“এপ্রিল ফুল” বোকা বানানোর দিবস!

../news_img/april-fools-.jpg

মুসলমানদের স্পেন বিজয় একটি ঐতিহাসিক ঘটনা। স্পেন বিজয়ের পূর্বমুহূর্তে সেখানে উইতিজা নামক এক রাজা রাজত্ব করত। হঠাৎ উইতিজাকে সিংহাসনচ্যুত করে রডারিক সিংহাসন অধিকার করে। রডারিক ছিল অত্যন্ত উচ্চাভিলাষী ও অত্যাচারী ব্যক্তি। রডারিক সম্রাট উইতিজাকে নৃশংসভাবে হত্যা করে। 

অতঃপর রডারিকের দৃষ্টি নিবদ্ধ হয় ক্ষুদ্র স্বাধীন রাষ্ট্রগুলোর প্রতি। রডারিক প্রথমে আক্রমণ করে স্পেনের দক্ষিণাঞ্চলের সিউটা দ্বীপের স্বাধীন রাজা কাউন্ট জুলিয়ানকে। জুলিয়ান প্রথমে পরাজিত হয়ে রাজ্য ত্যাগ করতে বাধ্য হয়। পরবর্তীতে জুলিয়ান সিউটা ও আলজিসিরাসের গভর্ণরের দায়িত্ব পালন করতে থাকে। ইউরোপের সমসাময়িক নিয়ম ছিল যে, প্রদেশের গভর্ণর অথবা সামন্তরাজাদের পুত্র-কন্যাকে কেন্দ্রীয় রাজ দরবারে প্রেরণ করা। সম্ভবতঃ এর দু’টি কারণ ছিল। গভর্ণর অথবা সামন্তরাজাগণ যেন সহজেই বিদ্রোহ ঘোষণা করতে না পারে। অন্য কারণটি ছিল, রাজকীয় পরিবেশে আদব-কায়দা, সৈন্য-পরিচালনা ও রাজনীতি সর্ম্পকে সঠিক জ্ঞান ও ধারণা অর্জন করা। তাই কাউন্ট জুলিয়ান তার অত্যন্ত সুন্দরী কন্যা ফ্লোরিন্ডাকে রাজধানী টলেডোতে প্রেরণ করে। রাজধানীতে অবস্থানকালে রাজা রডারিক ফ্লোরিন্ডার সৌন্দর্যে বিমুগ্ধ হয়ে পড়ে। জুলিয়ান তনয়ার প্রতি সে কামনার হাত প্রসারিত করে। এই আচরণ ছিল যেমন গুরুতর তেমনি মর্যাদাহানিকর। এই অপমানজনক ঘটনার বিবরণ দিয়ে ফ্লোরিন্ডা গোপনে তার পিতার নিকট সংবাদ পাঠায়। এমনিতেই কাউন্ট জুলিয়ানের সঙ্গে রাজার সম্পর্ক ভাল ছিল না। রাজ্য হারানোর বেদনার সঙ্গে যুক্ত হ’ল কন্যার অবমাননা। প্রতিশোধ গ্রহণের জন্য এবং রডারিক নামক নরপশুর হাত থেকে দেশকে মুক্ত করার জন্য জুলিয়ান মূসা ইবন নুসাইরকে স্পেন আক্রমণের সাদর আমন্ত্রণ জানান। এবার সেনাপতি মূসা বিন নুসাইর প্রথমে পরীক্ষামূলক অভিযানের জন্য তারিফ বিন মালিককে চারশ’ পদাতিক এবং একশ’ অশ্বারোহী সৈন্য নিয়ে স্পেনের আলজিসিরাসে সফল অভিযান চালান। তারিফের এই সফল অভিযানের সংবাদ পেয়ে মূসা বিন নুসাইরের সহকারী সেনাধ্যক্ষ তারিক ইবনু যিয়াদ সাত হাযার সৈন্য সমন্বয়ে গঠিত এক মুজাহিদ বাহিনী অতি সফলতার সাথে ভূমধ্যসাগর ও আটলান্টিক মহাসাগর সংযোগকারী প্রণালিটি অতিক্রম করে ৯২ হিজরীর রজব অথবা শা‘বান মোতাবেক ৭১১ খ্রীষ্টাব্দের এপ্রিল অথবা মে মাসে স্পেন ভূখন্ডে অবতরণ করেন। যে পাহাড়ের পাদদেশে তারিক অবতরণ করেছিলেন তার নামকরণ করা হয় ‘জাবালুত তারিক’ (Gibralter)। 

এ সংবাদ স্পেনের শাসনকর্তা রডারিকের কর্ণগোচর হওয়া মাত্র তিনি যথাসাধ্য প্রস্ত্ততি নিলেন আক্রমণ প্রতিরোধের জন্য। অন্যদিকে সেনাপতি তারিকও তাঁর অভিযানকে স্পেনের মূল ভূখন্ডের দিকে পরিচালনা করলে সেনাধ্যক্ষ মূসা পাঁচ হাযার সৈন্য প্রেরণ করেন। সর্বমোট ১২০০০ সৈন্যসহ সেনাপতি তারিক অগ্রসর হন। ১৯ জুলাই ৭১১ খ্রীষ্টাব্দে মুসলিম বাহিনী এবং গথিক রাজা রডারিকের নিয়মিত বাহিনীর মধ্যে ওয়াদী লাজু নামক স্থানে এক তুমুল যুদ্ধ সংঘটিত হয়। এই যুদ্ধে গথিক বাহিনী ছিন্ন-ভিন্ন হয়ে পলায়ন করে। হাযার হাযার গথিক সৈন্য মৃত্যুবরণ করে। রডারিক উপায়ান্তর না দেখে পলায়ন করতে গিয়ে নদীবক্ষে ঝাঁপ দিয়ে প্রাণ হারান। তারিক আরো অগ্রসর হওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। তিনি মুসলিম বাহিনীকে উদ্দেশ্য করে এই ভাষণ দেন যে, ‘তোমাদের সম্মুখে শত্রুদল এবং পিছনে বিশাল বারিধি। তাই আল্লাহ্র কসম করে বলছি, যে কোন পরিস্থিতিতে ধৈর্যধারণ ও অবিচল থাকা এবং আল্লাহ্র সাথে কৃত ওয়াদা বাস্তবায়ন করা ব্যতীত তোমাদের বিকল্প কোন পথ নেই’। সৈনিকগণও সেনাপতির ভাষণের জবাব দেয়, জয় না হওয়া পর্যন্ত আমরা সংগ্রাম চালিয়ে যাব। কারণ আমরা সত্য প্রতিষ্ঠায় দৃঢ় প্রতিজ্ঞ। 

মুসলিম সৈনিকদের প্রচন্ড আক্রমণের ফলে গথিক রাজ্যের একটির পর একটি শহরের পতন হ’তে থাকে। ৭১১ খ্রীষ্টাব্দের অক্টোবরে মুসলমানরা কর্ডোভা জয় করেন। মুসলমানরা স্পেন জয় করার পর প্রথমে সেভিল (Seville) কে রাজধানী হিসাবে ঘোষণা করেন। কিন্তু সোলাইমান ইবনু আব্দিল মালিকের যুগে স্পেনের গভর্ণর সামাহ বিন মালেক খাওলানী রাজধানী সেভিল থেকে কর্ডোভায় স্থানান্তরিত করেন। এরপর এই কর্ডোভা শতাব্দীর পর শতাব্দী স্পেনের রাজধানী হিসাবে থেকে যায়। এভাবে পযার্য়ক্রমে বৃহত্তর স্পেন মুসলমানদের নেতৃত্বে চলে আসে। ইসলামী শাসনের শাশ্বত সৌন্দর্য ও ন্যায় বিচারে মুগ্ধ হয়ে হাযার হাযার মানুষ ইসলামের ছায়াতলে আশ্রয় গ্রহণ করে। সাথে সাথে জ্ঞান-বিজ্ঞান, সাহিত্য-সংস্কৃতি ও শিল্প-সভ্যতার ক্ষেত্রে বিস্ময়কর উন্নতি সাধিত হ’তে থাকে।

এদিকে ইউরোপীয় খ্রীষ্টান রাজাদের চক্ষুশূলের কারণ হয় মুসলমানদের এই অগ্রগতি। ফলে ইউরোপীয় মাটি থেকে মুসলিম শাসনের উচ্ছেদ চিন্তায় তারা ব্যাকুল হয়ে উঠে। অতঃপর আরগুনের ফার্ডিন্যান্ড এবং কাস্তালিয়ার পর্তুগীজ রাণী ইসাবেলা এই দু’জনই চরম মুসলিম বিদ্বেষী খ্রীষ্টান নেতা পরস্পর বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়। তাঁরা সর্বাত্মক শক্তি প্রয়োগ করে মুসলমানদের উপর আঘাত হানবার জন্য মরিয়া হয়ে উঠে। তারা মুসলমানদের দুর্বলতার সুযোগ খুঁজতে থাকে। এমন এক মুহূর্তে ১৪৮৩ সালে আবুল হাসানের পুত্র আবু আব্দিল্লাহ বোয়াবদিল খ্রীষ্টান শহর লুসানা আক্রমণ করে পরাজিত ও বন্দী হন। এবার ফার্ডিন্যান্ড বন্দী বোয়াবদিলকে গ্রানাডা ধ্বংসের হাতিয়ার হিসাবে ব্যবহার করে। একদল সৈন্য দিয়ে বোয়াবদিলকে প্রেরণ করে তাঁরই পিতৃব্য আল-জাগালের বিরুদ্ধে। বিশ্বাসঘাতক বোয়াবদিল ফার্ডিন্যান্ডের ধূর্তামি বুঝতে পারেননি এবং নিজেদের পতন নিজেদের দ্বারাই সংঘটিত হবে এ কথা তখন তার মনে জাগেনি। খ্রীষ্টানরাও উপযুক্ত মওকা পেয়ে তাদের লক্ষ্যবস্ত্তর উপর দৃষ্টি নিবদ্ধ করে পরিকল্পনা কার্যকর করতে থাকে। বোয়াবদিল গ্রানাডা আক্রমণ করলে আজ-জাগাল উপায়ন্তর না দেখে মুসলিম শক্তিকে টিকিয়ে রাখার মানসেই বোয়াবদিলকে প্রস্তাব দেন যে, গ্রানাডা তারা যুক্তভাবে শাসন করবেন এবং সাধারণ শত্রুদের মোকাবেলার জন্য লড়াই করতে থাকবেন। কিন্তু আজ-জাগালের দেয়া এ প্রস্তাব অযোগ্য ও হতভাগ্য বোয়াবদিল প্রত্যাখ্যান করেন। শুরু হয় উভয়ের মাঝে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ। 

ফার্ডিন্যান্ড ও রাণী ইসাবেলা মুসলমানদের এই আত্মঘাতী গৃহযুদ্ধের সুযোগ গ্রহণ করে গ্রাম-গঞ্জের নিরীহ মুসলিম নারী-পুরুষকে হত্যা করে গ্রামের পর গ্রাম জ্বালিয়ে দিতে দিতে ছুটে আসে শহরের দিকে। অতঃপর রাজধানী গ্রানাডা অবরোধ করে। এতক্ষণে টনক নড়ে মুসলিম সেনাবাহিনীর। তারা গা ঝাড়া দিয়ে উঠে। তাতে ভড়কে যায় সম্মিলিত কাপুরুষ খ্রীষ্টান বাহিনী। সম্মুখ যুদ্ধে নির্ঘাত পরাজয় বুঝতে পেরে তারা ভিন্ন পথ অবলম্বন করে। তারা আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দেয় শহরের বাইরের সকল শস্য খামার এবং বিশেষ করে শহরের খাদ্য সরবরাহের প্রধান উৎস ‘ভেগা’ উপত্যকা। ফলে অচিরেই দুর্ভিক্ষ নেমে আসে শহরে। খাদ্যাভাবে সেখানে হাহাকার দেখা দেয়। এই সুযোগে প্রতারক খ্রীষ্টান রাজা ফার্ডিন্যান্ড ঘোষণা করে, ‘মুসলমানেরা যদি শহরের প্রধান ফটক খুলে দেয় এবং নিরস্ত্র অবস্থায় মসজিদে আশ্রয় নেয়, তাহ’লে তাদেরকে বিনা রক্তপাতে মুক্তি দেয়া হবে। আর যারা খ্রীষ্টান জাহাজগুলোতে আশ্রয় নিবে, তাদেরকে অন্যান্য মুসলিম রাষ্ট্রে পাঠিয়ে দেয়া হবে। অন্যথা আমার হাতে তোমাদেরকে প্রাণ বিসর্জন দিতে হবে’। 

দুর্ভিক্ষতাড়িত অসহায় নারী-পুরুষ ও মাছুম বাচ্চাদের কচি মুখের দিকে তাকিয়ে মুসলিম নেতৃবৃন্দ সেদিন খ্রীষ্টান নেতাদের আশ্বাসে বিশ্বাস করে শহরের প্রধান ফটক খুলে দেন ও সবাইকে নিয়ে আল্লাহ্র ঘর মসজিদে আশ্রয় নেন। কেউবা জাহাজগুলোতে আশ্রয় গ্রহণ করেন। কিন্তু শহরে ঢুকে খ্রীষ্টান বাহিনী নিরস্ত্র মুসলমানদেরকে মসজিদে আটকিয়ে বাহির থেকে প্রতিটি মসজিদে তালা লাগিয়ে দেয়। অতঃপর একযোগে সকল মসজিদে আগুন লাগিয়ে বর্বর উল্লাসে ফেটে পড়ে নরপশুরা। আর জাহাজগুলোকে মাঝ দরিয়ায় ডুবিয়ে দেয়া হয়। কেউ উইপোকার মত আগুনে পুড়ে ভস্ম হয়ে গেল, কারো হ’ল সলিল সমাধি। প্রজ্জ্বলিত অগ্নিশিখায় দগ্ধীভূত ৭ লক্ষাধিক অসহায় মুসলিম নারী-পুরুষ ও শিশুদের আর্তচিৎকারে গ্রানাডার আকাশ-বাতাস যখন ভারী ও শোকাতুর হয়ে উঠেছিল, তখন হিংস্রতার নগ্নমূর্তি ফার্ডিন্যান্ড আনন্দের আতিশয্যে স্ত্রী ইসাবেলাকে জড়িয়ে ধরে ক্রূর হাসি হেসে বলতে থাকে, Oh! Muslim! How fool you are! ‘হায় মুসলমান! তোমরা কত বোকা’।

যেদিন এই হৃদয় বিদারক, মর্মান্তিক ও লোমহর্ষক ঘটনা ঘটেছিল, সে দিনটি ছিল ১৪৯২ খ্রীষ্টাব্দের ১লা এপ্রিল। সেদিন থেকেই খ্রীষ্টান জগৎ প্রতি বছর ১লা এপ্রিল সাড়ম্বরে পালন করে আসছে April fools Day তথা ‘এপ্রিলের বোকা দিবস’ হিসাবে। মুসলমানদের বোকা বানানোর এই নিষ্ঠুর ধোঁকাবাজিকে স্মরণীয় করে রাখার উদ্দেশ্যে সমগ্র ইউরোপে প্রতিবছর ১লা এপ্রিল ‘এপ্রিল ফুল’ দিবস হিসাবে পালিত হয়।