সাবেক অর্থমন্ত্রী শাহ এএমএস কিবরিয়ার ৮৫ তম জন্মবার্ষিকী আজ

../news_img/ams-kibria.gif

শাহাবুদ্দিন শুভ:: আজ অর্থনীতিবিদ, কূটনীতিক, রাজনীতিক, লেখক ও মৃদুভাষণ প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক শাহ  এ এম এস কিবরিয়ার জন্মদিন। আজকের এই দিনে হবিগঞ্জ জেলার নবীগঞ্জ থানাধীন জালালসাফ গ্রামে জন্ম গ্রহণ করেন শামস কিবরিয়া। মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে আজ বনানীকবরস্থানে মরহুমের রূহের মাগফেরাত কামনা করে ফাতেহা পাঠ ও মোনাজাত করা হয়।

যদিও পাঠক জানেন তবুও শাহ এ এম এস কিবরিয়ার শিক্ষা, কর্মজীবন, রাজনৈতিক ও লেখালেখির বিষয়ে সংক্ষেপে কিছু আলোকপাত করছি।   শাহ এ.এম.এস (১৯৩১-২০০৫)  অর্থনীতিবিদ, কূটনীতিক, রাজনীতিক, লেখক ও সম্পাদক। পুরো নাম শাহ আবু মোহাম্মদ শামসুল কিবরিয়া। ১৯৩১ সালের ১ মে হবিগঞ্জের নবীগঞ্জ থানাধীন জালালসাফ গ্রামে তাঁর জন্ম। পিতা শাহ ইমতিয়াজ আলী ছিলেন সিলেট অঞ্চলে প্রাথমিক শিক্ষা প্রসারের অন্যতম উদ্যোক্তা। শামসুল কিবরিয়া মৌলভী বাজার সরকারী উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ১৯৪৭ সালে ম্যাট্রিকুলেশন এবং ১৯৪৯ সালে সিলেট মুরারীচাঁদ কলেজ থেকে আইএ পাশ করেন। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে ১৯৫২ সালে বি.এ (অনার্স) এবং ১৯৫৩ সালে এম.এ ডিগ্রি লাভ করেন। উভয় পরীক্ষায় তিনি প্রথম শ্রেণীতে প্রথম স্থান অধিকার করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালে তিনি ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে যোগ দেন এবং দেড় মাস কারাবরণ করেন।

শাহ এ.এম.এস কিবরিয়া ১৯৫৪ সালে পাকিস্তান সেন্ট্রাল সুপিরিয়র সার্ভিস পরীক্ষায় প্রথম স্থান অধিকার করে পররাষ্ট্র সার্ভিসে যোগ দেন। কূটনৈতিক দায়িত্ব পালনের লক্ষ্যে তিনি বোস্টনে ফ্লেচার স্কুল অব ল অ্যান্ড ডিপ্লোম্যাসি ও লন্ডনে ব্রিটিশ পররাষ্ট্র  অফিস থেকে প্রশিক্ষণ  গ্রহণ করেন এবং প্যারিসে ফরাসী ভাষা শিক্ষার কোর্স সম্পন্ন করেন। ১৯৫৭ থেকে ১৯৭০ সাল পর্যন্ত শাহ কিবরিয়া পাকিস্তান কূটনৈতিক মিশনের সদস্য হিসেবে কলকাতা, কায়রো, জাতিসংঘ মিশন, নিউইয়র্ক, তেহরান এবং জাকার্তায় দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তী সময়ে তিনি ইসলামাবাদে পররাষ্ট্র মন্ত্রনালয়ে এবং ওয়াশিংটনে পাকিস্তান দূতাবাসে কমর্রত ছিলেন। শাহ কিবরিয়া বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় ১৯৭১ সালের ৪ আগস্ট ওয়াশিংটনে পাকিস্তান  দূতাবাস ত্যাগ করে মুজিবনগর সরকারের  প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করেন। ওয়াশিংটনে বাংলাদেশ মিশন সংগঠনে তিনি সক্রিয় ভূমিকা রাখেন এবং বহির্বিশ্বে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে জনমত গঠনে কাজ করেন।

তিনি মার্কিন সিনেটর ও কংগ্রেস সদস্য এবং ওয়াশিংটনের সিনিয়র কলামিস্টদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের যৌক্তিকতা তুলে ধরেন। সে সময়ে তিনি ওয়াশিংটন থেকে একটি বুলেটিন প্রকাশ করতেন, যার মাধ্যমে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় বাংলাদেশের যুদ্ধপরিস্থিতি, মুক্তিযোদ্ধাদের কার্যক্রম এবং যুদ্ধকালীন অবস্থায় হানাদার বাহিনী কর্তৃক অবরুদ্ধ বাংলাদেশের জনগণের প্রকৃত অবস্থা সম্পর্কে অবহিত হতে পারত।

বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর শাহ এ.এম.এস কিবরিয়া ১৯৭২ সালের জানুয়ারি মাসে পররাষ্ট্র মন্ত্রনালয়ের রাজনীতি সংশ্লিষ্ট বিভাগে ডিরেক্টর জেনারেল পদে যোগ দেন এবং মার্চ মাসে  পররাষ্ট্র সচিব পদে পদোন্নতি লাভ করেন। তিনি ১৯৭৩ থেকে ১৯৭৮ সাল পর্যন্ত অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড, ফিজিতে হাই কমিশনার এবং জাতিসংঘের ইউরোপীয় অফিস জেনেভায়  বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি ছিলেন। ১৯৭৮ সালে তিনি পররাষ্ট্র সচিব পদে প্রত্যাবর্তন করেন। এ সময়ে তিনি সার্কের প্রাথমিক ধারণাপত্রের  খসড়া তৈরি করেন। ১৯৭৯ সালে কিবরিয়া  গ্রুপ-৭৭ এর প্রস্ত্ততিমূলক কমিটির নির্বাচিত চেয়ারম্যান হিসেবে ম্যানিলায় অনুষ্ঠিত জাতিসংঘের বাণিজ্য এবং উন্নয়ন বিষয়ক সম্মেলনে (আঙ্কটাড) অংশ নেন। ১৯৮১ সালের ৩১ এপ্রিল পর্যন্ত তিনি পররাষ্ট্র সচিব হিসেবে কর্মরত ছিলেন।

শাহ কিবরিয়া ১৯৮১ সালের মে মাস থেকে ১৯৯২ সালের মার্চ পর্যন্ত জাতিসংঘের  এশিয়া ও প্যাসেফিকের অর্থনৈতিক ও সামাজিক কমিশন (এসকাপ)-এর নির্বাহী সচিব হিসেবে আন্ডার সেক্রেটারী জেনারেলের মর্যাদায় অধিষ্ঠিত ছিলেন। তিনি ১৯৮৬ সালে জাতিসংঘ মহাসচিবের বিশেষ প্রতিনিধি হিসেবে কম্বোডিয়ান হিউম্যানিটারিয়ান রিলিফ প্রোগ্রামে অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করেন।

শাহ কিবরিয়া ১৯৯২ সালে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগে যোগ দেন। তাঁকে দলের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য করা হয়।  ১৯৯৪ সালে তাঁকে আওয়ামী লীগ সভাপতির রাজনৈতিক উপদেষ্টা নিয়োগ করা হয়। ১৯৯৬ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত তিনি শেখ হাসিনার মন্ত্রিসভায় অর্থমন্ত্রীর  দায়িত্ব পালন করেন। ২০০১ সালে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি হবিগঞ্জ-৩ আসন থেকে সংসদ-সদস্য নির্বাচিত হন।

শাহ কিবরিয়া অর্থমন্ত্রী হিসেবে পাঁচ বছর দায়িত্ব¡ পালনকালে বিভিন্ন কর্মসূচি হাতে নেন। এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো: বৃদ্ধ ভাতা, বিধবা ভাতা, ক্ষুদ্র পরিসরের কৃষিঋণ কার্যক্রম, স্বল্পব্যয়ে গৃহায়ন স্কীম, যুব কর্মসংস্থান কর্মসূচি, এবং ব্যাংকিং ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার কর্মসূচি। তথ্যপ্রযুক্তি সামগ্রীর  শুল্কমুক্ত আমদানির ক্ষেত্রেও তিনি কার্যকর পদক্ষেপ নেন। ১৯৯৮ সালের বন্যার প্রভাব মোকাবেলায় তিনি কাউন্টার সাইক্লিক্যাল পলিসি গ্রহণ করেন। তিনি উন্নয়নের ক্ষেত্রে কৃষিমুখী অর্থনীতির প্রসারের উদ্যোগ নেন এবং তা দ্রব্যমূল্যের স্থিতিশীলতা আনয়নে সহায়ক হয়।

শাহ এ.এম.এস কিবরিয়া ১৯৯৭ সালে এশিয়া ও প্যাসেফিকের অর্থনৈতিক ও সামাজিক কমিশন (এসকাপ)-এর চেয়ারম্যান এবং ১৯৯৮ সালে ইন্টারন্যাশনাল ফান্ড ফর এগ্রিকালচারাল ডেভেলপমেন্ট (ইফাদ)-এর গর্ভনিং কাউন্সিলের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। তিনি বাংলাদেশ ফাউন্ডেশন ফর ডেভেলপমেন্ট রিসার্চ-এর চেয়ারম্যান এবং বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট  অব ল’ অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল অ্যাফেয়ার্স- এর অল্টারনেট চেয়ারম্যান ছিলেন।

এ এম এস কিবরিয়া বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক বিষয়ে কলামিস্ট ছিলেন। তিনি ছিলেন সাপ্তাহিক মৃদুভাষণ পত্রিকার প্রতিষ্ঠাতা ও সম্পাদক। তাঁর রচিত গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে: মৃদুভাষণ (১৯৯৭),  The Emerging New World Order (১৯৯৯),  Bangladesh at the Crossroads (1999)(১৯৯৯) এবং চিত্ত যেথা ভয় শূণ্য।


২০০৫ সালের ২৭ জানুয়ারি হবিগঞ্জ সদর উপজেলার বৈদ্যের বাজারে গ্রেনেড হামলায় শিকার হন সাবেক অর্থমন্ত্রী শাহ এএমএস কিবরিয়া। আহত অবস্থায় চিকিৎসার জন্য ঢাকা নেয়ার পথে তিনি মারা যান।