রবিবার, ১৮ নভেম্বর ২০১৮, ০৩:০৭ অপরাহ্ন

মানালির রোথাংপাস ও সোলাং ভ্যালি

নার্গিস জাহান :: সেদিন মানালির সকালের মেজাজটা ছিল বেশ ফুরফুরে রৌদ্রজ্জ্বল। কটেজের বারান্দা থেকে বাহিরের প্রকৃতিটাও ছিল মন ভাল করে দেয়ার মত।সিমলা আর মানালিকে অনেকেই একই ছকে ফেলে দেন, কিন্তু তা কি করে হয়?পৃথিবীতে কোটি কোটি মানুষের হাতের আঙ্গুলের ছাপ যেখানে এক রকম হয় না তেমনি স্রষ্টা প্রকৃতিকে ও ভিন্ন বর্ণে ভিন্ন রঙে নানা আঙ্গিকে সাজিয়ে রেখেছেন।সিমলা মানালিও দু,টোর আলাদা আলাদা সৌন্দর্য রয়েছে।
মানালির প্রথম সকালে কটেজের বারান্দায় বসে বসে বাহিরের প্রকৃতি দেখছিলাম, কত শান্ত,ছিমছাম। কোথাও গিজ গিজ বাড়িঘর কিংবা প্রকৃতিকে আড়াল করার মত আকাশ ছোঁয়া কোন অট্টালিকা এখানে গড়ে ওঠেনি।যতদূর চোখ যায় শুধু সবুজের হাতছানি আর রাস্তার পাশ জুড়ে নজর কাড়ছিল আপেলের বাগান।রাস্তায় গাড়ীর বেপু একেবারেই কম।সকালের নাস্তা সেরে আমরা বেড়িয়ে পড়লাম রোথাংপাস আর সোলাং ভ্যালির উদ্দেশ্যে।

রোথাংপাস–মানালি শহর থেকে৫১কিঃমিঃবা৩২ মাইল দূরে রোথাংপাসের অবস্থান।সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে এটি ৩৯৭৮ মিঃ বা১৩০৫০ ফিট উচ্চতায় রয়েছে।এই ছোট্ট পাহাড়ি শহরের গা ঘেঁষে জড়িয়ে রয়েছে কুলকুল বয়ে চলা স্রোতস্বিনী বিয়াস নদী।বিয়াসের পূর্ব নাম ছিল বিপাশা।বড় বড় পাথরের বুকে আছড়ে পড়া বিয়াসের স্রোত যেনো ঝলমলিয়ে জ্বলে উঠছে।পাহাড় কাটা রাস্তা দিয়ে ছুটে চলেছে আমাদের গাড়ী। রাস্তার একপাশে সবুজ পাহাড়, কেউবা রাজকীয় ভাবে বরফের মুকুট পরে সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করে যাচ্ছেন, অন্যপাশে স্যুট লেজে মিলিত হওয়ার নেশায় কলকলিয়ে ছুটে চলেছে বিয়াস নদী।আর আমিও পাহাড় আর জলের কাব্য পড়তে পড়তে রোথাংপাসের কাছে চলে আসলাম।কিছুদূর পর পরই নদী রাফটিং এর জন্য বিভিন্ন টীম তাদের দামদর, এটাওটা বলে রাফটিং এর জন্য উৎসাহিত করছিল।সবারই রাফটিং করার ইচ্ছা ছিল আর সামিয়াতো আগে থেকেই লাফাচ্ছিল।কিন্তু ভাগ্য আমাদের অনু কূলে ছিলোনা।কারণ সূর্যরাজ উনার সমস্ত রোষানল আমাদের মাথার উপর বর্ষণ করছিলেন।এমতাবস্থায় রাফটিং আর আমাদের কপালে সইলো না।কি আর করা বিয়াসের গান আর পাহাড়ের রূপ দেখতে দেখতেই গাড়ী ছুটে চললো সোলাংভ্যালির দিকে।

সোলাং ভ্যালিঃ সমুদ্রপৃষ্ট থেকে সাড়ে আট হাজার ফিট উচ্চতায় মানালি শহর থেকে ১৪ কিঃমিঃ উত্তর পশ্চিম দিকে এর অবস্থান। স্থানীয় নাম “সোলাং নালাহ”। সোলাং শব্দের অর্থ হলো-নিকটবর্তী গ্রাম আরনালাহ্ শব্দের অর্থ প্রবহমান পানি।অর্থাৎ প্রবহমান পানির নিকটবর্তী গ্রাম।এটা কুলু উপত্যকার একেবারে প্রান্তবর্তী এলাকা।এডভেঞ্চার প্রেমিকদের কাছে এ নামটি খুবই পরিচিত।শীতে সোলাংভ্যালি পুরোটা বরফের আস্তরণে ঢাকা থাকে।প্যারাসুটিং,প্যারাগ্লাইডিং আর শীতে স্কেটিংসহ আরো নানা বিনোদনের ব্যবস্থা রয়েছে এখানে।মূল পয়েন্টে যাওয়ার আগে গাড়ী এসে থামলো পার্কিং এলাকায়।আমরা যখন গেলাম তখন বরফের প্রেম গলে গলে শীতল প্রবাহ হয়ে বয়ে যাচ্ছিল।আর সেই জলের স্পর্শ পেতে হলে জলে পা ভিজাতে হলে যেতে হবে ঘোড়ায় চড়ে।সাত পাঁচ ভাবতে ভাবতে শেষ পর্যন্ত দূরু দূরু বুকে ঘোড়ায় চড়ে বসলাম।পাথরে জড়ানো উঁচু নিচু দুর্গম পথে ঘোড়া আমাদের নিয়ে হাঁটা শুরু করলো।কোথাও পাথর কোথাও আবার পাহাড় থেকে নেমে আসা ঝর্ণার পানিতে কাদা কাদা হয়ে আছে।কাদার মধ্যে কখনো ঘোড়ার পা পিছলে যাচ্ছিল।এই পড়ে যাবো এই পড়ে যাবো ভাবতে ভাবতে বুকের মাঝে একটা খিল ধরেছিল।মূল পয়েন্টে নেমে মনে হলো যেনো হাফ ছেড়ে বাঁচলাম।উপর থেকে নেমে আসা কুল কুল স্রোতের ধারায় মুগ্ধ হয়ে পর্যটকরাও কলকলিয়ে হাসি খেলায় মেতে উঠলেন।দূরে পাইন, দেবদারু গাছ আর আকাশে ভেসে যাওয়া মেঘ,সবুজ পাহাড় তার চূড়ায় রয়েছে বরফ- স্রষ্টা যেনো পৃথিবীতেই তাঁর স্বর্গের ছিটা ফুটা ছড়িয়ে রেখেছেন।আমার কানের কাছে কে যেনো গাইতে লাগলো”কোন রাখালের ঐ ঘর ছাড়া বাঁশিতে
সবুজের ঐ দোল দোল হাসিতে
মন আমার মিশে গেলে বেশ হয়

যদি পৃথিবীটা স্বপ্নের দেশ হয়…..”।বিয়াসের মন কাড়া স্রোত দেখে এতক্ষণ পানিতে ঝাপাঝাপির যে ইচ্ছে মনের ভেতর কাজ করছিল এবার মনে হলো ভাল করে পানি নিয়ে জলকেলি খেলবো।কিন্তু নাহ তাতেও বিধি বাম।পানিতে পা দিতেই মিনিটের মধ্যেই বরফের ঠাণ্ডা পায়ে সূই ফোটাচ্ছে মনে হলো।তবুও পা ডুবচ্ছিলাম আর উঠচ্ছিলাম।ভীষণ ভাল লাগছিল।প্রকৃতিকে ভাল লাগার কিছু কিছু সময় আছে মনে হয় অনন্ত সময় ধরে বসে থাকি।

কথায় আছে যেমন দেশ তেমন বেশ।সত্যি তাই।আমি যেখানে এক মিনিট পা ডুবিয়ে রাখতে পারছিলাম না সেখানে ঘোড়াগুলি ঠাণ্ডা পানিতে দাঁড়িয়ে এমন হিম শীতল পানি তৃপ্তির সাথে অনেকক্ষণ ধরে পান করছিল।আশ্চর্য ও লাগলো মায়াও লাগলো। আহা!বেচারা, এমন উঁচুতে কত কত সাইজের পর্যটকদের এখানে টেনে তুলতে তুলতে গলাটা-ই শুকিয়ে গেছে।পানির নহরের পাশেই গড়ে তোলা হয়েছে খাবারের দোকান পাট,তারও পাশে পেতে রাখা হয়েছে প্লাস্টিকের চেয়ার।ঠাণ্ডা যতই হোক বসে থাকতে পারছিলাম না।কঠিন পাথরের বুকচিরে জলের ধারা কিভাবে ছুটে চলেছে মনে হচ্ছিল যেনো একদণ্ড দাঁড়াবার ফুরসত নাই।ইচ্ছে করছিল পাথরের উপর দিয়ে হেঁটে ঐপারে যাই।দু’পা বাড়াতেই সাঙ্গপাঙ্গরা পড়ে যাবে পড়ে যাবে বলে হৈ হৈ রৈ রৈ করে আমার হাতে ধরে ফেললো।চেয়ারে আমার পাশেই বসলেন কলিকাতার এক বয়স্ক ভদ্রমহিলা। আর যায় কই,শুরু হয়ে গেল এপার বাংলা ওপার বাংলার ভালবাসার গল্প।সংসার স্বামী, সন্তান বৌমা নাতী সবার গল্পই করলেন।আমাকে উষ্ণ প্রসবন দেখতে মাণিক রণে যেতে পরামর্শ দিলেন।উনার স্বামীর সাথে পরিচয়ও করিয়ে দিলেন।মেয়ে ছেলেরা বড় বড় পাথরের উপর দিয়ে হেঁটে হেঁটে নীচে নেমে ছবি তুলতে লাগলো। আমার বাবা এত সাহস হলো না তাই এখানেই রয়ে গেলাম।খান সাহেব এই পানিতে ওযু করে যোহরের নামায আদায় করলেন।ঘড়ির কাঁটায় দুপুর গড়াতে চললো, বাচ্চারাও উপরে উঠে আসলো।দোকানে চৌমিনের মত কি বানাচ্ছিল তাই রাবি গরম গরম কিনে নিয়ে আসলো।এসব খেয়েতো আর বাঙ্গালির পেটপূজো হয়না । এখন ফিরে যেতে হবে, তাছাড়া ঘোড়ারওতো রিটার্ন টিকেট করা তাই ওখান থেকেও তাগাদা আসছিলো।আশে পাশের দেবদারুর ঘন সবুজ বন আর দূরে পাহারের চূড়ায় বরফের উপর রোদের লুকোচুরি খেলা দেখতে দেখতে ঘোড়ার কাছে চলে আসলাম।শেষবারের মত আরো কিছু ছবিও তুললাম।শেষবারের মত দেখে নিলাম জলকন্যার চপল পায়ের নৃত্য আর মৃদু লয়ে জলের কুলকুল গানও কানে সেট করে নিলাম।

ঘোড়ার মালিক বলে দিলেন এবার যেহেতু ঘোড়া নীচ নামবে তাই আমাকে বসতে হবে পা সামনের দিকে টান করে আর পিঠ পিছনের দিকে ঠেলে। ভালোয় ভালোয় প্রায় ৪০/৪৫মিনিটের পথ পাড়ি দিয়ে নীচে এসে নামলাম।এবারের গন্তব্য মানালির মলরোড।একের ভিতর দুই কাজ।খাওয়া দাওয়া আর ডলার ভাঙ্গিয়ে কেনাকাটা।তবে তাই হোক,লেটস গো।আবার আসবো গল্পের ফেরি নিয়ে।


© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত মৃদুভাষণ - ২০১৪
Design & Developed BY ThemesBazar.Com