মঙ্গলবার, ২০ অগাস্ট ২০১৯, ০৯:২৯ পূর্বাহ্ন

এটিএম বুথে জালিয়াতি : আরও ৭ বুথে হানা দেয় সিরিয়াল হ্যাকার গ্রুপ

মৃদুভাষণ ডেস্ক :: এটিএম বুথে জালিয়াতির ঘটনায় জড়িত ইউক্রেনের চক্রটি ডাচ্‌-বাংলা ব্যাংকের মোট নয়টি বুথে হানা দিয়েছিল। তবে শুরু থেকেই সাতটি বুথে জালিয়াতির কথা চক্রটি গোপন রেখেছিল। পরে তদন্তে উঠে আসে, ঢাকার বিভিন্ন এলাকার নয়টি বুথ থেকে মোট ১৫ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছে তারা। যদিও সংশ্নিষ্ট ব্যাংকও জানিয়েছিল, দুটি বুথে জালিয়াত চক্র ঢুকেছিল। কিন্তু মামলার তদন্ত করতে গিয়ে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) ও পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ সিআইডি নতুন এসব তথ্য পেয়েছে। তবে তদন্ত-সংশ্নিষ্টদের ধারণা, সম্প্রতি আরও কয়েকটি এটিএম বুথে একই ধরনের ঘটনা ঘটলেও সংশ্নিষ্ট ব্যাংকগুলো গ্রাহকদের কথা মাথায় রেখে তা গোপন করে।

তদন্ত-সংশ্নিষ্ট দায়িত্বশীল সূত্র বলছে, ইউক্রেনের গ্রুপটি মূলত আন্তর্জাতিক সিরিয়াল হ্যাকার গ্রুপের সদস্য। এরপর তাদের টার্গেট ছিল ভারতসহ আরও কয়েকটি দেশে প্রতারণা করার। ঈদের ছুটির সময়কে টার্গেট করে তারা ঢাকায় আসে। তাদের ধারণা ছিল, এ সময় নিরাপত্তা শিথিল থাকবে। তাই বুথ থেকে অর্থ হাতিয়ে নিতে তেমন কোনো বেগ পেতে হবে না।

ডিবির এক দায়িত্বশীল কর্মকর্তা জানান, এখন পর্যন্ত এই প্রতারক চক্র ডাচ্‌-বাংলা ব্যাংকের নয়টি বুথে ঢুকেছে। এর মধ্যে রয়েছে খিলগাঁওয়ের দুটি, কাকরাইলের একটি, র‌্যাডিসনের একটি, ভিআইপি রোডের একটি ও নিকুঞ্জের দুটি বুথ। এসব বুথ থেকে তারা ১৫ লাখ টাকা হাতিয়ে নিলেও গ্রেফতার ছয়জনের কাছ থেকে কোনো অর্থ পাওয়া যায়নি। গোয়েন্দারা মনে করছেন, একই চক্রের আরেকটি ব্যাকআপ গ্রুপও দেশে রয়েছে। তাদের মধ্যে বাংলাদেশি ও বিদেশি নাগরিক রয়েছে। এরই মধ্যে হাতিয়ে নেওয়া অর্থ তাদের কাছে রয়েছে। গোয়েন্দারা বলছেন, ইউক্রেনের এই গ্রুপের সঙ্গে বাংলাদেশি কারও সংশ্নিষ্ট থাকার জোরালো আশঙ্কা রয়েছে। কারণ, বুথ থেকে হাতিয়ে নেওয়া অর্থ ডলারে রূপান্তর করতে হলেও বাংলাদেশি কারও সহযোগিতা প্রয়োজন।

তদন্ত কর্মকর্তাদের ধারণা, এটিএমের পুরো সিস্টেম হ্যাক করতে পেরেছিল ওই চক্র। যদিও ব্যাংক কর্তৃপক্ষ তাদের কাছে দাবি করছে, এই চক্রের সদস্যরা শুধু বুথের নিয়ন্ত্রণ নিতে সক্ষম হয়েছে। কেন্দ্রীয় সিস্টেম থেকে বুথকে আলাদা করতে পেরেছিল। এতে বুথের অর্থ লেনদেনের তথ্য কেন্দ্রীয় সার্ভারে যায়নি। তবে গোয়েন্দা কর্মকর্তারা বলছেন, এটিএম বুথের মেশিনকে নিয়ন্ত্রণে নিতে হলে সেখানে বাইরে থেকে কোনো ডিভাইস প্রবেশ করাতে হয়। কিন্তু তেমন কোনো ডিভাইস প্রবেশ করানোর তথ্য এখনও পাওয়া যায়নি। তদন্তের অংশ হিসেবে যেসব বুথে জালিয়াতির ঘটনা ঘটেছে, সেগুলোর মেশিনপত্রের ফরেনসিক পরীক্ষা শুরু করেছে সিআইডি। এই জালিয়াতির রহস্য উদ্ঘাটনে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) কম্পিউটার কাউন্সিল পুলিশকে সহযোগিতা করছে। এটিএম বুথের মেশিনপত্রের ডুপ্লিকেট ভার্সন তৈরি করে ফরেনসিক প্রতিবেদন হাতে পাওয়ার কাজও শুরু করেছেন গোয়েন্দারা।

দায়িত্বশীল আরও একটি সূত্র জানিয়েছে, গত এক মাসে ইউক্রেনের যেসব নাগরিক বাংলাদেশে এসেছে ও বাংলাদেশ থেকে ফেরত গেছে, তাদের ব্যাপারে তথ্য নিচ্ছে এসবি। এমনকি পুলিশ সদর দপ্তরের একটি বিশেষ শাখা আন্তর্জাতিক পুলিশ সংস্থা ইন্টারপোলের মাধ্যমে গ্রেফতার ছয় ইউক্রেনের নাগরিকের তথ্য জানার চেষ্টা করছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র নির্বাহী পরিচালক সিরাজুল ইসলাম সমকালকে বলেন, এটিএম বুথের সার্বিক নিরাপত্তা নিয়ে ব্যাংকারদের আগে থেকেই সতর্ক করা হয়েছিল। সম্প্রতি ডাচ্‌-বাংলা ব্যাংকের কয়েকটি বুথে জালিয়াতির পর তাদের আবারও সতর্ক করা হয়। এখন নিরাপত্তা ইস্যুতে সব ব্যাংক কর্তৃপক্ষকে নিয়ে বৈঠক করা হবে। এ ছাড়া আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে তদন্তে সব ধরনের সহযোগিতা করা হবে।

ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের খিলগাঁও বিভাগের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার শাহিদুর রহমান বলেন, এ চক্রের নেপথ্যে যারা রয়েছে, তাদের সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য জানার চেষ্টা চলছে। দেশি-বিদেশি আরও যারা যুক্ত, তাদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় নেওয়া হবে।

সিআইডির অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মাহমুদুল ইসলাম বলেন, ফরেনসিক প্রতিবেদন পাওয়ার পর নিশ্চিত হওয়া যাবে চক্রটি কীভাবে এটিএম জালিয়াতিতে যুক্ত হয়।

১ জুন রাত পৌনে ৮টার দিকে খিলগাঁও থানাধীন তালতলা মার্কেটের বিপরীতে ডাচ্‌-বাংলা বুথে দুই বিদেশি নাগরিক মুখোশ ও টুপি পরে বুথে ঢোকে। সিকিউরিটি গার্ড জালাল তাদের গতিবিধি সন্দেহজনক বলে মনে করেন। সন্দেহভাজন দু’জনকে ধরার চেষ্টা করলে তারাও পালাতে চায়। এরপর স্থানীয় লোকজনের সহায়তায় দেনিস ভেতোমস্কি নামের এক বিদেশিকে গ্রেফতার করা সম্ভব হয়। খবর পেয়ে খিলগাঁও থানা পুলিশের একটি দল সেখানে যায়। পরে থানা পুলিশ, ডিবি ও সিআইডির একটি যৌথ দল দেনিসকে নিয়ে পান্থপথের ওলিও ড্রিম হোটেলে অভিযান চালায়। সেখান থেকে গ্রেফতার করা হয় আরও পাঁচজনকে। তারা হলো ভালোদিমির ত্রিশেনসকি, নাজারি ভজনোক, সের্গেই উকরাইনেতসআলেগ শেভচুক, আলেগ শেভচুক ও ভাটালি কিলিমচুক। তারা সবাই ইউক্রেনের নাগরিক। তাদের কাছ থেকে ম্যাগনেটিক কার্ড, ড্রাইভিং লাইসেন্স, মোবাইল, ট্যাবসহ অন্যান্য আলামত উদ্ধার করা হয়। গত সোমবার গ্রেফতার ছয় বিদেশিকে আদালতে হাজির করে আট দিনের রিমান্ড আবেদন করে ডিবি। আদালত তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। কারাবন্দি ছয় বিদেশিকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য দু-একদিনের মধ্যে ডিবি হেফাজতে নেওয়া হবে।

মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা এফবিআই ইউক্রেনের এই জালিয়াত চক্রের ব্যাপারে বাংলাদেশকে আগেই সতর্ক করেছিল। ওই সতর্কবার্তা পাওয়ার পর সংশ্নিষ্ট ব্যাংককে জানানো হয়। জালিয়াতি রোধে করণীয় নিয়ে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষ থেকে তাদের দেওয়া হয়েছিল বিস্তারিত দিকনির্দেশনা। এতে বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতি থেকে রক্ষা পাওয়া গেছে।


© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত মৃদুভাষণ - ২০১৪
Design & Developed BY ThemesBazar.Com