রবিবার, ১৮ নভেম্বর ২০১৮, ০৩:০৭ অপরাহ্ন

জেনেভায় একদিন

খায়রুন নাহার চৌধুরী (লাভলী) ::৩১ আগস্ট ২০১৮,জেনেভায় অবস্থিত জাতিসংঘের ইউরোপীয় কার্যালয় দেখতে এসেছি।জেনেভায় যারাই আসেন, এটা অবশ্যই দেখে যান।

এখানে ঢুকতে হলে সাথে পাসপোর্ট নিয়ে যেতে হবে ।নিরাপত্তা তল্লাশির পরে ,নির্ধারিত ফি দিয়ে আই ডি কার্ড তৈরি করে নিতে হয়।এবং এই সবকিছু করতে খুব বেশি সময় লাগে না ।যে অফিসার আমাদের আই ডি কার্ড তৈরি করে দিলেন ,তিনি বেশ মজার মানুষ ।আমাকে বললেন,তোমার রাষ্ট্রে কোনো সমস্যা থাকলে বলে যেও। এই প্রতিষ্ঠান সবার বিপদ আপদে পাশে দাঁড়ানোর জন্যই তৈরি করা হয়েছে, বলে চোখ টিপে দিলেন। আমি বললাম সত্যি যদি আমাকে একটু বলার সুযোগ দেয়া হতো ‘আমি রোহিঙ্গা সমস্যা আর ফারাক্কা নিয়ে কথা বলতাম । আমাদের কথা শুনে আশেপাশের লোকজন বেশ কৌতূহলী হয়ে উঠলেন । রোহিঙ্গা সমস্যা নিয়ে এটা সেটা জিজ্ঞাসা করা শুরু করলেন। আমি যতটুকু জানি বললাম । সবার আফসোসের শেষ নেই। যারা বুঝবার তারাই শুধু বুঝেন না !

আমরা যখন আই ডি কার্ড হাতে নিয়ে ভীতরে প্রবেশ করার জন্য লাইন ধরে দাঁড়িয়ে আছি,হঠাৎ খেয়াল করলাম সেই অফিসার,যিনি আমাদের আই ডি তৈরি করে দিয়েছিলেন তিনি আমাকে দরজার ওপাশ থেকে ইশারায় ডাকছেন। প্রথমে বিষয়টা বুঝতে পারিনি। পরে আমার স্বামী বললেন,তোমাকে সম্ভবত উনি ডাকছেন । বেচারা ভয় পেয়ে গিয়েছিলেন মনে হয় । আমাকে জিজ্ঞেস করলেন,কোনো সমস্যা বাধাওনি তো আবার? আমি বললাম কিসের সমস্যা বাধাবো!এই জায়গা হলো সমস্যা সমাধানের জন্য ।আমি তার কাছে গেলাম,গিয়ে দেখি বেচারি আটকা পড়ে গেছেন । ভুলে আই ডি কার্ড ডেক্সে রেখে এসেছেন ,তাই দরজা বাইরে থেকে খোলা যাচ্ছে না ।আমাকে ভীতর থেকে খুলে দেয়ার জন্য অনুরোধ করলেন ।আমি দরজাটা খুলে দিলাম,উনি জড়িয়ে ধরে ধন্যবাদ জানালেন ।আমি হেসে দিয়ে বললাম,আপনারা নিজেরাই আছেন বিপদে,দরজা খুলতে আমাদের সাহায্য চাচ্ছেন । আর আমাদের কি সাহায্য করবেন? উনি বললেন,আমি মনে মনে চিন্তা করছিলাম তুমি এই কথাটাই বলবে । তবে ধন্যবাদ সুন্দর করে বলবার জন্য ।পৃথিবীর প্রায় প্রত্যেকটি দেশের প্রতিনিধি আছেন এই কার্যালয়ে ।মোট ১৯৩ টি দেশ এর সদস্য ।ভ্যাটিকান সিটি আর ইজরাইল ওবজারভারব স্টেট ।তাইওয়ানও সদস্য নয়,চীন তাইওয়ানের রিপ্রেজেন্ট।যতটুকু জানলাম ৩০ টির বেশি সামাজিক ও অর্থনৈতিক সংস্থা এখানে কাজ করছে।আমাদের গাইড চমৎকার ভাবে প্রতিটি বিষয় বুঝিয়ে বললিছেন।আমাদের সাথে আরো ২০>২৫ জন বিভিন্ন দেশের নাগরিক ছিলেন । প্রত্যেকের ভাষা সংস্কৃতি ভিন্ন । আমরা যখন পরিদর্শন করছি,তখন একটা বিশেষ অধিবেশন চলছিল ।গাইডকে জিজ্ঞাসা করলাম,আজকের আলোচনার বিষয় কি?সে বললো একটু অপেক্ষা করো জেনে আসি। যদিও ভীতরে ঢুকা নিষেধ,তবুও তোমার কৌতূহল দেখে ভালো লাগলো বলে,সে গেলো বিষয় জানতে। একগাল হাসি নিয়ে ফিরে এসে বললো,আজকের বিষয় হলো”রবোটিক অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ ” বেশ গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এখানে বছরে তিনটি অধিবেশন হয়।মার্চ ,জুন আর সেপ্টেম্বরে।১৯৪৮ সালে শুরু হওয়া জাতিসংঘের এই বিশাল কর্মযজ্ঞ আজো তার মহান উদ্দেশ্য নিয়ে কাজ করে চলেছে ।যদিও বুঝতে পারছি না কতটুকু সফল। তবুও মন্দের ভালো। মোটামুটি সব ঘুরে দেখা হলো। সব শেষ গেলাম সেই বিখ্যাত হলে,যেখানে পৃথিবীর সব দেশের প্রতিনিধিরা বশে পৃথিবী বাসীর সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করেন ।

গিয়ে অবাক হয়ে এই হল ঘরের স্থাপত্য আর দেয়াল জুড়ে অসাধারণ চিত্রকর্ম দেখছিলাম । গাইড কি বলছিলেন আমার সে দিকে খেয়াল ছিল না । এই দেয়াল চিত্র সম্পর্কে যা জানলাম তা হলো,স্পেনের চিত্রকর মিকেলো ভার্সেলো প্রায় ২৩.৫০০ টন রঙ ব্যবহার করেছেন এই চিত্রকর্ম তৈরি করতে।এবং এখানে ৩০ টির বেশি রঙ ব্যবহার করা হয়েছে । পৃথিবীতে ঘটে যাওয়া বিভিন্ন দুর্যোগের চিত্র এখানে তুলে ধরা হয়েছে ।সবচেয়ে আকর্ষণীয় আর গর্ব করার মতো মূহুর্ত তখনই আবিষ্কার করলাম, যখন দেখলাম ১৯৩ টি দেশের জন্য নির্ধারিত আসনের একটিতে Bangladesh লিখা । জানেন আনন্দে তখন চোখে অশ্রু চলে এসেছিল । দেশটাকে নিয়ে আজেবাজে কথা অনেকে বলেন,আমার এসব কথা একেবারে পছন্দ না । আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি ।


© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত মৃদুভাষণ - ২০১৪
Design & Developed BY ThemesBazar.Com