বৃহস্পতিবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ১২:০৬ অপরাহ্ন

সত্য গল্প : কলিগ

সাব্বিরুল হক : ব্যাংকিং জগতের লাকী আক্তার খুব হাসিখুশি মেয়ে, এক সময়ের সহকর্মী,অনেক কাজ শিখেছি লাকী আপার কাছে;গত দশ বছরে একবারের জন্যও বিরক্ত হতে দেখিনি,কোমল ব্যবহার আর মুখের মায়া ভরা হাসি সুখ্যাত করে তুলেছে লাকী আপাকে।অফিস আর গ্রাহক সেবাই যার প্রতিদিন!মাঝে অনেকগুলো বছর দূরের শাখা অফিসে বদলি হয়ে চলে গেছিলেন,ফলে লাকী আপার সঙ্গে দিনপ্রতি দেখা-সাক্ষাতে বিরতি আসে;পরের সময়গুলোতে যোগাযোগ রয়েছিল শুধু ফোন আর মোবাইলে।

আজ বাংলাদেশ ব্যাংকের সামনে হঠাৎ করেই দেখা,আগের মতই চিনতে পারলেন,রসিকতা করলেন, আরও কালো হয়ে যাচ্ছি বলে । টিপ্পনি মেরে ছড়াও কাটলেন,’সাব্বির ভাই দেখতে কালো,দাম কম তার জিনিস ভালো’ । আমিও ইয়ার্কি করলাম,’লাকী আপা ভালো লোক, জয়ের মালা তার হোক’।

দেখলাম,লাকী আপা আরো সুন্দরী হয়েছেন বছর ব্যবধানে!চেহারা সুন্দরের প্রশংসা শুনে লাকী আপা অভ্যস্ত।এড়িয়ে চলতে পারেন ভাল;জরুরি কাজ না থাকলে দ্রুতই ফিরে বাসায় যাওয়ার অভ্যেস তার।

অনেকদিন পরে আগের প্রিয় খাবারের রেস্তোরাঁয় বসে লাকী আপার পেশাগত অগ্রগতি জানতে চাই।আমার জানা মতে মনোভাবের দিক দিয়ে লাকী আপা কঠোর; বাণিজ্যিক ব্যাংকের দায়িত্বশীল কর্মকতা!

দীর্ঘ দশ বছরে বিচলিত হতে দেখিনি লাকী আপাকে, নির্ভুল হিসেব নিকেশ করতে দেখে কত কাজ শিখে নিয়েছি ।পেশাদারি দক্ষতার সাথে অমায়িক ব্যবহার, অমলিন হাসি মিলেই হচ্ছেন লাকী আপা।

আজকের ডায়েরির শুরু ও শেষ লাকী আপাকে দিয়ে।
কিছু কথাবার্তা হয়েছিল তার সাথে রেস্তোরাঁয় খেতে বসে, সেই কথাগুলো বলতে চাচ্ছি এখানেl

পরিবারের ভালমন্দ জানতে চাইতেই লাকী আপা খাবার বন্ধ করে দেন।যা কখনো দেখিনি সেই বিরক্তি দেখা দেয় চোখে-মুখে।
কি জানতে চাস বল্ ?
তোমার ফ্যামিলির খবর।কেমন আছে তোমার সুখী পরিবারের সবাই?
জানা কি খুব দরকার তোর?
হ্যাঁ । এতোদিন পর দেখা! জানবোনা?
গিয়ে তো খবর নিস নাই!
যেতে পারি নাই নানান কারণে । গিয়ে দেখাই সব না!
অজুহাত দেখাস কেনো?

আত্নসমর্পণ করি লাকী আপার কাছে,আগের মতোই।
ধরা খেলাম আপা!বলোনা সবার কথা শুনি?
‘আমি এবার যাবো । আমার কাজ শেষ ।’ বলতে-বলতে উঠে গেলেন লাকী আপা।
অবাক হয়ে বললাম,’যাও । কিন্তু জানিয়ে যাও পরিবারের খবর । তোমার ছেলে কি করছে? আর দুলাভাইয়ের খবর কি?
শুনিসনি কিছুই?
না তো!
বসে পড়েন লাকী আপা;দৃষ্টি তীব্র হয় তার, রাগ না দুঃখে বুঝি না।
তুই তো দেখছি বলদই রয়ে গেছিস আগের মতো!

দশ বছরে প্রথমবার বিচলিত হতে দেখি প্রিয় সহকর্মী লাকী আক্তারকে।
জানতে চাই,’কি হয়েছিলো লাকী আপা!’
আমার ছেলেটা সিরিয়ায় চলে গেছে।পরে জেনেছি আই.এসের জঙ্গীগ্রুপে যোগ দিয়েছে নাকি সে!
আর দুলাভাই?
লাকী আপার চোখে জল দেখতে পাই,একেবারেই অপ্রত্যাশিত দৃশ্য । ছবি তুলে রাখার প্রয়োজন বোধ করি,পারিনা l
‘মারা গেছে ক্রসফায়ারে । তুলে নিয়ে গিয়েছিল জঙ্গী সন্দেহে’,চোখের পানি মুছে উঠে দাঁড়ান লাকী আপা,আগের সেই পেশাদারি মনোবৃত্তি নিয়ে।
‘আমি আর কাঁদবো না বুঝেছিস । কি হবে কেঁদে? কার জন্য কাঁদবো বল্?’

চোখে জল নিয়ে হেসে লাকী আপা আমার ডায়েরি শেষ করে দেন,’কেঁদে ভাসালেও আরো দুটো নদী নালা হবেনা বুঝলি!আমি ভালো আছি একাই আমার ব্যাংকের গ্রাহকদের নিয়ে।’


© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত মৃদুভাষণ - ২০১৪
Design & Developed BY ThemesBazar.Com