মঙ্গলবার, ২৩ জুলাই ২০১৯, ০৩:৪৬ অপরাহ্ন

পেহেলগাম জয়ের গল্প

নার্গিস জাহান :: ভ্রমণ কাহিনী শুরু করেছিলাম কাশ্মীরের শ্রীনগরের ডাল লেক দিয়ে এবার করবো পেহেলগাম জয়ের গল্প দিয়ে, হ্যাঁ জয়ই বলা যায়। ওরে বাপরে বাপ, যে কিনা কোনদিন সাইকেল চালায়নি তার সামনে আনা হলো টগবগে ত্যাজী তাগড়া ঘোড়া।
অভিযান পেহেলগাম।পেহেল মানে পহেলা মনে হলেও পেহেল অর্থ ভেড়া।পূর্বে যদিও এটা ভেড়া ওয়ালাদের গ্রাম হিসাবে পরিচিত ছিল এখন আর তা নেই।এখন এটা কাশ্মীর উপত্যকার সবচেয়ে বড় আকর্ষণীয় পর্যটনের নাম।শ্রীনগর থেকে ৯৬নব্বই কিঃমিঃদক্ষিণে এর অবস্থান।

তবে হ্যাঁ, এটা কাশ্মীরের সবচেয়ে প্রথম গ্রাম।হিমালয়ের বুক চিরে লিডর ভ্যালি থেকে এঁকে বেঁকে নেমে আসা লিড্র নদী দেশি বিদেশী পর্যটকের কাছে পেহেলগামকে করে তুলেছে আকর্ষণীয়।আমরা যে দামী দামী পশমিনা শাল দেখি এগুলো এখানকার ভেড়ার পশম দিয়েই তৈরি হয়।

পেহেলগাম যেতে যেতে পথেই নজর কাড়ে প্রকৃতির অপার সৌন্দর্য। আমাদের দেশের মত ওখানে অসহ্য ট্রাফিকজ্যাম না থাকাতে নিজেকে প্রকৃতির মাঝে আকন্ঠ সঁপে দেয়া যায়।গাড়ীর জানালা দিয়ে তাকালে একপাশে দেখা যাবে বিশাল বিশাল পর্বতের গা সবুজের গালিচা দিয়ে ঢাকা রয়েছে।অন্য পাশে হিমালয় থেকে ছুটে আসা কলকল ছলছল স্বচ্ছ ফেনিল ঢেউয়ের একমুখী নদী।নদীতো নয় যেন রিনিঝিনি নূপুর পায়ে ছুটে চলা কোন কিশোরী মেয়ে।আকাশের নীলও বুঝি জলের আয়নায় নিজেকে দেখে নিতে চায়।আর দেবদারু গাছ সেও আকাশ ছোঁয়ার স্বপ্ন দেখে।যেমন খুশি সাজে সেজেছে পাহাড়ের শৃঙ্গগুলি।কেউবা মাথায় পরেছে রূপালী মুকুট, কারো সবুজ অষ্টে চুম্মনরত মেঘবালিকা।ঝিলাম নদীতে মিলিত হওয়ার তীব্র নেশায় ছুটে চলেছে নীলাভ নদী।এতটুকু দাঁড়াবার সময়ও বুঝি তার নেই।

আমরা যেদিন পেহেলগাম যাব তার পূর্ব রাতে নাজির ভাই এর মেয়ের বেড়াতে আসা বান্ধবীরা(ওরা সেদিন পেহেলগাম ঘুরে এসেছে)বলছিল ওখানে যাওয়াটা খুব কঠিন,তবে চ্যালেঞ্জিং।ভ্যালিগুলো দেখে উঠা নামাতে আড়াই থেকে তিন ঘন্টা লাগবে।ভীতুরামের মনের ভিতর একটা ভয় ঢুকিয়ে দেয়া আর কি।যাই হোক, পরদিন ওখানে ঘোড়ায় চড়া ছাড়া আর কোন উপায় ছিলনা।(চ্যালেঞ্জিং শব্দটা একটুখানি মনে ধরেছিল)। ঘোড়ার সাইজ দেখে কিছু মূহুর্তের জন্য দুটানায় পড়ে গিয়েছিলাম।তাও আবার ঘোড়ায় চড়ার পর বুঝতে পারলাম পাঁচটা ঘোড়ার মধ্যে আমারটাই সবচেয়ে উচু অথচ পাঁচটা মানুষের মাঝে আমি মানুষটা সাইজে সবার ছোট।বলুনতো কেমন হলো ব্যাপারটা?মনে মনে চালককে বেরহম মনে হতে লাগলো।

যাত্রার শুরুতেই ঘোড়া চালক আমাদের বলে দিলেন যে, এ বনে বাঘ ছাড়াও অনেক হিংস্র জীব জন্তু রয়েছে। সারি সারি পাইন গাছের মাঝ দিয়ে পাথর মাটির এবড়ো থেবড়ো খাঁড়া পাহাড়ের গা বেয়ে উর্দ্ধমুখে ছুটে চললো আমাদের পঙ্খীরাজ।প্রতি মূহুর্তেই মনে হচ্ছিলএই বুঝি মাটিতে পড়ে যাব।মনে হলো পথ যেন শেষ হচ্ছেনা।মনে মনে কঠিন কাজ সহজ হওয়ার দোয়া পড়তে লাগলাম।চালক বললো ঘোড়ার চিন্তা করবেননা,আপনারা সৌন্দর্য্য উপভোগ করেন।পাঁচটা ঘোড়ার জন্য আমাদের সাথে তিনজন চালক ছিলেন।দুইজন অল্প বয়সী বালক,একজন তুলনামূলকভাবে বয়সে একটু বড়।

যখন চালক গ্রীণ ভ্যালিতে নামিয়ে রাজ রাজরাদের শিকারের গল্প শুনাতে লাগলো আমি তখন নিজের অজান্তেই ছোটবেলার শোনা রূপকথার রাজ্যে হারিয়ে গেলাম।টগবগ টগবগ ঘোড়ায় চড়ে রাজার গহীন জঙ্গলে ছুটে চলা,কখনো চারবন্ধু নিয়ে চাঁদকুমারের বনের ভিতর দিয়ে ঘাড়া নিয়ে শিকারের চিত্র মনের মধ্যে ভেসে উঠতে লাগলো।যাই হোক ভ্যালি দেখতে দেখতে এক সময় আল্লাহর রহমতে অক্ষতভাবে এসে পৌছালাম স্বপ্নের সেই রাজ্যে যাকে বলে মিনি সুইজারল্যান্ড ।দৃষ্টির সীমা ছাড়িয়ে সুবিশাল ঢালু মাঠ। পুরোটাই সবুজ ঘাসের আস্তরণে ঢাকা।ছোট ছোট বাচ্চাদের ছুটাছুটি, দূরে সবুজ পাহাড় আর মেঘেদের মিতালী।স্রষ্টা যেন পৃথিবীতে স্বর্গের উপমা দিয়ে রেখেছেন।মাঠঘেষে রয়েছে খাবারের দোকান।আমাদের দেশের মত ওদের পর্যটন কেন্দ্রে গলাকাটা দাম নেয়না।মাঠজুড়ে কত যে পর্যটক। ইচ্ছে হলো সবুজের গালিচায় নিজেকে এলিয়ে দেই।কিন্তু শুয়ে পড়লেতো আর পুরোটা দেখা হবে না।যেদিকেই তাকাচ্ছি অবাক করা সৌন্দর্যে তন্ময় হয়ে যাচ্ছি। চলছিল নানা ব্যবসা,কেউ কাশ্মীরী শাল বিক্রি করছে,একজন বৃদ্ধ আসলেন হাতে পায়রা নিয়ে।ছবি তোলার জন্য পায়রা ভাড়া দেন।আরেকজন বৃদ্ধ একই উদ্দেশ্যে কোলে করে ভেড়া নিয়ে আসলেন।।উনাকে দেখেই আমার মনে পড়ে গেল,আরে এটাতো সেই মাঠ যেখানে হিন্দি ফিল্ম “বজরঙ্গী ভাইজানে”র মুন্নি ভেড়া নিয়ে দৌড়াচ্ছিল।দিব্য চোখে আমি যেন মুন্নিকে দেখতে পেলাম।৷৷৷৷

কিন্তু না বাস্তব অন্য কথা বলছে।প্রকৃতির স্বপ্নমাখা রূপ,পর্যটকের ভীড়,সরকারের আয়ের মোটা অংক কোনটাই দরিদ্র পেহেলগামবাসীর জীবনে কোন পরিবর্তন ঘটাতে পারনি।পারেনি তাদের জীবনের দুঃখ কষ্ট দূর করে দিতে। যেখানে ঘোড়ার পিঠে চড়ে উঠতে আমার কষ্ট হচ্ছিল,সেখানে এই বাচ্চাছেলেগুলো ঘোড়া সামলিয়ে, আমাদের খেয়াল রেখে পড়িমরি করে পায়ে হেটে এত উঁচু পাহাড় বেয়ে উঠলো,ভাবতেই মনের ভেতর কেমন যেন অপরাধবোধ কাজ করতে লাগলো।বয়সে একটু বড় যে তার জীবনের কাহিনী আরো করুণ।সে শুনিয়েছে হিংস্র বাঘের মুখে প্রাণ দেয়া তার সন্তানের জীবনাবসানের অশ্রু গাঁথা। আমার ঘোড়ার চালকে উদ্দেশ্য করে যতবার আমি ডাকছিলাম সে কোন উত্তর দিচ্ছিলনা বা তাকাচ্ছিলনা।মনে মনে তাকে বেয়াদব-ই ভাবলাম।কিন্তু না কিছুক্ষণ পরই আমার ভুল ভেঙ্গে গেল।সে পিছন ফিরে কি যেন বলতে চাইলো আর তখনই বুঝলাম ও শ্রবণ প্রতিবন্ধী।ছেলেটার জন্য বুকের ভেতরটা হু হু করে উঠলো।অবাক হয়ে ভাবলাম যে, ওদের কোন প্রতিবন্ধকতাই ওদেরকে থামিয়ে রাখতে পারেনি।জীবনের ঝুকি নিয়ে নাজানি ওরা কত বার এই উঁচু পাহাড় বেয়ে উঠানামা করে।বাঁচার তাগিদে কেউ শাল বিক্রি করছে,কেউ পায়রা কেউ ভেড়া ভাড়া দিচ্ছে,কেউ ঘোড়ার লাগাম বিক্রি করতে কতনা কাকুতি মিনতি করে চলেছে।এত অভাবের পরও আমরা যখন আমাদের সাথের ঘোড়া চালককে আমাদের সাথে খাবার খেতে সাধছিলাম তখন সহজে রাজী হচ্ছিল না।ওখানে কাউকে হাত পেতে ভিক্ষা করতে দেখিনি।ওরা কোন কিছুর বিনিময়ে অর্থ চাচ্ছিল,কাজেরও যে ওখানে অভাব।

আমরা শুধু পাহাড়ের ঝর্ণা-ই দেখি দেখিনা ওদের চোখে বয়ে যাওয়া অশ্রু, পাহাড়ের সবুজে নিজেকে হারিয়ে ফেলি, উপলব্ধি করতে পারিনা ওদের বুকের ভেতরের রক্তাক্ত লাল ক্ষরণ। আমরা শুধু জলের গানই শুনি,শুনিনা ওদের জীবনের বেদনার গান।শুধু পাহাড় জয় নয়,ওরা যেন একদিন ওদের দারিদ্র্যকে জয় করতে পারে সেই প্রত্যাশায় নিয়ে ফিরে আসলাম।. চলবে..

 

পেহেলগাম জয়ের গল্প

ভূ-স্বর্গ কাশ্মীরের পথে প্রান্তরে

শ্রীনগর থেকে সোনামার্গ

মেঘ বালিকার দেশে


© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত মৃদুভাষণ - ২০১৪
Design & Developed BY ThemesBazar.Com