রবিবার, ১৮ নভেম্বর ২০১৮, ০৩:০৯ অপরাহ্ন

সংলাপ ব্যর্থ হলে আন্দোলন: ঐক্যফ্রন্ট

জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের সমাবেশ। ছবি- সংগৃহিত

মৃদুভাষণ ডেস্ক :: সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের সমাবেশ থেকে জনগণকে ঐক্যবদ্ধভাবে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার শপথ নিতে বললেন বিশিষ্ট আইনজীবী, জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের শীর্ষ নেতা ও গণফোরাম সভাপতি ড. কামাল হোসেন।

তিনি বলেছেন, বাংলাদেশ কোনো রাজতন্ত্র নয়। এখানে কোনো মহারানি নেই, কোনো মহারাজা নেই। এ দেশ জনগণের। আমরা সবাই এ দেশের মালিক। তাই একটি সুন্দর, গণতান্ত্রিক দেশ আমাদেরই নিশ্চিত করতে হবে। ঐক্যবদ্ধভাবে আমরা আমাদের সেই দাবি আদায় করেই ছাড়ব।

মঙ্গলবার রাজধানীর ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের উদ্যোগে অনুষ্ঠিত জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে ড. কামাল হোসেন এসব কথা বলেন।

বিএনপির মহাসচিব ও জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের মুখপাত্র মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এতে সভাপতিত্ব করেন। পাশাপাশি তিনি সাত দফা দাবি মেনে নিতে প্রধানমন্ত্রীকে আলটিমেটাম দিয়ে ৮ নভেম্বর রাজশাহীর উদ্দেশে রোডমার্চ এবং ৯ নভেম্বর সেখানে সমাবেশের কর্মসূচি ঘোষণা করেন।

মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, ‘আমাদের এর পরের কর্মসূচি হলো, খুলনায় জনসভা। তারপরও দাবি না মানলে নির্বাচন কমিশন অভিমুখে লংমার্চ করা হবে’।

জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে ড. কামাল হোসেন সমাবেশ উপলক্ষে সরকার যোগাযোগব্যবস্থা সীমিত করেছে- এমন দাবি করে বলেন, রাস্তা বন্ধ করে, বাস বন্ধ করে- জনগণকে দমানো যাবে না। সমাবেশকে কেন্দ্র করে সরকার বাস, লঞ্চ বন্ধ করে দিয়েছে। এর নাম কি গণতন্ত্র? আপনারা যেভাবে এসেছেন, এমন অদম্যভাবে, আপসহীনভাবে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার শপথ নিতে হবে।

বর্তমান সরকারের শাসনামলে গুম-খুনের সমালোচনা করে তিনি বলেন, সরকার দেশটাকে জিম্মি করে রেখেছে। এই ভয়াবহ অবস্থার অবসান ঘটাতে হবে। এ জন্য বসে থাকার সুযোগ নেই। জনগণের কাছে যেতে হবে। তাদের জাগাতে হবে। পরিবর্তনের যে জাগরণ উঠেছে, তাকে জনগণের মধ্যে ছড়িয়ে দিতে হবে। অবাধ, সুষ্ঠু এবং অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের দাবি জানিয়ে ড. কামাল হোসেন বলেন, সুষ্ঠু নির্বাচন হতে হবে। দেশে আর কোনো প্রহসনের নির্বাচন হতে দেয়া হবে না।

জনগণের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, আপনাদেরকে ভোটাধিকার পাহারা দিতে হবে। ভোটাধিকার পাহারা দেয়া মানে স্বাধীনতাকে পাহারা দেওয়া। সুষ্ঠু নির্বাচন মানে গণতন্ত্রকে বাঁচিয়ে রাখা, দেশকে বাঁচিয়ে রাখা। ড. কামাল হোসেন এ সময় বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াসহ কারাগারে আটক সব রাজবন্দির মুক্তি দাবি করেন।

তিনি বলেন, ‘দেশে আইনের শাসন নেই। যেনতেনভাবে বিরোধীদের সবাইকে গ্রেফতার ও হয়রানি করা চলবে না। আইন বিরোধী দলের জন্য একরকম আর সরকারি দলের জন্য একরকম, এটা চলতে পারে না। একটা অনির্বাচিত সরকার এটা করতে পারে না। আমি অবশ্যই খালেদা জিয়ার মুক্তি চাই, সাথে অন্যান্য রাজবন্দিদেরও মুক্তি চাই’।

সরকারের সমালোচনা করে ড. কামাল হোসেন বলেন, এই সরকার যখন গঠন হলো তখন আমি কোর্টে ছিলাম, তখন তারা বলেছিলেন আরেকটি নির্বাচন দেব। ২০১৫ গেল, ২০১৬ গেল, কই নির্বাচন দিলেন না। এই সরকারের কথার এক পয়সার দাম নেই।

উপস্থিত নেতাকর্মীদের উদ্দেশে ড. কামাল বলেন, আপনারা দেশের মালিক, আপনারা মালিক হিসেবে আছেন। দেশে সুষ্ঠু নির্বাচন না হলে গণতন্ত্র মূল্যহীন থাকে। সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য দাঁড়াতে হবে।

তিনি বলেন, ‘আমি কোনো দলের সদস্য হিসেবে বলছি না। দেশের মালিক হিসেবে আপনারা দাঁড়িয়ে যান। যেভাবে দেশ চলছে তা হতে পারে না। সুষ্ঠু ভোটের জন্য শপথ নিন। সবাই ঐক্যবদ্ধ থাকবেন কারো সঙ্গে আপস করবেন না’।

সভাপতির বক্তব্যে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, ‘আজ এ সমাবেশের কিছু দূরেই ছোট্ট একটি কক্ষে আমাদের দেশনেত্রী গণতন্ত্রের মাতা খালেদা জিয়া অসুস্থ অবস্থায় বন্দিত্ব কাটাচ্ছেন। আমি জানি না, এই আওয়াজ তার কানে পৌঁছাচ্ছে কিনা। আমি বিশ্বাস করি গণতন্ত্রের এই আওয়াজ তার কানে গিয়ে পৌঁছেছে এবং তিনি সেখান থেকেই আপনাদেরকে আশীর্বাদ করছেন। তিনি নেতাকর্মীদের নির্দেশ দিচ্ছেন- এগিয়ে এগিয়ে যাও। গণতন্ত্রের মুক্তির জন্য এগিয়ে যাও, নিজের মুক্তির জন্য এগিয়ে যাও।

বিএনপির মহাসচিব বলেন, ‘কারাগারে যাওয়ার আগে তিনি (খালেদা জিয়া) বলেছিলেন আমি কারাগারে যেতে ভয় পায়ই না। তিনি বলেছিলেন, তোমরা গণতন্ত্র মুক্ত করার জন্য সমগ্র জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করবে। জাতীয় নেতাদেরকে আহ্বান জানাবে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে। আল্লাহ তায়ালার কাছে এই শুকরিয়া আদায় করছি আজকে দেশের বরেণ্য জাতীয় নেতারা এক মঞ্চে দাঁড়িয়ে দেশনেত্রী খালেদা জিয়ার মুক্তি চাইছেন। বাংলাদেশের জনগণের মুক্তি চাইছেন’।

তিনি বলেন, আমাদের ওপর অনেক অত্যাচার, নির্যাতন-নিপীড়ন হয়েছে। এখনও হচ্ছে। আমাদের ছেলে, আমাদের ভাইদেরকে হত্যা করা হয়েছে, গুম করা হয়েছে। এখনও চলছে তথাকথিত প্রহসনের সংলাপ। সংলাপে বলা হলো, যে আর আমাদের গ্রেফতার করা হবে না। মামলা তুলে নেয়া হবে। কিচ্ছু করা হয় নাই। প্রতিদিন গ্রেফতার চলছে। এই সমাবেশ থেকেও গ্রেফতার করা হয়েছে।’

বিএনপি মহাসচিব বলেন, ‘পহেলা সেপ্টেম্বর থেকে এখন পর্যন্ত ৪ হাজার ৩৭১টি মামলা হয়েছে। ২৫ লাখ আসামি। যারা অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট তাদের তুলে নেয়া হয়েছে। আমাদের চার ভাইকে নিয়ে যাওয়া হয়েছে এখন পর্যন্ত তাদের খবর পাওয়া যায়নি’।

তিনি নেতাকর্মীদের উদ্দেশে প্রশ্ন রেখে বলেন, ‘আপনারা কি জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের কর্মসূচি সফল করতে প্রস্তুত আছেন। গণতন্ত্রের মুক্তির জন্য যে কোনো ত্যাগ স্বীকারে প্রস্তুত আছেন। তাহলে আসুন ঐক্যবদ্ধভাবে রাজপথে নামি’।

মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, ‘আগামীকাল আবারও একটি ছোট সংলাপের আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। আমরা রাজি আছি যেতে। কারণ আমরা সংলাপে বিশ্বাস করি। শান্তিতে বিশ্বাস করি। সমঝোতায় বিশ্বাস করি। আমরা চাই আলাপ-আলোচনার মাধ্যমেই জনগণের সমস্যা সমাধান হোক। জনগণ মুক্তি পাক। কিন্তু এখানে নাটক করলে চলবে না। খালেদা জিয়াকে মুক্তি দিতে হবে। পার্লামেন্ট ভেঙে দিতে হবে। একই সঙ্গে নির্বাচনের জন্য একটি নিরপেক্ষ নির্বাচনকালীন সরকার গঠন করতে হবে। এর কোনো বিকল্প নেই’।

তিনি আরও বলেন, ‘অমরা আশা করব সরকারের শুভবুদ্ধির উদয় হবে। জনগণের ও গণতন্ত্রের স্বার্থে সরকার সাত দফা দাবি মেনে নেবে’। বিএনপির মহাসচিব এ সময় ব্যারিস্টার মইনুল হোসেন, আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীসহ কারাগারে থাকা সব নেতাকর্মীর মুক্তির দাবি জানান।

বিএনপির মহাসচিব বলেন, ‘আমরা আর গ্রেফতার হতে চাই না। আমরা আন্দোলনের মধ্যে দিয়ে জনগণকে সঙ্গে নিয়ে এই সরকারকে পরাজিত করতে চাই। জনগণের সরকার প্রতিষ্ঠা করতে চাই। সাত দফা আমরা সফল করতে চাই। এটাই হচ্ছে আমদের শপথ। দেশনেত্রী খালেদা জিয়াকে সর্বপ্রথম মুক্তি দিতে হবে। তারপরই সব কিছু হবে। তারেক রহমানের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলায় যে সাজা দেয়া হয়েছে তা প্রত্যাহার করতে হবে। সব মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার করতে হবে।

মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এ সময় সংলাপ পর্যন্ত সরকারকে আলটিমেটাম দিয়ে বলেন, ‘এই সরকার যদি আগামীকালের সংলাপে আমাদের দাবিদাওয়া মেনে না নেয় তাহলে ৮ নভেম্বর রাজশাহীতে আমরা রোডমার্চ করব। রাজশাহীতে ৯ নভেম্বর জনসভা হবে। এরপর খুলনা, ময়মনসিংহ ও বরিশালে জনসভা হবে। নির্বাচন কমিশন যদি একতরফাভাবে তফসিল ঘোষণা করতে চায় তাহলে নির্বাচন কমিশন অভিমুখে পদযাত্রা হবে। তারপর আবারও বৃহত্তর আন্দোলনের কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে’।

এতে প্রধান বক্তা ছিলেন জেএসডির সভাপতি আ স ম আবদুর রব।

জনসভায় প্রথমবারের মতো কৃষক-শ্রমিক-জনতা লীগের কাদের সিদ্দিকী যোগ দেন।

এছাড়া সমাবেশে আরও বক্তব্য দেন-নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না, জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়ার সদস্য সুলতান মোহাম্মদ মুনসুর আহমেদ, গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী, বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টির চেয়ারম্যান সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম, গণফোরামের নির্বাহী সভাপতি সুব্রত চৌধুরী ও সাধারণ সম্পাদক মোস্তাফা মোহসীন মন্টু, বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ, মির্জা আব্বাস, গয়েশ্বর চন্দ্র রায় ও ড. আবদুল মঈন খান, ভাইস চেয়ারম্যান আবদুল্লাহ আল নোমান, আলতাফ হোসেন, সেলিমা রহমান, বরকত উল্লাহ বুলু, মো. শাজাহান, শামসুজ্জামান দুদু, ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন, অ্যাডভোকেট আহমেদ আযম খান, চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা আমানউল্লাহ আমান, জয়নুল আবদীন ফারুক, হাবিবুর রহমান হাবিব, ড. সুকোমল বড়ুয়া, আবদুস সালাম, আতাউর রহমান ঢালী, যুগ্ম মহাসচিব ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকন, সাংগঠনিক সম্পাদক ফজলুল হক মিলন, এমরান সালেহ প্রিন্স ও শামা ওবায়েদ প্রমুখ উপস্থিত হয়েছেন।

এর আগে মঙ্গলবার সকাল থেকেই সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের জনসভায় জড়ো হতে থাকেন ঐক্যফ্রন্টের নেতাকর্মীরা।

রাজধানীসহ ঢাকার আশপাশের জেলা থেকে নেতাকর্মীরা মিছিল নিয়ে উদ্যানে প্রবেশ করেন।

এ সময় তাদের হাতে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া, ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের ছবিসংবলিত ব্যানার-ফেস্টুন দেখা যায়।


© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত মৃদুভাষণ - ২০১৪
Design & Developed BY ThemesBazar.Com