সিলেটের পাথর রক্ষায় চলছে শুধু চিঠি চালাচালি

../news_img/61391 mri.jpg

মৃদুভাষণ ডেস্ক :: সিলেটে সীমান্ত আইন লঙ্ঘন করে জিরোপয়েন্ট থেকে রাতের আধারে পাথর বিক্রির অভিযোগ উঠেছে বর্ডারগার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) সদস্যদের বিরুদ্ধে। পাথর বিক্রির ঘটনা উপজেলা প্রশাসন হাতেনাতে ধরেও কোনও ব্যবস্থা নিতে পারছে না। চলছে শুধু চিঠি চালাচালি।

এই সুযোগে প্রতিরাতে কমপক্ষে কোটি টাকার পাথর চলে যাচ্ছে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্য খ্যাত ভোলাগঞ্জ, বিছানাকান্দি আর জাফলং জিরোপয়েন্ট থেকে।

অভিযোগ রয়েছে প্রতিরাতে ১০০০ থেকে ১২০০ নৌকা প্রবেশ করে জিরোপয়েন্টে এবং প্রতি নৌকা থেকে ৩ হাজার টাকা হাতিয়ে নেন বিজিবি সদস্যরা। সেই হিসাবে প্রতিরাতেই ৩০ লাখ টাকা হাতিয়ে নেন তারা। আর এ কাজে বেপরোয়া ভূমিকা পালন করছেন ৪৮ ব্যাটালিয়নের ভোলাগঞ্জ পাথর কোয়ারী ক্যাম্পের কমান্ডার আইয়ুব আলী।

কেউ তাকে এ বিষয়ে প্রশ্ন করলেই তিনি নাম ভাঙ্গান সরকারী দলের প্রভাবশালী নেতাদের। যাতে করে ভয়ে আর কেউ কিছু না বলতে পারেন। এমন একটি অডিও ক্লিপ নিয়ে তোলপাড় চলছে কোম্পানীগঞ্জ উপজেলায়। অডিওতে তাকে বলতে শোনা যায় সেক্টর কামান্ডার তার কিছুই করতে পারবে না।

স্থানীয় এক ছাত্রলীগ নেতার সঙ্গে এই কোম্পানী কমান্ডারের অডিও ক্লিপ ইতিমধ্যে প্রশাসনসহ বিভিন্ন দফতরে পাঠানো হয়েছে। তার এই বক্তব্যে হতভম্ব স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা এবং প্রশাসনের কর্মকর্তারা।

আইয়ুব আলী যাদের নাম বলেছেন তারা কেউই এই ধরনের কর্মকান্ডে জড়িত হওয়া তো দূরের কথা তাদের জানারই কথা নয় এখানে এ ধরনের কর্মকান্ড চলছে।

সীমান্ত আইন অনুযায়ী ভারত বাংলাদেশের মধ্যবর্তী ২০০ গজ জিরো পয়েন্ট এলাকায় জনসাধারণের প্রবেশ কিংবা পাথর উত্তোলন নিষেধ এবং এ এলাকার দেখভালের দায়িত্বভার থাকে সীমান্তরক্ষী বাহিনীর ওপর।

অন্যদিকে প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি ভোলাগঞ্জ, বিছানাকান্দি আর জাফলং এ পর্যটকদের আকর্ষনের জন্য জিরো পয়েন্টের পাথর সরানো সম্পূর্নরূপে অবৈধ ঘোষণা করে স্থানীয় প্রশাসন।

কিন্তু দীর্ঘদিন এই আইন চলতে থাকলেও গত ১৫ দিন ধরে হঠাৎ পাল্টে যায় চিত্র। প্রথমে ভোলাগঞ্জ পাথর কোয়ারীর কালাসাদেক ক্যাম্পের (পাথর কোয়ারী ক্যাম্প) কোম্পানী কমান্ডার মো. আয়ুব আলী জিরোপয়েন্টে পাথরবাহী নৌকা প্রবেশের সুযোগ দেন। এর জন্য প্রতি নৌকায় তিন হাজার টাকা হাতিয়ে নেন তিনি। এ বিষয়টি নিয়ে ক্ষিপ্ত হন স্থানীয় একটি শ্রমিক সংগঠন।

কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা পাথর উত্তোলন এবং বহনকারী শ্রমিক ইউনিয়নের (রেজি নং: ২২৬৩) সভাপতি সিরাজুল ইসলাম এবং সাধারন সম্পাদক রিয়াজ মিয়া গত ৩০ মে এই আয়ুব আলীর বিরুদ্ধে প্রতিরাতে ৩০ লাখ টাকা চাঁদাবাজির অভিযোগ এনে বিভাগীয় কমিশনার এবং বিভিন্ন দফতরে স্বারক লিপি প্রদান করেন। সেই সঙ্গে আয়ুব আলীকে কালাসাদেক ক্যাম্প থেকে প্রত্যাহারের দাবী জানান।

এর পরই তদন্তে নামে উপজেলা প্রশাসন। গত ২ জুন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার দফতর থেকে এক পত্র পাঠানো হয় জেলা প্রশাসক বরাবর।

কোম্পানী কমান্ডার আয়ুব আলীর কাছে রাতের আধারে লাখ লাখ টাকার পাথর বিক্রির কথা জানতে চান কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার সরকারদলীয় এক ছাত্র নেতা। যে অডিও ক্লিপে শোনা যায়, শুরুতেই আয়ুব আলী তাকে আপনি বলে সম্ভোধন করলেও একটু পরেই চলে আসেন তুমিতে। তারপর টাকা নিয়ে পাথর বিক্রির কথা জিজ্ঞাসা করলে, আয়ুব আলী বলেন “অবশ্যই টাকা নিচ্ছি, হান্ড্রেড পার্সেন্ট টাকা নিচ্ছি” আর কিছু জানার আছে?

সেই ছাত্র নেতাটি তাকে জিজ্ঞাসা করেন, এটা করছেন কেন? এমন প্রশ্নের জবাবে কোম্পানী কমান্ডার জানান, এটা তিনি করছেন না, আওয়ামী লীগের বড় নেতাদের জিজ্ঞাসা করেন তারা জানেন কে করছেন।

এসময় তিনি বলেন নাম নিবে তুমি, আমি বলি এটা হুকুম দিয়েছে বলে দুটি নামের কথা উল্লেখ করেন, পারলে তাদের সঙ্গে কথা বল।

এসময় ছাত্র নেতাটি এসব কথা রেকর্ড করেছেন বললে তিনি তাকে গালিগালাজও করেন এবং বলেন তুই পারলে সেক্টর কমান্ডারকে গিয়ে এসব শোনা। আমার কিছুই যায় আসে না।

এসব বিষয়ে কোম্পানী কমান্ডার যুগান্তরকে মো. আয়ুব আলী বলেন, এখানে যা হচ্ছে সরকারের নির্দেশেই হচ্ছে। তার নিজের সিদ্ধান্তে কিছু হচ্ছে না।

সরকার বলতে কাকে বোঝাচ্ছেন এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, একদিন বেড়াতে আসেন দাওয়াত করছি, তাহলেই সব বুঝে যাবেন। সেই অডিওর প্রসঙ্গ আনতেই ফোন কেটে দেন তিনি।

অন্যদিকে ভোলাগঞ্জে জিরোপয়েন্টের পাথর হরিুলুটের সাথে সাথেই শুরু হয় বিছানাকান্দি এবং জাফলং জিরোপয়েন্টেও সেখানকার বিজিবি কামান্ডারও স্থানীয়দের সঙ্গে মিলে একই কাজ শুরু করেন। এ নিয়েও চিঠি দিয়েছেন গোয়াইনঘাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা।

সিলেটে বিজিবি ৪৮ ব্যাটালিয়নের কমান্ডিং অফিসার লে. কর্নেল মহসিনুল কবির মঙ্গলবার জানান, তিনি বিষয়টি জানেন না, জেনে তার পর কথা বলবেন। এর জন্য একদিন সময় চান তিনি।

বুধবার তিনি জানান, আপনাদের তথ্য আমাদেরকে সহায়তা করেছে। বিষয়টি সিরিয়াসলি দেখছি। ইতিমধ্যেই সেই কোম্পানী কমান্ডার আইয়ুব আলীকে প্রত্যাহার করা হয়েছে। এছাড়া বিষয়টি বিভাগীয় তদন্ত হচ্ছে। অভিযোগ প্রমাণিত হলে দোষীদের বিরুদ্ধে অবশ্যই ব্যবস্থা নেয়া হবে।

এছাড়া বিছানাকান্দি ও জাফলং জিরোপয়েন্ট থেকে পাথর উত্তোলনের বিষয়ে বিজিবি ৪৮ ব্যাটালিয়নের কমান্ডিং অফিসার লে. কর্নেল মহসিনুল কবির বলেন, তাদের ওই বিষয়ে জানা ছিল তাই দ্রুত ব্যবস্থা নিয়েছেন তারা।

কিন্তু জেলা প্রশাসন কার্যালয় বলছে ভিন্ন কথা। কয়েকদিন ধরেই চিঠি দিয়েও এ বিষয়ে কোন সুরাহা হচ্ছে না। এমনকি সমন্বয় সভাতেও বিষয়টি তুলে বিজিবিকে বিষয়টি জানানো হয়েছে।

এ বিষয়ে জেলা প্রশাসক নুমেরী জামান যুগান্তরকে জানান, তারা এ ঘটনা শুরুর পর থেকেই বিভিন্ন স্থানে কথা বলছেন কিন্তু এটা থামানো যাচ্ছে না। বিষয়টি যেহেতু সীমান্ত এলাকা তাই বিজিবিকেই এর ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে বলে জানান তিনি।