বৃহস্পতিবার, ১৩ জুন ২০১৯, ০৯:০৭ অপরাহ্ন

বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কে প্রভাব পড়বে না

সি এম শফি সামি

সি এম শফি সামি :: ভারতের নির্বাচনে কোন দল বা জোট জিতল, কেন জিতল কিংবা যারা হেরেছে তারা কেন হারল- এ নিয়ে মন্তব্য করার কিছু নেই। কারণ, এই নির্বাচন ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয়। দেশটির জনগণ ভোট দিয়ে তাদের নেতৃত্ব নির্বাচন করেছে। বাইরে থেকে এ নিয়ে মন্তব্য করার সুযোগ নেই। তার চেয়ে বরং বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যকার দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হতে পারে। এ ক্ষেত্রে একবাক্যেই বলা যায়, ভারতে কোন দল বা জোট ক্ষমতায় এলো-গেল, তা দুই দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে বিবেচ্য কোনো বিষয় নয়। যারাই ক্ষমতায় আসুক; বাংলাদেশ-ভারতের সুসম্পর্ক অব্যাহত থাকবে এবং উত্তরোত্তর আরও নিবিড় হবে, তা জোর দিয়েই বলতে পারি।

প্রতিবেশী এ দুই দেশের সম্পর্কের দুটি দিক রয়েছে। প্রথমটি হচ্ছে, দুই দেশের জনগণের মধ্যকার সম্পর্ক। সংস্কৃতি এবং ঐতিহ্যগতভাবে বাংলাদেশ ও ভারতের জনগণের সম্পর্ক অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিভিন্ন ক্ষেত্রে আন্তঃযোগাযোগ বৃদ্ধি পাওয়ায় এ সম্পর্ক আরও গভীর হয়েছে। সময়ের সঙ্গে এ সম্পর্ক গভীরতর হবে বলেই প্রত্যাশা করা যায় এবং সামগ্রিক পরিস্থিতি বিবেচনায় এমনটাই হওয়ার কথা। এই বাস্তবতা থেকেই বাংলাদেশ ও ভারত নিজেদের কূটনীতিতে দুই দেশের জনগণের সম্পর্ক বৃদ্ধির বিষয়ে জোর দিয়েছে। জনগণের যোগাযোগ বাড়াতে উভয় দেশই ইতিবাচক নানা পদক্ষেপ নিয়েছে। যে দল বা জোটই ক্ষমতায় আসুক, এসব উদ্যোগ এগিয়ে নেওয়ার ব্যাপারেই তারা গুরুত্ব দেবে; এ নিয়ে সন্দেহের অবকাশ নেই।

বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের দ্বিতীয় জরুরি দিকটি হচ্ছে দুই দেশের সরকারের মধ্যকার সম্পর্ক। এই সম্পর্ক কিন্তু সুনির্দিষ্ট কোনো রাজনৈতিক দলের জয়ী হওয়া না-হওয়ার ওপর নির্ভর করে না। এই সম্পর্ক সরকারের সঙ্গে সরকারের। তাই কোন দেশে কোন দল সরকারে আছে, তা মুখ্য নয়। দ্বিপক্ষীয় বাস্তবতার নিরিখে বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে ভারত সরকারের সুসম্পর্ক সব সময় বজায় ছিল। সাম্প্রতিক সময়ে এ সম্পর্কও অন্য উচ্চতায় পৌঁছেছে। দুই দেশের শীর্ষ পর্যায়ের সফর বিনিময় এবং বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ দ্বিপক্ষীয় বিষয়ের সমাধান হয়েছে। বাংলাদেশের সর্বশেষ নির্বাচন ও ভারতের এবারের নির্বাচনে ক্ষমতাসীনরাই ফের সরকার গঠনের সুযোগ পেয়েছে। তাই সরকারের সঙ্গে সরকারের সম্পর্ক যে খুব চমৎকার থাকছে, তা সহজেই অনুমেয়।

এ ক্ষেত্রে যে প্রশ্নটি সামনে চলে আসে তা হলো- এই উপমহাদেশের বর্তমান আঞ্চলিক রাজনীতির প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক চীনের সঙ্গে সম্পর্কে কতটা প্রভাব ফেলবে? সোজা কথায় এ প্রশ্নের জবাব হলো, বাংলাদেশ, ভারত ও চীন- প্রতিটি দেশের আরেকটি দেশের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের নিজস্ব ধরন রয়েছে। তৃতীয় কোনো দেশের সঙ্গে কারও সম্পর্কের বিষয়টি এ ক্ষেত্রে খুব একটা বিবেচ্য হয় না। যেমন বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের ও চীনের সম্পর্কের ধরনে ভিন্নতা রয়েছে। বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যকার সম্পর্কে এক ধরনের বিষয় প্রাধান্য পায়, চীনের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে প্রাধান্য পায় আরেক ধরনের বিষয়। একইভাবে ভারতের সঙ্গে চীনের সম্পর্কের যে ধরন, বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্কের ধরন তার চেয়ে আলাদা। অতএব, একটা দেশের সঙ্গে সম্পর্ক আর একটি দেশের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যের। এ কারণেই বলতে চাই, চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের বিষয় বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কে কোনো প্রভাব ফেলছে কিংবা ভবিষ্যতে ফেলবে বলে আমার মনে হয় না। বাংলাদেশ-ভারতের নিবিড় সম্পর্ক যেভাবে অব্যাহত থাকবে, তেমনি চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কও নিজস্ব বৈশিষ্ট্যে এগিয়ে যাবে।

ভারতে বিজেপি আগেরবার ক্ষমতায় আসার পর যে প্রশ্ন উঠেছিল, সেটি এবারও উঠছে। বিজেপি ভারতের ক্ষমতায় থাকলে উপমহাদেশের রাজনীতিতে সাম্প্রদায়িকতা কোনো সংকট হয়ে দাঁড়াবে কি-না। এ প্রশ্নের জবাব গেল পাঁচ বছরের পরিসংখ্যানের মধ্যেই রয়েছে। গতবার বিজেপি ক্ষমতায় আসার পরের পাঁচ বছরে উপমহাদেশের রাজনীতিতে আসলেও কি উল্লেখ করার মতো কোনো প্রভাব পড়েছে? অতএব, বিজেপি ফের ক্ষমতায় আসার পর আঞ্চলিক রাজনীতিতে কী প্রভাব পড়বে, তা নিয়ে নতুন করে আলোচনার কিছু নেই।

লেখক :সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ও সাবেক পররাষ্ট্র সচিব


© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত মৃদুভাষণ - ২০১৪
Design & Developed BY ThemesBazar.Com