মিটফোর্ডের ইতিহাস

../news_img/27516 mri n u.jpg

এস এম মুকুল  ::
মিটফোর্ড হাসপাতাল শুধু নাম নয় একটি ইতিহাস। বুড়িগঙ্গা নদীর তীরে প্রায় ১২.৮ একর জায়গা জুড়ে হাসপাতালটি। হাসপাতালটি ইনডোর এবং আউটডোর ট্রিটমেন্টের পাশাপাশি প্যাথোলজিক্যাল ও ডায়াগনস্টিক সার্ভিস প্রদান করে থাকে। বর্তমানে হাসপাতালটি প্রতিদিন প্রায় ২৫০০ আউটডোর রোগীকে চিকিৎসাসেবা প্রদান করছে। ১৯৯৯ সাল থেকে হাসপাতালে ৬০০ বেড  থাকলেও প্রতিদিন প্রায় ১০০০ জনেরও বেশি ইনডোর রোগী হাসপাতালে অবস্থান করে। এই হাসপাতালটিই হল ব্রিটিশ শাসিত তৎকালীন পূর্ব বাংলার প্রথম জেনারেল হসপিটাল। শুরু থেকে এই হাসপাতালটি ঢাকা মিউনিসিপ্যালিটির একটি বোর্ডের অধীনে ছিল। মিটফোর্ড হাসপাতাল  শুরু থেকেই এটি এদেশের মানুষদের বিশেষকরে অসহায়, নিম্নবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্তদেরকে চিকিৎসাসেবা প্রদানে ভূমিকা পালন করে আসছে। ইতিহাস থেকে জানা যায়, তৎকালীন ঢাকার কালেক্টর ছিলেন স্যার রবার্ট মিটফোর্ড। তিনি দীর্ঘদিন প্রাদেশিক আপীল বিভাগের বিচারপতিও ছিলেন। ১৮২০ সালে স্যার রবার্ট মিটফোর্ড প্রথম মিটফোর্ড হসপিটালটি প্রতিষ্ঠার জন্য উদ্যোগ গ্রহণ করেন। তখন ঢাকাতে কলেরা মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়ে। মেডিকেল সুবিধা তখন খুবই অপর্যাপ্ত ছিল। প্রতিদিন প্রায় ১৫০ থেকে ২০০ জন মারা যেত।  এ অবস্থা দেখে স্যার মিটফোর্ড খুবই ব্যথিত হন। তিনি ইংল্যান্ডে মৃত্যুর(১৮৩৬) আগে উইল করে তার প্রচুর সম্পত্তি (তখনকার সময় প্রায় ৮ লক্ষ টাকা) এই অঞ্চলে হাসপাতালটি প্রতিষ্ঠাসহ অন্যান্য নানা উন্নয়ন কর্মের জন্য তৎকালীন বাংলার সরকারকে দান করে দিয়ে যান। কিন্তু পরবর্তীতে তার উত্তরাধিকারীদের জন্য এই উইল নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দেয়। কিন্তু ১৮৫০ সালে সর্ব্বোচ্চ আদালতের চ্যান্সারি বিভাগের (chancery court) রায় অনুযায়ী বাংলার সরকার মিটফোর্ডের সম্পত্তি থেকে ১ লক্ষ ৬৬ হাজার টাকা লাভ করে। পরবরর্তীতে লর্ড ডালহৌসির উদ্যোগে এই ফান্ড দিয়ে ১৮৫৪ সালে বর্তমান স্থানে হাসপাতালটি প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়। তারও আগে এই স্থানটি ডাচ কুঠি হিসেবে ব্যবসার কাজে ব্যবহৃত হত বলে জানা যায়। তবে হাসপাতালটি প্রতিষ্ঠায় বেশ কয়েকজন স্থানীয় ধনাঢ্য ব্যক্তিও অর্থসাহায্য প্রদান করেন।


১৮৫৮ সালের ১লা মে মিটফোর্ড হসপিটাল আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করে। তখন এতে পুরুষদের জন্য দুটি ও মহিলাদের জন্য একটি ওয়ার্ডসহ ৮২টি বেড ছিল। ঢাকার নবাব খাজা আহসানুল্লাহ ও ভাঁওয়ালের রাজা রাজেন্দ্র নারায়ণ রায়ের দানে ১৮৮২ সালে হাসপাতালে মহিলাদের জন্য পৃথক একটি ওয়ার্ড প্রতিষ্ঠা করা হয়। নবাব আহসানুল্লাহ ১৮৮৮-৮৯ সালে একই সাথে ৫০ হাজার টাকা দান করেন একই এলাকায় ''Lady Dufferin Hospital'' প্রতিষ্ঠার জন্য। ১৮৮৭ সালে হাসপাতালে একটি ইউরোপিয়ান ওয়ার্ড প্রতিষ্ঠা করা হয়। ১৮৮৯-৯০ সালে ভাগ্যকুলের রাজা শ্রীনাথ রায় ৩ লক্ষ টাকা ব্যয়ে তার মায়ের স্মরণে হাসপাতালে একটি চক্ষু ইউনিট প্রতিষ্ঠা করেন। তারপর ১৯১৭ সালে এটি প্রথম শ্রেণীর হাসপাতাল হিসেবে স্বীকৃতি পায়।

 দেশের প্রথম পাইকারি ওষুধের ব্যবসা কেন্দ্র। বাংলাদেশ কেমিস্টস অ্যান্ড ড্রাগিস্টস্ সমিতির তথ্যানুযায়ী, বর্তমানে মিটফোর্ড এলাকায় ছোট-বড় প্রায় ১৩০০ দোকান গড়ে উঠেছে। বহুতল বিশিষ্ট ওষুধের মার্কেটের সংখ্যা প্রায় ৪০টি। প্রতি  দোকানে দৈনিক গড়ে ৫০ হাজার টাকার কেনাবেচা হলে বছরে বন্ধ বাদ দিয়ে ৩০০ দিনে মোট কেনাবেচা হয় প্রায় দুই হাজার কোটি টাকার ওষুধ। দেশে ওষুধ শিল্পের বিকাশে বাজারে প্রতিযোগিতা বেড়েছে। কম্পানিগুলো তাদের বিক্রয় প্রতিনিধির মাধ্যমে সারা দেশের ওষুধ বিক্রেতাদের কাছে পৌঁছে দিচ্ছে ওষুধ। ফলে জেলার বিক্রেতাদের ওষুধ কিনতে আর ঢাকায় যাওয়ার প্রয়োজন হচ্ছে না। উল্টো মিটফোর্ডের ব্যবসায়ীরাই এখন এখন জেলায় জেলায় গিয়ে ওষুধ কিনে আনছে। মিটফোর্ডে বিক্রি হওয়া প্রায় ৭০ ভাগ ওষুধ জেলা থেকে নিয়ে আসা হয়।

মিটফোর্ড পাইকারি ওষুধের বাজার হিসেবে সুখ্যাতি ছড়িয়েছে। রাজধানীর এই মিটফোর্ড ওষুধের বাজারে বছরে বিক্রি হয় ২০০০ কোটি টাকার ওষুধ। বাংলাদেশের ওষুধের সুনাম এখন বহির্বিশ্বেও। দেশেই ওষুধের বাজার রয়েছে ৫০০০ কোটি টাকারও বেশি। মিটফোর্ড ব্যবসায়ীদের তথ্য অনুযায়ী- চোরাচালানের মাধ্যমে ১০০০ কোটি টাকারও বেশি পরিমাণ বিদেশি ওষুধ আসছে দেশে। এই চোরাচালান ঠেকানো সম্ভব হলে দেশে ওষুধের বাজার চাহিদা আরও সম্প্রসারিত হবে। ওষুধ সমিতির তথ্যে দেখা গেছে, সারাদেশে প্রায় ৩ লাখ ওষুধের দোকান রয়েছে। তার মধ্যে প্রায় ৭৫ হাজার দোকান অবৈধ। লাইসেন্স বিহীনভাবে ব্যবসা করছেন অনেক ওষুধ ব্যবসায়ী। মিটফোর্ড ছাড়াও দেশে আরো ৪টি বড় ওষুধের মার্কেট রয়েছেÑ খুলনা, রাজশাহী, কুমিল্লা, নোয়াখালীর লক্ষ্মীপুর এবং চট্টগ্রামের হাটহাজারিতে। কেমিস্ট ও ড্রাগিস্ট সমিতির তথ্যে- দেশে ওষুধ কোম্পানী রয়েছে ২৪৬টি। দেশে ওষুধ উৎপাদনের মান দিন দিনই বাড়ছে। ওষুধ মালিক সমিতির সূত্রে জানা যায়, দেশের চাহিদা পূরণে ৯৭ ভাগ অবদান রাখছে দেশের তৈরি ওষুধ। তবে ঐতিহাসিক এই পাইকারি ওষুধ বাজারের সুনাম এভন আর নেই। বিভিন্ন সংবাদ তথ্যে জানা গেছে- প্রতিদিন প্রায় ৫০ কোটি টাকার ভেজাল ও নকল ওষুধ হাতবদল হয় মিটফোর্ড থেকে! দেড়শ বছরের পুরনো এই ঐতিহ্যবাহী হাসপাতাল আর দেশের অন্যতম ওষুধের পাইকারি বাজার মিটফোর্ডের সুনাম রক্ষা করার দায়িত্ব স্বাস্থ্যমন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ সরকারের।