২ ছেলে থাকেন বিদেশে, ৭৩ বছর বয়সী বাবা চালান রিকশা!

../news_img/55580mmri iu.jpg

শুভ্র দেব: গাইবান্ধার বাসিন্দা আলাউদ্দিন মিয়া। ৬৫ বছর বয়সী আলাউদ্দিন এখনো জীবনের ঘানি টানছেন। অসুস্থ শরীর নিয়ে ঢাকার রাজপথে রিকশা চালিয়ে সংসারের খরচ বহন করেন। কিন্তু একসময় স্ত্রী রুকি বেগম, দুই ছেলে ও এক মেয়েকে নিয়ে সুখের সংসার ছিল তার। রাত-দিন রিকশা চালিয়ে যা আয় হতো সেটা দিয়ে ভালোই চলতো। স্বপ্ন ছিল সন্তানেরা বড় হয়ে কাজে নামবে। হয়তো তখন তার জীবনের ঘানি টানা বন্ধ হবে। কিন্তু কই, তার উল্টো হয়েছে। যে সময়টা তার আরাম আয়েশে থাকার কথা। নাতি-নাতনি নিয়ে সময় পার করার কথা, সে সময়টাই তিনি শরীরের ঘাম ঝরিয়ে পরিবারের ঘানি টানতে ব্যস্ত।

ছেলে-মেয়ে বড় হওয়ার পর আলাউদ্দিন তাদের বিয়ে দেন। বিয়ের পর ছেলেরা স্ত্রী-সন্তান নিয়ে আলাদা হয়েছে। তারা তাদের নিজ নিজ সংসার নিয়ে ব্যস্ত। অসুস্থ বুড়ো বাবা-মার দিকে তারা ফিরেও তাকায় না। তাই তো আলাউদ্দিন মিয়া টাঙ্গাইল থেকে খিলগাঁর মেরাদিয়ার নতুনপাড়া কলোনিতে এসে উঠেছেন। গতকাল রাজধানীর কমলাপুর এলাকায় এই প্রতিবেদকের কাছে তুলে ধরেন তার জীবনের দুঃখ-দুর্দশার কথা।

তিনি বলেন, অনেক আশা ছিল, দুই ছেলে আয়-রোজগার করবে। সংসারের খরচের পেছনে নিজের শেষ সম্বল ভিটে বিক্রি করেছি। ভেবেছিলাম দুই ছেলে আবার কিছু ভিটেমাটি করবে। কিন্তু তা আর হলো না। বয়স হয়েছে। ঠিকমতো রিকশা চালাতে পারি না। অনেক সময় অসুস্থ হয়ে ঘরে বসে থাকি। তখন না খেয়ে থাকতে হয়। কারণ, আমি ছাড়া এখন আর সংসারে রোজগার করার মতো কেউ নেই। তাই অনেক সময় অসুস্থ শরীর নিয়েই রাস্তায় নামি। নিজের রিকশা নেই। যা কামাই করি তা থেকে ১০০ টাকা মালিককে দিতে হয়। এরপর যা থাকে তা দিয়েই সংসারের যাবতীয় খরচ ও স্বামী-স্ত্রী দুজনের ওষুধের খরচ বহন করতে হয়।

৭৩ বছর বয়সী আব্দুল বাসেত। তিনি জামালপুরের বাসিন্দা। প্রায় ৪০ বছর ধরে রিকশা চালিয়ে সংসার চালান। তিনি ছাড়া সংসারে স্ত্রী, দুই ছেলে ও দুই মেয়ে আছে। মেয়েদের বিয়ে দিয়েছেন আরো অনেক আগে। দুই ছেলে বিদেশে থাকে। তাদেরও বিয়ে হয়েছে, সন্তান আছে। স্ত্রীকে নিয়ে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় থাকেন। ছেলেরা কোনো টাকাপয়সা দেয় না। বয়সের চাপ ও অসুস্থ শরীরে অনেক সময় রিকশা চালানোর শক্তি খোঁজে পান না। তার পরও সংসারের খরচ চালাতে তিনি বের হোন রাস্তায়।

আরামবাগ মোড়ে এই প্রতিবেদকের সঙ্গে আলাপকালে আব্দুল বাসেত বলেন, প্রচণ্ড গরমে রিকশা চালাতে অনেক কষ্ট হয়। বয়স হয়েছে এখন বিশ্রামে থাকার কথা। কিন্তু অভাব-অনটনের জন্য ঘরে বসে থাকতে পারি না। নিজের সন্তানরা তাদের সংসার নিয়ে ব্যস্ত। কষ্ট করে তাদেরকে বড় করে এখন তারাই আজ দূরে চলে গেল। তিনি বলেন, অনেক যাত্রী আছে যারা আমার কষ্ট দেখে সহানুভূতি দেখায়। কিন্তু নিজের সন্তানদের মধ্যে বুড়ো বাবা-মায়ের জন্য কোনো ভালোবাসা নেই।

টাঙ্গাইলের বাসিন্দা মুজিবুর রহমান (৬০)। তিন ছেলে ও এক মেয়ের জনক আলাউদ্দিন নানা রোগে আক্রান্ত। স্ত্রী জাহানার বেগমও অসুস্থ। কিন্তু থেমে নেই তার জীবনযুদ্ধ। বিরামহীনভাবে রাজধানীর অলিগলিতে রিকশা নিয়ে ছুটে চলেন। দিন শেষে ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা আয় হয়। ভাড়ায় রিকশা চালান বিধায় ১১০ টাকা মালিকের হাতে তুলে দিতে হয়। বাকি টাকা দিয়ে বাসাভাড়া, খাবারের খরচ ও ওষুধের খরচ বহন করতে হয়। সেই ছোট বেলা থেকে রিকশা চালিয়ে সংসারের হাল ধরে আজও তিনি রিকশা নিয়ে রাস্তায় আছেন। মেয়ের বিয়ে দিয়েছেন। ছেলেরাও তাদের পছন্দ অনুযায়ী বিয়ে করেছে। অভাব-অনটনে নিজের ভিটেটুকু হারিয়েছেন। বেঁচে থাকার অবলম্বন এখন শুধুই স্ত্রী। বুড়ো বয়সে স্ত্রীকে নিয়ে উত্তর যাত্রাবাড়ী এলাকার একটি কলোনিতে উঠেছেন।

এই প্রতিবেদককে মুজিবুর মিয়া বলেন, বাবা-মার বয়স হলে সন্তানেরা দায়িত্ব নেয়। কিন্তু আমার সন্তানেরা তাদের স্ত্রী ও সন্তান নিয়ে আলাদা হয়েছে। বাড়তি বোঝা ভেবে আমাদেরকে ছেড়ে দূরে সরে গেছে। কিন্তু তাদেরকে আমি অভিশাপ দিই না। শরীরে যত দিন শক্তি থাকবে, রিকশা চালিয়ে সংসার চালাবো। তার পরও চাই তারা ভালো থাকুক, সুখে থাক।

রাজধানীতে ২০ বছর ধরে রিকশা চালান জামালপুরের ৬৫ বছর বয়সী হজরত আলী। স্ত্রী, ৩ ছেলে ও ৩ মেয়েকে নিয়ে তিনি মাতুয়াইল কলোনিতে থাকেন। ২ মেয়ে ও ২ ছেলের বিয়ে হয়েছে। ছোট ছেলে ও মেয়ে নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী। বিয়ের পর দুই ছেলেই আলাদা সংসার করেছে। তারা দুজনেই ভালো চাকরি করে। কিন্তু বাবা-মাকে কোনো খরচ দেয় না। সংসারের খরচ, ছেলে-মেয়ের লেখাপড়া খরচসহ যাবতীয় সব কিছু সামলানো কঠিন হয়ে পড়ে। তাই তিনি ৬৫ বছর বয়সে সংসারের বোঝা টানতে রাত-দিন দৌড়াচ্ছেন।

একই অবস্থা ৬০ বছর বয়সী কুমিল্লার দাউদকান্দির আয়াত আলীর। পরিবারে আয় রোজগার করার মতো সদস্য থাকার পরও সংসারের ঘানি টানছেন। দুই ছেলে বিয়ে করার আগ পর্যন্ত একসঙ্গেই ছিল। কিন্তু বিয়ের পরপরই তারা আর বাবা-মায়ের সঙ্গে থাকে না। রোদ-বৃষ্টি উপেক্ষা করে আয়াত আলী রিকশা নিয়ে ছুটে চলেন শহরের অলিগলি। শুধু আলাউদ্দিন মিয়া, আব্দুল বাসেত, মুজিবুর মিয়া, হজরত আলী আর আয়াত আলী নন রাজধানীতে এখন এমন কয়েক হাজার রিকশাচালক আছেন, যাদের বয়স ৬০ থেকে শুরু করে ৭৫ বছর। যে সময়টা তারা সংসারের হাল নিজের সন্তানের ওপর ছেড়ে দিয়ে সুখে-শান্তিতে বাস করার কথা; ঠিক সে সময়টাই তারা বয়ে বেড়াচ্ছেন সংসারের বোঝা। সারা জীবন খেয়ে-না-খেয়ে কষ্ট করে যে সন্তানদের বড় করেছেন, যারা আজ সংসারের দায়িত্ব নিয়ে বাবা-মাকে মুক্তি দেয়ার কথা, তারাই আজ অসুস্থ; বয়স্ক বাবা-মাকে ফেলে রেখে সুখের সংসার করছেন অন্যত্র। একজন বাবা হয়ে যদি সন্তানের দায়িত্ব নেয়া যায় তবে সন্তানেরা বড় হয়ে কেন বাবা-মার অন্তিম সময়টায় পাশে থাকবে না?

সমাজবিজ্ঞানীরা মনে করছেন সামাজিক অবক্ষয়ের জন্য এখন এরকম হচ্ছে। একটা সময় ছিল বাবা-মার বয়স হলে তাদের পাশে দাঁড়িয়েছেন সন্তানেরা। কিন্তু হালে আজ সমাজ ব্যবস্থার চরম বিপর্যয়। সূত্র: মানবজমিন