1. ahmedshuvo@gmail.com : admi2018 :
  2. mridubhashan@gmail.com : Mridubhashan .Com : Mridubhashan .Com

শুক্রবার, ০৬ ডিসেম্বর ২০১৯, ১২:৫৪ অপরাহ্ন

একজন রিক্সাচালক সামাদ ভাই

খায়রুন নাহার চৌধুরী (লাভলী)

খায়রুন নাহার চৌধুরী (লাভলী) :: এক সময় প্রাইভেট রিক্সার খুব প্রচলন ছিল। এখন তো চোখেই পড়ে না । আমাদের অবশ্য একটা প্রাইভেট কার ছিল। কিন্তু খুব একটা সুবিধার ছিল না ।বেশ পুরানো, প্রায় সময় যান্ত্রিক গোলযোগ দেখা দিত, অনেক সময় এমনও হয়েছে, অর্ধেক রাস্তা যাওয়ার পর গাড়ি আর এই চুলও নড়ছে না!রাস্তা থেকে লোক ডেকে ঠেলতে ঠেলতে কোনো রকম গেরেজে নিয়ে যাওয়া হতো। আমরা পড়তাম মহা লজ্জায়! তাই যতটুকু সম্ভব এই গাড়ি এড়িয়ে চলার চেষ্টা করতাম । আর সে কারনে প্রাইভেট রিক্সাই ছিল একমাত্র ভরসা। আমাদের রিক্সা ড্রাইভারের নাম ছিল সামাদ ,আমাদের প্রিয় সামাদ ভাই । উল্কার গতিতে আমাদের স্কুলে নিয়ে যেতেন, নিয়ে আসতেন। বাকি সময় ঘরের কাজেও সহযোগিতা করতেন । তার নয় ছেলেমেয়ে সহ বিশাল পরিবারটির দায়িত্ব আমার মায়ের উপর ছেড়ে দিয়ে, বেশ আরাম করেই দিনকাল চলে যাচ্ছিল।

আম্মা খুব ভালো করে বুঝিয়ে বলতেন, সামাদ সাবধানে যেও,খবরদার ওভারটেক করবে না।” সামাদ ভাইও আম্মার কথায় অতি বিনয়ের সাথে হা বোধক মাথা নাড়তেন । আর প্রতিবার আমাদের দুই বোনকে সাক্ষী বানাতেন । বলতেন, “ময়নাইতরে (কোনো এক কারনে আমাদের নাম ধরে ডাকা নিষেধ ছিল) জিকাউকা, আমি কি জাত যত্ন করি আস্তে ধীরে রিক্সা চালাই। আমরাও কি এক অজানা কারণে সব সময় সামাদ ভাইয়ের পক্ষে সায় দিতাম ।

যখন একটু বড় হলাম, নাইন টেনে পড়ি, তখন বৃষ্টি হলে আমরা রিক্সার হুড ফেলে দিতাম। বইয়ের ব্যাগ বিশেষ কায়দায় পলিথিনে মোড়ে রাখতাম । আর কাক ভিজা হয়ে বাসায় ফিরতাম। আহা,কি যে আনন্দের দিনগুলো ছিল!

তখন আবার সামাদ ভাই আমাদের পক্ষ নিতো,ইনিয়ে বিনিয়ে দুনিয়ার মিথ্যে কথা বলে আম্মাকে বোঝানোর চেষ্টা করতেন যে, আমরা ইচ্ছে করে বৃষ্টিতে ভিজি নাই। ঘটনাক্রমে ভিজেছি। একবার রিক্সার চাকায় আমার ওড়না পেঁচিয়ে গেলো ।সামাদ ভাই তার চিরদিনের অভ্যাস মতো রিক্সাটা হাওয়ায় ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছিলেন। এদিকে আমি চিৎকার করছি, সাথে বড় আপা থাকায় সে যাত্রা বেঁচে যাই। তা না হলে আমরা জীবন ঘড়ি হয়তো সেদিনই থেমে যেতো।

ইদানিং “ইজি বাইক” নামক বাহনটার চাকায় ওড়না জড়িয়ে অনেক মেয়ের জীবন তছনছ হয়ে গেছে। অনেকে অকালে প্রাণ হারিয়েছে।এসব হয়তো আমরা জানি না,আসলে জানাতে চাইও না।

যখন কলেজে উঠলাম, তখন আমাদের একটু পাখা গজালো!😉 তিন চারজন মিলে মার্কেটে যাওয়া, কোচিং করতে যাওয়া, লতিফ সেন্টারে আইসক্রিম খেতে যাওয়া! তখনও সামাদ ভাই আমাদের কান্ডারি । যেখানে বলতাম নিয়ে যেতেন,কোনো না নেই।

খালি বলতেন “ময়না, আফনারা পেরেম করবা না ।ইকটা খুব বাদ জিনিস, মুখো লওয়াও গুনা।” তখন আমাদের ভীতরে কেমন একটা পরিবর্তন এসেছে ,ছেলেদের সাথে কথা বলতে ভালো লাগতো ।আমাদের সাথে এম সি কলেজর অনেক স্টুডেন্টরা প্রাইভেট পড়তো।

একদিন সামাদ ভাই বললেন “ময়না হুনুকা, ইতা ফুয়াইতর লগে মাতবানা । মাতলে গুনা অইবো,ইতা শয়তান অখল, আফনারা বুঝতা নায় ।” আমার তখন একটা দুষ্টবুদ্ধি মাথায় আসলো। জিজ্ঞেস করলাম “আচ্ছা সামাদ ভাই,ভালোবাসা জিনিসটা বলতে তুমি কি বুঝো? তোমার মনে যা আসে তাই বলো।” তখন উনাকে দেখে মনে হচ্ছিল বিরাট একটা লজ্জার মধ্যে পড়ে গেছেন । উনি লজ্জা শরমের মাথা খেয়ে বললেন,” দেখুকা ইকটা বড় শরমর কথা, মুখেদিউ বারর না,কইতাম কিলান?
তবে বেশ জ্ঞানীর মতো করে বললেন, “যদিও শরমর বিষয় তবুও ই জিনিস ছাড়া চলেও না,ইকটারও দরকার আছে। আমি বললাম এতো সুন্দর একটা কথা!এখানে শরমের কি হলো?

যাই হোক, এই যে এতক্ষণ আমি যে মানুষটার কথা বলছিলাম, তাকে অনেক খুঁজেও পাইনি। আমাদের এতো পুরানো আর অনুগত একজন মানুষ, কোথায় হারিয়ে গেলেন,কে জানে? নাকি এই পৃথিবীর মায়াজাল ছিন্ন করে অনির্দিষ্ট গন্তব্যে পাড়ি দিয়েছেন ।

সামাদ ভাই রিক্সা চালক ছিলেন,কিন্তু আপনজনের চেয়ে কোনো অংশে কম ছিলেন না।

সামাদ ভাই তুমি যেখানেই থাকো ভালো থেকো । আজ বহু বছর পর তোমাকে নিয়ে লিখছি । এই লিখার মাধ্যমে যদি তোমার কিছু ঋন পরিশোধ হয়, এই আশায় ।


© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত মৃদুভাষণ - ২০১৪
Design & Developed BY ThemesBazar.Com