স্বাধীনতা ঘোষণার চিন্তা ৩ মার্চেই ওয়াশিংটনকে জানানো হয়

../news_img/Shah AMS kibria.jpg

মিজানুর রহমান খান
বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণার পরিকল্পনা নিয়ে একটি চমকপ্রদ তথ্য উদ্ঘাটিত হলো। আনুষ্ঠানিক স্বাধীনতার ঘোষণা ২৬ নাকি ২৭ মার্চ—এ নিয়ে বিতর্ক চলছেই। এই প্রেক্ষাপটে সম্ভবত এই প্রথম কোনো মার্কিন দলিল থেকে জানা গেল, একাত্তরের ৩ মার্চেই বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণার চিন্তা এবং ওয়াশিংটনে বাংলাদেশ দূতাবাস খোলার পরিকল্পনা প্রকাশ করা হয়েছিল।
মার্কিন কূটনীতিক ক্রেইগ ব্যাক্সটারের কাছে আওয়ামী লীগের পক্ষে এই তথ্য প্রকাশ করেছিলেন পাকিস্তান দূতাবাসের বাঙালি পলিটিক্যাল কাউন্সিলর এবং পরে অর্থমন্ত্রী শাহ এ এম এস কিবরিয়া। ব্যাক্সটার পরে দক্ষিণ এশীয় বিশেষজ্ঞ হিসেবে বিশেষ খ্যাতি অর্জন করেন এবং বাংলাদেশের বন্ধু হিসেবে পরিচিত হন। ব্যাক্সটার একাত্তরে পররাষ্ট্র দপ্তরে জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা ছিলেন। ২০০৮ সালে তিনি মারা গেছেন। অধ্যাপক ব্যাক্সটার বাংলাদেশ বিষয়ে একাধিক বই লিখেছেন।

বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ঠ ও তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. কামাল হোসেন মনে করেন, ‘এই নতুন তথ্য উদ্ঘাটন একটা গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক ঘটনা। মার্কিন সরকারি নথি থেকেই এটা আমরা জানছি। সুতরাং এর সত্যতা নিয়ে কোনো বিতর্কের সুযোগ দেখি না।’

প্রথম আলোর কাছে এ বিষয় দলিলটির মূল নথির আলোকচিত্র রয়েছে। এতে দেখা যায়, মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরে ওই বার্তা পৌঁছাতে ঢাকা থেকে একজন বার্তাবাহক ওয়াশিংটনে গিয়েছিলেন। কিন্তু তাঁর পরিচয় জানা যায়নি।
কামাল হোসেন বলেন, আওয়ামী লীগের কে বা কাকে এ বিষয়ে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল, তা তাঁর অজানা ছিল। তিনি অবশ্য প্রথম আলোকে বলেন, ‘৩ মার্চ ডাকা জাতীয় পরিষদের অধিবেশন ১ মার্চে ইয়াহিয়া স্থগিত করেন। এ সময় বঙ্গবন্ধু একটি ব্রিফ তৈরি করতে নির্দেশ দেন এবং দেশের বাইরে যে যাবেন, তাঁর কাছেই তা দিয়ে দেওয়ার নির্দেশ দেন। আমি আবু সাঈদ চৌধুরী ও হোসেন আলীর কাছে এর দুটি অনুলিপি পৌঁছে দিয়েছিলাম।’ এক প্রশ্নের জবাবে তিনি স্বাধীনতা ঘোষণার সিদ্ধান্ত মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরকে জনাব কিবরিয়ার অবহিত করার বিষয়টিকে ‘সন্দেহাতীতভাবে মুজিবের জ্ঞাতসারে’ এবং মুজিবের পরিকল্পনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বলে মন্তব্য করেন।

উল্লিখিত মার্কিন নথিটির অবিকল তরজমা নিচে তুলে ধরা হলো:
গোপনীয় তারবার্তা। প্রাপক মার্কিন দূতাবাস, ইসলামাবাদ, মার্কিন কনসাল ঢাকা। বিষয়: স্বাধীনতা বিষয়ে বাঙালি পাক কর্মকর্তা। তারবার্তা প্রস্তুতকারী ব্যাক্সটার। নং স্টেট ০৩৬২৫৫।

‘১. ১৯৭১ সালের ৩ মার্চ ব্যাক্সটারের সঙ্গে মধ্যাহ্নভোজ করেন পলিটিক্যাল কাউন্সিলর কিবরিয়া। এ সময় তিনি স্পষ্ট করেন যে ডেপুটি চিফ অব মিশন করিম [এস এ করিম, বাংলাদেশের প্রথম পররাষ্ট্রসচিব] এবং পাকিস্তান দূতাবাসের অন্য বাঙালি কর্মকর্তা এবং তিনি তাঁর নিজের পক্ষে “বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণার” পরিপ্রেক্ষিতে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর এবং বাঙালি কর্মকর্তাদের ভবিষ্যৎ সম্পর্ক কী হবে, সে বিষয়ে কথা বলতে এসেছেন। তিনি উল্লেখ করেন, বাঙালি কর্মকর্তারা ইতিমধ্যেই সম্মত হয়েছেন যে স্বাধীনতার ঘোষণার খবর ওয়াশিংটনে পৌঁছামাত্রই করিম ঢাকার নির্দেশনার অপেক্ষায় না থেকে [স্বাধীন বাংলাদেশ] দূতাবাস প্রধানের দায়িত্ব নেবেন। তাঁদের মূল উদ্বেগ হচ্ছে, পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী পূর্ব পাকিস্তানের বিচ্ছিন্নতা দমনে যে অতিরিক্ত [সম্ভাব্য] সেনা অভিযান চালাবে, এর ফলে মাত্র কয়েক দিনের জন্য একটা ছেদ নয়, বরং তা দীর্ঘ বিলম্ব সৃষ্টি করবে। কিবরিয়া দ্রুত মধ্যাহ্নভোজের ব্যবস্থা করেন।

২. এ বিষয়ে এক প্রশ্নের জবাবে কিবরিয়া পরিস্থিতি পর্যালোচনা করেন এবং আওয়ামী লীগের সামনে থাকা বিকল্পগুলো উল্লেখ করেন এবং বলেন, তিনি ও তাঁর সহকর্মীরা এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন যে (“আর পিছিয়ে না আসার পর্যায়ও অতিক্রান্ত হয়েছে”) এখন আর অন্য বিকল্প নেই। সুনির্দিষ্টভাবে কিবরিয়া আরও বলেন, এদিন সকালেই ঢাকা থেকে এক ভদ্রলোক এসেছেন। (কিবরিয়া বলেন, তিনি আওয়ামী লীগের কর্তৃপক্ষীয় বক্তব্য নিয়েই এসেছেন) তিনি এই বার্তা নিয়ে এসেছেন যে ক্রান্তিকালের জন্য প্রস্তুতি এখনই গ্রহণ করা উচিত হবে। পরিবর্তিত পরিস্থিতির মিশ্রণ এবং [ঢাকার] এই বার্তা বিবেচনায় নিয়ে দূতাবাসের বাঙালি কর্মকর্তারা বিশ্বাস করতে শুরু করেছেন যে স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের লক্ষ্যে ভিত্তি তৈরির কাজ এখনই শুরু করতে হবে।

৩. রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে বৈঠকে বসতে ইয়াহিয়ার উদ্যোগকে কিবরিয়া যথেষ্ট বিলম্বিত বলে উল্লেখ করেন। সেই সঙ্গে তিনি যোগ করেন যে বাঙালিরা এমন পর্যায়ে পৌঁছে গেছে, তারা আরও একটি সপ্তাহের অপেক্ষা বরদাশত করবে না। এমনকি শেখ মুজিবের ৭ মার্চের ভাষণের আগেই এ বিষয়ে উদ্যোগ নিতে জনগণ সম্ভবত চাপ সৃষ্টি করবে এবং স্বাধীনতার ঘোষণা ৭ মার্চের পরে যাবে না।
কিবরিয়া আশঙ্কা করেন, মুজিব ইতস্তত করবেন এবং সে কারণে “বাম চরমপন্থীদের” কাছে তিনি তাঁর নেতৃত্ব হারাবেন। “বাম চরমপন্থীরা” জনতাকে নিজেদের উদ্দেশ্যসাধনে কাজে লাগাবে। কিবরিয়া আরও গভীরভাবে উদ্বেগ প্রকাশ করেন যে পাকিস্তানের সেনাবাহিনী কথিতমতে ইতিমধ্যেই বাঙালি পুলিশকে নিরস্ত্র করেছে এবং ইতিমধ্যে কতিপয় দমনমূলক পদক্ষেপ (আজকের সংবাদপত্র দ্রষ্টব্য) নিয়েছে। তিনি অনুমান করেন, পাকিস্তানের সেনাবাহিনী “আমার দেশবাসীর প্রতি কসাইগিরি” চালাতে পারবে বটে। তবে তাতে বড়জোর কার্যকর স্বাধীনতা অর্জন বাধাগ্রস্ত হবে, কিন্তু তাকে স্তব্ধ করা যাবে না। বরং ‘বর্বরোচিত’ কাণ্ড ঘটালে তা বাঙালি প্রতিরোধকে আরও কঠিন করে তুলবে। তিনি পৌনঃপুনিকভাবে গুরুত্বারোপ করেন যে [স্বাধীনতা ঘোষণা থেকে] এখন আর পিছিয়ে আসা সম্ভব নয়। তাঁর এই দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে অন্যরাও সহমত পোষণ করেন।

৪. কিবরিয়া জানতে চান, বাংলাদেশ স্বাধীনতার ঘোষণা দিলে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের অবস্থান কী হবে? তিনি এটা বুঝতে পারছেন যে বাংলাদেশকে স্বীকৃতি প্রদানের পরে [মার্কিন] পররাষ্ট্র দপ্তরের সঙ্গে যোগাযোগ এবং সম্পর্ক স্থাপন নিয়ে কোনো প্রশ্ন থাকবে না। কিন্তু তাঁর উদ্বেগটা হলো, বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা এবং [যুক্তরাষ্ট্র সরকারের] স্বীকৃতি প্রদান (ওপরে যেভাবে উল্লিখিত) বিলম্বিত হতে পারে, তার অন্তর্র্বতীকালে পররাষ্ট্র দপ্তরের সঙ্গে তাঁদের সম্পর্কটা কী দাঁড়াবে। ব্যাক্সটার ইঙ্গিত দেন যে আমরা স্বাভাবিকভাবেই এখানে এবং ঢাকার মধ্যে অনানুষ্ঠানিক সম্পর্ক বজায় রাখব। কিন্তু এখানে কোনো আনুষ্ঠানিক যোগাযোগ রক্ষা করা সমীচীন হবে না। কিবরিয়া যুক্তিটি গ্রহণ করলেন। তবে ভবিষ্যতে তাঁরা যে অনানুষ্ঠানিক যোগাযোগ করতে পারেন, সেই সম্ভাবনা কিবরিয়া নাকচ করেননি। তিনি একই সঙ্গে ঢাকা ও ওয়াশিংটনের মধ্যে যোগাযোগের বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। এবং জানতে চান যে চরম প্রয়োজনে পররাষ্ট্র দপ্তরের চ্যানেল ব্যবহার করা যাবে কি না। ব্যাক্সটার সরাসরি এর উত্তর এড়িয়ে বলেছেন, এটা অনিয়মিত, তবে যখন অনুরোধ করা হবে, সেই সময় ও বিদ্যমান পরিস্থিতির আলোকে তা বিবেচনা করা হবে।

৫. কিবরিয়া কিছু প্রশাসনিক বিষয় নিয়েও কথা বলেন। দৃষ্টান্তস্বরূপ, বাংলাদেশ স্বাধীনতা ঘোষণা করলে পশ্চিম পাকিস্তান তা চ্যালেঞ্জ করবে। তিনি ও তাঁর সহকর্মীরা বিশ্বাস করেন, সেই পরিস্থিতিতে [ওয়াশিংটনে নিযুক্ত পাকিস্তানের] রাষ্ট্রদূত হিলালি তখন পাকিস্তান দূতাবাস থেকে বাঙালি কূটনীতিকদের বহিষ্কারের নির্দেশনা পাবেন এবং তা অনুসরণ করবেন। তিনি তাঁদের বেতন-ভাতাও বন্ধ করে দেবেন। কিবরিয়া এ বিষয়ে কোনো সহায়তা চাননি। কিন্তু বলেছেন, দূতাবাসের মধ্যে বাঙালিরা তখন একটা “পুলিশ পরিস্থিতি” সৃষ্টি করতে পারে। ব্যাক্সটার ইঙ্গিত দেন যে সেটা হবে সবচেয়ে দুর্ভাগ্যজনক এবং তা যুক্তরাষ্ট্র সরকারকে একটা জটিল অবস্থার মুখে ফেলে দেবে। কিবরিয়া এ বিষয়টি বুঝতে পেরেছেন এবং বলেছেন, তিনি তাঁর সহকর্মীদের এ ধরনের পরিস্থিতি এড়িয়ে চলার পরামর্শ দেবেন।

৬. কিবরিয়া আলোচনার পুরো সময় একাগ্রচিত্ত ছিলেন। কিবরিয়া বলেন, তিনি ও অন্যদের পাকিস্তানি হিসেবে থাকাটাকেই প্রাধান্য দেওয়া উচিত ছিল। কিন্তু তাঁরা এটা দেখতে পাচ্ছেন না যে পশ্চিম পাকিস্তান গণতন্ত্রের পথে যাবে এবং সে কারণে একমাত্র বিকল্প হিসেবে এখন তাঁরা বাংলাদেশের স্বাধীনতার প্রতি সমর্থন দিচ্ছেন। তিনি আরও বলেন, সবার জন্যই সাম্প্রতিক দিনগুলো কঠিন হয়ে পড়েছে এবং নিকট ভবিষ্যতে কোনো সান্ত্বনা নেই। তিনি কথার ইতি টেনে এই মন্তব্য করেন, “আমরা যদি ব্যর্থ হই, তাহলে আমরা বিশ্বের সবচেয়ে অসুখী মানুষে পরিণত হব।’” শেষ।

উল্লেখ্য, এই নথিটি অনুমোদন করেছেন পররাষ্ট্র দপ্তরের দক্ষিণ এশিয়াবিষয়ক ডেপুটি অ্যাসিস্ট্যান্ট সেক্রেটারি ক্রিস্টোফার ভ্যান হোলেন। তাঁর ছেলে কংগ্রেসম্যান ক্রিস ভ্যান হোলেন বর্তমানে মার্কিন কংগ্রেসে বাংলাদেশ ককাসের প্রভাবশালী সদস্য। তাঁর বাবা ৯০ বছর বয়সে গত ৩০ জানুয়ারি মারা যান। ৩১ জানুয়ারি ২০১৩ ওয়াশিংটন পোস্ট এক শোকগাথায় বলেছে, ‘ভিয়েতনাম যুদ্ধ চলতে থাকলেও একাত্তরের বাংলাদেশ সংকট মোকাবিলা করতেই ভ্যান হোলেন তাঁর সর্বশক্তি নিঃশেষ করেছিলেন।’

জনাব কিবরিয়া ২০০৬ সালে ইউপিএল প্রকাশিত তাঁর স্মৃতিকথায় লিখেছেন, ‘মার্চ মাসের গোড়া থেকেই আমি ও আমার সহকর্মীরা যুক্তরাষ্ট্রে স্বাধীন বাংলাদেশের দূতাবাস খোলা সম্পর্কে বিভিন্ন পরিকল্পনা করেছিলাম।’

দৈনিক প্রথম আলো,  ২৬.০৩.২০১৩