মাস্টার্সের ছাত্রী এবং স্থানীয় একটি বেসরকারি স্কুলের শিক্ষিকা ছিলেন।

বাড়িতে নিয়ে আসার পর থেকে চিকিৎসকের মৃত ঘোষিত শিবানীকে বাঁচিয়ে তোলার আশ্বাসে ওঝাদের একদল সটকে পড়ে আরেক দল ঝাড়ফুঁক শুরু করছে। সোমবার (০৬ আগস্ট) থেকে মঙ্গলবার (০৭ আগস্ট) রাত পর্যন্ত চলে এ ঝাড়ফুঁক।

এদিকে মঙ্গলবার (০৭ আগস্ট) বিকেল থেকে শান্তনা বিশ্বাস নামের এক নারী নিজেকে সর্পদেবী মনসা (মনসা হলেন একজন লৌকিক হিন্দু দেবী) দাবি করেন। তিনি লাশের সৎকার না করে নদীতে ভাসিয়ে দিতে ওই পরিবারকে ভয়ভীতি দেখান। না হলে পরিবারের আরো সদস্যের বড় ধরণের ক্ষয়ক্ষতি হতে পারে বলে কথিত সর্পদেবী মনসা বলেন। এরপর থেকে লাশ নদীতে ভাসিয়ে দেবে কি-না সৎকার করবে (মৃতদেহ দাহ করবার কাজ) তা নিয়ে সিদ্ধান্তহীনতায় রয়েছে শিবানী দাসের পরিবার।

সরেজমিনে ওই বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, সাপেকাটা ওই কলেজছাত্রীর বাড়ির সামনে গাড়ির দীর্ঘ লাইন। শত-শত উৎসুক জনতা ভিড় করছেন। লোকজনের ভীড় সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছেন নিহতের স্বজনরা। নিহত কলেজছাত্রীর লাশ আগের মতই বাড়ির উঠানে রয়েছে। সময় বাড়ার সাথে সাথে লাশ ফোলতে শুরু করেছে। সোমবার রাতে ঝাড়ফুঁক শুরু করা ওঝা বালাগঞ্জের ওঝা উস্তার আলী ইতিমধ্যে বিদায় নিয়েছে।

নিহত শিবানী রানী দাসের কাকাতো ভাই কাতার প্রবাসী চন্দন কুমার দাস (০৮ আগস্ট) সন্ধ্যায় সাংবাদিকদের বলেন, ‘শান্তনা বিশ্বাস নিজেকে বিষরী (সর্পদেবী মনসা) পরিচয় দেন। আমার বোনকে বাঁচানোর আশ্বাস দেন। পরে বলেছেন আর বাঁচানো যাবে না। তিনি ভেলায় করে নদীতে লাশ ভাসিয়ে দিতে বলেছেন। না হলে আমাদের পরিবারের বড় ধরনের ক্ষতি হবে। সে জন্য আমরা ভয়ে আছি। লাশ ভাসিয়ে দেব কি-না সৎকার করব এটা নিয়ে বড় দুশ্চিন্তায় আছি। তবে বিষরী (সর্পদেবী মনসা) আমাদের অনুমতি দিলে আমরা লাশ সৎকারে ব্যবস্থা করব।’

ওই বাড়িতে কথা হয় কথিত সর্পদেবী মনসা শান্তনা বিশ্বাসের সঙ্গে। তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ‘তাঁকে (শিবানীকে) আর বাঁচানো সম্ভব নয়। বাঁচাতে আমরা সব ধরনের চেষ্টা করেছি। আমি স্বপ্নে দেখেছি ওকে নদীতে ভাসিয়ে দিতে হবে। তাই ভাসিয়ে দেওয়ার জন্য বলেছিলাম।’ ভয়ভীতির বিষয়ে তিনি (শান্তনা বিশ্বাস) বলেন, ‘ভয়ভীতি আমি দেখাইনি। এটা সঠিক নয়। তবে লাশ ভাসিয়ে দেওয়া হবে কি-না বা সৎকার করা হবে এ বিষয়ে প্রশ্ন করলে তিনি কোনো কথা বলেননি।’

অন্যদিকে বৃহস্পতিবার (০৮ আগস্ট) রাত ৭টার দিকে ঘটনাস্থলে যায় থানা পুলিশের একটি দল। তাঁরা লাশের সুরতাহল প্রতিবেদন তৈরি করেন।

লাশের সুরতহাল প্রস্তুতকারী বড়লেখা থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) মোঃ মাজহারুল ইসলাম বৃহস্পতিবার (০৮ আগস্ট) রাত সাড়ে ৯টায় বলেন, ‘খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে যাই। তিন দিন আগে মেয়েটিকে সাপে কেটেছে। ডাক্তার বাঁচাতে পারেনি। কিন্তু স্বজনরা মন সান্তনা দিতে ওঝা দিয়ে ঝাড়ফুঁক করিয়েছেন। নিহতের পরিবার ময়নাতদন্ত ছাড়া লাশ সৎকার করার জন্য যথাযথ কর্তৃপক্ষের বরাবর আবেদন করেছেন।’

এ ব্যাপারে বড়লেখা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মুহাম্মদ সুহেল মাহমুদ বৃহস্পতিবার (০৮ আগস্ট) রাতে বলেন, ‘ঘটনাটি শুনেছি। চিকিৎসকের মৃত ঘোষিত ব্যক্তিকে ঝাড়ফুঁকে জীবিত করার নজির নেই। পরিবারের লোকজন আমার কাছে এসেছিলেন। আমি তাদের সাথে কথা বলেছি। ধর্মীয় রীতি অনুযায়ী সৎকার করতে বলেছি। এছাড়া তাঁরা ময়নাতদন্ত ছাড়া লাশ সৎকারের জন্য যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন করেছেন।’

উল্লেখ্য, গত রবিবার (০৫ আগস্ট) দিবাগত রাত আনুমানিক ১১টার দিকে নিজ বাড়িতে সাপের কামড়ে আহত হন শিবানী দাস। ওই রাতে আহত অবস্থায় শিবানীকে সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পর দিন সোমবার সকাল ৮টার দিকে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

 

বড়লেখায় সাপের কামড়ে কলেজ ছাত্রীর মৃত্যু, সুস্থ করার নামে চলছে ওঝাদের ঝাড়ফুঁক


© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত মৃদুভাষণ - ২০১৪
Design & Developed BY ThemesBazar.Com