শুক্রবার, ০৮ নভেম্বর ২০১৯, ০৫:১৪ অপরাহ্ন

প্রিয়াঙ্কায় কেন এত আস্থা

মেহেদী হাসান :: ভারতের ১৭তম লোকসভা নির্বাচন চলছে। একটি বিশেষ বিষয় নিয়ে শুরু হয়েছে জল্পনা-কল্পনা আর বিতর্ক। টেলিভিশনের পর্দায়, সংবাদপত্রের পাতায়, জনগণের মুখে মুখে একই প্রশ্ন- কে হবেন নরেন্দ্র মোদির বিপরীতে কংগ্রেসের প্রার্থী?

অনেকেই বলছেন প্রিয়াঙ্কা গান্ধীর নাম। এক্ষেত্রে প্রিয়াঙ্কার সুন্দর আচরণ, স্বচ্ছ মানসিকতা, উত্তম ব্যক্তিত্ব, চারিত্রিক দৃঢ়তা, পারিবারিক গ্রহণযোগ্যতা, রাজনৈতিক দূরদর্শিতা ও প্রজ্ঞা, পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা, নেতৃত্ব গুণ, সংবেদনশীলতা ও ধৈর্য তাকে এগিয়ে রেখেছে, যদিও কংগ্রেসের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত এ ব্যাপারে কোনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেয়া হয়নি।

নেহেরু-গান্ধী পরিবারের এ চতুর্থ প্রজন্মকে বিরোধী শিবির বিজেপিও নিয়েছে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে। ২০০৪ সালে মায়ের নির্বাচনী প্রচারণার মধ্য দিয়ে প্রিয়াঙ্কাকে প্রথম রাজনীতির মাঠে দেখা গেলেও মধ্যবয়স্ক ভারতীয়রা প্রিয়াঙ্কাকে দেখেছে অনেক আগেই।

১৯৮০ সালে চাচা সঞ্জয় গান্ধীর শেষকৃত্য অনুষ্ঠানে নিষ্পলক দাঁড়িয়ে থাকতে, ’৮৪-তে দাদির মৃতদেহের পাশে প্রবল বিস্ময় নিয়ে তাকিয়ে থাকতে, আর ’৯১-এ বাবার মৃত্যুতে শোকগ্রস্ত মাকে সান্ত্বনা দিতে। সেই নিষ্পাপ সাবলীল মুখাবয়বের প্রিয়াঙ্কার মধ্যে অনেকেই প্রয়াত শ্রীমতউ ইন্দিরা গান্ধীকে খোঁজেন। প্রিয়াঙ্কা বলেছেন, তিনি দাদির দেয়া পারিবারিক শিক্ষার মধ্য দিয়েই বড় হয়েছেন, দাদিই তাকে জোয়ান অব আর্কের গল্প শুনিয়ে ঘুম পাড়াতেন, দাদিই তাকে শিখিয়েছেন কীভাবে ভয়কে জয় করতে হয়। এক সাক্ষাৎকারে প্রিয়াঙ্কা বলেছেন, ‘আমায় দেখতে দাদির মতো। আমি হয়তো অনেকটা আমার দাদির মতোও।

ছোটবেলায় এমন একটা বাড়িতে বড় হয়েছি যেখানে তিনিই ছিলেন কর্ত্রী। তার একটা প্রভাব তো আমার ওপর পড়েছিল।’ তবে স্বভাবের দিক থেকে, তার দাবি, তিনি বাবা রাজীব গান্ধীর বেশি কাছাকাছি অর্থাৎ কোমল স্বভাবের।

প্রিয়াঙ্কা নিজে একাধিকবার তামিলনাডুর জেলে গিয়ে তার বাবার অন্যতম হত্যাকারী নলিনী মুরুগনের সঙ্গে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কথা বলেছেন। সেই পরিবারে তিনি বড় হয়ে উঠেছেন, যেখানে মা সোনিয়া গান্ধীর হস্তক্ষেপেই আদালত হত্যাকারীদের মৃত্যুদণ্ড কমিয়ে যাবজ্জীবন করেছে।

প্রিয়াঙ্কার প্রপিতামহ থেকে মা পর্যন্ত দুই দশক কংগ্রেসের সভাপতি ছিলেন। ২০১৭ সালে এ দায়িত্ব দেয়া হয় ভাই রাহুল গান্ধীকে। রাজনীতিতে প্রিয়াঙ্কা নতুন নন, এর আগে প্রায় ২০ বছর তার কর্মকাণ্ড মা ও ভাইয়ের আসন আমেথি ও রায়বেরেলিতেই প্রচার কাজে সীমাবদ্ধ ছিল।

ঐতিহ্যবাহী দলটি গত নির্বাচনে ভরাডুবির পর যখন ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে, তখন কংগ্রেস সভাপতি অনেক ভরসা নিয়ে প্রিয়াঙ্কাকে বড় দায়িত্ব দিলেন। রাহুল গান্ধী স্বাক্ষরিত এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে ২৩ জানুয়ারি উত্তরপ্রদেশের পূর্বাঞ্চলের জন্য কংগ্রেসের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে তার নাম ঘোষণা করে রাহুল বলেন, ‘আমাদের জন্য উত্তরপ্রদেশ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রদেশগুলোর একটি। এই দায়িত্ব প্রিয়াঙ্কার জন্য একটি চ্যালেঞ্জ এবং সে-ই পারবে এটি সামলে নিতে। আমার পূর্ণ আস্থা রয়েছে তার প্রতি, সে একজন পরিশ্রমী ও সক্ষম রাজনীতিক।’

রাহুল আরও বলেন, ‘ব্যক্তিগতভাবে তিনি ভীষণ খুশি যে, প্রিয়াঙ্কা অবশেষে তার সঙ্গে কাজ করতে যাচ্ছে।’ উত্তরপ্রদেশের ৮০টি লোকসভা আসনের মধ্যে প্রিয়াঙ্কার দায়িত্বে পড়ছে পূর্বাঞ্চলের ৪২টি কেন্দ্র। এ অঞ্চলেই পড়ছে রাহুলের আমেথি, সোনিয়া গান্ধীর রায়বেরেলি, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বারানসি এবং রাজ্যের বিজেপি মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথের গোরক্ষপুর।

ক্যারিশম্যাটিক প্রিয়াঙ্কা যাতে কংগ্রেসের হাল ধরেন সেজন্য গত প্রায় দু’দশক ধরেই দলের নেতাকর্মীরা দাবি জানিয়ে আসছিলেন। জনমনে প্রিয়াঙ্কার আবেদন সম্পর্কে বিবিসির সাংবাদিক শুভজ্যোতি ঘোষ বলেছেন- ‘‘পাঁচ বছর আগে উত্তরপ্রদেশে এমনই একটি নির্বাচনী সভায় দেখেছিলাম কোনো নেতা-মন্ত্রী না হওয়া সত্ত্বেও আমজনতার কাছে তার আকর্ষণ কতটা অপ্রতিরোধ্য, কীভাবে মানুষ তাকে ‘দ্বিতীয় ইন্দিরা গান্ধী’ হিসেবে দেখেন।’’

প্রিয়াঙ্কা সম্পর্কে দিল্লিতে সিনিয়র সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক সোমা চৌধুরী বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন, ‘দেখুন, রাজনৈতিক উপস্থিতি, ব্যক্তিত্ব বা প্রতিপক্ষর টক্কর নেয়ার ক্ষমতা ধরলে প্রিয়াঙ্কা অবশ্যই কংগ্রেসের জন্য সম্পদ।’ পর্যবেক্ষকদের একটা বড় অংশ মনে করেন, কংগ্রেসের সর্বস্তরের নেতাকর্মী থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষের মধ্যে প্রিয়াঙ্কার গ্রহণযোগ্যতা প্রয়াত ইন্দিরা গান্ধীর মতোই। তার রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও দূরদর্শিতার ওপর অনেকেই আস্থা রাখেন। কংগ্রেসের অনেকেই মনে করেন, তিনি রাহুলের চেয়ে অনেক বেশি ক্যারিশম্যাটিক। অনেকেই ২০১৪ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত রাজ্য পর্যায়ে বিভিন্ন নির্বাচনে কংগ্রেসের পরাজয়ের পেছনে রাহুল গান্ধীর ভুলেভরা নেতৃত্বকেই দায়ী করেন। রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রিয়াঙ্কা যতবারই প্রচারণায় গিয়েছেন ততবারই জনস্রোত দেখেছে কংগ্রেস।

প্রিয়াঙ্কার রাজনীতিতে আসার বহু প্রত্যাশিত সিদ্ধান্তে ভারতজুড়ে নতুন করে চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়েছে। ২০১৪ সালে বিপর্যয়ের মুখে পড়েছিল কংগ্রেস এবং উত্তরপ্রদেশে বিজেপির বিপুল সাফল্যই কার্যত মোদির জন্য দিল্লির সিংহাসনের রাস্তা খুলে দিয়েছিল। কংগ্রেস সে সময় মাত্র দুটি আসন লাভ করে। কংগ্রেসের ভোটের পরিমাণ কমে দাঁড়িয়েছিল মাত্র আট শতাংশে। এমনই এক অবস্থায় ডুবন্ত দলটিকে রক্ষায় দিন-রাত এক করে ফেলছেন প্রিয়াঙ্কা। একের পর এক করেছেন জনসভা, রোড শো। কংগ্রেস কর্মীরা প্রিয়াঙ্কাকে তুলনা করছে দেবী দুর্গার সঙ্গে।

সমর্থকরা বলছেন, ইন্দিরা গান্ধীর মতোই প্রিয়াঙ্কা ভবিষ্যতে নিজেকে আয়রন লেডি হিসেবে তুলে ধরতে সফল হবেন। উত্তরপ্রদেশে দুর্নীতির অবসান ঘটবে প্রিয়াঙ্কার হাত ধরে। লখনৌ থেকে বিবিসি প্রতিবেদক জানিয়েছেন, ‘কংগ্রেসের কর্মী ও সমর্থকরা প্রিয়াঙ্কার যোগদানে যথেষ্ট উদ্দীপ্ত। রয়টার্সের প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, প্রিয়াঙ্কা নারী ভোটারদের কাছে অনেক বেশি জনপ্রিয়। আর ভারতে এবার পুরুষ ভোটারের চেয়ে নারী ভোটারের সংখ্যা বেশি।

প্রিয়াঙ্কার কারণে সাধারণ ভোটারদের মধ্যে কংগ্রেসের প্রতি আগ্রহ বাড়ছে। অযোধ্যার এক দোকানি মহেশ গুপ্তা বলেছেন, ‘প্রিয়াঙ্কার কারণেই এখানকার মানুষ কংগ্রেসকে সমর্থন করছে।’ তিনি আরও বলেন, প্রিয়াঙ্কার নির্বাচনী প্রচার ভালো লাগায় এবার তিনি কংগ্রেসে ভোট দেবেন।’

জরিপ সংস্থা ‘সিভোটার’ জানায়, প্রিয়াঙ্কা দলীয় পদ গ্রহণের পর উত্তরপ্রদেশে কংগ্রেসের সমর্থন এক লাফে ১০ শতাংশ বেড়ে গিয়েছিল। প্রিয়াঙ্কা তার বাবারই মতো প্রতিপক্ষকে কখনও ব্যক্তিগত আক্রমণ করেন না, তার বক্তব্য খুবই পরিমার্জিত ও যৌক্তিক। শব্দ চয়নে তার রুচিশীলতা যে কাউকে মুগ্ধ করে।

প্রিয়াঙ্কার স্বচ্ছ ব্যক্তিত্বের কাছে বিরোধীরা ধরাশায়ী হলেও স্বামী রবার্ট ভদ্রের ওপর আর্থিক দুর্নীতির অভিযোগ এনেছিল বিরোধী শিবির। তখন রবার্টকে এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট (ইডি) অফিসে ছেড়ে দিয়ে যান খোদ প্রিয়াঙ্কা গান্ধী, বার্তা দেন তিনি সত্যের পক্ষে। উত্তরপ্রদেশের বারানসি কেন্দ্রে ২০১৪ সালে মোদি পেয়েছিলেন ৫৬ শতাংশ ভোট। সেক্ষেত্রে বড় অবদান ছিল ‘আপার কাস্টের’, যারা একসময় কংগ্রেসের সমর্থক ছিল এবং এ মুহূর্তের বিজেপির প্রতি ক্ষুব্ধ।

প্রিয়াঙ্কার আগমনে তাদের কংগ্রেসের প্রতি আগ্রহ ফিরবে বলে মনে হচ্ছে। এছাড়া ওই রাজ্যের অন্যতম দল কৃষকদের সমাজবাদী পার্টি ও দলিতদের বহুজন সমাজবাদী পার্টির নেতাদের চেয়ে প্রিয়াঙ্কা অনেক বেশি গ্রহণযোগ্য। কংগ্রেস ছাড়া শরিক দলগুলো প্রিয়াঙ্কাতেই বেশি ভরসা রাখে। যেমন কংগ্রেস উত্তরপ্রদেশে কতগুলো আসন পাবে, এই প্রশ্নে যখন সমাজবাদী পার্টির সঙ্গে জোট ভেঙে যাচ্ছিল, তখন প্রিয়াঙ্কাই ফোন করে জোট বাঁচিয়েছেন।

উত্তরপ্রদেশে ৫০ শতাংশের বেশি ভোট সমাজবাদী পার্টি ও বহুজন সমাজবাদী পার্টির নিয়ন্ত্রণে। কংগ্রেস যদি কোনোভাবে প্রিয়াঙ্কাকে সামনে নিয়ে সমাজবাদী দল ও বহুজন সমাজবাদী পার্টির সঙ্গে একটা পরোক্ষ আঁতাত তৈরি করতে পারে, তাহলে বিজেপি নিশ্চিত বিপদে পড়ে যাবে।

রাজনীতিতে প্রিয়াঙ্কার আবির্ভাব ভারতের জন্য কল্যাণকর হবে বলেই মনে হয়।

মেহেদী হাসান : শিক্ষক, হিউম্যান রিসোর্স ম্যানেজমেন্ট ডিসিপ্লিন, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়

mehedihasan@ku.ac.bd


© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত মৃদুভাষণ - ২০১৪
Design & Developed BY ThemesBazar.Com