শুক্রবার, ১৭ অগাস্ট ২০১৮, ০৭:৩৮ অপরাহ্ন

মেঘ বালিকার দেশে

সাজেক

নার্গিস জাহান ::

সাজেকে লেখক

দেখা হয় নাই চক্ষু মেলিয়া
ঘর হতে শুধু দুই পা ফেলিয়া
একটি ধানের শিষের উপর
একটি শিশির বিন্দু”
শত ভেজালের এই যুগে এই কথাটি কিন্তু একশত ভাগ সত্যি।আমাদের থলেতে যদি কিছু ছুটি অথবা অর্থ জমা পড়ে যায় তবে আমরা কোন দেশে বেড়াতে যাব সেই চিন্তাই সবার আগে মাথায় আসে।অথচ প্রচার ও তুলে ধরার অভাবে আমাদের দেশের অনেক আকর্ষনীয় দর্শনীয় স্হান আমাদের দেখা হয়ে উঠে না।
বান্দরবান, কক্সবাজারের অনেক দর্শনীয় স্হান দেখা হলেও রাঙ্গামাটির সাজেক দেখার সুযোগ আমার হয়ে উঠেনি।সাজেকের হৃদয় হরণ করা সৌন্দর্যের গল্প শুনতে শুনতে এবার নিজেই সাজেক যাওয়ার প্রস্তুতি নিয়ে ফেললাম।

সাজেক

সাজেক হলো রাঙ্গা মাটি জেলার অন্তর্ভূক্ত বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় ইউনিয়নের নাম।খাগড়াছড়ি থেকে এর দূরত্ব হচ্ছে ৭০কিঃমিঃ।রাঙ্গামাটির চেয়ে খাগড়াছড়ি থেকে সাজেক যাওয়া অনেকটা সহজ।সমতল থেকে সাজেকের উচ্চতা হচ্ছে ১৮৬০ বর্গফুট।সাজেক ভ্যালির উত্তরে ভারতের ত্রিপুরা,দক্ষিণে রাঙ্গামাটির লংদু,পূর্বে ভারতের মিজোরাম আর পশ্চিমে খাগড়াছড়ির দীঘিনালা।সাজেকের প্রথম গ্রাম হচ্ছে রুইলুই পাড়া আর শেষ গ্রাম হচ্ছে কংলক পাড়া।এখানকার আদি বাসিন্দা হচ্ছে লুসাই গোষ্ঠী।তাছাড়া রয়েছে পাংকুয়া ও ত্রিপুরা জনগোষ্ঠী।

এতদিন জেনে আসছিলাম যে,পূর্ণিমার রাতে চাঁদের আলোয় প্রকৃতি বনবনানী ভাসিয়ে নিয়ে যায় আর তাই বুঝি জ্যোৎস্না রাতে সবাই বনে যেতে চায়।তেমনি একটা ইচ্ছা আমিও মনে মনে পোষে আসছিলাম।কিন্তু না আমার হিসাব নিকাশ একপাশে রেখে ছেলে বললো বর্ষা-ই সাজেক বেড়ানোর সঠিক সময়।সবুজ প্রকৃতি আর হাত বাড়িয়ে মেঘ ছুঁতে পারার এখনই সময়।এমন রূপকথার গল্প আগেতো কখনো শুনিনি।

সাজেক রিসোর্টে রুম খালি পাওয়ায় দুদিনেই খাগড়াছড়ি হয়ে সাজেক যাওয়ার প্রস্তুতি নিয়ে নিলাম।তালিকায় খাগড়াছড়ি এজন্য নিলাম কারণ,ওখানেও রয়েছে অনেক দর্শনীয় স্হান।শহরটি বেশ পরিপাটি আর পরিচ্ছন্ন।এখানে অরণ্য কুঠির নামে রয়েছে বৌদ্ধদের তীর্থস্হান।এছাড়া রয়েছে মহাল ছড়ি হ্রদ, আলুটিলা গুহা।উপজেলা শহরে রয়েছে পাহাড়ি পথ হাতিমুড়া।আলুটিলা থেকে ২কিঃমিঃ দূরে রয়েছে রিসাং ঝর্ণা।
প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্য্য দেখতে দেখতে সকাল ৯ঘটিকায় খাগড়াছড়ি থেকে সাজেকের পথে রওয়ানা হলাম।রাস্তার দুই পাশে সুদৃশ্য পাহাড় আর সবুজ অক্সিজেনের ফেক্টোরি থেকে নির্মল নিশ্বাস নিতে নিতে দীঘিনালা পেরিয়ে গাড়ী ছুটে চললো রুইলুই গ্রামের সাজেকের উদ্দশ্যে।সমতল থেকে উপরে চলে যাওয়া আঁকাবাঁকা রাস্তা দেখতে ভীষন ভাল লাগছিল।এমন নির্মল পরিবেশে গাড়ীর এসি বন্ধ করে জানালা খুলে দিতেই হলো।
পথিমধ্যে কয়েকটি আর্মি ও বি জি বি ক্যাম্প অতিক্রম করলাম।নৈস্বর্গিক রূপ উপভোগ করতে করতে অবশেষে পৌঁছে গেলাম সেই রূপকথার মেঘ রাজ্যে।
সাজেকের মন ভুলানো পরিবেশ নিমিষেই পথের সব ক্লান্তি দূর করে দিল।প্রকৃতির ঐশ্বর্য দেখতে দেখতেই সূর্য ডোবার সময় হয়ে এলো।পাহাড়ের চূড়ায় বসে সূর্য ডোবার দৃশ্যও দেখার মত ছিল।

সাজেক

প্রকৃতি যাকে এত অকৃপণ হাতে নিজেকে উজাড় করে দিয়েছে,খোলা আকাশ, মেঘেদের দলবেঁধে ঘুরে বেড়ানো,পাহাড়ের গা ঘেষে ঝর্ণার বয়ে চলা,সবুজ শ্যামল প্রকৃতি সেখানে সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো পর্যাপ্ত পানির সমস্যা।প্রায় সবকটা বাড়ীতেই গাজী ট্যাংকে বৃষ্টির পানি ধরে রাখতে দেখলাম।ইতিমধ্যে আমার দেখা কয়েকটি বি জি বি ক্যাম্পেও একই সমস্যা লক্ষ্য করলাম।

পানির অপর নাম জীবন হলেও বি জি বি সদস্যরা খুবই পানি সংকটে ভূগছেন। কেউ কেউ পাহাড়ের নীচে যেয়ে পানি সংগ্রহ করছেন আবার কোন ক্যাম্পের আশে পাশে ঝর্ণাও নাই।একদিকে গরম,টিনের ঘর,বিদ্যুৎ ও পানি সংকটে কিছু ক্যাম্পের সদস্যদের দেখে খুব কষ্ট লেগেছে।অথচ সমতলে ডীপ টিউবওয়েল বসিয়ে পাইপ দিয়ে পানি সরবরাহ করলে পুরো এলাকাবাসীর সংকট দূর হয়ে যেত।আমার বিশ্বাস এসব যন্ত্রনা আর কষ্টের কথা প্রধানমন্ত্রী পর্যন্ত পৌঁছায় না, উনি এটা জানলে এসব এলাকার চিত্র অন্য রকম হতো।যারা দেশকে ভালবেসে আমাদের নিরাপত্তার জন্য দেশের নিরাপত্তার জন্য অক্লান্ত কাজ করে যাচ্ছেন, তাদের বুকে তারা ঝুলুক না ঝুলুক আমি তাদের সবাইকে সেল্যুট জানাই।

সারাদিন ঘুরেঘুরে সন্ধ্যার পর পশ্চিমমূখি হয়ে পাহাড়ের উপর বসে ছিলাম।অবিরাম এক বেহেস্তী শীতল হাওয়া বয়েই যাচ্ছিল।গল্প করতে করতে হঠাৎ ঘন কুয়াশারমত মেঘ এসে আমাদের চারপাশ ঘিরে ফেললো।আর যাই কোথায় মূহুর্তেই ঝমঝম বৃষ্টি শুরু হয়ে গেল।আর এই বৃষ্টির জন্যই সকাল থেকে অপেক্ষা করছিলাম।কারণ কেবল রাতে বৃষ্টি হলেই ভোর হতে হতে সাদা মেঘ এসে আপনার দরজায় কড়া নাড়বেই।

টিনের চালে রিমঝিম বৃষ্টির গান ছেড়ে রিসোর্টে যেতে মন চাইছিলনা।বৃষ্টি থামলে চলে আসলাম আমাদের রুমে।সকালে মেঘ বালিকারা আমার সাথে দেখা না করেই যেন ফিরে না যায় সেজন্য তাড়াতাড়ি শুয়ে পড়লাম।রাত সাড়ে তিনটায় বেডরুমের পর্দা সরিয়ে বাহিরে তাকাতেই দেখলাম কুয়াশার মত মেঘ এসে পুরো এলাকা ঘিরে ফেলেছে।ভোর পাঁচটায় উঠে দেখি সাদা মেঘের ভেলা আকাশ ছেড়ে একদম নীচে নেমে এসেছে।এমন দৃশ্যে নিজেকে স্হির রাখতে পারলাম না।কারো অপেক্ষা না করেই নীচে নেমে আসলাম।যেদিকে বাতাসের গতি মেঘ সেদিকেই দৌড়াচ্ছে।এমন এক স্বপ্নপুরীতে আসবো আমি কখনো -ই কল্পনা করতে পারিনি।মেঘের সাথে সাথে আমিও কখনো ডানে কখনো বায়ে কখনো হেলিপ্যাডে আবার কখনো বিজিবি ক্যাম্পের উপরে ছুটে গেলাম। যেদিক থেকে বাতাস আসছিল সেদিক থেকেই মেঘ এসে ছুঁয়ে দিয়ে যাচ্ছিল বা ভিজিয়ে দিচ্ছিল।

মেঘগুলো দেখে মনে হলো ওরা যেন প্রভাতের অঞ্জলি নিয়ে লুটিয়ে পড়তে চায়।এদিক ওদিক থেকে মেঘ নিয়ে ছুটে আসা বাতাসও যেনো কানে কাছে ডেকেই যাচ্ছিল মেঘ নেবেগো মেঘ?

 

পেহেলগাম জয়ের গল্প

ভূ-স্বর্গ কাশ্মীরের পথে প্রান্তরে

শ্রীনগর থেকে সোনামার্গ

মেঘ বালিকার দেশে


© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত মৃদুভাষণ - ২০১৪
Design & Developed BY ThemesBazar.Com