বৃহস্পতিবার, ২২ অগাস্ট ২০১৯, ০৮:২৮ পূর্বাহ্ন

ছোট ছিলাম একাত্তরে-১

সাব্বিরুল হক :: ১৯৭১ সালে, বয়স তখন তিন কি চার । খুব বেশি কিছু বুঝতে পারতাম বলে মনে পড়ে না। কিন্তু যুদ্ধের আওয়াজ খুব করে কানে বাজে । আকাশে যুদ্ধ বিমানের কর্কশ শব্দ কানে তালা মেরে দেয় এখনও । প্রায়ই গভীর রাতে শুনতে পাই যুদ্ধ দিনের প্রচন্ড গোলাগুলির আওয়াজ । আর সমর অস্ত্রের মহড়া ।

আব্বা তখন সিলেটের মোগলাবাজারে । ওখানকার মহকুমা পর্যায়ের সরকারি অফিসে তাঁর চাকরি । বাসা ছিল রেলস্টেশনের কাছেই । একদিন রেলগাড়ি বোঝাই সামরিক পোষাকের সৈন্য দেখতে পেয়ে অবাক হয়েছিলাম । আম্মাকে বলতে শুনলাম,’দেশের অবস্থা ভালো না । গন্ডগোল শুরু হয়ে গেছে !’

সেই গন্ডগোলটা যে ১৯৭১য়ের মুক্তিযুদ্ধ ; জানতে আমার সময় লেগেছে বেশ কয়েক বছর । এমন সময় এসে আব্বা বন্ধ করে দিলেন অফিসে যাওয়া । খাবার-দাবারের সমস্যা দেখা দিলো আমাদের । পাশেই বিরাট বাড়িটা ছিলো মাহবুব ভাইদের । প্রখ্যাত সাংবাদিক, অধুনালুপ্ত যুগভেরী পত্রিকার সম্পাদক মাহবুবুর রহমান । তাঁর মা-বাবার সহায়তা পেয়েছি আমরা, মনে আছে সে সময়টায় । মাহবুব ভাইয়ের আম্মা গরুর দুধ পাঠাতেন । বাড়িতে নিয়ে খাইয়ে দিতেন নিজের হাতে ।
সম্ভবত জুন-জুলাই মাসের দিকে মাহবুব ভাইয়ের আব্বার সঙ্গে সিলেট শহরে গিয়েছিলেন আব্বা । বেতনের জন্য । মাহবুব ভাইয়ের আব্বাও ছিলেন সরকারি চাকরিজীবী ।

সেদিন রাতেই ফিরে আসেন আব্বারা । এসে জানান প্রচুর শেলিং হচ্ছে সিলেটে । বাসের পাশে পাকবাহিনীর নিক্ষিপ্ত গোলায় মারা যান মাহবুব ভাইয়ের আব্বা সেরাতেই ।

আমার মনেহয় আমার দেখা যুদ্ধের প্রথম শহীদের লাশ । বাড়ি জুড়ে কান্নার রোল । সারারাত আহাজারি শুনেছিলাম । আর সজাগ থেকে অস্থির হয়ে পায়চারী করতে দেখেছি আব্বাকে । আমিও ঘুমোতে পারিনি একবিন্দু ।
পরের দিনেই সিদ্ধান্ত চুড়ান্ত হয়ে যায় আম্মার । সিলেট শহরেই চলে যাবেন । নানার বাসায় । কিন্তু কিভাবে যাবেন ? রেল যোগাযোগ বন্ধ হয়ে গেছে । দু’একটা মালগাড়ি দেখা গেলেও যাত্রীবাহী ট্রেন তো নেই ! আম্মা দৃঢ় প্রতিজ্ঞ । হেঁটেই চলে যাবেন প্রয়োজনে । ২০/২৫ মাইল কি, যত লম্বা পথই হোক ।

যুদ্ধ দামামার শত আশঙ্কা মাথায় নিয়ে সপরিবারে বেড়িয়ে পড়তে হয়েছিলো আব্বাকে । শেলিং-বোমাবর্ষণ-মৃত্যুকে আশে-পাশে রেখে পথে নেমে ভাগ্যের পক্ষপাত পেয়েছিলেন । নাহলে কেমন করে এক পরিচিত বাস-চালকের সাহায্য পেয়ে সিলেট শহরের কাছে চলে আসা এবং হেঁটে পৌঁছে যেতে পেরেছিলেন কুমার পাড়ায় । মানিক পীরের টিলার উল্টোদিকে নানার বাসায় । নিরাপদেই !

নানার বাসা তখন থমথমে । এখানে ওখানে খোঁড়া হয়েছে বাঙ্কার । সারাদিন লুকোচুরি খেলেছি খালাত ভাই-বোনের সঙ্গে সেই বাঙ্কারে । খালারাও চলে এসেছেন নানা বাড়িতে । মামাদের সাবধানী চলাফেরার কারণ বুঝতে পারিনি তখনও । তবে রাস্তার দিকে তাকিয়ে লোকজন চোখে পড়েনি । বাইরে বেরুতে যেতেই ধমক খেয়েছিলাম প্রচন্ড !

সে রাতটা সুখকর হয়ে আসেনি মোটেও । রাত বাড়তেই শুরু হলো ভয়াবহ গোলাগুলি । বজ্রপাতের মতো মর্টার শেল আর ভূকম্পনের মতো কামানের গোলা নিক্ষেপের আওয়াজ । মা-খালাদের ভয়ার্ত গলায় দোয়া-দুরূদ পড়া আর মামাদের প্রবল উৎকণ্ঠা ! মানিকপীর টিলার উপর থেকে ক্ষণে ক্ষণে মেশিনগানের গুলির কর্কশ শব্দ । আর অন্যদিক থেকে ভেসে আসা ভয়ঙ্কর বিষ্ফোরণ । ভয়ানক রাতের রং ছিলো নিকষ কালো । রাত যতোই বাড়ছিলো, অস্ত্রের মহড়া বেড়েই চলছিলো সমান তালে । টিনের চালে বৃষ্টির মতো পড়ছিল গুলির খোসা । ভয়ে-আতঙ্কে আব্বাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতেও ভুলে গিয়েছিলাম ছোট্ট বালক আমি ।

(চলবে )


© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত মৃদুভাষণ - ২০১৪
Design & Developed BY ThemesBazar.Com