শুক্রবার, ১৪ ডিসেম্বর ২০১৮, ০৭:৪০ অপরাহ্ন

সুন্দরী শ্রীভূমি

পাংথুমাই জলপ্রপাত

সাব্বিরুল হক :: কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সিলেটে বেড়াতে এসে মুগ্ধ-মোহিত হয়েছিলেন ওখানকার রূপ-সৌন্দর্যে।অনবদ্য এক কবিতাও লিখে ফেলেছিলেন এ নিয়ে।কবিতায় সিলেটকে চিহ্নিত করেছিলেন সুন্দরী শ্রীভূমি নামে।সত্যি বলতে কি,সিলেটকে দেখ মুগ্ধতার শেষ শুধু রবীন্দ্রনাথেই নয় নিঃসন্দেহে।পরে ব্রিটিশ লর্ড সাহেবদের জীবনীতেও বারবার এসেছে সিলেটের বিষয়াদি।আসলে যে কোনো দিক দিয়েই সিলেটকে আলাদা করে ফেলা যায় অন্যান্য এলাকা থেকে।এ অঞ্চলের প্রকৃতি, সংস্কৃতি এবং অধিবাসীদের বিশেষ কিছু সামাজিক অভ্যাস ও প্রথার প্রচলন নিয়ে এই রচনা।

প্রকৃতি সংশ্লিষ্ট কিছু জায়গা
পাংথুমাই জলপ্রপাত

পাংথুমাই গোয়াইনঘাট উপজেলার পশ্চিম জাফলং ইউনিয়নের গ্রাম।মেঘালয় পর্বত শ্রেণীর পূর্ব-খাসিয়া হিলসের কোলে ছিমছাম,ছবির মতো সুন্দর গ্রামটির অন্যতম আকর্ষণ হচ্ছে বিশাল ‘বড়হিল’ ঝর্ণা।যদিও ঝর্ণাটি ভৌগলিকভাবে ভারতের অন্তর্ভুক্ত কিন্তু একেবারে সামনাসামনি দাঁড়িয়েই এর উপচে পড়া সৌন্দর্য উপভোগ করা যায়।ঝর্নার নীচ থেকে বয়ে চলা পিয়াইন নদীর একটি শাখা পশ্চিম দিকে প্রবাহমান।এই নদী ধরে আরেকটি পর্যটক গন্তব্য বিছনাকান্দি যাওয়া যায়।পাংথুমাই যেতে হলে প্রথমে আসতে হবে গোয়াইনঘাট উপজেলা সদরে। সিলেট থেকে জাফলং রোড ধরে সারীঘাট (৪২ কি.মি.) পৌঁছে বামদিকে ১৬ কি.মি. গেলেই গোয়াইনঘাট পয়েন্ট।সেখান থেকে ডানে রাস্তা চলে গেছে উপজেলা অফিসে,বামের রাস্তা সিলেট এয়ারপোর্টের দিকে।বামের রাস্তায় এক কি.মি. এগুলো গোয়াইনঘাট কলেজ।কলেজের পাশ দিয়ে পূবের সরু রাস্তা ধরে ১২ কি.মি. এর মতো এগিয়ে গেলেই পাংথুমাই গ্রাম।এর আগে মাতুরতল বাজার।গ্রামের ভেতর পর্যন্ত পাকা রাস্তা।গাড়ী থেকে নেমে হাতের বামে গেলেই দৃশ্যমান-অপূর্ব সেই জলপ্রপাত।ঝর্না ছাড়াও গোয়াইনঘাট-পাংথুমাই পথটিও আকর্ষণীয়।পূব দিকে এগুলে বিশাল পাহাড় ক্রমশ কাছে এগিয়ে আসতে থাকে।নীল থেকে সবুজ হয়ে উঠে,এর মাঝে-মাঝেই মেঘ ও ঝর্ণার লুকোচুরি।পাংথুমাই ভ্রমণের উপযুক্ত সময় এপ্রিল থেকে মধ্য অক্টোবর।
চাইলে লালা খাল ও পাংথুমাই একদিনে ভ্রমণ করা যায়।সকাল বেলা গাড়ী নিয়ে লালা খাল পৌঁছে,নৌকা নিয়ে জিরো পয়েন্ট, চা বাগান ঘুরে রিভারকুইনে দুপুরের খাবার শেষে চলে আসা যায় পাংথুমাই।লালা খাল থেকে গাড়ী নিয়ে পাংথুমাই পৌঁছুতে সময় লাগবে সর্ব্বোচ্চ একঘণ্টা তিরিশ মিনিট।বিকেলটা ঝর্ণার নীচে কাটিয়ে সন্ধ্যায় ফিরতে পারেন শহরে।সিলেট শহরে পৌঁছুতে সময় লাগবে ঘণ্টা দুয়েক।

 

 

লালা খাল

লালা খাল

মেঘালয় পর্বত শ্রেণীর সবচেয়ে পূবের অংশ জৈন্তিয়া হিলসের ঠিক নীচে পাহাড়,প্রাকৃতিক বন,চা বাগান ও নদীঘেরা একটি গ্রাম লালা খাল,সিলেট জেলার জৈন্তিয়াপুর উপজেলায় অবস্থান। জৈন্তিয়া হিলসের ভারতীয় অংশ থেকে মাইন্ডু (গুহঃফঁ) নদী লালা খালের সীমান্তের কাছেই সারী নদী নামে প্রবেশ করেছে এবং ভাটির দিকে সারীঘাট পেরিয়ে গোয়াইন নদীর সাথে মিশেছে।লালা খাল থেকে সারীঘাট পর্যন্ত নদীর বারো কি.মি. পানির রঙ পান্না সবুজ।পুরো শীতকাল এবং অন্যান্য সময় বৃষ্টি না হলে এই রঙ থাকে।মুলতঃ জৈন্তিয়া পাহাড় থেকে আসা প্রবাহমান পানির সাথে মিশে থাকা খনিজ এবং কাদার পরিবর্তে নদীর বালুময় তলদেশের কারণেই এই নদীর পানির রঙ এরকম দেখায়।সিলেট জাফলং মহাসড়কে শহর থেকে প্রায় ৪২ কি.মি. দূরে সারীঘাট।সারীঘাট থেকে সাধারণত নৌকা নিয়ে পর্যটকরা লালাখাল যান।স্থানীয় ইঞ্জিনচালিত নৌকায় একঘন্টা পনেরো মিনিটের মতো সময় লাগে সারী নদীর উৎসমুখ পর্যন্ত যেতে।নদীর পানির পান্না সবুজ রঙ আর দুইপাশের পাহাড় সারির ছায়া পর্যটকদের মুগ্ধ করে।উৎসমুখের কাছাকাছিই রয়েছে লালাখাল চা বাগান।

সারীঘাটে নাজিমগড় রিসোর্টসের একটি বোট স্টেশন আছে।এখান থেকে ও বিভিন্ন ধরনের ইঞ্জিন নৌকা নিয়ে লালাখাল যাওয়া যায়।লালাখালে সারী নদীর তীরে নাজিমগড়ের একটি মনোরম রেস্টুুরেন্ট রয়েছে,‘রিভার কুইন’। সব অতিথিদের জন্যই এটি উন্মুক্ত।রিভারকুইন রেস্টুুরেন্টের পাশেই রয়েছে ‘এডভেঞ্চার টেন্ট ক্যাম্প’। এ্যাডভেঞ্চার প্রিয় পর্যটকরা এখানে রাত্রিযাপন করতে পারেন।নদীপেরিয়ে লালাখাল চা বাগানের ভেতর দিয়ে রয়েছে প্রাকৃতিকভাবে গড়ে উঠা হাঁটার পথ (ট্রেকিং ট্রেইল)।এ ছাড়া পেছনে পাহাড়ের ঢাল ও চূড়োয় গড়ে উঠেছে নাজিমগড়ের বিলাসবহুল নতুন রিসোর্ট ‘ওয়াইল্ডারনেস’।আবাসিক অতিথি ছাড়া এখানে প্রবেশাধিকার সংরক্ষিত।

সরাসরি গাড়ী নিয়ে ও লালাখাল যাওয়া যায়।সারী ব্রীজ পেরিয়ে একটু সামনেই রাস্তার মাঝখানে একটি পুরনো স্থাপনা।এটি ছিলো জৈন্তিয়া রাজ্যের রাজকুমারী ইরাবতীর নামে একটি পান্থশালা।এর পাশ দিয়ে হাতের ডানের রাস্তায় ঢুকে সাত কি.মি. গেলেই লালাখাল।

ভোলাগঞ্জ পাথর কোয়ারী

ভোলাগঞ্জ পাথর কোয়ারী

সিলেট শহর থেকে সোজা উত্তরে তেত্রিশ কি.মি. দূরত্বে ভোলাগঞ্জ- বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় পাথর কোয়ারী।উত্তরের খাসিয়া পাহাড় থেকে নেমে আসা নদী ধলাই আর পূবদিকে ডাউকি থেকে আসা পিয়াইন এর মিলিত ধারার পাড়েই কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা সদর।সিলেট শহরের আম্বরখানা পয়েন্ট থেকে সালুটিকর-ভোলাগঞ্জ সড়ক ধরে ২৭ কি.মি. এগিয়ে গেলে কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা সদর।সেখান থেকে আরো ৬ কি.মি. গেলেই দীর্ঘ পাহাড় সারি,ধলাই নদী,দৃশ্যমান ঝর্ণা আর সারি-সারি পাথরের তীর্থ ভোলাগঞ্জ।

১৭৬৫ সালে সিলেট বৃটিশদের আয়ত্বে যাওয়ার পর ১৭৭৮ সালে রবার্ট লিন্ডসে কোম্পানীর রেভিনিউ কালেক্টর হিসেবে সিলেটে আসেন, বারো বছর এই দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি ভোলাগঞ্জ অঞ্চলে চুনাপাথরের ব্যবসার পত্তন ঘটান।ভোলাগঞ্জ থেকে শুরু করে উত্তরের চেরাপুঞ্জি পর্যন্ত বিস্তৃত পাহাড়গুলো থেকে চুনাপাথর সংগ্রহ করে নিয়ে আসা হতো ছাতকে, তারপর ছাতক থেকে সুরমা নদী হয়ে এই পাথর চলে যেতো কলকাতায়।এই অঞ্চলের পাথর ব্যবসার লাভ থেকেই লিন্ডসে স্কটল্যান্ড জমিদারী কেনেন,স্যার ও লর্ডস খেতাবে ভূষিত হন।রবার্ট লিন্ডসের আতœজীবনীতে তৎকালীন পাড়ুয়া,বর্তমানের ভোলাগঞ্জ এলাকার অপার সৌন্দর্য্যের বর্ণনা পাওয়া যায়।

লিন্ডসের বর্ণিত সেই বিখ্যাত সুন্দরের এখন আর অবশেষ নেই,মুলত গত কয়েক বছর ধরে অনিয়ন্ত্রিত পাথর উত্তোলন ও পাথরভাঙ্গা (ক্রাশার) মেশিনের উৎপাতে।এ ছাড়া পাথরবাহী ট্রাকের কারণে সিলেট-ভোলাগঞ্জ রাস্তার অবস্থাও বেশ খারাপ।

তবুও বর্ষায় মেঘালয় পাহাড়জুড়ে মেঘের উচ্ছাস,ঝর্ণার ছুটে চলা,নদীর স্রোতধারা,বর্ষা শেষে জেগে উঠা ধলাই’র দীর্ঘ বালিয়াড়ি পর্যটকদের মুগ্ধ করবে।

সিলেট থেকে মাত্র ৩৩ কি.মি. হলেও রাস্তার দূরবস্থার কারণে গাড়ী নিয়ে ভোলাগঞ্জ পৌঁছুতে সময় লাগে প্রায় দেড়ঘন্টা।যারা ট্রেকিং ভালোবাসেন,ভোলাগঞ্জ থেকে পূবদিকে দয়ার বাজার,মায়ার বাজার,উথমা,তুরং,উপুর দমদমা,বিত্তরগুল হয়ে চলে যেতে পারেন বিছনাকান্দি পর্যন্ত। মঘলায় পাহাড়ের নীচ ধরে বেশ কতোগুলো পাহাড়ী ছড়া পাড় হয়ে যেতে সময় লাগবে ঘন্টা চারেক।দূরত্ব বারো কিমি এর মতো। বিছনাকান্দি থেকে গাড়ী নিয়ে আবার ফিরে আসা যায় সিলেট শহরে।

 

ইতিহাস-ঐতিহ্য নিয়ে কিছু অনুসঙ্গ

ফিল্ড মার্শাল!

ফিল্ড মার্শাল!

সিলেট গভর্ণমেন্ট বয়েজ স্কুলে পড়ার সময় যেতে হতো ওসমানী সাহেবের বাসার সামনের রাস্তা দিয়ে। নাইওরপুলের ওই বাসার নাম,যতদূর মনে পড়ে-নূর মঞ্জিল।প্রতিদিন সকালে বাসার সামনে খোলা লনে পায়চারী করতে দেখা যেতো ওসমানীকে।হাতে ধরে রাখা শিকলে বাঁধা তাঁর পোষা কুকুর।কুকুরটা ছিল বিদেশী।ওসমানীর শিকলে বাঁধা বিদেশী কুকুরের লাফা-লাফির দৃশ্য ভয় নিয়েই দেখতাম স্কুলে যাওয়া-আসার পথে।

১৯৮১ সালের সম্ভবত জুন মাসের একদিন হেঁটে যাচ্ছি নূর মঞ্জিলের সামনে দিয়ে।সঙ্গে নবম শ্রেণীর সহপাঠি ইউসুফ শরীফ।স্কুলে দুঃসাহসী হিসেবে ব্যাপক পরিচিতি তখন ইউসুফের।নূর মঞ্জিলের সামনে এসে থেমে পড়ে সে।দেখাদেখি আমিও। দেখতে পাই গলায় শিকল দেয়া কুকুরটা নিয়ে যথারীতি পায়চারী করছেন ওসমানী সাহেব।ইউসুফ সালাম দেয় ওসমানীকে। আমাদের দেখতে পেয়ে গেটের দিকে এগিয়ে আসেন তিনি।গম্ভীর স্বরে জানতে চান ,‘তোমরা কোন স্কুলে পড়?’
আমাদের মুখে স্কুলের নাম শোনে মুচকি হাসেন ওসমানী।
বিশাল গোঁফ জোড়া নড়ে উঠে তাঁর,’আমিও তোমাদের স্কুলের ছাত্র ছিলাম …’
দেখলাম তাঁর হাতের শিকলে বাঁধা কুকুরটা লাফাচ্ছে ভীষণ।মনে হচ্ছিল,আমাদের পছন্দ করতে পারছে না সে। কুকুরটার দিকে তাকিয়ে ইউসুফ বিরক্ত হয়ে জানতে চাইলো,‘নাম কি আপনার কুকুরের?’
এমন বেমক্কা প্রশ্ন শুনে ভেবেছিলাম রেগে যাবেন প্রচন্ড,কিন্তু না,ওসমানী রাগ করলেন না একদমই।ধমক দিলেন কুকুরটাকেই।লাফ-ঝাঁপ থামিয়ে শান্ত হয়ে গেল ওটা।
আমাদের দিকে তাকিয়ে ধীর গলায় বললেন,‘আমার পালা কুকুর এটা।নাম শুনতে চাও?’
‘জ্বি। কি নাম কুকুরের?’
ওসমানী কুকুরটার দিকে একবার তাকিয়ে নিয়ে কি যেন ভাবলেন।তারপর ফিরে চাইলেন আমাদের দিকে।আমি ভয়ে-আতঙ্কে একটা হুঙ্কার শোনার প্রস্তুতি নিতে না নিতেই মুখ খুললেন বঙ্গবীর।আরো বেশি নির্লিপ্ত গলায়,নাটকীয় ভঙ্গিতে বললেন,‘কুকুরটার নাম ফিল্ড মার্শাল।’

 

সিলেটি ঘরানার দুই-একটা খাবার-দাবার

তুশা-শিন্নি

তুশা-শিন্নি

‘তুশা-শিন্নি’ খায়নি সিলেটে এমন মানুষ সম্ভবত বিরলতম।বাড়ি-ঘরে ধর্মীয় অনুষ্ঠানে তুশা শিরনি বিতরণ না করলে হয়ই না একেবারে।ধর্মীয় ভাব আবহের এই খাবারটি সিলেটে সব সময়ই ওতপ্রোত।পেছনে ইতিহাস রয়েছেএর। ইয়েমেন থেকে এখানে হজরত শাহজালাল (রহ.)-এর আগমণ,সঙ্গে এসেছিলেন আরও ৩৬০ আউলিয়া; যাঁরা অনেকে থেকে গিয়েছিলেন সিলেটেই। ধারণা করা হয়,তাঁদের সঙ্গেই মধ্যপ্রাচ্য থেকে কিছু রন্ধন-প্রণালি সিলেট অঞ্চলে চলে আসে।

এ রকমই একটি খাবার ময়দার হালুয়া,যা ‘তুশা শিন্নি’ নামে আঞ্চলিকভাবে পরিচিত।বাংলাদেশের বেশির ভাগ জায়গায় বুটের ডালের হালুয়া,বেসনের হালুয়া,সুজির হালুয়া তৈরি করা হয়ে থাকে।মূলত শব ই বরাতে হালুয়া তৈরির প্রচলন।তবে ময়দার হালুয়া বা তুশা শিন্নি সিলেটের বাইরে খুব কম প্রচলিত।শব-ই-বরাতে মসজিদে শিরনি বিতরণ বা আত্মীয়দের বাড়িতে পাঠানো রুটি-হালুয়ার তশতরিতে তুশা থাকবেই।

গরম পানিতে তেজপাতা,দারুচিনি,এলাচি দিয়ে ফুটিয়ে তাতে চিনি ঢেলে তৈরি করতে হয় সুগন্ধি ‘সিরা’।তারপর ময়দা ঘিয়ে ভেজে চিনির সিরা ঢেলে নেড়ে নেড়ে তৈরি করা হয় তুশা।তাতে মেশানো হয় কিশমিশ,বাদাম ইত্যাদি।

মাজার রোডে,দরগাহর ঠিক বাইরে দুপাশে তাকালে দেখা যায় অনেক দোকানেই টিলার মতো স্তূপ করে সাজিয়ে রাখা হয়েছে তুশা শিরনি।

মেয়ের বাড়ির আম-কাঁঠাল,ইফতারি

রোজার সময় সিলেটের প্রচলন মেয়ের বাড়িতে ইফতারি আর আম-কাঁঠাল;বিষয়টা এমন জরুরি যে,প্রায় অবশ্য-কর্তব্য হয়ে দাড়িয়েছে।না দিলে যেনো নয় একেবারে।বিয়ের প্রথম বছরে পয়লা রোজায় একবার,রোজার মাঝামাঝি একবার,শেষের দিকে একবার,কম করে হলেও তিনবার তো ইফতারি দিতেই হবে।ইফতারি কি যেমন-তেমন!মোটেও না।একেবারে বিশাল যজ্ঞ।বড়-বড় দুই/তিন ডেকচি আখনী পোলাও,যা ছাড়া সিলেটের ইফতারি অসম্পুর্ন;এক ডেকচি চানা-ভুনা,পিঁয়াজু,বেগুনী,জিলাপি,মিষ্টি,দই,নিমকি সহ সব ধরনের ফলমুল,হালিম আর হলো বাখরখানী।এ ছাড়া ইফতারি হবে না।ঢাকার বাখরখানী না;সিলেটের বাখরখানী-এক ধরনের মিষ্টি পরোটা,সঙ্গে হরেক পদের সেমাই-ফিরনি-মিঠাখানা তো থাকছেই আবশ্যিক।
এ-ই হচ্ছে সিলেটে যুগ-যুগ ধরে পাঠানো ‘মেয়ের বাড়ির ইফতারি!’

কাঁচা কাঁঠালের রেসিপি

সিলেটে এমন এলাকাও আছে,যেখানে পাকা কাঁঠাল খেতে চায় না সহজে।কদর বেশি কাঁচা পোক্ত কাঁঠালের। কাঁঠালের রান্না করা খাবার সে সব জায়গায় ব্যাপক চলে।খাওয়া তো দূরে থাক,কাঁঠালের নাম শুনলেই অনেকে বিরক্ত হয়।কিন্তু কাঁচা কাঠাল দিয়ে যে লোভনীয় খাবার হতে পারে সেটা অনেকেরই অজানা।মজাদার ভিন্ন স্বাদের কাঁচা কাঁঠাল-মাংস-মাছ আর এঁচোড় রান্না না খেলে কে বুঝবে যে পাকা না,কাঁচা কাঁঠালের রেসিপিও জাতীয় ফলের অনন্য আরেক অনুষঙ্গ!

 

অদূর অতীত

কূপ,কুয়ো,ইদারা

সিলেটে একসময় প্রচুর কূপ,কুয়ো বা ইদারা দেখা যেতো।জানা যায়,শাহজালাল (র.) সিলেট বিজয়ের পর বুঝতে পেরেছিলেন এখানকার সুপেয় জলের অপ্রতুলতা।তাই পানীয় জলের অভাব মেটানোর জন্য নির্দেশ দিয়েছিলেন কুয়ো বা কূপ খননের।তাঁর মাজারের একাধিক কুয়ো এ কাজের সাক্ষ্য দিচ্ছে আজও।

ছোটবেলায় সিলেট শহরের কুয়ার পার,ঝরনার পার,জল্লার পার এসব এলাকায় গভীর কুয়ো দেখতে পেতাম। উঁকি দিলে চোখে পড়তো স্বচ্ছ জলের তলদেশ।দড়ি দিয়ে বালতি বেঁধে নিচে ফেলে পানি তোলে ব্যবহার করা হতো। অবাক হয়ে দেখেছি, কিছুক্ষণ পরেই আবার পানিতে ভরে উঠেছে কুয়োর নিচের ফাঁকা জায়গা! কুয়ার পানি ঝরনার জলের মতো স্বচ্ছ আর শীতল।শরীর জুড়িয়ে দিতো প্রচন্ড গরমের দিনে।

ইদারা, ইন্দিরা,কূপ,কুয়া এমন বহু নাম রয়েছেএর।তবে সিলেটে ইদারা ও কূয়া নামে বেশী পরিচিত।ইদারা থেকে ইন্দিরা নাম এসেছে।ভারত উপমহাদেশে তো বটেই ইউরোপ,আমেরিকাসহ সারাবিশ্বে পানীয় জলের জন্য এক সময় একমাত্র কূয়া বা ইদারার প্রচলন ছিল।রাজা-বাদশারা জনস্বার্থে গ্রাম-গঞ্জে কূপ খনন করাতেন।এখন সে সব ইতিহাসের কথা।গত পঞ্চাশ-ষাটের দশকে স্বচ্ছ জলের দেখা পাওয়া সহজ ছিল না।সুপেয় জলের জন্য আঙ্গিনায় খোড়াখুড়ি করতে হতো পাতাল পর্যন্ত।তারপর গভীর গর্তের চারদিকে ইট, চুন, সুড়কি দিয়ে গেঁথে তোলা হতো কূপ বা ইদারা।পুরানো দিনের প্রায় সব বাড়িতে কূপ বা ইদারার চিহ্ন দেখতে পাওয়া যায়।

বৃটিশ আমলে প্রত্যেকটা রেল ষ্টেশন,আদালত,থানা এবং অফিস-আদালতের চত্বরে সরকারিভাবে নির্মাণ করা হতো ইদারা!ব্যক্তিগত কুয়ো ছিলো ছোট আকারের।পোড়া মাটির তৈরী রিং দিয়ে বাঁধানো কূপ বা কুয়া।এতে চুন, সুড়কি,বালি,সিমেন্ট কিছুই লাগতো না।সামান্য খরচেই তৈরী করা হয়েছে বাড়ি-ঘরে।সেসব ছিলো অগভীর। গেরস্থালি ছাড়াও তখন কৃষিকাজে লেগেছে কুয়োর পানি।

এখন কূপ,কূয়া বা ইদারার সবই ইতিহাস।কোথাও হঠাৎ ২/১টা ভগ্নদশার ভরাট ইদারা চোখে পড়ে।ভারতের রাজস্থান,বিহারের দ্বারভাঙ্গা,মুঙ্গের কাটিহারসহ বিভিন্ন প্রদেশে অবশ্য এখনও কূয়ার ব্যবহার প্রচলিত আছে। সেসব জায়গায় টিউবওয়েল বসানো যায় না।কারণ মাটির নিচে শুধুই শক্ত নিরেট পাথরের স্তর।

শেষ বলতে কিছু নেই

সিলেটকে ঘিরে বিষয়ের শেষ নেই।এখানকার প্রকৃতি-ইতিহাস-ঐতিহ্য নিয়ে লিখতে চাইলে লেখা যায়,কিন্তু আশ্চর্য ব্যাপার,লেখাটির শেষ আর হয় না।ফুরিয়ে যায় না সিলেট সংক্রান্ত বিষয়বস্তুর ব্যপ্তি,কিছুতেই।কেননা বর্ণনার রেশ রয়ে যায় বার-বার।


© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত মৃদুভাষণ - ২০১৪
Design & Developed BY ThemesBazar.Com