শনিবার, ২৩ নভেম্বর ২০১৯, ০৯:১৭ পূর্বাহ্ন

ভূ-স্বর্গ কাশ্মীরের পথে প্রান্তরে

নার্গিস জাহান :: আমরা যখন ডাল লেকের পাড়ে পৌঁছলাম সূর্য তখন তার বর্ণিল রঙের হোলি খেলায় ব্যস্ত।আমাদের অভ্যর্থনা জানাতে ঘাটে শিকার(প্রমোদ তরী) আগে থেকেই প্রস্তুত ছিল।বজরায় চড়ে বণিকের বাণিজ্য যাত্রা কিংবা জমিদারের নৌবিহারের গল্প ছোটবেলা কতনা শুনেছি,এবার বেড়াতে গিয়ে কোন হোটেলে না উঠে তেমনি একটা বোট হাউজে উঠলাম।সম্পূর্ণ ভিন্ন রকমের অনুভূতি ঠিক যেন বজরায় উঠলাম। বাহির থেকে বুঝাই যাচ্ছিলনা যে ভিতরে এত ফিটফাট পরিপাটি।গ্যাস, পানি, বিদ্যুৎ, ইন্টারনেট সবই আছে।ডাল লেকের পাড়ে হোটেল মোটেল ছাড়াও সারিবদ্ধ এসব ভাসমান বোট হাউজগুলো থাকা খাওয়ার সুবিধাসহ ভাড়া দেয়া হয়।পাঁচতারকা তিনতারকা হোটেলের মত এদের কোন তারা নেই তবে আছে চমৎকার চমৎকার নাম।শিকরায় ভাসতে ভাসতে আপনি হয়তো মিস ইন্ডিয়ার মত নাম দেখে চমকে উঠতে পারেন।ডাল লেকের দৈর্ঘ্য সাড়ে সাত কিঃমিঃ,প্রস্থ সাড়ে তিন কিঃমিঃ.।নগরের সমস্ত ব্যবসা বাণিজ্য মূলত: ডাল লেক কেন্দ্রিক আর আয়ের মূল উৎস টুরিস্টদের ঘিরে।

ডাল লেককে শ্রীনগরের মুকুটও বলা হয়।দুপুরের ডাল লেক সন্ধ্যায় শত রঙের আলো খেলায় মেতে উঠে।রঙবেরঙের শিকারগুলো লাল নীল সোনালি আলোর মায়ায় যাত্রী নিয়ে ভেসে বেড়ায়।বোট হাউজগুলোর কাঠের খোলা বারান্দায় জ্বলা উজ্জ্বল বাতিগুলো দূর থেকে দেখলে স্বপ্ন পুরির মত মনে হয়।ওহহো বলাইতও হয়নি,আমি বলছিলাম কাশ্মীরের শ্রীনগরের গল্প।কাশ্মীর, যাকে সবাই নাম দিয়েছে ভূস্বর্গ। এমন লোভনীয় একটা জায়গা দেখতে কার না ইচ্ছে করে।আমারও অনেক দিনের ইচ্ছে ছিল।এবার সামিয়া আর কবীরের( মেয়ে,জামাই)সুবাদে সুযোগ এলে তা লুফেই নিলাম।

কাশ্মীর যেখানে মেঘদের শতদল সবুজ পাহাড়ের রূপে মুগ্ধ হয়ে থমকে দাড়িয়ে আছে।কিছুদূর পরপর রাস্তার এপাশে ওপাশে বয়ে যাচ্ছে শীতল জলের হ্রদ আর সবুজ পাহাড়ের বুক চিরে বয়ে যাচ্ছে ঝর্ণার ধারা।কাশ্মীর প্রকৃতির মূল্যবান অলংকারে সাজানো সত্যি যেন এক রাজ কন্যা।প্রকৃতি যেন তার সমস্ত রূপ,রং,ঐশ্বর্য সব রাজকন্যার পায়েই নজরানা দিতে ব্যস্ত।আর তাই বুঝি রাজ কন্যাকে পাবার জন্য রাজায় রাজায় যুদ্ধ, এত রক্তারক্তি।

কাশ্মীর মূলতঃদুটি অংশে বিভক্ত-১.ভারত শাসিত জম্মু কাশ্মীর।আয়তন ২২২২৩৬কিঃমিঃ।সরকারী ভাষা উর্দু।
২. পাকিস্তান শাসিত আজাদি কাশ্মীর।আয়তন১২,৫৪১৩০কিঃমিঃ।সরকারী ভাষা উর্দু।শীতে বরফের জ্যাকেটে ঢাকা কাশ্মীরের যেমন মন কাড়া রূপ থাকে তেমনি গ্রীষ্মে সবুজের হাতছানি,ফুলে ফলে প্রকৃতির চোখ ঝলসানো রূপে নিজেকে হারয়ে ফেললাম।ক্যামেরায় কোন ছবি তুলবো আর কোনটা তুলবো না দিশেহারা হয়ে যাচ্ছিলাম।পাহাড়ের সবুজে হেলান দেয়া আকাশের ছেঁড়া ছেঁড়া সাদা মেঘে সূর্যাস্তের বর্ণিল রূপ আমাকে পাগল করে দিচ্ছিল।আবার পাহাড়ের চূড়ায় জমে থাকা সাদা বরফের উপর প্রভাত রবির কিরণ যেন হীরার দ্যুতি ছড়াচ্ছিল।

পেহেলগাম যেতে যেতে রাস্তার দুপাশে বয়ে চলা হ্রদে স্বচ্ছ স্রোতের কুলকুল সুরে আকন্ঠ ডুবে গেলাম।ইচ্ছে হলো গাড়ী থেকে নেমে হ্রদের পারে পা দুটো ডুবিয়ে জলের গান শুনি।পথ চলতে চলতে ড্রাইভার ভাই বিশেষ বিশেষ জায়গা, বাগান,ঐতিহ্য দেখিয়ে যাচ্ছিলেন।রাস্তার পাশে সারি সারি গোলাপি সবুজে মেশানো মনোরম আপেল বাগান নজর কেড়ে নিলো।এখানকার নানা রকম বাদাম, গরম মসল্লা রকমারি খাবারের গল্প শুনে পথিমধ্যে নেমে দোকান থেকে কিনে নিলাম ড্রাইফ্রুট বাদাম আর মসল্লা। বিখ্যাত জাফরানও তালিকা থেকে বাদ গেল না।

ভূস্বর্গ কাশ্মীরের শ্রীনগরকে মোঘল শাসকদের তৈরি বাগান,নিশাতবাগ,শালিমার বাগ,চাশমে শাহীবাগ ইত্যাদি সৌন্দর্য অন্য এক মাত্রা যোগ করেছে।বাগানগুলোতে হাঁটতে হাঁটতে মনের গোপন চোখে ভেসে উঠছিল সখিদের নিয়ে বাগানে নূর জাহানের খোশগল্পের চিত্র।(হা হা হা)।

মজার ব্যাপার হলো লক্ষ্য করলাম বাংলাদেশ থেকে এসেছি শুনলে কাশ্মীরের লোকজনকে বেশ খুশি মনে হলো।বাংলাদেশ ওদের খুব পরিচিত পছন্দের একটা দেশ।আমাদের ক্রিকেটারদের ওরা প্রায় সবাই চেনে,ভালবাসে।নামও জানে।কেউ কেউ কাশ্মীরে ব্যক্তিগতভাবে মাশরাফির সাথে পরিচিত হয়ে ছবি তোলার গল্প বললো,একইভাবে আমাদের সাকিবের গল্পও কেউ করলো।শুনতে খুব ভাল লাগছিল।মনে হলো আমরা যেন ওদের কত আপন।।

বলতে ভুলে গেছি,শ্রীনগরে রয়েছে মুসলমানদের পবিত্র মসজিদ হযরতবাল মসজিদ।জানা যায় মদিনা থেকে হযরত মোহাম্মদ (সঃ) এর মাথার চুল এখানে বিশেষভাবে রক্ষিত রয়েছে।শ্রীনগরে বিশাল এলাকাজুড়ে রয়েছে কাশ্মীর বিশ্ববিদ্যালয়।

সবুজ পাহাড় ফুলের বাগান,শান্ত হ্রদ আর বিখ্যাত জাফরানের মত কাশ্মীরের মানুষের জীবন এত সুন্দর আর সহজ নয়।এদের জীবন খুব কষ্টের।প্রাচুর্যে ভরা প্রকৃতির মত ওদের আর্থিক কোন প্রাচুর্য নেই।তেমন আলিশান কোন দালান আমার চোখে পড়েনি।আবহাওয়ার মত ওদের পরিবেশ পরিস্থিতি কোনটাই ওদের অনুকূলে নয়।যখন তখন বদলে যেতে পারে।কাশ্মীরের রাস্তায় রাস্তায় সেনা মোতায়েন রয়েছে। পেহেলগাম থেকে ফেরার পথে সন্ধ্যা নামলে আমাদের গাড়ীসহ আরও গাড়ী কিছু সময়ের জন্য ঊর্ধ্বতন সামরিক কর্তৃপক্ষের নির্দেশে আমাদের নিরাপত্তার জন্য আটকে রাখা হলো। কেননা পরদিন সকালে হিন্দুদের পবিত্র ইয়াত্রা যাত্রা ছিল।কিছুক্ষণ পর আমাদের সামরিক পাহারায় নির্দিষ্ট দূরত্ব পর্যন্ত এগিয়ে দেয়া হলো।( চুপি চুপি বলে ফেলি, আমি কিন্তু ভেতরে ভেতরে একটু ভয় পেয়েছিলাম)।

আমরা যার বোট হাউজে উঠেছিলাম উনার নাম নাজির ভাই।খুব ভাল মানুষ,পরিবারটাও।বড় দুই মেয়ে ছোট ছেলে ক্লাস এইটে পড়া শহীদ এখনই জীবন যুদ্ধে নেমে পড়েছে।বাবার হোটেল ব্যবসা বলতে গেলে ও-ই দেখাশোনা করে।পরিবারের সবাই নৌকা বাইতে পারে।আমরা যেদিন হাউজে উঠলাম সেদিন সন্ধ্যার পর থেকে নৌকা করে একে একে বিভিন্ন ব্যবসায়ী তাদের হাতের কাজের পশমিনা,শাল,কুর্তা,হাতের কাজের বেড কাভার কাঠও পুতির গয়না বিক্রির জন্য দেখাতে নিয়ে এলেন।এরা নিজেদের সব কাজ নিজেরাই করেন।ডাল লেকের এক পারে শিকার , অন্যপারে বোট হাউজ।বৃষ্টির দরুন আধশোয়া হয়ে কম্বল গায়ে দিয়ে শিকারে চড়ে আলোর সাগরে দোল খেতে খেতে ভাসমান মীনা বাজারও ঘুরে এলাম।সে অন্য রকম এক ভাল লাগা,অন্য রকম এক স্মৃতি।

সোনমার্গ,গুলমার্গ,গ্রীণভ্যালি,পেহেলগামসহ অন্য গল্প আরেকদিন না হয় বলবো।জানিনা কেন কাশ্মীরের সৌন্দর্য দেখতে দেখতে নিজের অজান্তেই চোখ ভিজে যাচ্ছিল।কোথায় যেন কোরআন শরীফে বর্ণিত বেহেস্তের বর্ণনার সাথে এখানকার পাহাড়, বয়ে চলা ঝর্ণার সাথে কিছু একটা মিল খুঁজে পাচ্ছিলাম।

ফেরার সময় বৃষ্টির কারণে ভীষণ ঠাণ্ডা লাগছিল।নাজিরভাই ছাতাসহ নৌকা দিয়ে আমাদেরকে গাড়ী পর্যন্ত এগিয়ে দিলেন।এত ঠাণ্ডায় কাশ্মীরী শালের উমে নিজেকে জড়িয়ে নিলাম, শুধু পারলাম না কোন ফুল তোলা রুমালে ওদের কষ্ট মুছে দিতে।


© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত মৃদুভাষণ - ২০১৪
Design & Developed BY ThemesBazar.Com