ছেলেবেলা- তখন ও এখন

../news_img/nasifa tasnim.jpg

নাসিফা তাসনীম ::
আমি যখন ছোট ছিলাম, দিনভর সবাইকে জ্বালানো ছিল আমার জাতীয় কাজ। আন্তর্জাতিক কাজ ছিল- বিয়েবাড়ি দেখলেই বিয়ে সম্পর্কিত যত ছড়া রয়েছে, সব একেক করে বলতে থাকা এবং ওখানে যাওয়ার জন্য বায়না ধরা। আমি সারাদিন খেলাতাম, বাসার সামনে মোটামুটি ভালই জায়গা ছিল। চারপাশে অনেক গাছপালা ছিল, দাদু শখ করে লাগিয়েছিলেন। আমার খেলার নিত্যসঙ্গী ছিলেন আমার প্রয়াত দাদা। তিনি আমাকে খেলাচ্ছলে অনেক কিছু শিখিয়েছিলেন- কোনটি কি পাখি, গাছের নাম, খেলনা কিভাবে গুছিয়ে রাখতে হয়। বিশেষত – শুদ্ধ বাংলা ভাষায় কথা বলা, উচ্চারণ, বাচনভঙ্গি ইত্যাদি শিখিয়েছিলেন কবিতা শেখানোর মাধ্যমে। অনেকগুলো কবিতা শিখেছিলাম যার কিয়দংশ বর্তমানে মনে আছে। প্রতিবেশীদের অনেক আদর ও ভালোবাসা পেয়েছিলাম, পাড়ার মোটামুটি সবাইকে চিনতাম। তাই তখনো একাকিত্তের সাথে পরিচয় হয়নি।  কম্পিউটার, ল্যাপটপ,ভিডিও গেমসের যুগ ছিল না- তাই দুষ্টুমি, মারামারির আসল স্বাদ ঘোলে মেটাতে হয়নি।

বর্তমানে শিশুদের দেখলে আমার খুব কষ্ট হয়। তারা ছেলেবেলা কি জানেনা। গাছের নাম, মাছের নাম, ফুলের নাম জানেনা। বৌছি, গোল্লাছুট খেলতে পারেনা। খেলাচ্ছলে কিভাবে কবিতা শেখা যায়, কিভাবে বন্ধুত্ব করতে হয়, কিভাবে কোমর বেঁধে গলার রগ ফুলিয়ে ঝগড়া করতে হয়- জানেনা। এতসব মজার কাজগুলো না জানার পেছনে কারা দায়ী- আমরা, আমাদের সমাজ নাকি প্রযুক্তি??

একটু পেছন ফিরে দেখি। ’৯০ সাল থেকে চলমান বছরের চিত্র- খুব দ্রুত পরিবর্তন হয় মানুষের জীবনযাত্রায়। মাঠের সংখ্যা কমতে থাকে, পুকুর- খাল-বিল ভরাট করে সেখানে ডেভেলপারদের কল্যাণে বিভিন্ন চিত্তাকর্ষক নকশার দালান উঠতে থাকে, বহিরাগত টিভি চ্যানেলের সংখ্যা বাড়তে থাকে, ইন্টারনেটের কল্যাণে ‘সামাজিক যোগাযোগ’ সাইটসমূহ – ফেসবুক, টুইটার, হোয়াটসএ্যাপ, ভাইবার সহ আরও বিভিন্ন এ্যাপ্ স এর সাথে পরিচয় ঘটে, বিভিন্ন মারাত্মক গেমস উদয় হয়। গাছ, পাখি, ফুল, পানি, মাছ- সবকিছুর সংখ্যা আশঙ্কাজনক হারে কমতে থাকে, ধীরে ধীরে তাদের জায়গা হয় ইতিহাসের পাতায়, অথবা জাদুঘরে। আগ্রাসন থেকে বাঁচেনি তারাও। পোশাক, ব্যবহার,আচার-আচরনে অভাবনীয় পরিবর্তন হয়। ‘মুল্যবোধ’, ‘মনুষ্যত্ব’, ‘সময়ানুবর্তিতা’, ‘শৃঙ্খলাবোধ’, ‘ধর্মভীরুতা’, ‘ভ্রাতৃত্ব’ – এখন ডিকশনারি বা বইয়েই ঠাই পায়। সংস্কৃতি-সম্প্রীতিতেও ‘হারিয়ে গেছি’ সুর বাজে। ভাষার প্রতি ভালোবাসা, দেশের প্রতি ভালোবাসা আজ প্রশ্নবিদ্ধ। কিন্তু এমনটা কি হবার কথা ছিল?

এযুগের কচিকাঁচাদের আর কিছু দিতে পারুন কি না পারুন- অন্তত তাদেরকে একটু গ্রামে বেড়াতে নিয়ে যেতে পারেন, নদীতে নৌকা চড়াতে পারেন, দেশের সব ঐতিহাসিক ও দর্শনীয় স্থানগুলোতে ঘুরতে নিয়ে যেতে পারেন। এতে তাদের জ্ঞানবৃদ্ধি হবে, পাঠ্যবইয়ের সাথে মিলিয়ে নিতে পারবে, পড়ার আগ্রহ তৈরি হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তির জন্য যে চাপ সৃষ্টি করা হয়, তা শিশুর মেধাবিকাশে অন্যতম বাধা। অমনোযোগিতা, অনাগ্রহ – এসব সমস্যার উদ্ভব হয় অত্যধিক চাপের দরুন। এই অসুস্থ প্রতিযোগিতা ও আগ্রাসন তাদের নিয়ে যাচ্ছে আরও বড় কোন বিপর্যয়ের দিকে, যার জন্য হয়তো আমরা প্রস্তুত নই। তাই আমার মতে- বড় কোন ঝড় আসার আগে  তা মোকাবেলার পথ তৈরি করে নেয়া মঙ্গল।