মালয়েশিয়ায় বিপদগ্রস্ত প্রবাসীদের পাশে দাঁড়ান

../news_img/5355২ mri nu.jpeg

আর কে চৌধুরী ::  দেশের অন্যতম শ্রমবাজার মালয়েশিয়ায় অবৈধ অভিবাসীদের পাকড়াওয়ের অভিযান চলছে এবং সে অভিযানের শিকারে পরিণত হয়েছে কয়েক লাখ বাংলাদেশি। মালয়েশিয়ায় অবৈধ অভিবাসীর সংখ্যা ছয় লাখের মতো, এর মধ্যে বাংলাদেশির সংখ্যা প্রায় অর্ধেক। সেদেশের সরকার অবৈধ অভিবাসীদের বৈধ করার জন্য পাঁচ মাস সময় দিলেও অবৈধভাবে অবস্থানরত তিন লাখ বাংলাদেশির মধ্যে ৭১ হাজার বৈধ হওয়ার জন্য নিবন্ধন করেছেন। বাকিরা তাদের নাম নিবন্ধন করতে পারেননি মূলত নিয়োগকারীদের গাফিলতির কারণে। নিয়োগদাতারা সময়মতো তাদের প্রতিষ্ঠানে কর্মরত শ্রমিকদের জন্য ই-কার্ডের আবেদন না করায় প্রায় আড়াই লাখ বাংলাদেশি শ্রমিকের পক্ষে মালয়েশিয়ায় থাকা ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

অবৈধ অভিবাসীদের বিরুদ্ধে মালয়েশীয় পুলিশ যে অভিযান চালিয়েছে তাতে ইতিমধ্যে পাঁচ শতাধিক বাংলাদেশিকে আটক করা হয়েছে। স্মর্তব্য, মালয়েশিয়ায় অবৈধভাবে অবস্থানরত প্রায় ছয় লাখ অভিবাসীকে সাময়িক বৈধতা দিতে গত ১৫ ফেরুয়ারি ই-কার্ড বিতরণের কার্যক্রম শুরু করে সেদেশের অভিবাসন মন্ত্রণালয়। গত ৩০ জুন ছিল ই-কার্ড দেয়ার শেষদিন। কিন্তু এদিন পর্যন্ত মাত্র ২৩ শতাংশ শ্রমিক ই-কার্ড পেয়েছেন। বাকি ৭৭ শতাংশ অবৈধ শ্রমিককে হয়তো দেশে ফিরে আসতে হবে। অবৈধ অভিবাসীদের কাছে ই-কার্ড পাওয়া না পাওয়া ছিল বাঁচা-মরার প্রশ্ন। কিন্তু তাদের নিয়োগকারীরা এ ব্যাপারে গরজ না করায় গত ৩০ জুন পর্যন্ত প্রায় ৬ লাখ অবৈধ অভিবাসীর মাত্র এক-চতুর্থাংশ অর্থাৎ ১ লাখ ৫৫ হাজার ৬৮০টি আবেদনপত্র জমা হয়েছে। অভিবাসন মন্ত্রণালয় এর মধ্যে ১ লাখ ৪০ হাজার শ্রমিকের জন্য ই-কার্ড ইস্যু করেছে।

মালয়েশিয়া থেকে অবৈধ শ্রমিকদের বের করে দেয়া হলে শুধু যে সংশ্লিষ্ট শ্রমিকদের জীবিকা অনিশ্চিত হয়ে পড়বে তা নয়, সেদেশের শিল্প-কারখানাসহ অন্যান্য ক্ষেত্রেও সংকট সৃষ্টি হবে। ই-কার্ড পাওয়ার পুরো প্রক্রিয়ায় যেহেতু আধাবেলা সময় লাগে সেহেতু অনেক নিয়োগকর্তা তাদের শ্রমিকদের জন্য ই-কার্ড ইস্যুর আবেদন সময়মতো করেননি, যা বাংলাদেশের দুই লাখেরও বেশি শ্রমিককে বিড়ম্বনায় ফেলেছে। আমরা আশা করব সমস্যার সমাধানে প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয় সক্রিয় হবে। এ বিষয়ে অবিলম্বে মালয়েশীয় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করে সংকট নিরসনের উদ্যোগ নেয়া হবে এটিও কাম্য।

১৯৯৩ সাল থেকে মালয়েশিয়ার সরকারি সিদ্ধান্তে শ্রমিক আমদানি শুরু হয়। ২০১১ সালে জিটুজি চুক্তি হওয়ার আগে আরও ৫টি চুক্তি হয় বাংলাদেশ থেকে শ্রমিক আমদানির; কিন্তু প্রতিবারই চুক্তি অনুযায়ী শ্রমিক আমদানি সম্পূর্ণ হওয়ার আগেই দুর্নীতির কারণে তা বন্ধ হয়ে যায়। ফলে একদিকে যেমন দুর্নীতিবাজদের বিচার এবং জনগণ, দল ও এনজিও প্রতিষ্ঠানের কাছে কারণ দর্শাতে সরকারকে নানা সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়েছে, অপরদিকে বিদেশগামী শ্রমিকদের সঙ্গে প্রতারণার দায়ে বহু রিক্রুটিং এজেন্সির লাইসেন্স বাতিলের নোটিশ, আদালতের নোটিশ, অফিসে তালা দিয়ে পালানোর মতো ঘটনা ঘটেছে।

কয়েক বছর আগে মালয়েশিয়া তার চাহিদা অনুযায়ী শ্রমিক আমদানি করত ১৯টি দেশ থেকে। ন্যূনতম বেতন কাঠামো, অনুন্নত বাসস্থান, পুলিশি হয়রানি, শ্রমিক নির্যাতন ইত্যাদি কারণ দেখিয়ে বেশ কয়েকটি দেশ শ্রম রফতানিতে অনাগ্রহ ও সীমিত করে দেয়। কিন্তু বাংলাদেশ সরকার বন্ধুপ্রতিম দেশ মালয়েশিয়ার শ্রম সমস্যা সমাধানে এবং ভিশন ২০২০ বাস্তবায়নকে ত্বরান্বিত করতে জিটুজি চুক্তি সম্পাদন করে।
বর্তমানে মালয়েশিয়ায় ৭ লাখেরও বেশি বাংলাদেশি সাধারণ শ্রমিক রয়েছেন। এর মধ্যে প্রায় ৩ লাখ ৬২ হাজার বৈধ এবং বাকি শ্রমিকরা অবৈধ। এ অবৈধ শ্রমিকদের মধ্যে প্রায় ২১ হাজার ৬ পি-প্রোগ্রামে প্রতারিত, প্রায় ১১ হাজার ভিসা নবায়নে প্রতারিত বা ব্যর্থ, প্রায় ২৩ হাজার স্টুডেন্ট ভিসা, ট্রেনিং ভিসা ও শিপিং ভিসায় এসে অবৈধ এবং প্রায় ১ লাখ ১০ হাজার ভিজিট ভিসা ও ট্রানজিটে প্রবেশ করে অবৈধ। বাকি প্রায় ৮ হাজার নৌ ও সড়কপথে অবৈধভাবে প্রবেশ করে।
মালয়েশিয়ার সরকার এ পর্যন্ত ৩ বার বিদেশি শ্রমিকদের অবৈধ হওয়ার সুযোগ দিয়েছে এবং এই ৩ বারের পরিসংখ্যানেই বাংলাদেশিরা আনুপাতিক হারে সবচেয়ে বেশি বৈধ হয়েছে এবং আনুপাতিক হারে এজেন্ট ও তাদের সাব এজেন্ট কর্তৃক প্রতারিতও হয়েছে বেশি।
এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না, বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রাণশক্তি প্রবাসীদের পাঠানো রেমিটেন্স। বিদেশে তারা নানা ধরনের সমস্যায় পড়েন। বিদেশে অবস্থান ও চাকরি করাসহ সব ক্ষেত্রে প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য পাসপোর্ট অতি প্রয়োজনীয় নথি, যা না থাকলে যে কোনো মুহূর্তে বিপদে পড়তে পারেন তারা। তাই সবসময় সঙ্গে রাখতে হয় পাসপোর্ট। কাজেই তাদের পাসপোর্ট সংক্রান্ত জটিলতা নিরসনে দ্রুত উদ্যোগ নেয়া প্রয়োজন।

আর কে চৌধুরী : সাবেক চেয়ারম্যান, রাজউক; মুক্তিযুদ্ধে ২ ও ৩ নং সেক্টরের রাজনৈতিক উপদেষ্টা