1. ahmedshuvo@gmail.com : admi2018 :
  2. mridubhashan@gmail.com : Mridubhashan .Com : Mridubhashan .Com

সোমবার, ২৪ ফেব্রুয়ারী ২০২০, ১০:৫৮ পূর্বাহ্ন

কোথায় আমার ঘর?

জেসমিন চৌধুরী

জেসমিন চৌধুরী :: এক সপ্তাহ ডায়েটিং এর পর সুইমিং কস্টিউম পরিহিত নিজেকে আয়নায় দেখে মেজাজটা বেশ ফুরফুরে লাগছিল। কাজ হচ্ছে তাহলে! অনেক দিন পর আজ একাই জিমে গেলাম। অপু নেই তবু মন্দ লাগছিল না। সনা রুমে আজ সবচেয়ে নিষিদ্ধ আলাপটাই উঠে গেল। আমি চুপ করে শুনছিলাম, রাজনীতি খুব ভালো বুঝি না।

টোনি ব্লেয়ার মানুষ কেমন? এড মিলিবান্ড না ডেভিড মিলিবান্ড- লেবার পার্টির নেতা হবার যোগ্যতা কার বেশি ছিল? জেরেমি করবিন মানুষ ভালো, কিন্তু ক্ষমতায় আসার যোগ্যতা কি তার আছে? উপস্থিত সকলেই আমার চেয়ে বেশি জ্ঞান রাখে, অন্তত রাজনীতি সম্পর্কে। তাই চুপ করেই শুনছিলাম।

সব আলোচনায়ই একজন সবজান্তা টাইপ লোক থাকে যে ভাবে পুরো পৃথিবীকে জ্ঞান দানের দায়িত্ব তার একার। এমন একজন জুটে গিয়েছিল আজকেও, গায়ের রঙ দেখে মনে হলো এশিয়ান। তার আপন ছোট ভাই টোনি ব্লেয়ারের বডিগার্ড ছিল, এদেশের রাজনীতি তার চেয়ে বেশি আর কে বুঝবে?

এর মধ্যে ঝগড়াও লেগে গেল। একজন সাদা লোক বলল, ‘রাজনীতি হোক আর যা-ই হোক, নিজের কথায় এবং বিশ্বাসে একনিষ্ঠ থাকা জরুরী। এই দিক দিয়ে জেরেমি করবিন এবং ডোনাল্ড ট্রাম্প দুজনেই সমান। জেরেমি করবিন একনিষ্ঠভাবে মানবিক এবং ডোনাল্ড ট্রাম্প একনিষ্ঠভাবে স্টুপিড।’
সবজান্তা লোকটা ক্ষেপে গেল,’যা বোঝ না তা নিয়ে কথা বলতে এসো না’।

সাদা লোকটা রেগে লাল হয়ে বেরিয়ে গেল সনা রুম থেকে।পেছন থেকে সবজান্তা লোকটা রাগে গরগর করতে থাকল, ‘এখানে দেখছি মন খুলে কথাই বলা যাবে না, অন্য লোকে মাঝখানে কথা বলতে চলে আসে।এবার আমি আর চুপ থাকতে পারলাম না, ‘দেখো, এটা তো ইউনিভার্সিটির লেকচার থিয়েটার নয় যে একজন বলবে আর বাকিরা চুপ করে শুনবে। পাবলিক প্লেসের আলোচনায় কথা বলার অধিকার সবারই আছে’।

লোকটা আমাকে আক্রমণ করার আগেই আমি সনারুম থেকে বেরিয়ে এলাম। ঠান্ডা শাওয়ারের পাশে দেখা হয়ে গেল সেই সাদা লোকটার সাথে। সে মুখ কালো করে বলল, ‘আমি বেরিয়ে আসার সময় সে কী বলছিল আমি সব শুনেছি।’
‘আমি তো তোমার পক্ষ নিয়েছি’।
‘সেটাও শুনেছি, ধন্যবাদ তোমাকে’।

ঠান্ডা শাওয়ার নিয়ে আবার সনা রুমে ফিরে গেলাম। সবজান্তা লোকটা এখন নেই। অন্য একজন লোক, সে ও সম্ভবত এশিয়ান, আমাকে ধন্যবাদ দিল সাহস করে সত্য কথাটা বলার জন্য।
‘তুমি এদেশে কতদিন ধরে আছ?’
‘নব্বুই সালে এসেছিলাম, সাতান্নবইতে ফিরে গেছি, বারো বছর পর আবার ফিরেছি দুই হাজার নয় সালে’।
‘তার মানে দুই দেশে সমান সমান জীবন কেটেছে?’
‘হ্যাঁ।’
‘কোন দেশকে বেশি ‘হোম’ মনে হয়?’

আমাকে একটু থমকে যেতে হয়। আসলেই, কোথায় আমার ঘর? কোথায় বেশি শান্তি পাই আমি?

এদেশে প্রতি পদে পদে ভয় পেয়ে চলতে হয় না আমাকে, মনের কথা প্রাণ খুলে বলতে পারি। অথচ বাংলাদেশের মাটিতে পা রাখলেই কেমন একটা আনন্দে মন ভরে যায়। রিক্সাওয়ালার সাথে কথা বলতেও কী যে সুখ, মনে হয় পরম আত্মীয়ের সাথে কথা বলছি। রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে ডাবের পানি অথবা ফুচকা খাওয়া- আহ, বিলেতের সবচেয়ে দামি রেস্তোরাঁয় খেয়েও সেই সুখ নেই।

আবার নিজের দেশে ফুটপাতেও হাঁটতে না পারা, ট্রাফিক জ্যামে ঘন্টার পর ঘন্টা আটকে থাকা, রাতের বেলা বাইরে একা বেরোতে ভয় পাওয়া, যে কারো সামনে নিজের বিশ্বাস এবং অনুভূতি খোলামেলা প্রকাশ করতে না পারা, প্রয়োজনের অতিরিক্ত খেতে জোরাজুরি, মানুষের ব্যবহারে আরোপিত আহ্লাদ অথচ প্রকৃত শ্রদ্ধার অভাব আমাকে হাঁপিয়ে তোলে। তখন ঠিকই বিলেতের অপেক্ষাকৃত ভারসাম্যপূর্ণ জীবনকে মিস করি প্রচণ্ডভাবে।

আবার ইউকে ফিরে এলে মনে হয় এখানে কিছুই আমার নিজের নয়, দরখাস্ত করে পাওয়া একটা জীবন নিজের কী করে হয়? এতোদিনে এখানের জীবনের সাথে সম্পূর্ণরূপে মিশে গেছি, যা অনেক বাঙ্গালিই পারেননি। এখানের সমস্ত রাজনৈতিক এবং সামাজিক সমস্যায় নাক গলাই, ভোট দেই, নানান রকম কার্যক্রমে যোগ দেই, তবু মনের ভেতরে কেমন একটা হাহাকার কাজ করে। মগজ বলে ‘এই-ই এখন তোমার দেশ’। হৃদয় তবু জানতে চায়, ‘ ‘আসলে কোথায় তোমার দেশ?’

পথে হাঁটতে বেরিয়ে, টেসকোতে শপিং করতে গিয়ে, জিমে ব্যায়াম করতে গিয়ে যখন বর্ণবাদী হামলার শিকার হই তখন এই দেশকে নিজের দেশ মনে হয় না। আবার ভাবি, বাংলাদেশেও আমাকে অপমানের শিকার হতে হয় একজন নারী হিসেবে। দুর্বলের উপর সবলের নির্যাতনের প্রতিবাদ করতে গিয়ে রাজপথে হেনস্থা হতে হয়। কেউ এসে পাশে দাঁড়ায় না। এখানে তবু বিপদে পড়লে পাঁচ মিনিটের ভেতরে পুলিশ এসে হাজির হয়।

জন্ম না দরখাস্ত? নিরাপত্তা না উচ্ছ্বাস? নিশ্চয়তা না ভালোবাসা? প্রকাশের স্বাধীনতা না প্রাণের টান? কোনটা বেশি গুরুত্বপূর্ণ? সিদ্ধান্ত নেয়া কঠিন। দেশে এখন নিজের বলে ডাকবার মত চারটা দেয়াল আর একটা ছাদও নেই। আমার দেশ তবে কোথায়? কোথায় আমার ঘর? এই প্রশ্নের উত্তর বোধ হয় খুব সহজে আর কখনোই দিতে পারব না।

লোকটা আমার উত্তরের জন্য অপেক্ষা করছে। অবশেষে বলি, ‘পিপল লাইক মি নেভার ফিল হোম এনি মোর। দে আর অলওয়েজ এওয়ে, ওলয়েজ মিসিং সামথিং অর সামওয়ান। পিপল লাইক মি লিভ আ হাফ-লাইফ’।

লোকটা বোধ হয় আমার কথা বুঝতে পারে। সহানুভূতির সুরে বলে, ‘আই আন্ডারস্ট্যান্ড। আই ওয়াজ লাকি টু বি বর্ন হোয়ার আই লিভ’।

লোকটা তো আমার কথা বুঝল, আপনারা কি বুঝবেন? নাকি ‘অ-দেশপ্রেমিক’ বলে গালি দেবেন?

লেখক: শিক্ষক, অনুবাদক ও নাট্যকর্মী


© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত মৃদুভাষণ - ২০১৪
Design & Developed BY ThemesBazar.Com