বৃহস্পতিবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ১২:০৪ অপরাহ্ন

হিমাচলের পথে

নার্গিস জাহান :: গুগল মামা তুমি পারোও বটে!কোথায় বিহঙ্গের মত উড়ে উড়ে ঘুরে বেড়াবো তা আর হতে দিলে না, খুঁজে খুঁজে চোখের সামনে ধরিয়ে দিলে পৃথিবীর বিপজ্জনক রাস্তাগুলির একটি হিমাচলের রাস্তা।মনে মধ্যে ঢুকিয়ে দিলে জুজু বুড়ির ভয়।কিন্তু আমিও ছোট্ট খুকী নয় যে ভয়ে কুঁকড়ে যাব।তবুও অজানা এক ভয়ের শিহরণ নিয়েই সিমলার দিকে পা বাড়ালাম।

ভারতের রাজ্য হিমাচলের রাজধানীর নাম হচ্ছে সিমলা। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে এর উচ্চতা হচ্ছে২২০০ মিটার।হিমাচলের অন্যতম আকর্ষণ সিমলা।এর উত্তরে রয়েছে মান্ডি ও কুল্লু জেলা,পূর্বে কিন্নর,দক্ষিণ পশ্চিমে উত্তরখণ্ড ও সোলান সিমুর জেলা দ্বারা বেষ্টিত।

বাই এয়ার ঢাকা থেকে কলিকাতা হয়ে দিল্লী এয়ারপোর্ট নেমে মোবাইলের সিম কিনতে গিয়েই পড়লাম বিপাকে। আমাদের ফ্লাইট ল্যান্ড করেছে ১নং টার্মিনালে,অনেক খুঁজাখুঁজির পর জানতে পারলাম ৩নং টার্মিনালে এয়ারটেলের বুথ পাওয়া যাবে। আধা ঘণ্টা বাসে চড়ে ৩নং বুথে পৌঁছালে গেটে আবারও বাধা পড়লো। ভাগ্য ভাল একটা অল্প বয়সের ছেলে ভেতরে এয়ারটেলের বুথে সংবাদটা পৌঁছে দিলে ওখানকার একজন কর্মচারী এসে জানতে চাইলেন আমরা আজ দিল্লী থাকবো না অন্য কোঁথায় যাব। আমরা যখন সিমলার কথা বললাম তখন বলা হলো তা হলে সিম সিমলা থেকেই কিনতে হবে।অযথাই আসা যাওয়ায় ঘন্টা দেড়েক নষ্ট হলো।ভাগ্য ভাল এয়ারটেলে ওদের দেশে সম্পূর্ণ ফ্রিতে কথা বলা যায়।আহা আমাদের দেশেও যদি এ সুযোগ থাকতো! তাতো না-ই পারলে একটাকার জায়গায় দুটাকা কাটে।দীর্ঘশ্বাসটা আটকানো গেলনা।যাক, এ সুবিধাটা থাকায় কে এফ সিতে খেতে খেতে ওদের ফোনেই যোগাযোগের কাজটা করা গেল।

সন্ধ্যায় পূর্বনির্ধারিত গাড়ীতে করে রওয়ানা হলাম সিমলার পথে।দিল্লীর আশপাশ দেখতে দেখতে যতই এগিয়ে যাচ্ছিলাম ততই মনের আয়নায় হিমাচলের রাস্তাগুলোর ছবি উঁকিঝুঁকি মারছিল।রাত যত বাড়ছিল মনে হচ্ছিল আকাশের চাঁদটা বুঝি কাছে আসছে।বুঝতে পারলাম আমাদের গাড়ী অনেক উঁচু রাস্তা দিয়ে ছুটে চলেছে।ড্রাইভার ভাই এর ঘুম ভাগাতে উনার পছন্দমত একটা ধাবাতে বসে যারযার পছন্দমত খাবার খেয়ে আবারো রওয়ানা হলাম।গাড়ী ছুটছে তো ছুটছে,কখন সেই বুক কামড়ে ধরা রাস্তা পাড়ি দেব সেই টেনশনে কিছুক্ষণ পর পর জানালার বাহিরে দেখছিলাম।এরই মাঝে কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছি বুঝতেই পারিনি।ঘুম যখন ভাঙলো তখন নিজেকে সেই কল্পনায় দেখা রাস্তায় নিজেকে আবিষ্কার করলাম।রাস্তাতো নয় মনে হলো যমদূত সাথে নিয়ে ছুটছি।একেতো আকাশ ছোঁয়া, তার উপর পাহাড়ের আঁকাবাঁকা পাহাড়ি ঢেউ খেলানো সর্পিল রাস্তা।গাড়ীর স্পিড ও ছিল মা শা আল্লাহ।গাড়ী যেভাবে ঝিগঝাগ করে চলছিল মনে হচ্ছে। ছিল পুরো শরীরটাও (নাড়িভুঁড়ি সহ)কখনো ডানে কখনো বায়ে হেলে পড়ছিল।প্রতিমুহূর্তে মনে হচ্ছিল এই বুঝি গাড়ী খাদে গিয়ে পড়লো।এভাবে ভোর রাত গাড়ী গন্তব্যে পৌঁছালো।ভাবলাম বাঁচা গেল।

পূর্বনির্ধারিত ভাড়া করা বাসার নং খুঁজতে ড্রাইভার গারী মেইন রাস্তার পাশ দিয়ে নেমে যাওয়া পাথর মাটির উঁচুনিচু রাস্তা দিয়ে গড়গড় করে নীচের দিকে নামতে লাগলেন।এবার শুধু বুক নয় সারা শরীর কাঁটা দিয়ে উঠলো।কলিজাটা কেউ যেনো খামচি দিয়ে ধরে আছে।কিন্তু এখানেই শেষ নয়,গাড়ী থামলো কিন্তু বাসার নং মিললো না।গাড়ী আবরো স্টার্ট নিল। এবার এটা রাস্তা মনে হলোনা, উপর থেকে খাঁড়া নীচে, মনে হলো মৃত্যুকূপ গাড়ী নামছে।যাক বাবা দু’হাত জায়গা বাকী থাকতে কলিমা পড়তে পড়তে বাসার সামনে গাড়ী থামলো।আমার মত ভীতুরামের অবস্থা যা-ই হোক ড্রাইভার নির্লিপ্ত-ভাবে স্বাভাবিক নিয়মে গাড়ী পার্কিং করলেন।হিমাচলের বাড়িঘর যে এভাবেই পাহাড়ের খাঁজে খাঁজে গড়ে উঠেছে তা তখনও বুঝতে পারিনি।

ভোর ৫-৩০, বাসার কেয়ারটেকার মীনাজীকে ফোন দিলে উনি বাসার চাবি নিয়ে এসে আমাদের সব বুঝিয়ে দিয়ে গেলেন।ড্রয়িং, ডাইনিং গুছানোকিচেনসহ তিন বেডের বেশ আধুনিক পরিপাটি বাসা।বেশ ঠাণ্ডাও লাগছিল।ফ্রেশ হয়ে আপাতত: আরাম করে ঘুমিয়ে পড়লাম।

ভাল একটা ঘুম দিয়ে উঠে ফ্রেশ হয়ে সবুজের আহ্বানে তিন তলার ছাদে গেলাম।এত সুন্দর সকাল দেখে মুগ্ধতায় মন ভরে গেল।একরাশ হিমেল হাওয়া এসে আলতো ছুঁয়ে দিয়ে বলে দিল সুপ্রভাত।আর সকালের সোনারোদও আলিঙ্গনে জানিয়ে দিল স্বাগতম সিমলায়।প্রকৃতির নূতন রূপ দেখতে দেখতে নাস্তার ডাক পড়লে রোমে ফিরে এলাম।মীনাজী খাবার টেবিলে সুন্দর করে নাস্তা রেখে গেছেন।নাসতা সেরে সকালের অমেকটা সময় পের হয়ে গেল।তাই সবাই মল রোডের উদ্দেশ্যে রেডি হয়ে নীচে নামলাম।গাড়ী রেডি ই ছিল।গত রাতের ভয় তখনো কাটেনি।বা পাশে তাকাতেই পারছিলাম না। গাড়ীর ডান পাশের দরজা খুলে উঠে বসলাম।

টিপ টিপ হৃৎস্পন্দন নিয়ে রওয়ানা হলাম নীচের রাস্তা থেকে উঠে আসা মেইন রাস্তায়।চলতে চলতে বুঝতে পারলাম হিমাচল মানেই পাহাড়ের রাজ্য।সরু সরু রাস্তা দিয়ে চলতে চলতে যেমন ভাল লাগলো তেমনি অবাক হয়ে দেখলাম, এখানে আইনের প্রতি সবাই কত শ্রদ্ধাশীল। আইন মেনে চললে ছোট শহর ছোট রাস্তায়ও যে কত সুশৃঙ্খল,জ্যাম-মুক্ত,শান্তিপূর্ণ আর পরিপাটি হয় তা সিমলায় এসে বুঝতে পারলাম।ড্রাইভারদের ভেতরে অভারটেক করার কোন প্রবণতাই দৃষ্টিতে আমার পড়েনি।প্রতিটি ড্রাইভারকেই দক্ষ মনে হলো।ওদের পরিপাটি ইস্ত্রি করা পোশাক পরিহিত ট্রাফিক পুলিশদের দেখে আমাদের দারিদ্র ক্লিষ্ট রং-জ্বলা পোশাকের ট্রাফিক পুলিশের জন্য মনটা হুহু করে উঠলো।

 মল রোড যাওয়ার পূর্বে গাড়ী যেখানে থামলো সেখান থেকে লরোডে যাওয়ার জন্য অল্পদূর পায়ে হেটে যেয়ে কয়েটা সিঁড়ি অতিক্রম করে লিপ্টে যেতে হয়।দুটো লিফট্ পাশাপাশি। লিফটের ঠিকিট কেটে সবাই লাইন করে শান্তিপূর্ণভাবে দাড়িয়ে ছিল।সবচেয়ে ভাল লাগলো ওখানে সিনিয়রদের জন্য ঠিকিটে যেমন ছাড় রয়েছে তেমনি উনাদের লাইনে দাড়াতে হয়না।মনে মনে ভাবলাম এতটুকু সম্মানতো আমারও দেখাতে পারি।মল রোডের ভেতরে কোন যানবাহন চলাচল নিষেধ।ছোট বাচ্চা নিয়ে কেনাকাটা চলাফেরায় আলাদা কোন টেনশান নাই।কেনাকাটা,খাওয়াদাওয়া, ডলার ভাঙ্গানো,সীম কেনা রিজার্চকরা সবই এখানে সম্ভব।বিকেল বাসন্ধ্যা কাঠানোর জন্য জায়গাটা খুব মনোরম।মলরোড শেষ হলেি শুরু হয় দ্য রিজ,খোলামেলা বিশাল এলাকা।এখানে রয়েছে কয়কটি ল্যান্ডমার্ক।হাঁটতে হাঁটতে ক্লান্তি লাগলে বিশ্রামের জন্য পাতা রয়েছে একাধিক ব্রেন্ঞ্চ।মনের খোরাক জোগানোর জন্য রয়েছে স

সারি সারি ওক,পাইনসহ নানা রকম গাছের মনোরম সবুজ বন।।১৮৪৪সালে নির্মিত উত্তর ভারতের প্রাচীনতম গীর্জার দেখাও পাওয়া গেল এখানে।যার মধ্যে রয়েছে দেশের অন্যতম বড় পাইপ অর্গান।শহরের এই অংশের নীচে যে জলাশয়টি সেটি সিমলার জনজীবনে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে যাচ্ছ।কারণ এখান থেকেই শহরের ৮০ভাগ এলাকায় পানি সরবরাহ করা হয়

সন্ধ্যা নামতে না নামতেই পাহাড়ের গা ঘেঁষে গড়ে উঠা বাড়ীগুলোয় জ্বলে উঠলো লাল নীল বাতির দৃষ্টি নন্দন রূপ।আস্তে আস্তে দোকানপাটগুলোও বন্ধ হওয়ার প্রস্তুতি নিতে শুরু করলো। পাহাড়ের বাড়িগুলোয় জোনাকীর মত জ্বলে থাকা আলোর ঝিকিমিকি দেখে দেখে আমরাও আমাদের অস্হায়ী গন্তব্যের দিকে ফিরে চললাম।আগামীর সকাল অন্য কোন গন্তব্যে যাওয়ার প্ল্যান করে সেদিনের মত নিদ্রার কোলে ঢলে পড়লাম। চলবে…

 

পেহেলগাম জয়ের গল্প

ভূ-স্বর্গ কাশ্মীরের পথে প্রান্তরে

শ্রীনগর থেকে সোনামার্গ

মেঘ বালিকার দেশে


© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত মৃদুভাষণ - ২০১৪
Design & Developed BY ThemesBazar.Com