একজন বাবলা

../news_img/Dr. Farhana Mobin.jpg

ডাঃ ফারহানা মোবিন :
-    আপা, আমারে যদি বেতনটা দিতেন !
-    বুয়া তোমাকে কতোবার বলেছি এখন হাতে টাকা নাই। তুমি জানো না, সন্ধির বাবা আগামী নির্বাচনে দাঁড়াবে। ভোট পাবার জন্য তাকে অনেক টাকা খরচ করতে হবে। তাছাড়া আমার প্রতিমাসে দুস্থ নারীদের জন্য মিটিং থাকে। এই যে বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগে দুস্থ নারীদের যে ক্ষতি হলো, তাদের সাহায্যতো শুধু আমরাই করছি। ভাগ্যিস তুমি নারীনেত্রী হওনি। হলে বুঝতে পরে জন্য কতো চিন্তা হয়। চিন্তায় রাতে ঘুমাতেই পারবে না।
-    আপা বুঝছি। তয় আমার পুলাডা শুধু ট্যাকা চায়।
-    কেন ছোট মানুষের টাকা কি দরকার ? তুমি তো এই বাসা থেকে তিন বেলা খাবার নিয়ে যাও। ও টাকা নিয়ে কি করবে ?
-    আপা, তার খুব শখ সে ইস্কুলেত পইড়ব। নামী মানুষ হইবো। আমার কাছে ট্যাকা চায় বই কিনার লাগি। আর তার খুব শখ নতুন একটা জামা কিনার জন্যি। গত বছরের ঈদ থেইকা হে নতুন জামা চায় তারে দিতে পারিনা। আপা আপনার কাছে ছয় মাসের ব্যাতন পাই। আপনে যদি দিতেন। একটা মাত্র পুলার শখ মিটাইতে পারি না।
-    বুয়া, এক কথা বার বার বলো কেন ? তোমার ছেলেকে পুরানো জামা কোথা থেকে দিবো ? তুমি দেখোনি পুরানো সব জামা আমি বস্তা ভরে অসহায় মানুষজনদের কাছে পাঠালাম। দাতাগোষ্ঠীদের টাকা দিয়ে নামী-দামী লোকদেরকে গিফ্ট পাঠালাম পত্রিকায় আমার ছবি ছাপানোর জন্য। এটা আমার ক্যারিয়ারের জন্য লাভ। তোমার পঙ্গু ছেলে ঘরের বাইরে যেতে পারে না। তার নতুন জামার এতো লোভ কেন ? আর পঙ্গুদের লেখাপড়া করে কোন লাভ নেই বুঝেছো ? আজকাল কত এম.এ পাশ লোক বেকার হয়ে বসে আছে। ওরে বরং আমার বাসার কাজে লাগাও। সিড়ি ঝাড়– দিলেই তো পারে।
-    আপা, হেই তো পলিওর রোগী। ঠিক মতো খাড়াইতেই পারেনা।
-    আর কথা বলোনাতো। তোমার কথার অত্যাচারে আমি নোট লিখতে পারছি না। আজ আমাকে শিশু নির্যাতনের বিরুদ্ধে বক্তৃতা দিতে হবে। যাও তাড়াতাড়ি আমার শাড়ি ইস্ত্রি করে দাও।
বুয়া বিষন্ন মনে ইস্ত্রি চালায়। সে ইস্ত্রিতে শাড়ির প্রতিটি ভাজ সোজা হতে থাকে। আদরের ধনটার চোখদুটো ভেসে ওঠে তার স্মৃতিপটে। কতোক্ষণ দেখিনি তাকে সেকি (বাসী ভাতটুকু) খেয়েছে ?
চুলায় ফুটতে থাকে টগবগে ডাল। ডালা ভরা পেঁয়াজ কাটতে কাটতে থেমে আসে বুয়ার হাত।
সন্ধি     ঃ     বুয়া আজ কিন্তু স্কুলে যাবোনা। তুমি মাকে বলবে না। প্রতিদিন স্কুলে যেতে ভালো লাগেনা।
বুয়া     ঃ     বাবাজান আমার, ইস্কুলে যাও।
সন্ধি     ঃ     বুয়া, তোমার ছেলেকে আমার দেখার খুব শখ। মামনি বাইরে চলে গেলে চলো আমরা তোমার বাসায় যাই। ড্রাইভার আঙ্কেলকে নিষেধ করে দিবো। তাহলে আমাদের কথা কেউ জানতে পারবেনা। তোমার ছেলো হাটতে পারেনা। তুমি ভোরে কাজে এসেছো। চলো বুয়া গাড়ী নিয়ে তোমার ছেলেকে দেখে আসি।
বুয়া     ঃ    সত্যি যাইবা। চলো চলো। বাবলা ভাত খাইলো কিনা আমার খুব চিন্তা হইতাছে। তয় বাপজান, আপারে কোনদিন কইয়োনা। জানলে আমারে খুব মাইর দিবো।
পরের দৃশ্য
গাড়ী যেতে থাকে বস্তির রাস্তা ধরে। হঠাৎ কাঁদায় আটকে যায় গাড়ীর দুই চাকা।
বুয়া ঃ বাবজান, গাড়ীতো আর যাইবো না। এই রাস্তাগুলো তোমারে হাটতে হইবো। তুমিতো হাটতে পারবানা। আসো বাবজান, আমার কুলে আসো। তুমিতো এত্তো রাস্তা হাটতি পাইরবানা।
ড্রাইভার গাড়ী নিয়ে থেকে যায়। রাস্তার একধারে গাড়ী লক করে রাখে। আয়েশের ভঙ্গিতে টানতে থাকে বন্ধুর দেয়া গোল্ডলিফ সিগারেট। হঠাৎ একদল মাদকাসক্ত তরুণ অস্ত্র নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে ড্রাইভারের উপর। ড্রাইভারের বুকে বসিয়ে দেয় রামদা-র অগ্রভাগ। ছিনতাই বিদ্যার কৌশলে পাজেরো গাড়ীটার লক ভেঙ্গে দেয়। গাড়ী নিয়ে চলে যায় মাদকাসক্ত তরুণেরা। রক্তাক্ত ড্রাইভারকে ঘিরে ধরে উৎসুক বস্তিবাসী।
বুয়া ঃ     বাবলা, বাবলারে ! দেখ বাবজান, তোরে দেখতে কেডা আসছে। আমার মালিকের পুলা। তোরে দ্যাখার জন্যি হে আজ ইস্কুলেও যায় নাই। বাবজান (সন্ধ্যি) আমাদের বিছানা নাইকা। তুমারে যে মাটিতেই বইসতে হইবো।
সন্ধ্যি ঃ     বুয়া, মেঝেতে বসতে আমার ভালোই লাগে। তুমি দুশ্চিন্তা করোনাতো।
বুয়া ঃ বাবজান, তোমার ঠান্ডা লাগবিনাতো !
সন্ধ্যি ঃ না বুয়া, লাগবে না। তোমার ছেলে আমারই সমান তাই না ?
বুয়া ঃ হ।
সন্ধ্যি ঃ তাহলে আমাদের স্কুলে ভর্তি করে দাও। আমরা দু’জনে একসাথে ক্লাস করবো।
বুয়া ঃ হেইডা যে অয়না বাবজান।
সন্ধ্যি ঃ কেন হয় না ? মামনিকে বলো তোমাকে টাকা দিবে। মামনিতো আমাদের বয়সী ছেলে-মেয়েদের টাকা দেয়। দেখোনা টিভিতে মামনির কতো সাক্ষাতকার দেখায়। শিশুদের লেখাপড়ার জন্য অনেক বক্তৃতা দেয়। (ক্ষুধার্ত সন্ধি হঠাৎ বলে) আমি পান্তা খাবো। 
বুয়া ঃ হায় আল্লাহ ! হেডা হয়নাগো।
সন্ধ্যি ঃ হয়।
মাটির সানকিতে বুয়ার পান্তা ভাতের সাথে মিশে যায় সন্ধ্যির উচ্ছাস। সে উচ্ছাসে চোখ ভিজে আসে ফুলি বেগমের। ভুলে যায় সন্ধিদের বাসাতে ফেলে রাখা কাজগুলোর কথা।
বাবলা ঃ মা পুলিশের গাড়ির শব্দ, নাকি দমকল বাহিনীর ? কোথাও কি আগুন লাগছে ?
বুয়া ঃ জানিনাতো বাজান। তুই খা। কথা বন্ধ কর।
ফুলি বেগম গল্পের আসরে। বস্তির চারপাশ ঘিরে ফেলে পুলিশ। চুরির দায়ে ফুলিবেগমকে পুলিশ উপহার দেয় হাতকড়া। পুলিশের গাড়ীতে টেনে হিচড়ে নিয়ে যায় ফুলি বেগম আর সন্ধিকে। বাবলা চিৎকার করে কাঁদতে থকে। জড়িয়ে ধরে মায়ের পা’দুটো। কিন্তু পুলিশ অফিসার লাথি মারে বাবলাকে। বাবলা ছিটকে পড়ে ঘরের কোনে। দূর্বল হাড়গোড়ের শরীরটা তার অবশ হয়ে যায়। বোবা দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে মায়ের যাবার দিকে। আর চোখ দিয়ে ঝড়তে থাকে অশ্রু।
বস্তিবাসী মিনারা চিৎকার করে ওঠে।
মিনারা ঃ পুলিশ সাব, আমার একটা কথা শুনেন। স্যার আপনার পায়ে পড়ি।
পুলিশ ঃ অ্যায় বেটি, সামনে থেকে সরে যা।
মিনারা ছুটে যায় প্রীতি হকের কাছে।
মিনারা ঃ     মেডাম, আপনেরে বহুতবারি টিভিতে দেখছি। আপনে দয়ার সাগর। দয়া করেন মেডাম। ফুলি বু আপনের গাড়ি চুরি করে নায়। আপনের ড্যারাইবাররে বস্তিবাসী হাসপাতালে নিসে। হ্যাগো থেইকা জাইননা নেন। আপনের গাড়ী ছিনতাই হইছে।
সন্ধি ভীত কম্পিত পায়ে মায়ের ডান হাতের অনামিকা ধরে। অস্ফুট গলায় কাতর স্বরে করতে থাকে মিনতি। মামনি, চষবধংব, ষরংঃবহ ঃড় সব, বুয়া আমাকে চুরি করেনি। আমি বাবলাকে দেখার জন্য এখানে এসেছি। প্লীজ বুয়াকে জেলে পাঠিওনা। মামনি প্লীজ, মামনি, দেখো, বুয়া ছাড়া বাবলার কেউ নেই। বুয় আমাকে অজ্ঞান করার জন্য কোন খাবার খাওয়ায় নি। পান্তা নামের ভাতটা দেখতে কর্ণ স্যুপের মতো। তাই আমার খেতে ইচ্ছে করছিল।
প্রীতি হকের ইশারাতে পুলিশ কিছুক্ষণ থামে। ঝড়ের বেগে তাঁর পা ঝাপটে ধরে মিনারা।
মিনারা ঃ মেডাম গো ! ফুলি বুর স্বামী পকেট মারতো। হের লাগি হেই তারে ছাইড়্যা এহানে থাকে। হেই কারো এক পয়সাও ধরে নাগো। আপনে দয়ার সাগর। আপনে তারে বাঁচান।
প্রী. হ. ঃ এ্যায় ছাড়ো, ছাড়ো, আমার পা ছাড়ো। তোমাদের মতো লোকদের আমি ভালোভাবে চিনি। তোমরা হচ্ছে দু’মুখো সাপ।
পুলিশ ঃ ম্যাডাম কিছু বলবেন ?
প্রী. হ. ঃ     সহজেতো কথা বলবেনা। রিমান্ডে নেবেন। গাড়ী উদ্ধার করতেই হবে বুঝলেন। গাড়ীর কাগজপত্রে একটু সমস্যা আছে তো (দাতাগোষ্ঠীর ত্রানের টাকা দিয়ে কেনা এই গাড়ী), লাইসেন্সেও একটু ঝামেলা আছে। গাড়ী যেন অন্যের হাতে চলে না যায়।
পুলিশ ঃ     আপনি চিন্তা করবেন না ম্যাডাম। আমরাতো আছিই। আমাদের স্যারের সাথেতো আপনার ভালো সম্পর্ক। ম্যাডাম দাতাগোষ্ঠীর কিছু গিফ্ট-তো আমাদের দিলেও পারেন !
মিনারা প্রীতি হকের পা ধরেই থাকে। তাকে ধাক্কা দিয়ে দূরে সরায় প্রীতি হক। আর পুলিশ ফুলি বেগমের গলায় ধাক্কা দিয়ে ভ্যানে উঠায়।
সন্ধি চিৎকার করে কাঁদতে থাকে। বাবলা কাঁদতে পারেনা। ক্লান্ত, ক্ষুধার্ত দেহটা নিয়ে লুটিয়ে পড়ে মেঝেতে। পঙ্গু পাটা নিয়ে উঠে দাঁড়াতে যায়। দেখতে চয় মাকে শেষ বার। কিন্তু দেখা আর হয়না। এক পা নিয়ে কিছুতেই দাঁড়াতে পারে না। দাঁড়াতে গিয়ে অপর পায়ের ধাক্কায় ভেঙ্গে যায় পান্তা ভাতের সানকি। ভাতগুলো ছিটিয়ে  পরে যায় ঘরের স্যাঁতস্যাতে মাটিতে। বাবলার বুক ফেটে বের হয়ে আসে অস্ফুট স্বর। সে স্বরে শোনা যায়- মা, তুমি যাইওনা মা, মাগো, তুমি যাইও না, আমি আর কোনদিন তুমার কাছে জামা চাইবোনা, ইস্কুলেও পড়তি চাইবো না। যাইওনা মা। তুমি ছাড়া যে আমার আর কেউ নেই।

মেডিকেল অফিসার (গাইনী এন্ড অবস্)
স্কয়ার হাসপাতাল, ঢাকা, বাংলাদেশ।