বৃহস্পতিবার, ১৩ জুন ২০১৯, ০৯:১০ অপরাহ্ন

বাবা !

মু. আনোয়ার হোসেন রনি ::  প্রথম রোজা রাখার কথা মনে আছে খুব।আছরের নামাজের পর খুব দুর্বল হয়ে পড়েছিলাম।মা বাবা দুজনই অস্থির।আমার সামনে খাবারের থালা।সামনে একটা কলসি।মা বাবা দুজনেই বললেন “এই কলসিতে মুখ দিয়ে ফু দাও।রোজা চলে যাবে কলসির ভিতর।খাবার শেষ করে আবার মুখ লাগিয়ে রোজা টেনে নাও।আমার রোজা শুরু হয়ে যাবে”। আমি কিছুতেই ” কলসি রোজা” মানিনী।বাবা আমাকে কোলে নিয়ে ইফতারের আগ পর্যন্ত বাড়ির সামনের মাঠে হেঁটেছিলেন।

২. নব্বই এর গণআন্দোলন। দুপুর থেকেই মিছিলে আমি।ফিরতে ফিরতে রাত হয়ে গেল।লামা বাজারের রশিদ বিল্ডিং এর মেস এ এসে দেখি বাবা বিছানায় শুয়ে আছেন।জিজ্ঞেস করে জানলাম বাবা দুপুর থেকেই আমার বিছানায় শুয়ে অপেক্ষা করছেন।দুপুরে কিছু খাননি।আমি আসার পরে স্বাভাবিক ভাবেই বিছানা ছেড়ে বললেন “খুব খিদা লেগেছে,চলো কিছু খেয়ে আসি”,। খুব খারাপ লেগেছিলো সেদিন।বাবা আর আমি বন্দর বাজার ” ওরিয়েন্টাল ” হোটেলে গিয়ে খেলাম।যাওয়ার সময় কিছু টাকা হাতে দিয়ে বললেন “মিছিলে গেলে সাবধানে থাইকো খুব চিন্তা হয় তোমার জন্য”।

৩. ১৬ এপ্রিল ২০০৫।বিকেল ৩.৪৫ মিঃ, সিলেট ওসমানী মেডিক্যালে হার্টের অসুখে বাবা মারা গেলেন।ড. শুধাংশু পাশেই চেয়ারে বসে আছেন মাথায় হাত দিয়ে।চারিদিকে কান্নার রোল।আমি কাঁদতে পারছিনা।একেবারেই না।আমার ছোট বোন আফরোজাও চীৎকার করে কাঁদছে। আমি কাছে গিয়েই তার গালে চড় বসিয়ে দেই।আমার বোনদের গাঁয়ে আমি জীবনেও হাত তুলিনি।এটাই প্রথম, জানি এটাই শেষ।কেন এমন করেছিলাম-আজো এর উত্তর খোঁজে পাইনা।

৪.সিগনেচার দিয়ে লাশ গ্রহণ করতে হয় হাসপাতাল থেকে।আমাকে বার বার বলছিলেন কর্তৃপক্ষ। বড় ছেলে আমি।আমারই সেটা করার কথা।করিনি।কারো কোন কথা সেদিন শুনতে ইচ্ছে করছিলো না।
শামসুল বাসিত শেরো সেদিন সাইন করে বাবার “লাশ” গ্রহণে সাইন করেছিলো।

বাবা মা এতো স্মৃতি রেখে কেন চলে যান ওপারে?এমন হাজার-লক্ষ স্মৃতি’র চাপ সহ্য করে জীবন পার করা খুব সহজ নয়।

১৬ এপ্রিল ২০০৫ বাবা!
২৫ জুন ২০০৬ মা!!

এমন যদি হতো বছরে একবার অদৃশ্য বিধাতা বাচ্চাদের কাছে মা বাবাকে ফেরেশতা দিয়ে ১ দিনের জন্য পাঠাতেন। আমি এবার রোজায় চাইতাম।একটা “কলসি রোজা” রাখতাম।

বাবা-ফুটবল,বাউলগান,ছাতক প্রেসক্লাব,যুগভেরী,গ্রাম্য শালিশ,ব্যঞ্জো,তোমার পটলদা’র বাসা,ছাতক খেলাঘর,ফাংশান,রেডিও,টিভি -দৌড়াদৌড়ি।যেন তুমি ছাড়া সব অচল।কই আমার কবি বাবা,সবই চলছে ঠিকঠাক।শুধু তোমার দম মেশিন চীরিতরে বন্ধ।

“মরিলে কান্দিসনা আমার দায় রে যাদুধন”- বোকা বাবা, তোমার জন্য কান্না করিনা । মনে মনে ভাবি ” তোমার যা কিছু কাজ আছে,পরিচিতি আছে সেটার বিনিময়ে যদি একটা পদক পেয়ে যেতাম, উত্তরাধিকারসূত্রে আমি?মন্দ হতোনা”।

বাবা! গান এখন খায়।হৃদয়ে মর্মবাণী করেনা ধারণ যারা নিয়ম বানায় নিয়ম ভাঙ্গে সেসব কুলিন জনগণ।আর যা খায় তার দামও বেশী।সব মাধ্যম খাদ্য বিক্রি করে গরম গরম।
সৈয়দ শাহনূর, দীনভবানন্দ, কালাশাহ, শিতালং ফকির,দীনহীন কত মহাজন- করিলেন সৃজন এমন আলোর ঘর সেই ঘরগুলোও আজ যেন মৃতপুরি, জ্বলেনা মোমেরও আলো।

ভালো থেকে বাবা।খুব ভালো।
আজ তোমার ছেলের মন ভীষণ এলোমেলো।


© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত মৃদুভাষণ - ২০১৪
Design & Developed BY ThemesBazar.Com