শীতে হাকালুকি ও বড়লেখার ‘পাখিবাড়ি’

../news_img/58238 mmm.jpg

লিটন শরীফ, বড়লেখা (মৌলভীবাজার) প্রতিনিধি ::    হাকালুকি হাওর। বাংলাদেশের অন্যতম বড় হাওর। ভৌগোলিকভাবে মৌলভীবাজার ও সিলেট এই দুই জেলা নিয়ে হাকালুকি হাওরের বিস্তৃতি। ভরা বর্ষায় থাকে সাগরের মতো রূপ আর শীতে ফসলের মাঠ। শীতে এর সৌন্দর্য অনেকটাই ভিন্ন। পানিশূন্য ধূ-ধূ হাওরের বুকে প্রথমেই চোখে পড়বে দাঁড়িয়ে থাকা পর্যবেক্ষণ টাওয়ার। শুকিয়ে যাওয়া হাওরের মাঝে যতটুকু পানি আছে এতে করে সৃষ্টি হয় সুন্দর এক একটি ক্যানেলের। হাকালুকি হাওরে পড়ন্ত বিকেলে সূর্যাস্ত ও অতিথি পাখির নীড়ে ফেরার দৃশ্যগুলো ভ্রমণ পিপাসুদের অন্যরকম ভালো লাগে।   

শীতকালে হাকালুকি হাওরে বেড়াতে আসা ভ্রমণ পিপাসুদের অন্য রকম আনন্দ দেয় কৈয়ারকোণা বিলের (বদ্ধ) পাশে মনোহর আলী মাস্টারের পাখি বাড়ি। মৌলভীবাজারের বড়লেখা উপজেলা সদর থেকে প্রায় ১৫ কিলোমিটার পশ্চিমে হাল্লা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় লাগোয়া ‘পাখিবাড়ি’।  

দিনের প্রতিটি মুহূর্তে পাখির কলতানে মুখর হয়ে ওঠে চারদিক। হাকালুকি হাওর এলাকায় হাল্লা গ্রামের মনোহর আলী মাস্টারের পতিত বাড়িতে বছরজুড়ে থাকে পাখির মেলা। অনেক বছর ধরেই বাড়িটি পাখির অভয়াশ্রম। পাখির উপস্থিতির কারণে এলাকায় বাড়িটির পরিচিতিও এখন পাখি বাড়ি নামে।

বাড়ির সদস্য ও স্থানীয় লোকজন জানিয়েছেন, শীতের আগমনী বার্তা নিয়ে প্রতি বছর দক্ষিণ এশিয়ার বৃহত্তম হাওর হাকালুকিতে যখন ঝাঁকে ঝাঁকে আসে অতিথি পাখির দল, তখন হাওরের পাশাপাশি হাকালুকির হাল্লা গ্রামের মনোহর আলী মাস্টারের পতিত বাড়িটিও মুখর হয়ে ওঠে অতিথি পাখির কলকাকলিতে। হাজার হাজার পাখির আগমনে পুরো এলাকা পাখি রাজ্যে পরিণত হয়। সন্ধ্যা নামার সঙ্গে সঙ্গে হাকালুকি হাওরের বিভিন্ন বিল জলাশয় থেকে এসে আশ্রয় নেয় বাড়ির গাছ গাছালিতে। ভোর হলেই পুনরায় পাখিরা চলে যায় খাবারের সন্ধানে হাওরের বিভিন্ন বিল বাদাড়ে। তবে শুধু শীত মৌসুমে নয়, হাল্লা গ্রামের এই বাড়িটি বছর জুড়েই পাখির কলকাকলিতে মুখরিত। 

সরেজমিনে দেখা গেছে, সারা দিনের খাবার শেষে হাকালুকি হাওরের কইয়ারকোনা বিলে একটু বিশ্রাম নিলো হাজার হাজার নানাজাতের পাখি। তবে বকের সংখ্যাই বেশি। এরপর সবাই আকাশের চারদিকে একাধিকবার ঘুরতে ঘুরতে ঘড়ির কাঁটায় ঠিক ৬টা বাজতেই গিয়ে বসলো মনোহর আলীর বাড়ির হিজল, করস ও জারুল বাগানে। পাখির ডানার শব্দে মনে হলো ওপর দিয়ে বিমান গেলো বুঝি। এখানে নিশিবক, সাদাবক, লালবক, হাঁস, পানকৌড়ি, জলকুড়া, সরালি, কুদালীসহ নানা প্রজাতির পাখি আশ্রয় নিয়েছে। পাখি ওড়ার দৃশ্য এলাকার মানুষ ও পর্যটকদের মুগ্ধ করছে। প্রতিদিন অসংখ্য মানুষ পাখি দেখতে আসছেন পাখি বাড়িতে। বিশেষ করে ছুটির দিনে পাখিপ্রেমীরা ভিড় করেন বেশি। স্থানীয়রা জানালেন, মনোহর আলীর বাড়ি ছাড়া অন্য কোনো বাড়ির গাছে একটিও পাখি বসে না।

পাখি বাড়িতে বন্ধুদের নিয়ে পাখি দেখতে আসা জামিল বক্স, জুবের আহমদ ও আলতাফ হোসেন বলেন, ‘এক বন্ধুর মাধ্যমে এ বাড়িতে অতিথি পাখির মেলার কথা জানতে পারি। পাখিদের সঙ্গে আনন্দ ভাগাভাগি করতে ছুটে এসেছি পাখি বাড়িতে। পাখিদের কলতান শুনে মন জুড়িয়ে যাচ্ছে।’ কথা হয় কলেজ শিক্ষার্থী জয়দ্বীপ দত্ত ও তাওহিদ সারওয়ার মান্না সঙ্গে। তাঁরা বলেন, ‘এ বাড়িতে এত সুন্দর পাখি রয়েছে কেউ না দেখলে বিশ্বাস করবে না।’

মনোহর আলী মাস্টারের ছেলে আক্তার আহমদ শিপু জানান, প্রায় এক একর আয়তনের তাদের এ পতিত বাড়িতে বিগত প্রায় ৩০-৪০ বছর ধরে অতিথি পাখির বসবাস। পাখির বিষ্ঠার কারণে ঘরের টিন নষ্ট ও দুর্গন্ধময় পরিবেশের সৃষ্টি হয়। এতে প্রতি বছর আমাদের আর্থিক অনেক ক্ষতি হয়। তার পরও মমতায় নিজেদের ক্ষতির কথা চিন্তা না করে পাখিদের সঙ্গে বসবাস করছি। পাখির অভয়াশ্রমে দুর্গন্ধবিহীন পরিবেশ গড়ে তোলার পাশাপাশি এনজিও এবং সরকারি সহযোগিতা পেলে আমরা এ ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে পারি। সরকারি উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের কাছে তার আবেদন, পাখি বাড়িটি পরিদর্শন করে সরকারিভাবে পাখির অভয়াশ্রম হিসেবে এলাকাটিকে ঘোষণা করে তা সংরক্ষণের জন্য যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হোক।