রবিবার, ২০ অক্টোবর ২০১৯, ০৮:১০ পূর্বাহ্ন

বাজেট ২০১৯-২০ নিয়ে ড. রেজা কিবরিয়ার মতামত

সার-সংক্ষেপ

বাজেট কেবল সরকারের পরবর্তী বছরের আয়-ব্যয়ের হিসাব নয়। এটি আসন্ন বছরগুলোতে সরকারের নীতি কৌশল কী হবে তারও একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল। বাজেটকে সরকারের অর্থনৈতিক কার্যক্রম সম্প্রসারণ এবং আর্থিক ও সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতাকে সহায়তা করার অন্যতম দলিল হিসেবেও বিবেচনা করতে হবে।

এই বাজেট দুটি বিবেচনায় হতাশাজনক: (১) এটি রাজস্ব ও ঋণের সঠিক প্রাক্কলন প্রদানে এবং সাম্প্রতিক বছরগুলোর বাজেট ঘাটতি বিবেচনায় নিতে ব্যর্থ হয়েছে; (২) এ বাজেট বিগত বছরগুলোর হঠকারি বাজেট ও সামষ্টিক অর্থনৈতিক নীতির ফলে আর্থিক খাতে ও সার্বিক অর্থনীতিতে সৃষ্ট আসন্ন সংকট-উদভূত ঝুঁকি সম্পর্কে অজ্ঞতা প্রদর্শন করা হয়েছে। সকল সূচকই নির্দেশ করছে যে অর্থনীতিতে শীঘ্রই নিকট অতীতের সামষ্টিক অর্থনৈতিক অব্যবস্থাপনার নেতিবাচক প্রভাব আসন্ন। এই বাজেটে অর্থনীতি এখন সত্যিকারের যে বিপদের সম্মুখীন সে সম্পর্কে অজ্ঞাত প্রকাশ পেয়েছে।

বিশ্ব অর্থনীতিতে বাণিজ্য বিরোধ নিয়ে যে শংকা বিরাজমান তার ফলে আমাদের সামষ্টিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থাৃপনায় আভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক নিুোক্ত ভারসাম্যহীনতার ঝুঁকি সৃষ্টি হয়েছে:
 ভুল মুদ্রা বিনিময় হার নীতির কারণে প্রতিযোগিতা-সক্ষমতা হ্রাস পেয়েছে;
 সরকারি ব্যবস্থাপনায় ধান ও চাল ক্রয়ে অব্যবস্থাপনার কারণে কৃষিখাতে বিশৃঙ্খলা বিরাজ করছে;
 ব্যাংকিং খাত মন্দ ঋণের প্রভাবে ব্যাপক চাপের মুখে; মন্দ ঋণের পরিমাণ ২০১৮ সালের শেষ নাগাদ ১১.৩ শতাংশে ছুঁয়েছে, “অঘোষিত ঋণ খেলাপ” যোগ করলে বাস্তবে এর হার অনেক বেশি হবে;
 রাজস্ব আদায় কমে যাওয়ার এবং বিদেশি সহায়তা হ্রাস পাওয়ায় বাজেটের ওপর চাপ বেড়েছে যার ফলে সরকার দেশিয় ব্যাংক ও ব্যাংক- বহির্ভূত উৎস থেকে অনেক বেশি হারে ঋণ নিচ্ছে। এতে বেসরকারি ঋণের সুদের হারও বেড়েছে, পাশাপাশি ব্যাংকগুলো ঋণ দেওয়ার হারও কমিয়ে দিয়েছে।

এই বাজেটটিতে এসব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর কোনোটিকেই বিবেচনায় নেওয়া হয়নি এবং এগুলো সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতায় যেসব ঝুঁকি তৈরি করেছে সেসবও বিবেচনা করা হয়নি। বাজেটটিতে এছাড়া কালো টাকা ‘সাদা’ করার মতো সামাজিক মান্যকারী রাজনীতিক, পেশাজীবী, সরকারি-বেসরকারি কর্মকর্তা ও ব্যবসায়ীদের ক্ষুব্ধ করবে। সরকার এটিকে ‘স্মার্ট’ বাজেট বলে অভিহিত করছে যার মানে দেশের প্রকৃত সমস্যা থেকে জনগণের মনোযোগ সরানোর জন্য এটিতে ‘চটকদার’ বাড়তি কিছু বৈশিষ্ট্য যুক্ত করা হয়েছে। এই বাজেটে ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক বৈষম্য, দারিদ্র্য ও বেকারত্বের মতো গুরুতর সমস্যা মোকাবেলায় কোনো উদ্যোগ নেই। বাজেটটিতে দেশের জনগণের স্বার্থহানি ঘটিয়ে গুটিকয়েক ব্যবসায়ী ও রাজনৈতিক স্বার্থান্বেষী ব্যক্তির স্বার্থ হাসিলের ব্যবস্থা করা হয়েছে।

সামষ্টিক অর্থনেতিক উদ্বেগসমূহ
জিডিপি প্রবৃদ্ধির সরকারি পরিসংখ্যানকে অনেক অর্থনীতিবিদই প্রশ্নবিদ্ধ মনে করেন। গত বছর আমদানি ও রাজস্ব আদায়ে কম প্রবৃদ্ধি (বিশেষ করে ঠঅঞ-এ) জিডিপির প্রবৃদ্ধির হিসেবের সাথে সামঞ্জস্যহীন। বাংলাদেশের মতো দেশে (যেখানে অনানুষ্ঠানিক খাত বেশ বড়) জিডিপির প্রকৃত হিসেব নির্ণয় সবসময়ই কঠিন, সুতরাং প্রবৃদ্ধির অতি আশাবাদী সংখ্যাকে সতর্কতার সাথে ব্যাখ্যা করতে হবে। সরকারকে খুব সতর্কতার সাথে খাতওয়ারি প্রবৃদ্ধির হার (বিশেষ করে সেবা খাতে) এবং উপখাত সমন্বয় সূচকগুলোকে হিসেব করতে হবে, কারণ ভিত্তি বছর ও বিভিন্ন আইটেম বিরমযঃ উপর ভিত্তি করে এসব সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বদলে যেতে পারে। তথান্তু, রাজস্ব খাতের দুর্বল পারফরমেন্স, বার্ষিক উন্নয়ন পরিকল্পনার দুর্বল বাস্তবায়ন হার (৮০ থেকে ৮৫ শতাংশ) এবং ক্ষুদ্র ব্যবসা খাতের সূচকগুলো দেশে অর্থনৈতিক সম্প্রসারণের ব্যাপকতা ও বলিষ্ঠতা নিয়ে অস্বস্থির যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে।

ব্যাংকিং খাতে গত এক দশকের অবহেলা ও অব্যবস্থাপনার ফলে বেশিরভাগ অর্থনীতিবিদ মনে করেন যে আমরা একটি আর্থিক সংকটের দ্বারপ্রান্তে। এর প্রতিফলনে আন্তর্জাতিক রেটিং সংস্থাগুলো বাংলাদেশের ক্রেডিট রেটিং কমিয়ে দিয়েছে। বিভিন্ন উপাত্তে বাংকগুলোর দুর্বলতার আভাস পাওয়া যায়। যেমন, ২০১৯ সালের মার্চের শেষ নাগাদ সরকারি ও বেসরকারি ব্যাংকে ঋণ পুনঃতফসিল কমে যাওয়া এবং বকেয়া ঋণের অনুপাতে মন্দঋণ (ঘচখ) বেড়ে যাওয়া উল্লেখযোগ্য। মন্দ ঋণের পরিমাণ ২০১৯ সালের মার্চ মাস নাগাদ ১১০,৮৭৩ কোটি টাকায় (১১.৯) শতাংশ) পৌঁছেছে। প্রকৃত পরিস্থিতি এর চেয়েও খারাপ কারণ ব্যাংকিং খাতের নজরদারির দুর্বলতার কারণে কিছু অঘোষিত মন্দঋণ তৈরি হয়েছে। এ মন্দ ঋণগুলোর প্রায় অর্ধেকটা সরকারি ব্যাংকগুলোর, যার মন্দ ঋণের পরিমাণ ২০১৯-এর জানুয়ারি নাগাদ ৩০ শতাংশ এবং এসব ব্যাংকে আমানত ও ঋণের হার ১.৯ শতাংশে পৌঁছেছে। আরো চমকপ্রদ বিষয় হচ্ছে ব্যাংকের “ঝঃৎবংংবফ ধফাধহপবং”- এর হার (মন্দ ঋণ, পুনঃসংজ্ঞায়িত (ৎবংঃৎঁপঃঁৎবফ), পুনঃতফসিলিকৃত ঋণের মোট পরিমাণ) যা ২০১৭ সালের ডিসেম্বর নাগাদ ১৯ শতাংশ ছুঁয়েছে এবং এখন এর পরিমাণ অনেক বেশি। এসব পরিসংখ্যান যেকোনো বিচারে উদ্বেগজনক। এই প্রেক্ষাপটে মন্দঋণ পুনঃসংজ্ঞায়িত করণের নতুন নীতি বিভ্রান্তিকর ও বিপজ্জনক- বিষয়টি আগুনের ঝুঁকিতে থাকা কোনো ভবনের অগ্নি-সতর্কতা সংকেত বন্ধ করে দেওয়ার মতো।

ঋণের ২ শতাংশ টাকা পরিশোধ, ১০ বছর মেয়াদে ঋণ পরিশোধের ব্যবস্থা, ৯ শতাংশ সুদের হার এবং ২ বছর গ্রেস পিরিয়ড প্রভৃতি সুবিধা দিয়ে ঋণ পুনঃতফসিলিকরণের মাধ্যমে ঋণখেলাপীদেরকে সহায়তা করার সাম্প্রতিক পদক্ষেপগুলো বিপজ্জনকভাবে পশ্চাদমুখী। এর ফলে ঋণখেলাপীদের পুরস্কৃত করা হয়েছে এবং তাদের অযোগ্যতা, ঝুঁকি গ্রহণ ও সীমাহীন ডাকাতিকে করদাতা ও জনগণের উপর চাপিয়ে দেয়া হয়েছে। এ ধরনের পদক্ষেপ নিয়মিত ঋণ পরিশোধকারীদেরকে ও ঋণ পরিশোধে অনাগ্রহী করে তুলবে।
সরকারের নীতি-নির্ধারকরা যেভাবে ঋণের সুদের হার কমানোর আকুতি জানান তাতে বুঝা যায় যে আর্থিক খাত কিভাবে কাজ করে সে বিষয়ে এ সরকারের স্পষ্ট ধারণা নেই। সুদের হার বাজার পরিস্থিতির উপর নির্ভর করে- ব্যাংক-বহির্ভূত খাত থেকে বন্ডের মাধ্যমে মাত্রাতিরিক্ত সরকারি ঋণ গ্রহণের ফলে আমানত ও ঋণ উভয়েরই সুদের হারই নির্ধারিত হয়ে যায়। নয় শতাংশ হারে (বন্ডের সুদের হার সর্বোচ্চ ১১ শতাংশ) সরকারকে টাকা ধার দেওয়া তুলনামূলক কম ঝুঁকিপূর্ণ এবং যার ফলে ব্যাংকগুলো ঝুঁকিপূর্ণ বেসরকারি প্রকল্পে এই হারের চেয়ে উল্লেখযোগ্য বেশি হার ধার্য না করে ঋণ দিবে না।

দেশের ১ কোটি ৮০ লক্ষ কৃষক বর্তমানে যে সংকট মোকাবেলা করছে তার কারণ সরকারের অব্যবস্থাপনা ও অদক্ষতা। কৃষকদের কাছ থেকে সরাসরি ধান কিনে বাস্তবসম্মত মূল্য সহায়তা প্রদানে ব্যর্থতা আগামী বছরের কৃষি উৎপাদনে ব্যাপক প্রভাব ফেলবে। সরকারি সহায়তা ছিলো ‘যৎসামান্য এবং তা এসেছে অসময়ে’। সরকার টেকসই মূল্যে ধান কেনা শুরু করার পূর্বেই বেশিরভাগ কৃষক তাদের ধান বিক্রি করে দিয়েছে।

বাজেট বরাদ্দ
সরকারের নীতি নির্ধারকগণ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে বিষয়টি মোকাবেলা করেন তা হলো চলতি ও মুলধনী উভয় ব্যয়ে ক্ষেত্রে সরকারি অর্থের অপব্যবহার ও লুট। সরকারের সব ধরনের ংবৎারপব ফবষরাবৎু, বিশেষ করে শিক্ষা ও স্বাস্থ্যখাতে অত্যন্ত নিুমানের। এমনকি আর্থিক বরাদ্দ অপর্যাপ্ত মনে হলেও, এটা সত্য যে দক্ষতার সাথে সেই অর্থ ব্যয় করলে সেবা মান ও পরিধি বাড়ানো সম্ভব। অনুৎপাদনশীল খাতে ব্যয় কমাতে হবে- ক্ষমতাধর গোষ্ঠীসমূহকে অসন্তুষ্ট হলেও কিছু কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

অপচয় ও চুরি বন্ধে সক্ষমতা কিংবা দৃঢ় অঙ্গীকার প্রদর্শন উভয় ক্ষেত্রেই সরকার ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে। সরকারের সকল পর্যায়ে (রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক উভয় পর্যায়ে) সীমাহীন দুর্নীতির সবচেয়ে বড় ক্ষেত্রটি হচ্ছে সরকারি বিনিয়োগ কর্মসূচিগুলো, যেখানে প্রথমিকভাবে প্রাক্কলিত প্রকল্প ব্যয় দ্রুত ৩ থেকে ৫ গুণ বেড়ে যায়। এটি পার্শ্ববর্তী দেশগুলোতে গৃহীত একই ধরনের প্রকল্প ব্যয়ের চেয়ে অনেক বেশি। আমাদের নাগরিকদের দাবী হচ্ছে সরকার কর্তৃক সংগৃহীত রাজস্ব কার্যকরভাবে ব্যবহার করতে হবে এবং সকল সরকারি ব্যয়ে অর্থের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। সরকারি ব্যয়ের সাথে প্রাসঙ্গিক সব মূল্য সংবেদনশলী তথ্য জনগণের জন্য উন্মুক্ত করে দিতে হবে (যেমন বেসরকারি খাত এবং অন্যান্য দেশের মূল্যের সাথে সরকারিভাবে ক্রয়কৃত সব পণ্য ও সেবার তুলনামূলক মূল্য চিত্র তুলে ধরতে হবে।)

অপচয়, অদক্ষতা ও দুর্নীতির সবচেয়ে লজ্জাজনক চিত্রটি উঠে এসেছে বিদ্যুৎ খাতে। সম্প্রতি সংবাদ মাধ্যমের সাহসী অনুসন্ধিৎসু প্রতিবেদন থেকে যার কিছুটা আমরা জেনেছি। দেশে অদক্ষতা ও দুর্নীতির জন্য বিদ্যুৎ ও অবকাঠামো খাত সবাই জানে। প্রতিবছর বিডিপির বিপুল অংকের ক্ষতি (২০১৮/১৯ সালে ১০,২৭১ কোটি টাকা ক্ষতি) দেখায়। এর কারণ রাজনীতি সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলোর সাথে সরকারের উচ্চ মূল্যে বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তি এবং যার ফলে জনগণের উপর আর্থিক বোঝা চেপে বসেছে। এই অদক্ষতা ও দুর্নীতির দায় এখন বিদ্যুতের মূল্য বাড়িয়ে গ্রাহকদের উপর চাপানোর অপচেষ্টা করা হচ্ছে।
সরকারের অগ্রাধিকার কী এবং কোথায় তা সরকারি নেতাদের বক্তব্য বিবৃতি থেকে নয়, বরং বিভিন্ন খাতে সরকারি বরাদ্দ দেখেই বুঝা যায়। কৃষি ও শিক্ষা খাতে নামমাত্র বরাদ্দ বৃদ্ধি এই গুরুত্বপূর্ণ খাত দুটিতে সরকারের অগ্রাধিকার নিয়ে নাগরিকদের মাঝে উদ্বেগ তৈরি করেছে। সরকারি ব্যাংকগুলোতে পুনঃঅর্থায়নে বাজেট বরাদ্দের সিদ্ধান্তটি যথাযথ হয়নি এবং সিদ্ধান্তটি বাতিল করা উচিত। এ ধরনের পুনঃঅর্থায়ন করদাতাদের অর্থ সরকারি ব্যাংক লুটপাটকারীদের হাতে তুলে দেওয়ার নামান্তর। সরকারি ব্যাংকগুলোতে ঝেঁকে বসা বিদ্যমান সমস্যার সত্যিকারের সমাধানের পরই পুনঃঅর্থায়নের মতো সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত। এছাড়া প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়াতে বিভিন্ন খাতে গণহারে রপ্তানি ভর্তুকির ব্যবহার অর্থনৈতিক নীতির অদক্ষতার লক্ষণ। এটি বাজেটের অর্থের অপচয়। প্রতিযোগিতা-সক্ষমতা বাড়ানোর আরো অনেক উত্তম উপায় রয়েছে।
২০১৮/১৯ অর্থবছরে সংশোধিত বাজেটে নির্বাচন কমিশনের জন্য ৪,৩৮৩ কোটি টাকা খরচ দেখানো হয়েছে (মূল বাজেট বরাদ্দ ছিলো ১,৯২১ কোটি টাকা)। এ অর্থের পরিমাণ আমাদের স্বাস্থ্য খাতের বাজেটের চার ভাগের একভাগ। ২০১৮ সালের ডিসেম্বরের প্রশ্নবোধক কার্যক্রমে এত বিপুল অংকের অর্থ অপব্যায় করার জন্য এ দেশের জনগণ একদিন সংশ্লিষ্টদের জবাবদিহি করবে।

রাজস্ব
রাজস্ব সংগ্রহে সরকারের মরিয়াভাব সম্পর্কে সবাই অবগত। যদিও আমাদের সমজাতীয় অন্যান্য দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশে সব ধরনের করের হার বেশি, তথাপি প্রকৃত রাজস্ব সংগ্রহ পরিস্থিতি অত্যন্ত দুর্বল। রাজস্ব প্রশাসনে বড় ধরনের সংস্কার আবশ্যক।
২০১৮/১৯ অর্থবছরে ২,৮০,৬০০ কোটি টাকা রাজস্ব সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় এনবিআর এর রাজস্ব ঘাটতি চলতি বছর প্রায় ২৫ শতাংশে দাঁড়াতে পারে। ২০১৯/২০ সালের ৩,২৫,০০০ কোটি টাকার লক্ষ্যমাত্রা বিগত বছরের অনুপার্জিত লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় ১৬ শতাংশ বেশি। এটি সত্যিই দুশ্চিন্তার বিষয় কারণ এপ্রিল ২০১৯ পর্যন্ত বাৎসরিক প্রবৃদ্ধির হার ছিলো মাত্র ৭ শতাংশ।

ঘাটতি অর্থায়ন
বন্ডের মাধ্যমে দেশিয় উৎস থেকে সরকারের সংগৃহীত ঋণের পরিমাণ ১,০০,০০০ (এক লক্ষ) কোটি টাকায় পৌঁছুতে পারে (এটি জিডিপি’র ৩ শতাংশের বেশি)। ২০১৮/১৯ অর্থবছরে যার পরিমাণ ছিলো ২৬১৯৭ কোটি টাকা। এ ধরনের ঋণের সাথে উচ্চ হারের সুদ জড়িত এবং এ জাতীয় ঋণের দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব বিবেচনায় নেওয়া উচিত। বাজেটের জন্য দেশিয় ব্যাংক ও ব্যাংক বহির্ভূত ঋণ গ্রহণের পরিমাণ টেকসই সীমা অতিক্রম করেছে এবং চলতি বছরে বাজেটকৃত প্রাক্কলনের চেয়ে বাহ্যিক অর্থায়ন কম হওয়াটা আগামী বছরগুলোর জন্য দুশ্চিন্তার কারণ। এছাড়া বাহ্যিক ঋণের পরিমাণ বিগত বছরের লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ১৫,০০০ কোটি টাকা কমে যাবে (এ বছরেও এই লক্ষ্যমাত্রা একই আছে)। এ ফলে সরকারকে হয়তো বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে ঋণ গ্রহণ করতে হবে, যার ফল্যে মূল্যস্ফীতি বেড়ে যেতে পারে।

উপসংহার
বর্তমান বাজেটটি আমরা সম্পূর্ণরূপে প্রত্যাখ্যান করছি।
এটি জনগণের বাজেট নয়। এটি একটি অদূরদর্শী ও দুর্বলভাবে প্রণীত বাজেট যা দেশের প্রকৃত সমস্যা মোকাবিলার কোন চেষ্টা নেই। বর্তমানে দেশকে যারা লুটেপুটে খাচ্ছে এবং যারা অবৈধভাবে অর্জিত অর্থ বিদেশে পাচার করছে বাজেটটিতে তাদের সুবিধার জন্য তৈরি হয়েছে। বাজেটটি যারা প্রণয়ন করেছে তাদের এ দেশের ভবিষ্যত নিয়ে কোনো চিন্তা নেই।

এই প্রতিনিধিত্বহীন ও অনির্বাচিত সরকারের বাজেট যে আমাদের নাগরিকদের ইচ্ছার প্রতিফলন নয় এবং এটি যে দেশের প্রয়োজনীয়তা পূরণের লক্ষ্যে প্রণয়ন করা হয়নি এটাতে অবাক হওয়ার কোনো কারণ নেই। সুতরাং একটি সত্যিকারের প্রতিনিধিত্বশীল সরকার গঠনের লক্ষ্যে অনতিবিলম্বে দেশে একটি অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন আয়োজন করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দেশবাসীর সম্মুখে উপস্থিত কঠিন অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় প্রয়োজনীয় কঠিন পদক্ষেপ গ্রহণে কেবল সেই নির্বাচিত সরকারেরই যথার্থ আত্মবিশ্বাস থাকবে ও এই ব্যাপারে বাংলাদেশের জনগণের সমর্থণ থাকবে।

ড. রেজা কিবরিয়া
সাধারণ সম্পাদক, গণফোরাম


© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত মৃদুভাষণ - ২০১৪
Design & Developed BY ThemesBazar.Com