সোমবার, ১৭ ডিসেম্বর ২০১৮, ০৯:৪৫ অপরাহ্ন

অপ্রাকৃতিক

সাব্বিরুল হক :: বেশ কিছু ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ আছে একান্ত নিজের, তাই সে অনেকটাই বর্ণনাবহুল, পেশাগত পরিচয় খুঁজতে গেলে সে কেবল এক আইনজীবী মাত্র;এ কারণেই হয়ত কি-না বলতে পারবে না,আতœীয়-স্বজন,বন্ধু-বান্ধবের আচরণ খুব সুখকর না। ধারণা করে, অনেকের অপছন্দের তালিকায়ও নাম উঠে গেছে, অথচ কথায়-কথায় আইনের লম্বা হাত-পা দেখানোর বদভ্যোস অনেকের হলেও ওর কিন্তু নেই। আইন অবশ্য চোখে দেখা যায় না,হাতে ধরার মতো কিছু না। আবার আইনের নিজের চোখ বাঁধা আছে কালো কাপড়ের আবরণে,আইন পেশার লোক হিসেবে তাকে অনেক সময় দাঁড়াতে হয় অন্ধকারের কালো কিছু বিষয়বস্তুর সামনে। কথা হচ্ছে,কথা অবশ্য সেটা না।

ওর বন্ধু মিনহাজ ঝরে গেছে আইনের ঝড়ে; এক বান্ধবী,বেশ প্রিয় ছিলো, হারিয়ে গেছে সে-ও আইনের বিশাল গহ্বরে।ফাঁক-ফোকর পায়নি খুঁজে, না হলে হয়ত বেরিয়ে আসার সুযোগ পেতো। আইনের বই পড়তে দেখত এক সময়ের সহপাঠি নেসারউদ্দিনকে, গভীর পড়াশোনা বলে যাকে। সেই নেসার এখন জেল হাজতে-রাজনৈতিক মামলায়। প্রতিপক্ষ হয়রানির বেলায় কাজের অস্ত্র যে ধরনের মামলা-মোকদ্দমা, নাম না জানা আইনের কোন এক ধারার বিধান দেখিয়ে আটক। একের পর এক আইনের অজুহাতে পুরোপুরি ফাঁসিয়ে দেওয়া, ভালই হয়েছে ওর জন্য, হাজতে বসে নিয়মিত পড়তে পারছে প্রচুর আইনের বই। দেখতে গেলে নেসারের জন্য সে নিয়ে যায় ল-জার্নালের সর্বশেষ কপি।

ওর বোন খুশী-ও আইনের ছাত্রী, সে দেখতে বেশ কালো, গায়ের রং নিয়ে দুর্বলতা কাজ করে ওর বলেই মনে করে। খুশী বয়সে ওর কাছাকাছি, বড় হলেও, সম্পর্কটা অন্যধরণের একেবারে। সে যুবক হলেও ঠিক আছে, সবকিছুতে দায়িত্বশীল, কাজে কর্মে দক্ষ, আনেকটা মেজাজি আর অনেকগুলো সঙ্গত কারণে পড়ালেখায় মেধাবী। ভাবছিল খুশীর ব্যাপারে, খুশী সম্পূর্ণ ব্যতিক্রম সবকিছুতে, বাইরে ভেতরে ইচ্ছেমতো ঘুরে বেড়াবার অভ্যাসকে নৈমিত্তিক করেছে,যে বিষয়টা নিয়ে কথা বলার কেউ নেই এখানে। প্রায়ই রাত করে ফিরে বাড়িতে, জিজ্ঞেস করলে জানায় কোনো এক বান্ধবীর বাসায় অনুষ্ঠানে গিয়েছিল। মাঝে-মাঝে দুই/একদিন থেকেও আসে সে সব নাম না জানা বা নতুন জুটে যাওয়া বান্ধবীদের ওখানে।

খুশী বোন হলেও ওর সঙ্গে আরেক রকম, ভিন্নমাত্রিক,অবাক অচেনা! ‘আইন’ পড়ে বলেই হয়ত তেমন ঘাঁটায় না মেয়েটাকে কেউ, নাম ধরেই ডাকে ওকে, বাবু বলে; ওর বাসার নাম বাবু। আগে আহলাদ করে ভাইয়া বলে ডাকত এক সময়, এখন তাও না। খুশী এমন যে, উপস্থিতি টের পাওয়া যায় না, প্রায়ই খুঁজে পেতে হয় ওকে, খুব কম কথা বলে, ব্যস্ত থাকে নিজেকে নিয়ে। কোনোকিছুতেই ওকে বুঝে ওঠা যায় না, বিভিন্ন কারণে ভাইয়ের সঙ্গে সম্পর্ক অদ্ভূত, বলা যেতে পারে বিচিত্র ধরনের। ওর থেকে এক বছর সাত মাসের বড় হলেও ডাকা-ডাকিতে সমবয়েসি বা বড়গিরি সব খুশীরই।তবে বলতে হবে, নামটার মতোই খুশীর মুখে হাসি লেগেই থাকে।

দুই
খুশী কথায়-কথায় ঝগড়া বাধায়, কথা বলে তুই তোকারি করে। গায়ে ধাক্কা দেয়া, কান-চুল ধরে টান মেরে দিয়ে পিটে কিল-ঘুষি মারা অহরহ। বিশেষ কোনোকিছুতে উৎসাহ দেখেনি বাবু ওর আজ পর্যন্ত, আশ-পাশের অন্য সবার ভেতরে সে নিরব। শুধু থেকেই এসেছে চারপাশে, কথাবার্তা কম বলে এজন্য ওর গলা শোনা যায় না খুব একটা। যেটুকু বলে বাবুকেই বলে, রাগ-বিরক্তি সব যায় বাবুর দিকে; খুশীর আচরণে আছে অপার বিস্ময় আর চমক। এই যেমন সেদিন বিকেলে টেনে ধরলো হাত,‘এই বাবু শোন।’
‘কি রে খুশী, কি হয়েছে, বিউটি পার্লারে যাবি নাকি?’
‘না। এদিকে আয়।’
বাধ্য ছেলের মতো গেল বাবু, না গেলে তো মার নিশ্চিত! কাছে যেতেই চোখ পাকালো খুশী,‘তোর শার্টটা খুলে ফেল।’
‘কেনো!’
‘খুল বলছি, শার্টের কলারে ময়লা, দেখিসনি? নোংরা কোথাকার!’
এই হলো খুশীর অভ্যেস। ময়লা, নোংরা দেখতে পারে না; বলে অসহ্য!, ফলে শার্ট বাবুকে খুলে দিতেই হয়, আর যেহেতু পরেই সে হালকা করে নিতে হাসবে, তাই রসিকতা করেই বলে,‘প্যান্টও খুলে দিতে বলবি না তো আবার?’
বাবুর কথা শুনে চোখ আরো বড়-বড় হলো খুশীর। ঘুরিয়ে নিয়ে এদিক-ওদিক করে তাকালো সে,‘বলতেও পারি। দাঁড়া, খুব বেড়েছিস না? একদম চ্যাছা খাবি।’

এ হলো ওদেও অবাক এক সহচর্য। বাবু নিশ্চিত খুশীর সামনে এমনকি বিবস্ত্র হতেও কোনো দ্বিধা থাকবে না ওার। কিছুদিন ধরে স্বাস্থ্য বেড়েছে খুশীর, চোখে পড়ার মতো, এমনিতে বাড়িতে ওড়না পরে না সে, মাঝারি গড়ন, কালো মতো মেয়েটার চেহারা হঠাৎ করে বেশি রকম উজ্জ্বল দেখাচ্ছিলো ; তাই বেশি করে দেখছিল বাবু। তাতে খুশীর ভাবান্তর নেই, তবে কিছুটা অস্বস্থি নিয়ে জানতে চাইলো,‘তাকাচ্ছিস যে এমন করে?’
‘তোকে বেশ সুন্দর দেখাচ্ছে খুশী আপু। ফর্সা হয়েছিস মনে হয় অনেক।’
মন্তব্য করেই বুঝতে পারল সমস্যা করে ফেলেছে। চোখ পাকিয়ে তেড়ে এলো খুশী,‘কি বলেছিলি বল শুনি আবার।’
‘বললাম তো। শুনিসনি?’
এবার দৃশ্যপট বদলে দিয়ে নিমেষে জড়িয়ে ধরে বুকের কোমল উত্তাপে ঠেলে নিয়ে যায় খুশী বাবুকে। ছড়িয়ে যাওয়া চুলের রাশ আর গায়ের ঘ্রাণ মেশানো নরোম স্বরে বলে,‘আর তো কেউ বলে না রে।’
খুশীর বিঘত বুকের কোমল, কুসুম গরমে ভেতরের দিকে ঘেমে একাকার হতে থাকে। ওর বোন সেটা জানতেও পারে কি-না? যে কারণে বাবুর আর প্রশমন হয় না, প্রায়ই এমন করে দুমড়ে উঠতে থাকে সে, মুচড়ে যেতে থাকে, ওর কিছু বলা হয় না, সে পেরে উঠে না। কেবল বুঝতে পারে, এক ধরণের স্খলনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে ক্রমাগত। সব ওর কথাই ভাবছে বাবু, খুশীর ব্যাপার-স্যাপার বুঝে না, বুঝে বের করার সাধ্যও নেই ওর, এমনকি বোন সম্পর্কিত মেয়েটির ব্যুহ থেকে বেরিয়ে আসতে পারবে বলেও মনে হয় না বাবুর।

তিন

বাবুর দিন-রাত কাটে আইন ও আদেশের জগত নিয়ে, ভাবনা-চিন্তার গভীরতা ওর বেশ এটা ঠিক, পরিচিতরা বলবে কেন, সে নিজেও বুঝে; যে কারণে ওর কথাবার্তার ভাষা, ব্যাপ্তি এবং আকার বিস্তারিত। সে দেখেছে আইন প্রয়োগের চাপে ব্যর্থ হয়ে গেছে পরিচিত মেধাবি ছাত্র শফিকের সম্ভাব্য ভবিষ্যত। বিরোধী রাজনীতি বা প্রতিক্রিয়াশীল দলের সঙ্গে শফিকের জড়িত থাকার অভিযোগ খন্ডনে এগিয়ে আসেনি কেউ। কানুন কাজ করে গেছে প্রভাব এবং ক্ষমতার পক্ষে; আইনের কলকাঠি নেড়ে গেছে শীর্ষ ক্ষমতাধররা একতরফা।

খুশী একদিন জানিয়েছিল, ভিন্ন ধর্মের অনুসারীদের আইনের মার দিয়ে প্যাঁচে ফেলা সহজ। শত্রু সম্পত্তি আইনের কৌশল অথবা বাতিল দলিলের অভিযোগ দায়ের করে হাতিয়ে নেয়া যায় বিধর্মীর সম্পত্তি। এক্ষেত্রে আইনের জটিলতা নয় বরং তার প্রয়োগ ক্ষেত্রের পক্ষপাত আর ধর্মীয় বিভেদের আড়ালের বিদ্বেষই বাবুর নজর কেড়েছে। এ বিষয়ে ওর সিনিয়ির আইনজীবী নাকি প্রচুর কেস, মামলা দাখিল করে থাকেন! ওর চারপাশে আসলে বোন খুশী-ই একমাত্র, এটা ঠিক হলেও ভাবনা চিন্তার আবহে ওর আনাগোনা কম, সেখানে বাবু ভিন্নমাত্রার মানুষ; পেশাদারিত্বে ভরপুর।

দেখতে পায়, বিধি-নিষেধ আরোপের বেলায় সবাই জুড়িহীন, সুযোগ পেলেই হলো, চাপিয়ে দেয় নিষেধের বোঝা, বিধানের দায়ভার। ধর্মীয় বিধানের বহু ব্যাখ্যা-বিশ্লেষন রয়েছে অনেকের হাতে। সেখানে কে, কারা বঞ্চিত হবে আর কারা অধিকার লাভে হবে সফল, এ নিয়ে বাদানুবাদের শেষ দেখে না সে। আইন-বিধি-বিধান নিয়ে যা কিছু পায় তাই-ই খুশীকে জানিয়ে দেওয়া বাবুর আরেক কাজ, আগামীতে বোনের আইনচর্চায় করতে গেলে কাজে লাগবে ভেবে।

আজকাল ভাবনার খাত অন্যদিকে প্রবাহিত হয়ে যায় বাবুর। নারী অধিকার এবং ক্ষমতায়নের এখনকার বাতাসে নারীদের অধিকার, বিশেষ করে সমাজ, সংসার আর সম্পত্তিতে কি পরিমাণ নিরঙ্কুশ, সে ব্যাপারে সন্দেহ দেখা দেয় প্রায়ই। স্বামী করে স্ত্রীর অধিকার হরণ, ভাইরা করে বোনদের বঞ্চিত আর মায়ের সম্পত্তির অধিকার তো ছিনিয়ে নেয় সেই মায়ের ছেলেরাই। এটা ঠিক ওকে প্রায়ই দুঃখ দেয় এসব বিভেদ নিয়ে বিচার-আচার।

খুশীর সাথে ওর প্রাত্যহিক চলাফেরাকে বাবু আইনগত চোখে দেখতে চেষ্টা করে অনেক সময়, কিন্তু ওর বোনটার এক ধরণের উদ্ধত্য সব পরিকল্পনা ভেস্তে দিচ্ছে। গেল কিছুদিন ধরে বাবুর মনে হতে শুরু করেছে যে, খুশী ওকে শারিরিকভাবে উস্কানি দিয়ে চলেছে আজকাল!
বাবুর কাছে আইনের গল্প প্রেমের কাহিনী না যে, রং-চং, ছলা-কলা দিয়ে শেষ টানা যাবে। বরং প্রেম ভালোবাসা জনিত অনেক আসামির দেখা পেয়েছে, যারা কি-না বিজয় দেখতে চেয়েছে প্রণয়েরই। হতবাক হয়ে গেছে এ সংক্রান্ত অনেকগুলো দুর্ঘটনা শোনে। আবেগজনিত দূর্ঘটনা নিয়ন্ত্রণের আইন এতটাই কার্যকর যে, দমিয়ে দিতে সক্ষম প্রেমে দুঃসাহসি প্রেমিককে; প্রেমের বেলায় আবেগকে বশে রাখতে আইন-কানুন সজাগ, অন্ধ নয় মোটেও। হাত ধরে বেরিয়ে আসা নাবালিকা প্রিয়াকে নিয়ে মামলা-মোকদ্দমায় বিপর্যস্ত কয়েকজন অন্ধ প্রেমিকের সঙ্গে ব্যক্তিগত পরিচয় রয়েছে ওর। প্রেম পরিণয়ে সফলদেরও পড়তে দেখে আইনের ফাঁক-ফোকরে, প্রেমিকের সাময়িক সাফল্যে বাধা দেয় পারিবারিক আইনের বেড়াজাল।
অপ্রাপ্ত বয়স্ক প্রেমিকাকে হারিয়ে কারাগারে অন্তরীণ দেখেছে একাধিক প্রণয় বিলাসীকে। তাহলে বলতে হয়, প্রেম পরিণয়কে নিরুৎসাহিত করা হচ্ছে আইন-আদেশের প্রতিবন্ধক দিয়ে! প্রশ্ন করে অনেকে, আইন প্রেমিকের অধিকার সংরক্ষণ করে, নাকি করে না? তেমনি একই বিষয়ে প্রশ্রয় পায় না কেন প্রেমিকাকূল? মানবিক হিসেবে কি তাদের অধিকার বিবেচনায় আনার জন্য আইনের আশ্রয় পেতে পারে না নাকি তারা? অবাক করা কিছু আইন রয়েছে, এখানে আইনই সরব, জেনে গেছে বাবু।

ওর আশেপাশে পারিবারিক আদালতপাড়াও খুব তৎপর,পরিবারগুলো তাদের ভেতরকার বিরোধ হয়তো আপোষ মীমাংসা করে ফেলে। কিন্তু ভেতরের মনোমালিন্য যখন ছড়িয়ে পড়ে, তখন গড়িয়ে যায় অনেকগুলো আদালতে, পড়ে থাকে বিচার নিষ্পত্তির গ্যাঁড়াকলে, আমার ব্যাপ্তি এ ধরনের জটিলতা নিয়েই। কারো বিরক্তির কারণ হলে বলার কিছু নেই ওর, কারণ বাবু বিশ্বাস করে প্রাকৃতিক ন্যায়বিচার ও আতœপক্ষ সমর্থনে; এ জগতটা ওকে এভাবেই উপযুক্ত করে তুলেছে বলেই বাবুর ব্যক্তিগত একান্ত ধারণা।

উপরে বলা বিষয়বস্তুগুলো নিয়ে সে বিস্তারিত আলোচনা করে সহযোগি আইনজীবীদের মধ্যে, খুশীও মাঝে-মাঝে উপস্থিত থাকে আলোচনা আর বাদানুবাদে, ভবিষ্যতে এধরনের বিষয়ভিত্তিক আইনি তর্ক করতে হবে, বুঝে গেছে খুশীও। মাস্টার্স শেষ করে কয়েক বছর স্কুল-টিচার ছিল, তাই পেছনে পড়ে গেছে, না হলে এতোদিনে খুশীও মহিলা আইনজীবী হয়ে যেতো, জানে বাবু ওর আগেই।

চার
কেটে যাওয়া কয়েক মাস পরের একদিন।
কর্মজীবি মহিলা হোস্টেলে সীট হয়ে গেছে খুশীর,ওর ক্লাসমেটদের অনেকে ছিলো,আছে সেখানে;এদের একজন ব্যবস্থা করে দিয়েছে। প্রথমে একটু অবাক লাগলো বাবুর, ভাবল তলে-তলে এই বুঝি ছিল খুশীর উদ্দেশ্য! বাড়িতে এতোদিন ওর অদ্ভূত আচার-আচরণ বেমানান ঠেকেছে বাবুর কাছে প্রায় সময়ে। হোস্টেলে যাওয়ার ব্যাপারটা হঠাৎ করে জানিয়ে আমাকে চমকে দিয়ে হাসতে লাগল খুশী।
অবাক অরও বেড়ে গেল বাবুর,‘কিন্তু তোর এখন বাইরে চলে যেতে হবে কেনো?’
‘বসে থেকে কি করবো বল? এম.এ পাশ করেছি কতোদিন। ল-টাও শেষ হওয়ার পথে। সবাই চাকবি-বাকরি নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে । আমিও তো আর বেকার থাকতে পারি না। কি বলিস তুই?’
‘হোস্টেলে গিয়ে কি করবি ঠিক করলি?’
‘কাজের শেষ নেই। প্রথম কথা চাকরি খুঁজবো।’
‘কিসের চাকরি?’
‘কোম্পানীর চাকরি।’ নির্বিকার জানাল সে,‘ওটাই আমার পছন্দের।’
‘পাবি তো, নাকি?’
‘না পাওয়ার কি আছে? নারী বিষয়ক একটা উন্ন্য়ন সংস্থা কাজ দিয়ে ডেকেছে, তুই তো জানিস বোধহয়। এক বান্ধবী টিউশনি জোগাড় করে দিয়েছে দু’টো।’
‘বাহ। অনেককিছু করে ফেলেছিস দেখছি।’
‘করিনি এখনো। করবো।’
‘মা-কে বলেছিস? কিছু বললো?’
‘বলেছি। না বলেনি। না করবে কেনো বল! আমি তো আর হারিয়ে যেতে যাচ্ছি না। আমার সঙ্গের অনেকেই আছে না সেখানে?’
‘কবে যাচ্ছিস হোস্টেলে?’
‘চিন্তায় পড়ে গেছিস মনেহচ্ছে বাবু?’
‘না, চিন্তা না। পড়াশোনা করেছিস বাড়িতে থেকে। হোস্টেলে থাকিসনি তো কখনো। তাই একটু দুশ্চিন্তা আর কি।’
‘আরে না। আমার অসুবিধা হবে না। ছোট একরুম এক সিট পুরোটাই আমার। হো¯েটল সুপার আপা সিনিয়ার বোন। ব্যবস্থা করে দিয়েছেন।’
‘যাচ্ছিস তাহলে?’
‘হ্যাঁ। নিয়ে পৌঁছে দিবি তো তুই-ই। সামনের সাপ্তায়। অন্যকাজ আছে বলতে পারবি না কিন্তু।’
‘তা নাহয় গেলাম। কিন্তু আমার যে মন খারাপ থাকবে।’
‘মন খারাপের কি আছে শুনি? কোনো মন খারাপ নেই। এখন এক কাজ কর তো…
‘কি কাজ?’
‘প্যান্ট খুলে দে তাড়াতাড়ি। আর জিন্সের প্যান্ট পরা ছেড়ে দে তো এখন থেকে। অনেক ময়লা তোর প্যান্টে।’

পাঁচ
বাবুর আইনানুভূতিতে আরেকটা বিষয় আছে, সে ভেবে দেখেছে, মানুষের প্রতি মায়া-মততা দেখানোর জন্য আইনের গলগ্রহ হতে হয় না কাউকে। তবে স্নেহ-ভালবাসার নিদর্শন হিসেবে কোন সয়-সম্পত্তি দান করতে গেলে বিপত্তি আছে;ভূমি আইনে পাবে,কর আইনে দিতে হবে শতকরা হারে রাজস্ব। নিবন্ধন প্রক্রিয়ার জটিলতা তো জানা আছে সবারই,অনেক ক্ষেত্রে জমির বাজারদরের চেয়ে নিবন্ধন খরচাদি হয়ে যায় দ্বিগুন। তবে কি স্নেহ-মমতা কিংবা ভালবাসার নিদর্শন রাখতে কেউ কি সম্পত্তি (স্থাবর-অস্থাবর) দানপত্র করা থেকে বিরত থাকবে, মাত্রাতিরিক্ত ব্যয়বহুল হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনায়? রাজস্ব আদায়ের কলা-কৌশল হিসেবে যে সমস্ত আইন-কানুন আরোপ করা হচ্ছে সেগুলোর বোঝা আসলে বইবে কে? এমন কি হতে পারে না-বাবু নিজস্ব বিশ্লেষণ চালায়-ধনিক শ্রেণীর উপর সরাসরি বা ব্যাপক আয়ের পেশাজীবির উপর প্রত্যক্ষ এবং রহস্যময় ব্যবসায়ীর উপর বাধ্যতামুলক ভাবে চাপিয়ে দেয়া হল রাজস্বের করভার আর করদায় লাঘব করে দেয়া হল সব খেটে খাওয়া সীমিত আয়ের মানুষগুলোর জন্য। ভাবতে গিয়ে খেই হারিয়ে বাবু ওর বোন খুশীকে ডাক দেয়,উপযুক্ত ব্যাখ্যা দাঁড় করিয়ে দেওয়ার ক্ষমতা আছে খুশীর যে কোনো জটিল বিষয়ে।

হোস্টেলে যাওয়ার আগ পর্যন্ত কথাবার্তা আরো কমিয়ে দিয়েছে খুশী,মাঝখানে একবার বাড়ির সবাইকে জানিয়ে অনুমতি নিয়ে নিয়েছে,বাড়িতে কারো কোনো আপত্তি দেখল না বাবু। অবাক লাগলেও কিছু একটা ভালো দিক নিয়ে ভাবতে চাইল সে। মেয়েরা নিজে থেকে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার চেষ্টায় ওরও সমর্থন আছে। তাছাড়া শিক্ষিত মেয়েরা সত্যিই আজকাল অনেক কিছুই করছে, বাবুর জানা মতে ছেলেদের চেয়েও ভালো কিছু;খুশীর উপর মন খুশীই হয়ে ওঠে ওর। কথা মতো ওকে নিয়ে যেতে হয়,হোস্টেল কম দূরে না। ব্যাগ গুছিয়ে নিয়ে সকালেই রওয়ানা হতে হয়েছে ওকে নিয়ে বাবুর।

ছয়
খুশী বলেছিল কোম্পানীর চাকরি করবে সে। পছন্দের চাকরি ওর, কিন্তু খুশী জানে না কোম্পানী তা ব্যাংক-বীমা-আর্থিক প্রতিষ্ঠান যাই-ই হোক বাবুর জানা আছে ভেতরের ব্যাপার-স্যাপার। কেননা, কোম্পানি লাভজনক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হলে চক্ষুশূলে পড়ে একাধিক কর্তৃপক্ষের। দেওয়ানি, ফৌজদারি থেকে শুরু করে রাজস্ব আইনের হাতে কানমলা খেতে হয় নিয়মিত। এছাড়াও কোম্পানি-জনসাধারনের ব্যক্তিগত আয়ের উপর নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষের খবরদারি তো সীমাহীন। কোম্পানি নিজেই এক ব্যক্তিস্বত্বা, কোম্পানি আইনের বিধানে বলা আছে,আরো বলা আছে কোম্পানী কৃত্রিম ব্যক্তি,যার রয়েছে বৈধ,আইনানুগ পরিচিতি এবং অনিঃশেষ উত্তরাধিকার। কোম্পানি যেমন কারো বিরুদ্ধে মামলা করতে পারে, তেমনি যে কেউ কোম্পানির প্রতিপক্ষ হিসেবে নিতে পারে আইনের আশ্রয়। কিন্তু ও জানে বাস্তব বলে আরেক কথা। কোম্পানি নিজের স্বার্থেই জড়িয়ে পড়ে মামলা-মোকদ্দমায় আর বেরিয়ে আসতে হলে কোর্ট-কাছারি পার হয়ে,অনেক ঘাটের জল খেয়ে, আসতে হয় চূড়ান্ত নিষ্পত্তিতে। কোম্পানি,যে কিনা আইনের চোখে স্বতন্ত্র ব্যক্তি,সেও তেমন খাতির পায় না সংশ্লিষ্ট আদালতে। কোম্পানিকে তার দাবি-দাওয়া আদায়ের জন্য দ্বারস্থ হতে হয় বিভিন্ন কর্তৃপক্ষের।

খুশীকে জানাল বিষয়গুলো। ওর পাঠ্য তালিকায় আছে এ সব আইনের পাঠ। ছোটখাটো একটা বক্তব্য দিয়ে দিল,মনোযোগ দিয়ে শুনল খুশী কেনো কে জানে! কোম্পানি আইন আসলে কি কোম্পানির স্বার্থ টিকিয়ে রাখার জন্য? বাবুর মনে হয় না। বরং আইন কর্তৃপক্ষ এবং শাসক শ্রেণির হাতে লাভজনক বাণিজ্যিক সংগঠনকে কোণঠাসা করে রাখার পাঁয়তারা মাত্র মনে করে সে। অবিভক্ত ভারতের যে আইনের খসড়া রং-বেরংয়ের মোড়কে চালানো হচ্ছে এখনও, সেখানে দেওয়া ছাড়া কোম্পানীর কিছু পাওয়ার আছে বলে মনে করে না আইন পেশাজীবী বাবু।

তবুও সে জটিল, কালো কিন্তু ভালো মনের বোনটার জন্য কোম্পানী পর্যায়ের চাকুরি নিয়ে ভাবতে লাগল।
বাসের পাশাপাশি সিটে বসে হয়ে পড়ল আনমনা। রিক্সায় চড়ে খুশীর সঙ্গে কতো জায়গায় গিয়েছে আগে, কিন্তু এখন সে যেনো হয়ে গেছে কেমন অন্যরকম।
‘শোন বাবু তোকে বলি।’ যেনো গোপনীয় কিছু বলছে খুশী,‘আসলে আমি একা থাকতে চাই রে। বাড়িতে আর কতোকাল থাকবো বল?’
‘অবাক করছিস তো! কোথায় থাকবি বল? মেয়েরা তো বাড়িতেই থাকে।’
‘এভাবে বেঁচে থাকা একটু পাল্টাই কি বলিস?’ হাসতে থাকে খুশী।
ভাবনার গভীরতা আরেকটু বাড়ায় বাবু। খুশীর বয়স সাতাশ-আটাশ, ওর সঙ্গে খুব বেশি বেশ কম না হলেও মেয়ে হিসেবে বয়স হয়েছে ওর,শারিরিক গড়ন বড়সড়, ওকে দেখলে লম্বায় বাবুর চেয়ে কম মনে হয় না।
খুশী বললো,‘আমার গরম লাগছে।’
‘সব সময় তোর গরম লাগে! গরমটা বেশি তোর,বুঝলি?’
‘তুই বুঝলি কেমন করে যে আমার গরম বেশি? হাত দিয়ে দেখেছিস কখনো?’ জোরে হাসে খুশী।
‘শীতের সময়ও তোর ফ্যান ছাড়া চলে না।’
‘তোর গরম করে না?’
খুশীর বলার ভঙ্গি এমন যে বাবু লজ্জা পেয়ে যায়, ওর কান গরম হয়, নাকের ভেতরে গরম বাতাস লাগতে শুরু করে।
‘কি যে বলিস তুই!’
‘ছেলেদের শীত কানে, বুঝলি?’ খুশী আবারও দুর্বোধ্য হাসে।
‘তাহলে মেয়েদের শীত?’
এবার হেসে বাবুর গায়ে পড়ে খুশী,‘মেয়েদের ঠান্ডা আর ছেলেদের গরম হচ্ছে ওইখানে।’ উরুর দিকে ইশারা করে খুশী।

সাত
হোস্টেলে পৌঁছুতে দুপুর হয়ে গেল, বাবু দেখল খুশী যা বলেছে সবই ঠিক,সুপারিন্টেন্ডেন্ট আপা এগিয়ে আসলেন নিজেই, রুম বুঝিয়ে দিলেন খুশীকে, বাবুর সঙ্গে পরিচিত হয়ে ভালো লেগেছে জানালেন। খাবারের আয়োজন করে রেখেছিলেন আগেই, খাওয়ালেন নিজের বাড়ির মতো আদর যতœ করে; বেশ ভালো রান্না। যদিও বাড়ির তুলনায় কিছুই না, তবু ভালোই লাগল ওর কাছে হোস্টেলের স্থানীয় খাবার আর পরিবেশটা বুঝে বেশ স্বস্তি পাচ্ছিল সে।
খাবার শেষে খুশী বলে,‘বাবু চা খাবি রে?’
‘চা কোথায় পাবি!’
‘এখানেই বানায় সকাল বিকাল। এখন পাওয়া যাবে না। বাইরে গিয়ে খেয়ে আসি আয়। চা খাবো,গল্পও করা যাবে,কি বলিস?’
চা খেতে-খেতে মুখ খুলে যায় ওর, অনবরত কথা বলতে থাকে, হাসিটা উঁচু হয়ে যায় আরো বেশি।
বাবু বলে,‘তোকে কিন্তু ভারী ভালো লাগছে খুশী আপু।’
‘সুন্দর লাগছে না বুঝি?’
‘লাগছে তো।’
‘লজ্জা পাচ্ছিস কেনো! ভালো করে বলতে পারিস না? আবার বল।’
‘এবার শরম লাগছে আমার সত্যি।’
খুশী বিরক্ত হলো যেনো,‘ছেলেদের আবার লজ্জা-শরম! অবাক করলি তো। তোকে যে কথা বলছি অন্য কাউকে বললে কি করতো জানিস?’
’না, জানি না।’ আমিও বিরক্তি দেখালাম।
‘হয় পায়ে ধরতো, না হয় ঝাঁপিয়ে পড়ত উপরে।’
‘আচ্ছা, বুঝলাম।’
খুশী কিছুক্ষণ নিরব থাকে,কি যেনো বলার জন্য গুছিয়ে নেয় নিজের মনে,তারপর মাথা ঘুরিয়ে তাকায় বাবুর দিকে। ওর দৃষ্টি একেবারে অচেনা ঠেকে। চোখগুলো আবিষ্ট আর লালচে দেখায়, বাবু ভয় পেতে থাকে; আড়ষ্টবোধ জড়িয়ে ধরে আমাকে অষ্টে-পৃষ্ঠে।
খুশী বলে,‘আমার চোখের দিকে তাকা বাবু। কয়েকটা কথা বলবো, মনোযোগ দিয়ে শুনবি,কেমন?’
আড়চোখে তাকিয়ে বাবু বলল,‘কি কথা ?’
‘আমার কি মনে হয় জানিস?’
‘কি মনে হয়?’
‘আমার সারাজীবন একাই থাকতে হবে।

আট
খুশীকে কিছু জরুরি কথা বলা হয় না বাবুর,কখনো আদৌ হবে কি-না, এ বিষয়টাও ভাবায় ওকে। খুশীর বয়স হয়ে যাচ্ছে,বিয়ে দিতে হবে,সংসারই হবে খুশীর জন্য চুড়ান্ত গন্তব্য। এ নিয়ে বক্তব্য দেওয়ার উদ্দেশ্য ওর নেই। বাবু এটাও জানে খুশীকে বিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করাও ভয়ানক কঠিন হবে ওদের। তবে খুশী কালো হলেও মলিন নয়, চেহারায় শিক্ষা-দীক্ষার ছাপ রয়েছে। খুশীর ব্যক্তিগত চিন্তার পরিসর ধরতে পারলে ভালো হতো,অনেকদিন ওর পাশেই শুয়েছে,স্বীকার করছে নিজের উত্তাপ টের পেয়ে সতর্কও হতে হয়েছে ওকে পরে।

অনৈতিক সম্পর্ক কিংবা সামাজিক সম্পর্কের নীতিকথা নিয়ে প্রায়ই ভাবে বাবু। পেশাগত কারণে পরিবার অব্যবস্থাপনার ফল হিসেবে বিচ্ছেদের মামলা করতে হয়েছে কয়েকবার। খুব নিষ্ঠুর এক সিদ্ধান্ত, সম্পর্ক-বিচ্ছেদ। পারিবারিক মনোমালিন্যের জের হিসেবে এমন বিয়োগান্তক ঘটনা ঘটছে অহরহ। শহরাঞ্চলে বলতে হয় মহামারি। বিচ্ছেদকামী স্বামীদের অভিযোগ, পরপুরুষ, টাকা-পয়সা আত্মসাৎ,টিভি চ্যানেলে অতি-আসক্তির কারণে বিরোধ ইত্যাদি। এছাড়াও, স্ত্রীর রয়েছে আরো ব্যাপক অভিযোগ। স্বামীর অন্যনারী আসক্তি, যথাযথভাবে সংসার না করা, পছন্দের মেয়েমানুষ ঘরে তোলার পাঁয়তারা; আরো কতো কি ! ঘটনাচক্রে সব বিচ্ছেদকামী অনুভূতিতে এক। এমন কি প্রায় ক্ষেত্রে শুধুমাত্র সন্দেহের বশবর্তী হয়ে ঘটিয়ে দেয় চির-বিদায়।
অভিভাবকত্ব নিয়ে বিরোধ আরেক পদের জটিলতা। এক্ষেত্রে সন্তান যে কি-না নিস্পাপ, নিরপরাধ সে হয় বলির শিকার। এখানে বাবুর আরেক পর্যবেক্ষণ হচ্ছে যে, সন্তানের ভবিষ্যতের দিকে তাকানোর সময় পায় না ঝগড়া বিবাদে লিপ্ত দম্পত্তি।
ওর পরিচিত মিজানের বউ একমাত্র সন্তান আর ঘরের টাকা-পয়সা, গয়না-পত্র নিয়ে উধাও হয়ে যায়। খোঁজ-খবর নিতে লোক পাঠিয়ে দিয়ে ঘটনার তদন্ত চালাতে হয় মিজানকে। ছেলেও দিবে না, ডির্ভোসও করবে না। মামলার প্রস্তুতি নিতে গিয়েও ঘটতে থাকে বিপত্তি। অভিনব পদ্ধতিতে মিজান শেষ পর্যন্ত উদ্ধার করে আনে তার একমাত্র পুত্রসন্তানকে। ভুলিয়ে-ভালিয়ে শশুরবাড়ির বাইরে থেকে। পরে অবশ্য ওর ঘরছাড়া বউ ডির্ভোসের চিঠি পাঠিয়ে দেয় ওর বরাবরে।
আইন নিষ্পত্তি করতে পারেনি মিজানের দাম্পত্য বিরোধকে, করেছে সে নিজেই। অবশ্য এমন মীমাংসা কাম্য নয় কোন অবস্থাতেই, যখন মা-বাবার বিরোধের জেরে সন্তানের ভবিষ্যৎ হয়ে যায় অনিশ্চিত আধাঁরের। পারিবারিক সৌহার্দের ভেঙ্গে পড়ার কারণ নিয়েও কাজ করে বাবু নিজের মনে।
ঘটনার বিবরণ শুনে খুশী হেসেছে। বলেছে, ‘এ আর এমন কি! মিজান আরেকটা মেয়েকে ঘরে এনে তুললেই পারে।’

নয়

খুশীর কথাবার্তার অর্থ সে ধরতে পারে না, সত্যি বলতে কি আগেও পারেনি, বরাবরই অচেনা আর দুর্বোধ্য লেগেছে ওকে। তাই পাশাপাশি বসে অবাক হয়ে জানতে চায়,‘এ কেমন কথা বলছিস খুশী আপু!’
‘অবাক হবি না। আমি সেটাই মনে করি।’
‘বোকার মতো কথা বলছিস।’
‘না। সিরিয়াস। দেখিস তুই।’
‘বিয়ে হলেই তো তোর একা থাকার দিন শেষ,তাই না?’
‘সেটা হবে না।’
‘কি হবে না?’
‘বিয়ে।’
‘লজ্জা পাচ্ছিস না এ কথা বলতে?’
‘না। আমি বাস্তব বুঝতে পারি। আমার বিয়ে অসম্ভব।’
‘কি আবোল তাবোল বকছিস!’
‘মোটেও আবোল তাবোল বকছি না। মেনে নে সত্যিটা।’ হাসিটা থেমে আসে খুশীর, চেহারা বদলে যেতে দেখে পর-পর,বাবুর নিকটতম হয়ে এক অবিশ্বাস্য প্রশ্ন ছুঁড়ে দেয় খুশী,‘ওসব কথা বাদ দে। এখন বল তো আমাকে কি তোর ভালোলাগে? আমার চোখের দিকে চেয়ে বল।’

খুশীর রক্তাভ চোখের দিকে তাকিয়ে মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে পড়ে বাবু,চোখ ফিরিয়ে নিতে সাহস হয় না, অনিবার্য এক সমর্পনের দিকে এগিয়ে যেতে থাকে বাবু। এমন আভ্যন্তরিণ ক্ষরণ কিছুদিন ধরে প্রায়ই হচ্ছিল ওর। তবে দৃষ্টিসীমার আড়ালে, সে জানত এটা এক অজ্ঞাত অনুভব, একান্তই ওর নিজের। এবার খুশীর দিকে তাকিয়ে হতবিহ্বল আর স্পষ্ট হয়ে যায়, ওর ব্যক্তিগত স্খলনটা জেনে গেছে খুশী।
বাবু মাথা নামিয়ে নিয়ে নতজানু হয়েই যেনো জানায়,‘লাগে তো।’

খুশী এবার বাবুর হাত ধরে ফেলে, বাবু টের পায় খুশী বদলে যাচ্ছে নিমেষে, হয়ে উঠেছে অসম্ভব বলশালিনী। ওর মুখে অদেখা হাসি লক্ষ্য করে ভয়াবহ এক শিহরণ ঘটে যায় বাবুর। দেহ-মনের কৌণিক অবস্থানে অনুভব করতে থাকে প্রবল ভূ-কম্পন।
‘তাহলে এককাজ কর। আজকে থেকে যা আমার সঙ্গে।’
‘রাতে থাকতে দেবে আমাকে হোস্টেলে?’
‘অসুবিধা হবে না। আমি ব্যবস্থা করে নেবো। তুই থেকে যাচ্ছিস কিন্তু আমার সঙ্গে রাত্রে। বাড়ি ফিরবি কাল সকালে। ঠিক আছে?’

দশ
এমন একটা সময় হয়ত সবাই পার হয়ে থাকেন, যখন আইনের আশ্রয় নিতে যাওয়া ছাড়া উপায় থাকে না। নিরুপায় হয়ে আদালতের কাছে চলে যান, তখন ফিরে আসার উপায় থাকে না আর। তাহলে আইনবিহীন জীবনই প্রমাণিত হয়ে যায় সহজ,স্বাভাবিক জীবন হিসেবে।
আবার আইন-কানুন বিষয়ে অজ্ঞতাও বিপাকে ফেলে, যেমন, ভূমি বিষয়ক আইন-কানুন আর প্রচলিত বিধি-বিধান সম্পর্কে নূন্যতম জ্ঞানের ঘাটতি বঞ্চিত করে ফেলতে পারে জমির মালিকানা থেকে। অধিকার আদায়ের প্রশ্নে আইনের মৌলিক প্রয়োগ জানা থাকা দরকার হয় যে কারোর।
এমন কিছু ক্ষেত্র রয়েছে যে সব বিশেষে, সমস্যা সমাধানে আইনজীবীর সহায়তা কামনা করা লাগবে না। আইন সংক্রান্ত মৌলিক ধারণা থাকার কারণে চলে যেতে পারা যাবে সরাসরি আদালতে। বিষয় হতে পারে জামিনের, হতে পারে আপীল সংক্রান্ত, এমনকি তুচ্ছ কোন সামাজিক সমস্যা-সংকটের। এখানে আইনের চোখ রয়েছে খোলা, আদালতের দরজাও বন্ধ নয়। বিচারকরাও অন্তর্ভূক্ত সামাজিক সদস্য হিসেবে বিভিন্ন পরিবারের।
আইনের দিক-বিদিক নিয়ে বাবুর চিন্তা-ভাবনার ব্যাপ্তি বাড়তে থাকল। দিনে দিনে এক ধরণের ভিন্নমাত্রার ছাপ ঘিরে আসতে লাগলো ওর চারদিকে। একই সাথে পেশার গভীরতার চেয়ে আরেকটু গভীর হয়ে উঠতে লাগলো খুশীর ব্যাপার-স্যাপার। খুশীর সান্নিধ্যে নিয়মিতই পরিবর্তিত, রূপান্তরিত হতে আরম্ভ করেছে বাবু।

এগারো
কেটে গেলো আরো কিছুদিন।
আর্থিক সংকটে পড়ে গেল খুব বেশি করে হঠাৎ।
একরকম বাধ্য হয়ে চাকরি নিতে হলো সেই প্রাইভেট কোম্পানীতে যেখানে দু-একজন লোক আছে অনেক আগের পরিচিত। অন্য কারো কাছে চাকরি চাইতে যায়নি শেষপর্যন্ত, কেন যেন মনে হয়েছে কেউ আসলে ওকে চাকরি দিয়ে সাহায্য করবে না। কেনো করবে?

একটা শখের বাইক ছিল ওর,কোর্ট-কাছারিতে যাওয়া-আসা করত,বিক্রি করে দিল টানাটানিতে পড়ে, খরচাপাতি চালিয়ে যেতে গিয়ে বন্ধু-বান্ধবদের দেখা পায় না আর। পারিবারিক এবং ব্যক্তিগত সব সমস্যা তো আর খুলে বলতে পারে না সবাইকে, তবে সমাধান করতে হলে খুব সম্ভব বাড়িটাও বিক্রি করে দিতে হবে ওকে। বাড়ি বিক্রি করে দিতে চাইলেই কি দেয়া যায়? অনেকেই রাজি হবে না জানে, বাধা দেবে। দরকার হলে ওকে মামলা লড়তে হবে,অনেকে আবার বের করে দিতে বলবেন আমার বাড়ি থেকে ওকেই,নিশ্চিত।

বেচতে গেলে যে সময় লাগবে ততদিন টাকা-পয়সার কি সমাধান থাকবে কে জানে? আর বাড়ি বেচে দিয়ে কোথায় যাবে তাও তো জানে না। এক-একবার মনে হয় খুশী-র মতো সেও চলে যায় দূওে কোথাও। নিশ্চিত হয়ে থাকে, যেখানে গিয়ে জীবনটা কাটিয়ে দিতে পারবে একাকি একা।

বারো

সে রাতে ছোট একটা ধমক দিয়েছিল খুশী ওকে।
বলেছিল ‘শুধু তো আইন-বেআইন নিয়ে আছিস, বলতে পারবি আইন কোন লিঙ্গ?’ শরীর কাঁপিয়ে হাসছিল সে। আগেও দেখেছে খুশীর স্বাস্থ্য বেড়েছে কিছুদিন ধরে, যদিও ওর সুস্বাস্থ্য সম্বন্ধে বাবু ছাড়া জানে না কেউ বোধহয়। অনেক ভারি হয়েছে সে, আর নিজেই বলে গরম বেশি, এ কারণে যে, বাবুও জেনে গেছে আসলে খুশী ভয়ানক উত্যপ্ত। খুশী আবার বললো,‘ল-য়ের জেন্ডার বলতে পারবি?
বাবু বলে,‘না, পারবো না।’ বলে ঠিক, এদিকে খুশীর উত্তাপ থেকে নিরুপায় হয়ে নিরাপদ দূরত্ব খুঁজে পেতে চায় সেইসঙ্গে। একটা রাত পেরিয়ে যাওয়া ওর জন্য কোনো নতুন বিষয় না। কেননা গভীর রাতে নভো-আকাশ-নক্ষত্র বিচরণ বাবুর অনেকদিনের অভ্যেস, তবে সে সব রাত হয় দীর্ঘ, একাকি, নিস্তব্ধ। সেখানে সে অনুসন্ধান করে আকাশের রহস্যে ভরা গ্রহ-তারার লৌকিক অবস্থান।
‘তাহলে আমি বলি একটা কৌতুক। শুনবি?’
‘কি বিষয়ে কৌতুক?’
‘আরে বোকা, তোর আইন বিষয়ে আর কি!’
‘বল তাহলে, শুনি।’
‘শুনেছিস হয়ত কৌতুকটা।’ কাছ ঘেঁসে আসে খুশী, পুড়ে জ্বলতে থাকে বাবুম। খুশী বলে চলে,‘একবার হলো কি, একদল সভাসদের সামনে সভাপতি খুব দুশ্চিন্তায় পড়লেন। সমস্যা হয়েছে আইন বিষয়ক জটিলতা নিয়ে। তিনি জানতে চাচ্ছেন বার-বার, আচ্ছা, আইন শব্দটার লিঙ্গবিচ্ছেদ কি? আইন আসলে পুরুষ নাকি স্ত্রীবাচক শব্দ? প্রশ্ন শোনে উত্তেজিত হয়ে উঠেন সভাসদ সদস্যরা। সমস্বরে জুড়ে দিতে থাকেন নানান ধরনের উত্তর। একজন বলেন, এটি অবান্তর প্রশ্ন জনাব। বিরক্তি সামলে আরেকজন বলেন,‘আইনের লিঙ্গান্তর অপ্রয়োজনীয়।এটা জানলেই কি আইন প্রয়োগ সঠিকভাবে হবে? সদস্যদের বিভিন্ন মন্তব্যের এক পর্যায়ে সভাপতি থামিয়ে দেন সবাইকে, অর্ডার, অর্ডার থামুন সবাই। উত্তর পেয়ে গেছি আমার প্রশ্নের। সভাপতিকে সুস্থির দেখায়। সহজবোধ করতে থাকেন। সবশেষে হাসি মুখে তিনি জানান যে, আইন আসলে স্ত্রীবাচক। কেননা আইনের রয়েছে অনেক বড় ফাঁক।

তেরো
খুশীর কথা ভাবলেই বাবুর পতন হয় এক না-দেখা গভীর গহ্বরে। মনে পড়ে সেদিন ওর হোস্টেলে কাটিয়ে আসা রাতের কথা। সেরাতে থেকে যেতে হয়েছিল হোস্টেলের সেই একক রুমে, খুশীর সঙ্গে এক বিছানায়। খুশী হেসে-হেসে কথা বলেছে প্রায় সারা রাতে।

সে রাতে খুশীর পাশে শুয়ে কাটানো সময় ওর কাছে হয়ে থাকে রজনীর দিবাস্বপ্ন। আরো পরিষ্কার করে বললে বলতে হয় আরব্য রজনীর গল্প বা হয়ত রূপকথার ফ্যান্টাসি। কেননা জীবনে প্রথম বাবু এক নারী সৌষ্ঠব, এক দেহাতিত আলোর সামনে উপনিত হয়েছিল।অনেকটা ছোটবেলায় শোনা পরিস্থানের লালপরির গল্পের মতো। কেননা জীবনে প্রথম সে এক নারী দেহ এবং দেহাতিত আলোর সামনে নতজানু হয়েছিল রাতের অন্ধকারে। ভিন্ন অনভূতির আবেগে উত্তপ্ত হয়ে যাওয়া গভীর অতলে তলানোর চেষ্টা ব্যর্থ হচ্ছিলো ওর। কিন্তু আপরাজেয় নারী শক্তিতে অনুপ্রবেশ নিশ্চিত করে দেয় খুশী; উদগিরণ উন্মুক্ত অন্তঃপুরে। বিচ্যুতি ঘটে যায় পাললিক শিলা স্তরের। সেই অনৈতিক অন্দরে ঘটিয়ে দেয় শারিরিক অবগাহণ। বাবু খুঁজে পায় উত্তাল সাগরের অজানা দ্বীপমালার প্রবালে মুক্তো-ঝিনুক কিংবা লুকোনো গুপ্তধনের সিন্দুক। লোকচক্ষুর আড়ালে এক বিপুল রতœরাজির অলক্ষ্যে অবস্থান।

বাবু ফিরে এসেছিল বাড়িতে। চাকুরিটা চালিয়ে যেতে লেগে গেছে একা,প্রতিদিন যেতে হয়,ফিরে এসে খাবার-দাবার জোগাড় করতে হয় একাই। সমস্যা হচ্ছে কিন্তু মানিয়ে নিয়েছে এভাবে থাকাকে, এখন আর কাউকে নিয়ে আলাদা করে ভাবার সময় নেই ওর। অবসর যেটুকু পায়, কাটে আইন বিষয়ক কাজকর্ম, পড়া এবং ল-চেম্বারের কাজে। ওর ব্যস্ততা এখন পেশাগত দক্ষতা বাড়ানো নিয়ে। কিছুদিন পর-পর ফোন দিয়ে ডেকে নেয় খুশী, ওকে খুশী করতে যেতে হয়, যেতে বাধ্য থাকে হাজার ব্যস্ততা পেছনে ফেলে দিয়ে।

এখন আর বাবু খুশীর জন্য সংসার বা ওর নিজের জন্য নারীসঙ্গ নিয়েও দূরবর্তী কোনো ভাবনায় আচ্ছন্ন হয় না। করুণ একাকিত্বের একরূপ অনুভূতি ওর প্রায়ই হতো, এখন হয় না আর। সে ভাবতে শুরু করে পেছন দিক থেকে, না হয় একসময় কিছুটা হলেও সে আর খুশী নিরাপদ দূরে ছিল ভাই-বোন হিসেবে, খুশীর হয়ত অন্য একটি ছেলের সঙ্গেই সব করতে হতো, তারপরও তো একটা অলিখিত, অনিবদ্ধিত সম্মন্ধ পেয়ে গেছে সে বাবুর সঙ্গে। এমন সংশ্রব নেহাত দূর্ঘটনা এবং আইনের দৃষ্টিতে অপ্রকাশ্য, অনৈতিক হলেও বোঝাতে পারে না বাবু নিজেকে। খুশীর সঙ্গে ওর স্খলন,অবক্ষয় সবকিছু আজকাল হয়ে গেছে একেবারে কাছাকাছি দূর। সহোদর হলেও সে এখন ওর নিকটতম দূরবর্তী, তাহলে এটা কি প্রকৃতির বিরুদ্ধাচরণ হচ্ছে!
– ০ –

লেখকের অন্য পড়তে ক্লিক করুন-

ছোট ছিলাম একাত্তরে-১

ছোট ছিলাম একাত্তরে – ২

ছোট ছিলাম একাত্তরে-৩

ছোট ছিলাম একাত্তরে – ৪

অপ্রাকৃতিক

গিনি

সত্য গল্প : কলিগ

জ ন শূ ন্য

 


© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত মৃদুভাষণ - ২০১৪
Design & Developed BY ThemesBazar.Com