শুভ নববর্ষ

../news_img/images (3).jpg

আজ পহেলা বৈশাখ, বাংলাসনের প্রথম মাসের প্রথম দিন, শুভ নববর্ষ। যাত্রা শুরু হলো ১৪২২ সালের। আমাদের জাতীয় ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও অর্থনীতির সঙ্গে বাংলাসনের সম্পর্ক অচ্ছেদ্য। অতীতে হিজরী বর্ষপঞ্জি অনুসারে সন-তারিখ গণনার যে রেওয়াজ প্রচলিত ছিল, সে অনুযায়ী খাজনা আদায়ের বিষয়টি সামঞ্জস্যপূর্ণ না হওয়ায় মুঘল সম্রাট আকবর নতুন সনের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন। সে মোতাবেক তারই নির্দেশে আমীর ফতেহ উল্লাহ শিরাজী বাংলাসনের উদ্ভাবন করেন। ব্রিটিশ শাসনপূর্বকালে আমাদের দেশে হিজরী ও বাংলাসন একই সঙ্গে চালু ছিল। ব্রিটিশ যুগে খ্রিস্টীয় বর্ষপঞ্জি চালু হয়। সেই থেকে এখন পর্যন্ত এই তিন সনই চালু আছে। ধর্মীয় অনুষ্ঠানাদির ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয় হিজরী সন। গ্রামীণ অর্থনীতি, জীবনযাত্রা, ফসল বোনা, ফসল কাটা ইত্যাদি ক্ষেত্রে বাংলাসন অনুসৃত হয়। অন্যান্য ক্ষেত্রে অনুসৃত হয় খ্রিস্টীয় সন। দীর্ঘকাল ধরে ব্যবসায়ীরা পহেলা বৈশাখকে নতুন হিসাব খোলা বা হাল খাতার দিন হিসেবে পালন করে আসছে। এ দিনে গ্রামীণ সমাজে মেলার আয়োজন আগেও ছিল, এখনও আছে। এসব মেলায় নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যসহ মিষ্টি-মিঠাই বিক্রি হয়। খেলাধুলারও ব্যবস্থা করা হয়ে থাকে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে শহরে সাড়ম্বরে পহেলা বৈশাখ বা নববর্ষ উদযাপিত হচ্ছে। এ জন্য থাকছে নানা আয়োজন। বাংলা নববর্ষ এখন সার্বজনীন একটি জাতীয় উৎসবে পরিণত হয়েছে। এক সময় ধারণা করা হতো, এটি হিন্দু সম্প্রদায়ের একটি উৎসব। এ কথা সত্য নয়। মুঘল শাসনামলে বাংলাসনের উদ্ভব এবং এর ভিত্তি হলো হিজরী। হিজরীর সঙ্গে এর পার্থক্য হলো, হিজরী চান্দ্রসন এবং বাংলা সৌরসন, যার সঙ্গে খ্রিস্টীয় সনের মিল রয়েছে। এর মাস ও দিনের নাম এসেছে প্রাচীন উৎস থেকে। কাল বা সময় অবিভাজ্য ও প্রবাহমান হলেও আমরা দিন, মাস ও বছরের হিসাবকালের একটি অংশকে মূল্যায়ন ও বিবেচনা করি আমাদেরই প্রয়োজনে। সেই হিসাবে বছর-কালের মূল্যায়ন একটি রীতিতে পরিণত হয়েছে।

 

নববর্ষ যেহেতু সার্বজনীন জাতীয় উৎসব, সুতরাং ধর্ম, বর্ণ, গোত্র নির্বিশেষে সকল মানুষের জন্য এটা একটা প্রধান আকর্ষণ। বলা বাহুল্য, নববর্ষ উদযাপন অতীতে যেভাবেই হোক না কেন, এখন হচ্ছে জাতীয় উৎসবের আমেজে। অনেক দেশ-জাতিরই নিজস্ব সন ও নববর্ষ নেই। বাংলাদেশ ও তার জনগণের বিশেষ সৌভাগ্যই বলতে হবে, বাংলাদেশের একটি নিজস্ব সন আছে, আছে জনগণের নিজস্ব নববর্ষ। এই জাতীয় উৎসবে তাই জাতীয় ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি এবং বিশ্বাস ও মূল্যবোধের প্রতিফলন থাকা একান্তভাবেই অপরিহার্য। লক্ষ্য করা যাচ্ছে, এ উৎসবকে কেন্দ্র করে আলপনা সংস্কৃতির চর্চা বাড়ছে। বাদ্য-বাজনার সঙ্গে জীব-জন্তুর মুখোশ পরে উৎকট নৃত্যের দৌরাত্ম্য বাড়ছে। এসব বাংলাদেশর বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর সংস্কৃতি ও মূল্যবোধের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। এসব বিদেশি-বিজাতীয় সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের অংশ। এগুলোকে আমাদের জাতীয় সংস্কৃতির অংশ বলে তুলে ধরা হচ্ছে। এই মনোভাব ও প্রবণতা উদ্বেগজনক। ধর্ম সংস্কৃতির উৎস। যে সংস্কৃতি জনগণের ধর্মীয় মূল্যবোধের সঙ্গে সাংঘর্ষিক, সে সংস্কৃতি তার জাতীয় সংস্কৃতি হতে পারে না। এদিকটি আমাদের সতর্কতার সঙ্গে খেয়াল রাখতে হবে। বাংলা নববর্ষ অপসংস্কৃতি ও ভিন্ন সংস্কৃতি প্রতিরোধের হাতিয়ারে পরিণত করতে হবে।

পরিশেষে, আমরা নববর্ষে দেশবাসীসহ আমাদের পাঠক, সমর্থক, পৃষ্ঠপোষক, শুভানুধ্যায়ীদের আন্তরিক শুভেচ্ছা জানাই।