বাবা!

../news_img/60189 mrini.jpg

রনি আনোয়ার ::

১৬ই এপ্রিল ২০০৫।

আমি তখন চাকুরীসুত্রে মৌলভীবাজার। সপ্তাহান্তে সিলেট আসি আবার ফিরে যাই। ওইদিন অফিসে ঢুকে খাতায় সই করতে যাব ঠিক তখনই ছোটভাই এর ফোন ' বাবার বুকের ব্যথা শেষ রাত থেকে'।
বললাম 'এখনি সিলেট হাসপাতালে নিয়ে আসো'।

আমি গাড়ি নিয়ে রওয়ানা হলাম মৌলবিবাজার থেকে । বাড়ি থেকে দ্রুত একটি সিএনজি করে বাবাকে নিয়ে হাসপাতালে এলো সবাই।

আমাদের বাড়ির পাশেই মসজিদ। মসজিদের আংগিনায় আমার দাদার কবর।তার পাশে আমার দাদির বাড়ি।বিশাল বাড়ির পুকুর পাড়ে আমার দাদির কবর।গাড়ি করে এদিক দিয়েই আসতে হয়।
বাবার বুকে তিব্র ব্যাথা।গাড়ি থামিয়ে বাবা,আমার দাদা- দাদীর কবর জিয়ারতের জন্য নামলেন।দীর্ঘ সময় নিয়ে জিয়ারত শেষে,গাড়িতে উঠে সিলেট ওসমানি হাসপাতালের দিকে রওয়ানা হলেন।

হাসপাতালে শুয়ে ব্যাথায় কাতরাচ্ছেন বাবা। আমার পরিবারের সবাই কান্নাকাটি করছেন। ড.শুধাংশু মাথায় হাত চেপে চেয়ারে বসে আছেন।এমন এক ভয়াবহ পরিবেশে আমি হাসপাতালে পৌছি।
এমন দৃশ্য দেখবো ভাবিনি। আমার বুকের ভেতর হুহু করে উঠলো। কি ঘটতে যাচ্ছে।

আগের দিন আমি বাবাকে নিয়ে বাড়ি গেলাম।আমি ড্রাইভ করছি আর বাবা আমার পাশের সিটে বসা।পেছনে ইশমাম আর কুমকুম। কত গল্প হলো গাড়িতে বসে।
বাড়িতে এসে একসাথে বসে ইন্ডিয়া -পাকিস্তানের মধ্যকার ক্রিকেট খেলা দেখলাম।
পরেরদিন আমার অফিস,তাই সন্ধ্যায় চলে আসবো,বাবা বললেন 'আমার স্প্রে শেষ, আরেকটা কিনে দিও'।আমি বললাম 'শেষ হবার আগে বলনা কেন বাবা'? বাবার উত্তর ' ঠিক আছে,পরেরবার বলবো, শেষ হবার আগে'।

ড. শুধাংশু বলেছেন 'সবাইকে খবর দাও,আসতে বলো'।আমার শিশুসন্তান ইশমামসহ আমার ভাই-বোন, স্বজন ইতিমধ্যে ভীড় জমিয়েছেন হাসপাতালে।

গাড়ি যেন আজ আর চলেনা। সময় আমার ফুরোয়না। হাসপাতালে যখন পৌছলাম তখন মধ্যদুপুর।বাবা বার বার আমার কথা জিজ্ঞেস করছেন। আমাকে দেখেই বলে উঠলেন ' তুমি আইছো?'

বাবার চোখে যেন রাজ্যের ক্লান্তি। বুকের ব্যাথায় কাহিল। আমি পাশে বসলাম। ভাইবোন সবাই কান্না করছে।আমি বাবার পাশে বোকার মত বসে আছি।কখনোবা উঠে গিয়ে বারান্দায় অস্থির পায়চারী করছি।
কিছুই বুঝে উঠতে পারছিনা।

৩.৪৫ এ বাবার ব্যথা চীরতরে বন্ধ হলো। সাদা কাপড়ে ঢেকে দেয়া হলো আমার বাবার দীর্ঘদেহ। বাবা!

২দিন আগে ছিল পয়লা বৈশাখ।লোকগানের স্বনামধন্য শিল্পী বিদিতলাল দাশ তঁার সংগঠন নীলম সংগীতালয় থেকে বাবাকে সংবর্ধনা দিলেন। আমি আমার গাড়ি করে বাবাকে আনতে গেলাম। আমি যাওয়ার পর বললেন 'আসো পটল'দার(বিদিত লাল দাশ) সাথে দেখা করে যাই'। আমিসহ নীলম সংগীতালয় এর কার্য্যালয়ে বসলাম।পটল কাকা কে বাবা তঁার পাঞ্জাবির পকেট থেকে একটা কাগজ বের করে দিলেন।কাগজে লেখা বাবার একটি গান।
কথা এরকম:

'শেষ বিয়ার সানাই বাজিল
ডাকছে কাল শমনে
আমার বাসরঘর হবেগো
সাড়ে তিনহাত মাটির তলে
প্রান বন্ধুর সনে"।

তখন বাবার দ্বিতীয় গানের বই 'শেষ বিয়ার সানাই' এর কাজ শেষ পর্যায়ে।
গানটি পটল কাকাকে দিয়ে বললেন সুর দিতে এবং বই এর প্রকাশনা অনুষ্ঠানে এই গানটি গাইতে।আরো কিছু কথা বলেই বিদায় নিয়ে চলে এলেন।

ইচ্ছে ছিলো বাবার দ্বিতীয় গানের বই এর প্রকাশনা অনুষ্ঠান খুব যত্ন করে করবো। সাধ্যমত সর্বোচ্চ আয়োজনে করেছিলাম ও।যে অনুষ্ঠানে বরেণ্য কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদসহ অনেক গুনীজন উপস্থিত ছিলেন।শুধু ছিলেন না আমার বাবা।
বাবাবিহিন এই অনুষ্ঠানে পটল কাকা গেয়েছিলেন 'শেষ বিয়ার সানাই বাজিল,ডাকছে কাল সমনে'।

বাবা! আমরা,তোমার সন্তানেরা তোমাকে খুব মিস করি বাবা।তুমি পৃথিবী র সব ভালো বাবাদের একজন।