গাধা-ঘোড়ার তর্ক আর বছর শেষের হিসেব নিকেশ

../news_img/58219 mmm.jpg

ডাঃ মামুন আল মাহতাব (স্বপ্নীল) :: গাধা আর ঘোড়ায় তুমুল তর্ক হচ্ছে। বিষয় ‘ঘাসের রং কি?’ ঘোড়া যতই বলে ঘাসের রং সবুজ, গাধা তা মানতে নারাজ। তার যুক্তি ঘাস নীল। শেষে গাধা আর ঘোড়া বনের রাজা বাঘের দ্বারস্থ হলো। সব শুনে বাঘ ঘোড়াকে এক মাসের কারাদন্ড দিলেন। হতভম্ব ঘোড়া করজোড়ে প্রশ্ন করল, ‘মহারাজ, আপনার বিচার শিরধার্য্য, কিন্তু বড় জানতে ইচ্ছে করছে কি অপরাধে আমার এই সাজা’। ‘গাধাতো গাধার মত তর্ক করবেই, তার সাথে তর্ক করাটাই তোমার অপরাধ’, বাঘের উত্তর।

 

এবারের কোচিন যাত্রার উদ্দেশ্য ছিল, শুধুই ছুটি কাটানো। একসাথে পরিবারের সবাই, আর সেই সাথে আম্মা ও শ্বাশুড়ি। কেরালার বিখ্যাত ভেম্বানাদ লেকে হাউজবোটে একরাত কাটানো ছুটির অন্যতম আকর্ষণ। তিন রুমের লাক্সারি হাউজবোট, অদ্ভুত সুন্দর প্রকৃতি, ডাহুক - পানকৌড়ি - কালো আর সাদা বক - গাঙচিল এমনি হরেক রকমের হাজারো পাখির সমারোহ, মোবাইল আর ওয়াইফাই ছাড়া এক অবিশ্বাস্য নিঃশব্দ, অলস প্রকৃতি আর সাথে লেকের তাজা গলদা চিংড়ি - লাল বিল্লি মাছ ভাজা দিয়ে লাঞ্চ - ডিনার, সবমিলিয়ে অদ্ভুত সুন্দর একটা অভিজ্ঞতা। লেকে সুর্যাস্তের পর বোট চলা নিষেধ। সারেং বোটটাকে রাতের মত নোঙর করল মানববসতিহীন একটা জঙ্গল টাইপের জায়গায়। ঘন কালো অন্ধকার, আকাশে সারি-সারি বাদুড়, একটু যেন গা ছমছম করা। সারেংকে ডেকে বললাম, ‘কোনরকম চুরি ডাকাতির ভয় নেইতো আবার’। ÔWhen you are in Kerala, you are safe’ – সারেং-এর উত্তরটা গালে যেন চটাশ করে চড়ের মত লাগলো। সরকারের বর্ষপুর্তিতে নানাজনের নানা পোস্ট ফেসবুকে ইদানিং নজরে পরছে। মনটা কেদে ওঠে আগুন সন্ত্রাসের দুর্বিষহ ছবিগুলো দেখে। পুড়ছে শিশু, জ্বলছে বাস-ট্রেন, এমনকি গরুও। ইট দিয়ে থেতলে দেয়া হয়েছে পুলিশ কর্মকর্তার মাথা। অসহায় পুলিশ কর্মকর্তাকে কোলে নিয়ে পথচারী নারীর আকুতি। মনে পড়ে এমনি কত শত দুর্বিসহ স্মৃতি। 

 

দেশটাতো খারাপ চলছে না। পদ্মা ব্রিজ, মেট্রো রেল, রূপপুর পারমানবিক বিদ্যুত কেন্দ্র, বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট, যশোর শেখ হাসিনা সফটওয়্যার পার্ক, মাতারবাড়ি পাওয়ার হাব, ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে, পে-পাল, ৯৯৯ - এমনি কত অর্জনইতো এক নিঃশ্বাসে বলে যাবেন সরকারী লোকজন। অর্জন আছে আরো অনেক, আছে কম-বেশী সব সেক্টরেই। আমি বাজি ধরে বলতে পারি বর্তমান সরকারের যা কিছু অর্জন তার পুর্নাঙ্গ কোন তালিকা তৈরী করতে পারবে না আওয়ামী লীগের সবচাইতে নিষ্ঠাবান কর্মীটিও। তালিকাটি অনেক বেশী লম্বা আর বৈচিত্রময়।

 

আমি অতশত বুঝি না। আমি দেখেছি গত রমজানে আরো অনেকের মতই অতি উৎসাহী হয়ে সেহরী খেতে গিয়ে অভিজাত এলাকার একাধিক রেষ্টুরেন্টে জায়গা না পেয়ে পরে পরিচিত এক রেষ্টুরেন্ট মালিককে জ্যাক দিয়ে সপরিবারে সেহরী সেরেছি। আবার তার আগের বছরই পুরানো ঢাকার আল রাজ্জাক রেষ্টুরেন্টে লাইন দিয়ে জমিয়ে পায়া দিয়ে সেহরী করে ঢেকুর তুলতে তুলতে বাসায় আসার দু’দিন পরই হলি আর্টিজানের রক্তে রাঙ্গাতে দেখেছি এই ঢাকা শহরকে। 

 

আমাদের আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীতো অন্তত একের পর এক জঙ্গি আস্তানা গুড়িয়ে দেয়ায় ভালই দক্ষতা দেখাচ্ছে। তাদের নিয়ে অনেক অভিযোগই থাকতে পারে। যেমন আছে আমাদের মতন চিকিৎসকদের নিয়েও। কিন্তু একজন চিকিৎসক হিসেবে আমি যেমন আমার ভাল কাজটুকুর প্রশংসা প্রত্যাশা করি, তেমনি আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদেরও তাদের প্রাপ্য ধন্যবাদটুকু দিতে আমার কোন কার্পন্য নেই। অথচ কেরালার সেই সারেং-এর উত্তরটাতো আমার গালে চড়ের মতই লেগেছে। আমার যে শহরে সেহরি খেতে রেস্তোরায় লাইন দিতে হয়, দিতে হয় রেস্তোরা মালিককে জ্যাক, সেই শহরে কেন আগুনে জ্বলে ঝলছে যায় মানুষ আর অবলা প্রাণী? কে দায়ী এর জন্য? কার স্বার্থে এই আগুন সন্ত্রাস? জঙ্গি দমনে আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর এত সাফল্যের পরও কেন আবার হলি আর্টিজান? উত্তরটা জানা। তবুও জানা জিনিষ বলব না, অযথা তর্কে জড়াবো না। কারণ গাধার সাথে তর্কে যাওয়াটাও অপরাধ।

 

শুধু একটু মনে রাখতে হবে গাধা-ঘোড়ার তর্কে জড়িয়ে আমরা যেন বছর শেষে আগামী পাচ বছরের জন্য আমাদের ভবিতব্য নির্ধারণের দায়িত্ব ভুল কারো হাতে না দিয়ে বসি। জাতি হিসাবে আমাদের সাফল্য অনেক। ভুলও যে একেবারে নেই তা নয়। তবে ২০১৮ আমাদের ভুল করার বছর না।