সাবেক এমপি জনাব আলীর মৃত্যুবার্ষিকীতে শ্রদ্ধাঞ্জলি

../news_img/no_img.png

পিয়ানুর আহমেদ হাসান :: আজ ১৫ মে বানিয়াচঙ্গ-আজমিরীগঞ্জের সাবেক এমপি, বিশিষ্ট রাজনীতিবিদ, শিক্ষানুরাগী ও সমাজসেবক এডভোকেট জনাব আলীর ৩২তম মৃত্যুবার্ষিকী। এই কৃতি পুরুষ ১৯৩৭ সনের ১ মে হবিগঞ্জ জেলার বানিয়াচঙ্গ উপজেলা সদরের ৪নং ইউনিয়নের দক্ষিণ যাত্রাপাশা গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতার নাম আব্দুর রহিম, মা ইংরাজ বিবি।
তিনি ছাত্রজীবন থেকেই অত্যন্ত মেধাবী ও দৃঢ় চিত্তের অধিকারী ছিলেন। জনাব আলী ১৯৫৩ সালে বানিয়াচঙ্গ এলআর হাইস্কুল থেকে প্রথম বিভাগে এসএসসি পাস করেন। ১৯৫৫ সালে হবিগঞ্জ বৃন্দাবন সরকারি কলেজ থেকে প্রথম বিভাগে এইচএসসি পাস করেন। ১৯৫৭ সালে ২য় শ্রেণীতে বিএ ডিগ্রি লাভ করেন এবং ঢাকা সেন্ট্রাল ‘ল’ কলেজ থেকে ১ম বিভাগে (ইংরেজি মাধ্যম) এলএলবি পাশ করেন। পরে হবিগঞ্জ বারে আইন পেশায় নিজেকে নিয়োজিত করেন।


ছাত্রজীবন থেকেই তিনি এলাকায় শিক্ষা ও বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কর্মকান্ডে আত্মনিয়োগ করেন। কিভাবে দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া যায় ও জনগণের ভাগ্যোন্নয়ন করা যায়, তিনি সেই বিষয়ে সবসময় ভাবতেন। তিনি মনে করতেন- শিক্ষার উন্নতি হলেই দেশের উন্নতি সম্ভব। এই লক্ষ্যে দেশের স্বার্থে এলাকায় গরীব জনসাধারণের মধ্যে শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দেয়ার জন্য বানিয়াচঙ্গে জনাব আলী ডিগ্রি কলেজ নামে একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নিজ খরচে ১৯৭৯ সালে প্রতিষ্ঠা করেন। প্রথম পর্যায়ে কলেজটি উচ্চ মাধ্যমিক পর্যন্ত চালু ছিল। পরবর্তীতে কলেজে ডিগ্রি চালু করা হয়। কলেজটি বানিয়াচঙ্গের ৩নং ইউপির অন্তর্গত গ্যানিংগঞ্জ বাজার সংলগ্ন পূর্বদিকে এক মনোরম পরিবেশে অবস্থিত। কলেজটিকে একটি সুবিধাজনক পর্যায়ে উন্নীত করার মানসে কলেজ সংলগ্ন স্থানে একটি অধ্যাপক নিবাস ও ছাত্রদের থাকার জন্য ছাত্রাবাসের ব্যবস্থা করেন। তাছাড়া কলেজের অধ্যক্ষ থাকার জন্য বাসস্থান ও ছাত্রদের বিনোদনের জন্য একটি কলেজ অডিটোরিয়াম ও খেলার মাঠ (আম বাগান সংলগ্ন) প্রতিষ্ঠা করেন। কলেজটি প্রতিষ্ঠার পূর্বে বানিয়াচঙ্গে কোন কলেজ ছিল না। বেশ কয়েকটি মাধ্যমিক স্কুল থেকে এলাকার গরীব জনসাধারণের সন্তানরা এসএসসি পাশ করার পর এলাকায় কলেজ না থাকায় উচ্চ মাধ্যমিকে ভর্তি হত না। কারণ জেলা শহরে বসবাস করে উচ্চ শিক্ষার ব্যয়ভার বহন করা গরীব পিতামাতার পক্ষে সম্ভবপর ছিল না। তাই শুধুমাত্র এলাকার ধনী পরিবারগুলোর ছেলেমেয়েরাই বানিয়াচঙ্গের বাইরে গিয়ে কলেজে পড়ার সুযোগ পেতেন। এলাকার সিংহভাগ গরীব পরিবারগুলোর ছেলেমেয়েদের উচ্চ শিক্ষার সুযোগ সৃষ্টির জন্য জনাব আলী সাহেব নিজের পৈত্রিক ৪ একর জমি বিক্রি করে কলেজটি প্রতিষ্ঠা করেন। কলেজের ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে তিনি মুমূর্ষ থাকা অবস্থায় তার পারিবারিক তহবিল থেকে প্রায় ৪ লাখ টাকার জনাব আলী কল্যাণ ট্রাস্ট গঠন করেন এবং কলেজ পরিচালনার স্বার্থে আরো অনেক টাকা কলেজের স্থায়ী আমানত হিসেবে রেখে যান। এই ট্রাস্ট গঠন করতে গিয়ে তাকে হবিগঞ্জ শহরের তকদিরা ভিলা নামের নিজ সম্পত্তি বিক্রি করতে হয়।

জনাব আলী ছিলেন সত্যিকার অর্থেই অত্যন্ত ভাল মানুষ ছিলেন। মুসলিম জনসাধারণের কথা বিবেচনা করে ১৯৭৬ সনে যাত্রাপাশায় তাঁর নিজ মহল্লায় জনাব আলী ঈদগাহ প্রতিষ্ঠা করেন।

রাজনীতিতে তিনি মূলত মজলুম জননেতা মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানীর যোগ্য উত্তরসূরী ছিলেন। ১৯৭০ সাল থেকে ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত তিনি ন্যাপ (ভাসানী) হবিগঞ্জ জেলা শাখার সম্পাদক ছিলেন এবং ১৯৭৮ সালের পূর্ব পর্যন্ত তিনি ন্যাপ হবিগঞ্জ জেলা শাখার সিনিয়র সহ-সভাপতি ছিলেন। পরবর্তীতে জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের সূচনা লগ্নে তিনি এলাকার উন্নয়নের স্বার্থে তৎকালিন নেতা যাদু মিয়ার নেতৃত্বে ১৯৭৮ সালে ডিসেম্বর মাসে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী আন্দোলনে যোগদান করেন। তারপর শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের জাতীয়তাবাদী আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়ে ১৯৭৯ সালে বানিয়াচঙ্গ-আজমিরীগঞ্জ নির্বাচনী এলাকা থেকে বিপুল ভোটে জয়ী হন। এরপর থেকে তিনি এলাকায় বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কাজে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন। সংসদ সদস্য হিসেবে বানিয়াচঙ্গ-আজমিরিগঞ্জ সড়কের পরিকল্পনা করেন এবং তিনি হবিগঞ্জ-বানিয়াচঙ্গ সড়কের ইট সলিং (এইচবিবি) এর কাজ পুরোপুরি সমাপ্ত করেন।

ব্যক্তিগত জীবনে তিনি অত্যন্ত সাদাসিধে জীবন পছন্দ করতেন এবং সেই মতে চলতেন। তিনি সংসদ সদস্য থাকাকালীন সময়ে সংসদ থেকে প্রাপ্ত সম্মানী এলাকার গরীব জনসাধারণের মধ্যে বিতরণ করতেন। এলাকার সাধারণ মানুষের সাথে, তাদের বিপদে-আপদে সবসময় পাশে থাকতেন। এ ব্যাপারে তাঁর মধ্যে কোন অহঙ্কার ও আলস্য দেখা যেত না। কারো বিপদের খবর পাওয়া মাত্র ছুটে যেতেন সহযোগিতার জন্য। এক কথায় তিনি ছিলেন এলাকার জনগণের প্রকৃত বন্ধু। তিনি এলাকার বিভিন্ন স্থানে বহু মসজিদ, মাদ্রাসা, মন্দির রাস্তাঘাট, সেতু ইত্যাদি উন্নয়নমূলক কাজ নিজ খরচে করেন। ১৯৮৫ সালের ১৫ মে হবিগঞ্জ শহরে সিনেমা হল রোডস্থ নিজ বাসভবনে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স ছির ৪৮ বছর। তার উত্তরসূরী হিসেবে স্ত্রী, ৫ কন্যা ও ১ পুত্রসহ অসংখ্য গুণগ্রাহী রেখে যান। তাঁর মৃত্যুবার্ষিকীতে গভীর শ্রদ্ধাঞ্জলি নিবেদন করছি।