রবিবার, ২০ অক্টোবর ২০১৯, ০৮:০৫ পূর্বাহ্ন

সবাই তো তারকা হতে চায়, কিন্তু কতজন হয়?

বাবা রহমান মৃধার সঙ্গে মেয়ে টেনিস তারকা

রহমান মৃধা, ক্রোয়েশিয়া থেকে :: উৎসর্জন, প্রেরণা, নৈবেদ্য ও সহনের সমন্বয়ে সৃষ্টি হয় বিশ্ব তারকা। হোক না সে শিল্পী, অভিনেতা, অভিনেত্রী, স্প্রিন্টার, টেনিস বা ফুটবল খেলোয়াড়।

এদের লক্ষ্য এবং উদ্দেশ্য এক এবং অভিন্ন। ব্যক্তি হিসেবে এরা এদের ব্যক্তিত্বে স্বতন্ত্র। এরা সাধারণদের মধ্যে অসাধারণ এবং এদের সংখ্যা কম।

কিন্ত এরা বিজয়ী হিসাবে সব ক্রেডিট একাই নিয়ে থাকে। আমরা সবাই ফিনিস প্রোডাক্ট বা সমাপ্ত পণ্য দেখতে চাই কিন্তু কেউ কি কখনো ভেবেছে যে এই সমাপ্ত পণ্য তৈরির পেছনে কী পরিমাণ অর্থ এবং একটি বিশাল সংগঠন জড়িত?

আকাশের লক্ষ্য তারার মাঝে চাঁদ কিন্তু আমরা একটিই দেখতে পাই তেমনটি কোটি কোটি মানুষের ভিড়ে খুবই সামান্য তারকার জন্ম হয় বা প্রতিভার বিকাশ ঘঠে যা আমরা দেখতে পাই খেলার মাঠে, টেনিস কোর্টে, সিনেমার পর্দায়, স্টকহোমের সিটি হলে (যাঁরা নোবেল বিজয়ী)।

বিশ্বের মানব জাতির মাঝে যারা খেলাধুলার জন্য ত্যাগ শিকার করা থেকে শুরু করে উৎসর্গ ও বিসর্জন দিয়েছেন তাদের জীবন, সংখ্যায় তাঁরা কিন্তু খুবই কম।

তবে ভোগকারীদের সংখ্যা যেমন বেশি তেমন দর্শকের সংখ্যাও বেশি। তাইতো দেখা যায় খোলা মাঠে, টেনিস কোর্টে বা সিনেমা হলে কিছু সীমিত লোকের ক্রিয়াকলাপ বা বিনোদন দেখার জন্য জমা হয় হাজারো লোকেরা।

খেলাধুলার জগতে একটি জিনিষের প্রচুর মিল রয়েছে তা হলো কঠিন পরিশ্রম ও ত্যাগ শিকার করা সে যে খেলাই হোক না কেন।

আজ লিখব বা বর্ণনা করব আমার ছেলে ও মেয়ের টেনিসের ওপর, তাদের প্রস্তুতি শুরু থেকে আজ অবধি একজন ক্রমপরিণত তারকা হিসাবে তাদের বর্তমান প্রগতিশীলতার ওপর।

আমার পোস্টিং হয়েছে ফার্মাসিউটিক্যালস ইন্ডাস্ট্রির একজন উৎপাদন বিভাগের পরিচালক হিসাবে, স্ট্রেংনেছে।

স্ট্রেংনেছ, স্টকহোম থেকে ৮০ কিলোমিটার দূরে। মারিয়া আমার বউ, সেও চাকরি করছে ফার্মাসিটিক্যালসে একজন অ্যানালিটিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার হিসাবে।

বিধায় কোম্পানি তাকেও পোস্টিং করল একই শহরে। জনাথানের বয়স তখন পাঁচ বছর। সে কিন্ডারগার্টেনে যায়, সেখানে লেখাপড়ার সঙ্গে ফুটবল, হকি এসব নিয়েই সে ব্যস্ত।

চলছে তার দিনকাল ভালোই। ছোট্ট শহরে এসেই মারিয়া বায়না ধরল যে সে আরেকটি বাচ্চা নিতে চায়। আমি আমার কাজের কারণে তখন দেশের বাইরে প্রায় ৫০-৬০% সময়।

হয়ত তার কিছুটা একাকিত্ব এবং জনাথনের জন্য ভালো হবে বাড়িতে আরেকটি বাচ্চা থাকলে, তাই হতে পারে তাঁর সেই বায়নার কারণ! দীর্ঘ গল্প সংক্ষিপ্ত করি, আমার মেয়ে জেসিকার জন্ম হলো। মারিয়া পেরেন্টাল লিভে বাচ্চাদের নিয়ে বাসাতে আর আমি আমার কাজে।

চলছে আমাদের জীবন ভালই। মারিয়া জেসিকাকে স্ট্রলে করে সঙ্গে নিয়ে জনাথানকে স্কুল থেকে আনা নেওয়া করে।

আজ পথে আসতে ঘটলো এক অলৌকিক ঘটনা। হঠাৎ করে একটি কাগজ উড়তে উড়তে এসে পড়ল জেসিকার স্ট্রলারের ওপরে।

মারিয়া কাগজটি পড়ে দেখে লেখা রয়েছে বিনামূল্যে তিনদিন টেনিস প্রশিক্ষণের সুযোগ। বয়স ৫-৭ বছর হতে হবে।

সামনেই স্ট্রেংনেছ, ভিসহোলমেন লেকের ধারে টেনিসের ক্লাব, মারিয়া জনাথানকে জিজ্ঞাসা করল, বাবা তুমি কি চেষ্টা করতে চাও? জনাথান একবাক্যে উত্তর দিল, হ্যাঁ মা, আমি চেষ্টা করতে চাই। সঙ্গে সঙ্গে চলে গেলো এবং ট্রেনারের সঙ্গে দেখা মিলতেই খেলার সুযোগ মিলে গেলো।

সেদিন ছিল মঙ্গলবার ৫ জুন, ২০০১ সাল। সেই চেষ্টা থেকে আজ সে একজন প্রগতিশীল তারকা, জনাথান মৃধা। জনাথান নিজেকে প্রস্তুত করছে সেই সমাপ্ত পণ্য (ফিনিশিং প্রডাক্ট) হবার জন্য।

জনাথান তার শুরুর প্রথম তিনদিন টেনিস খেলার সুযোগ তৈরি করেছিল ভাললাগা থেকে।

ভালবাসা আর সেই থেকে মেধা ও বয়স ভিত্তিক সুইডেনের সেরা টেনিস খেলায়াড় হিসেবে প্রথম স্থানটি সে তার দখলে রেখে নতুন চ্যালেঞ্জের পথে বিশ্বের সেরা ১০০ জনের মধ্যে আসার লক্ষ্যে চালিয়ে যাচ্ছে তার কঠিন প্রশিক্ষণ।

“প্রাকটিস মেক্স এ ম্যান পারফেক্ট”, টেনিসের জগতেও এটা খুবই সত্যি। জনাথান বর্তমান বিশ্বের ৫০০ জনের মধ্যে রয়েছে এবং সে তার লক্ষ্য এবং উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে কাজ করে চলছে।

জেসিকাও ঠিক তার ছয় বছর বয়সে হঠাৎ তার মাকে বলেছিল, “মা আমিও টেনিস খেলতে চাই”। হয়ত বা ভাইয়ের প্রতিভা এবং অণুপ্রেরণা তাকেও টেনিসের জগতে আনতে সাহায্য করেছিল সেদিন।

জসিকাকেও ঠিক অনুসরণ থেকে ভাললাগা আর ভাললাগা থেকে ভালবাসা এই কনসেপ্টের মধ্য দিয়েই শুরু করেছিল তার টেনিস প্রশিক্ষণ।

এবং সেও তার বয়স ভিত্তিক ও মেধা অনুযায়ী সুইডেনের দ্বিতীয় স্থানটি দখলে রেখেছে। জেসিকা টেনিসের সঙ্গে তার লেখা পড়াও শেষ করতে চায়।

তাই পেশাদারীর পথটা এখনও সঠিক করেনি, তবে সে নিয়মিত লেখাপড়ার সঙ্গে প্রশিক্ষণ চালিয়ে যাচ্ছে। মনে হচ্ছে এ এক শেষ না হওয়া প্রক্রিয়া বা ‘নেভার অ্যান্ডিং প্রসেস’।

শেষ সেদিন হবে যেদিন তারা টেনিসের জগত থেকে অবসর নিবে, তার আগ পর্যন্ত এটা একটি “অন গোয়িং ডেভেলপমেন্ট প্রসেস”।

শুরু থেকে শেষ এবং কী হবে বা কী না হবে তা জানিনে, তবে চলতে থাকবে এ যাত্রা।

বাঙ্গালীর রক্ত বইছে তাদের শরীরে তাই আমার আনন্দ, বুকভরা ভালবাসা আর প্রাণভরা আশা একদিন হয়ত উড়বে লাল সবুজের পতাকা সারা বিশ্বে। এমন প্রত্যাশা টেনিসের জগত থেকে।

রহমান মৃধা, ক্রোয়েশিয়া থেকে। rahman.mridha@ownit.nu


© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত মৃদুভাষণ - ২০১৪
Design & Developed BY ThemesBazar.Com