সোমবার, ১৯ অগাস্ট ২০১৯, ০৩:৩০ অপরাহ্ন

বাবার ঋণ শোধের দায় নিয়েছিলেন তানিয়া

শাহিনুর আক্তার তানিয়া

মৃদুভাষণ ডেস্ক :: নার্স শাহিনুর আক্তার তানিয়া ছিলেন পরিবারের প্রতি খুবই দায়িত্বশীল। মা হালিমা খাতুন দীর্ঘদিন ক্যান্সারে ভুগে মারা গেছেন গত বছরের ৩০ ডিসেম্বর। মায়ের চিকিৎসাসহ পরিবার চালাতে গিয়ে তার বাবা গিয়াস উদ্দিন বিপুল অঙ্কের ঋণ করে ফেলেন। তানিয়া ও তার এক ভাই কফিল উদ্দিন চাকরি করে কিছু টাকা শোধ করলেও এখনও সাত লাখ টাকা দেনা রয়েছে বাবার। বড় ভাই শফিকুল ইসলাম সুজন জানিয়েছেন, তানিয়ার বয়স বাড়ছিল। তার বিয়ের ব্যাপারে কথা বললেও সে ঋণের টাকা শোধ না করা পর্যন্ত বিয়ে করতে রাজি ছিল না।

চার ভাই ও দুই বোনের মধ্যে তানিয়া ছিলেন সবার ছোট। তাদের পরিবারটি খুবই অসচ্ছল। এ অবস্থায় মায়ের চিকিৎসা, তানিয়া ও কফিল উদ্দিনের নার্সিং পড়ার খরচ আর পরিবারের খরচ চালাতে গিয়েই এই বিপুল পরিমাণ টাকা ঋণ করতে হয়েছিল বলে জানিয়েছেন সুজন। তানিয়া ঢাকার কল্যাণপুরের ইবনে সিনা হাসপাতালে চাকরি করতেন। আর ভাই কফিল উদ্দিন ঢাকার বঙ্গবন্ধু চিকিৎসা বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে একই পেশায় চাকরি করছেন। তানিয়া নিয়মিত পরিবারকে টাকা দিতেন। আরও চার দিন আগেই তার বাড়ি আসার কথা ছিল। কিন্তু তার কর্মস্থল ইবনে সিনা হাসপাতাল থেকে বেতন পাননি বলে ৬ মে বেতন উঠিয়ে বাড়ি আসছিলেন। বেতন পেয়ে বাড়ির জন্য একটি ১৯ ইঞ্চি এলইডি টিভি, পরিবারের সদস্যদের জন্য কিছু নতুন জামা এবং বাবার হাতে তুলে দেওয়ার জন্য নগদ ১৫ হাজার টাকাও এনেছিলেন। কিন্তু হতভাগা তানিয়া এসব জিনিস পরিবারের হাতে তুলে দিতে পারেননি। বাসচালক নুরু, তার সহযোগী লালন ও বোরহানের লালসার শিকার হয়ে পৃথিবী থেকে বিদায় নিতে হলো প্রাণোচ্ছল মেয়েটিকে।

জেলা পুলিশের একাধিক সূত্র জানায়, স্বর্ণলতা পরিবহনের বাসটি (ঢাকা মেট্রো ব-১৫-৪২৭৪) গাজীপুরের রাজেন্দ্রপুর এলাকায় পৌঁছার পর যাত্রীদের টিকিট পরীক্ষা করার পর তারা নিশ্চিত হন তানিয়ার শেষ গন্তব্য পিরিজপুর। তখনই বাসচালক নুরুজ্জামান নুরু তানিয়াকে টার্গেট করে। নুরু মোবাইল ফোনে ডেকে তার খালাতো ভাই বোরহানকে বীর উজুলী থেকে বাসে ওঠায়। কটিয়াদী বাসস্ট্যান্ডে পৌঁছার পর থেকেই পরিকল্পনা বাস্তবায়নে মরিয়া হয়ে ওঠে নুরু, বোরহান ও লালন। নুরু ও তার সহযোগী লালন মিয়ার আদালতে দেওয়া ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি এসব উঠে এসেছে বলে তদন্ত সংশ্নিষ্টরা জানান।

বোরহানকে ধরিয়ে দিতে পারলে ৫০ হাজার টাকা পুরস্কার :ধর্ষক ও হত্যাকাণ্ডের মূল হোতা বোরহানকে ধরিয়ে দিতে পারলে জেলা পুলিশের পক্ষ থেকে ৫০ হাজার টাকা পুরস্কার ঘোষণা করা হয়েছে। জেলা পুলিশ সুপার মাশরুকুর রহমান খালেদ বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, সুনির্দিষ্ট তথ্য ও প্রযুক্তি কাজে লাগিয়ে বোরহানকে গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে। তবে সে খুব চালাক ও ধূর্ত প্রকৃতির। পুলিশ আশাবাদী, খুব শিগগির তাকে গ্রেফতার করা সম্ভব হবে। সে ধরা পড়লেই ঘটনায় সরাসরি জড়িত সবাই আইনের আওতায় চলে আসবে।

এদিকে অ্যাডভোকেট মায়া ভৌমিক, বিলকিস বেগম, সুলতানা রাজিয়া, আতিয়া হোসেনসহ নারী নেত্রীরা বলেছেন, ১৪ দিনে বোরহানকে গ্রেফতার করতে না পারায় ঘটনার মূল রহস্য এখনও আমরা জানতে পারিনি। স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি থেকে ধর্ষকদের চিহ্নিত করা গেছে। গ্রেফতার বিলম্ব হলে মামলা অন্যদিকে মোড় নিতে পারে। কারণ, ধর্ষকদের পেছনে প্রভাবশালী মহল রয়েছে।

রংপুরে মানববন্ধন :রংপুর অফিস জানায়, নার্স শাহিনুর আক্তার তানিয়াকে গণধর্ষণ ও হত্যার ঘটনায় খুনিদের দ্রুত বিচারের আওতায় এনে ফাঁসির দাবিতে রংপুরে মানববন্ধন ও সমাবেশ হয়েছে। গতকাল সকালে প্রেস ক্লাবে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের স্বাধীনতা নার্সেস পরিষদ, নার্সেস অ্যাসোসিয়েশন ও নারী মুক্তি কেন্দ্রের উদ্যোগে এ মানববন্ধন হয়। বক্তারা বলেন, খুনিদের দ্রুত বিচার করে শাস্তি দিতে না পারলে ধর্ষকরা আরও বেপরোয়া হয়ে উঠবে।


© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত মৃদুভাষণ - ২০১৪
Design & Developed BY ThemesBazar.Com