সোমবার, ১৯ নভেম্বর ২০১৮, ০৪:২২ অপরাহ্ন

‘প্রচারেই প্রসার’, যেভাবে শিখিয়েছে ‘দেবী’

মৃদুভাষণ ডেস্ক :: বলা হয়ে থাকে ‘প্রচারেই প্রসার’। ব্যাপারটা আসলেই তাই। প্রমোশন কাকে বলে? কত প্রকার ও কি কি? বাস্তব উদাহরণ সহকারে বাংলাদেশের পরিপ্রেক্ষিতে দেখিয়ে দিলো সিনেমা ‘দেবী’। সিনেমা প্রচার নিয়ে নানা কৌশল আমরা হরহামেশাই দেখতে পাই হলিউড-বলিউডসহ বিশ্বের খ্যাতনামা ইন্ডাস্ট্রিগুলোতে। সিনেমার অন্যন্য ক্ষেত্রে আমরা যেমন পিছিয়ে, প্রচারণার ক্ষেত্রে আমাদের দক্ষতা নেই বললেই চলে। প্রচারণার জন্য নায়ক- নায়িকার প্রেমের গুজব, মারামারি, অমুক সংগঠনের কেস- এমন কত কি না শুনতে পাই হলিউড- বলিউডের সিনেমা মুক্তির আগে। সমানে চলে নেগেটিভ- পজেটিভ প্রচারণা। সেখানে আমরা শুন্যের কোঠায়।

প্রচারে সফলতা- বিফলতার হিসেব: নানা সঙ্কট আর সমস্যার মধ্যেও ছবিগুলো সব শ্রেণির দর্শককে হলে টানে প্রচারের চাকচিক্যেই। কিছু কিছু ছবি যেগুলো কেবল প্রচারের কারণেই বাজিমাত করে দিয়েছে। সে তালিকায় নাম আসবে ‘আয়নাবাজি’,‘নবাব’,‘রাজনীতি’,‘পোড়ামন ২’,‘ঢাকা অ্যাটাক’-্এর। আবার ‘কৃষ্ণপক্ষ’,‘জালালের গল্প’, ‘অজ্ঞাতনামা’র মতো ছবিগুলো খুব ভালো হলেও প্রচারের অভাবে হল পায়নি, ব্যবসাও পায়নি। তবে ‘ডুব’,‘ভয়ংকর সুন্দর’,‘অঙ্গার’, ‘মেয়েটি এখন কোথায় যাবে’,‘ধ্যাততেরিকী’,‘স্বপ্নজাল’, ‘গহীন বালুচর’র মতো ছবিগুলো ভালো প্রচারণা পেলেও ছবির গল্প, নির্মাণ ও পাত্রপাত্রীর জন্য দর্শক পায়নি।

সাম্প্রতিককালের খতিয়ানে চোখ রাখলে দেখা যাবে অমিতাভ রেজার ‘আয়নাবাজি’ ছবিটি প্রচারের কারণেই টানা এক মাসেরও বেশি সময় দর্শক হলে টেনেছে। ‘ঢাকা অ্যাটাক’ সিনেমার কপালও অনেকটা খুলেছে প্রচারণার স্বার্থে। বুলবুল বিশ্বাসের ‘রাজনীতি’ ছবির ব্যবসা নিয়ে যখন সবাই শঙ্কায় ছিলেন তখন দেখা গেল বহুদিন পর আড়াল ভেঙে অপু বিশ্বাসের প্রকাশ্যে এসে ছবিটির জন্য প্রচারণা চালানোর পর দর্শক দারুণভাবে সাড়া দিয়েছেন। আবার ‘দুলাভাই জিন্দাবাদ’,‘রংবাজ’,‘অহংকার’,‘সত্তা’ ছবিগুলো হাই প্রোফাইল তারকাসম্পন্ন হওয়ার পরও ব্যবসার মুখ দেখেনি।

বাংলাদেশে কী হয় ও ‘দেবী’:

বাংলাদেশে সাধারণত দুই ধরনের সিনেমা মুক্তি পায়। ১. কমার্শিয়াল (বিএফডিসি কেন্দ্রিক); ২. নন-কমার্শিয়াল/অফট্রাক (যেগুলো বানানো হয় বিভিন্ন ফেস্টিভালকে কেন্দ্র করে)। খেয়াল করলে দেখবেন, দুই ধরণের সিনেমাতেই দর্শক বঞ্চিত হন। কেউ অতি কমার্শিয়াল হতে গিয়ে সিলেক্টেড অডিয়েন্স বেছে নেয়, আবার কেউ অতি পুরস্কার লোভী হতে গিয়ে মাস পিপলকে এভয়েড করে। আসলে দর্শক তাহলে বিনোদনের জন্য কোন সিনেমা গিয়ে হলে দেখবে? সবচেয়ে বড় কথা এমন অনেক সিনেমা আছে যা সাধারণ দর্শক মুক্তির আগে জানেই না। ‘দেবী’ যে টাইপের অফট্রাক সিনেমা বলা হয়। কিন্তু মুক্তির আগে প্রমোশনে বুঝিয়েছে, এটা সব শ্রেনীর দর্শককে দেখতে হবে। প্রচারণায় তারা নানা কৌশল দেখিয়েছে। এনেছিল এমন কিছু নতুন কৌশল। যা দর্শকের চোখে পড়তে বাধ্য।

তাক লাগানো দেবীর প্রচারণা কৌশল:

দেবী মঞ্চ (মডেল হান্ট প্রতিযোগিতা): কোন একটি সিনেমাকে কেন্দ্র করে পুরো অনুষ্ঠান এর আগে বাংলা চলচ্চিত্র ইতিহাসে কোন সিনেমার ক্ষেত্রে হয়নি। লাক্স প্রতিযোগিতায় বিজয়ীকে নিয়ে সিনেমা করা হবে, সেটা অন্য হিসেব। সে অনুষ্ঠানের পোষাকের করা হয় ‘দেবী’কে কেন্দ্র করে। বিশ্বরঙের আয়োজনে গত ২৯শে সেপ্টেম্বর রাজধানীর যমুনা ফিউচার পার্কের সেন্ট্রাল কোর্টে হয়ে যাওয়া ফ্যাশন শোটি সত্যিই অন্যরকম নজির স্থাপন করলো আমাদের চলচ্চিত্রে। অনুষ্ঠানটিতে শো স্টপার হিসেবে মঞ্চে আসেন দেবী চরিত্রের জয়া আহসান। এরপর একে একে মঞ্চে আসেন মিসির আলি চরিত্রের চঞ্চল চৌধুরী এবং নিলু চরিত্রের শবনম ফারিয়া। দর্শক অনবরত করতালির মাধ্যমে তাদেরকে বরণ করে নেন।

বঙ্গবন্ধু গোল্ডকাপ: বঙ্গবন্ধু গোল্ডকাপের ট্রফি উন্মোচন এবং ট্রফি বিতরণে উপস্থিত ছিলেন জয়া আহসান এবং চঞ্চল চৌধুরী। এর আগে বাংলা চলচ্চিত্রে এমনটা হয়নি। এর আগে অবশ্য আয়না চরিত্র সেজে চঞ্চল চৌধুরিকে গ্যালারিতে দেখা গেছে ‘আয়নাবাজি’ সিনেমার প্রমোশনের কৌশল হিসেবে।

সাংবাদিকদের জন্য রেড কার্পেট: সাধারণত রেড কার্পেটে হাঁটেন অভিনয়শিল্পী, পরিচালক-প্রযোজকগণ কিন্তু গত ১৫ই অক্টোবর দেখা গেল ভিন্ন চিত্র। ঢাকা ক্লাবে দেবী`র `মিট দ্য প্রেস` অনুষ্ঠানে রেড কার্পেটে হাঁটলেন সাংবাদিকগণ। অনুষ্ঠান শেষে সাংবাদিকগণকে থ্যাংকস গিভিং কার্ড দেয়া হয় কেননা, তারা প্রথম থেকে অদ্যবধি দেবীর প্রচারণায় বিভিন্নভাবে সহযোগিতা করছেন।

সংবাদ পাঠ: প্রমোশনের সর্বশেষ চমক/সংযোজন ছিল মাছরাঙা টিভিতে দেবী এবং মিসির আলি চরিত্রে অভিনয় করা জয়া আহসান ও চঞ্চল চৌধুরীর নিউজ প্রেজেন্টার বনে যাওয়া। একমুহূর্তের জন্য মনে হয়নি তারা অভিনয়শিল্পী হয়ে সংবাদ পাঠ করছেন। ১৭ অক্টোবর রাত ১০টায় মাছরাঙা টেলিভিশনের পর্দায় দর্শকরা অবাক হয়। মাছরাঙা টেলিভিশনের সংবাদ দেখার জন্য বসলে হঠাৎ করেই দেখা যায় সংবাদ পাঠকের আসনে চঞ্চল এবং জয়া আহসান। রাত ১০টার সংবাদের পুরোটা সময় তারা সংবাদ পরিবেশন করেন।

উপরোক্ত সারপ্রাইজিং প্রমোশন স্ট্রাটেজিগুলো ছাড়াও দেবী প্রচলিত অনেক প্রচারণাও করেছে। যেমন: দেশের এত তারকাও কোনও প্রযোজক ও তার ছবির জন্য এতটা আন্তরিকভাবে শুভকামনা জানাননি প্রকাশ্যে। দেশান্তরি অনেক তারকাও ভিডিও বার্তা দিয়েছে। সব মিলিয়ে ‘দেবী’ ছড়িয়ে দিয়েছে উৎসবের আমেজ। টি- প্যাকে দেবী, ক্যাম্পাসে যাওয়া, পত্রিকা-টিভি-রেডিওতে সাক্ষাৎকার, ফেসবুক লাইভ, টি-শার্ট, পোস্টার ডিজাইন কন্টেস্ট, টিকটক চ্যালেঞ্জ, শুভাকাঙ্খীদের নিয়মিত উইশ ইত্যাদি তো ছিলই। এখন অপেক্ষা কতটা সফল হতে পারে ছবিটি।


© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত মৃদুভাষণ - ২০১৪
Design & Developed BY ThemesBazar.Com