আমি কেন বলি নি

../news_img/nasifa tasnim.jpg

নাসিফা তাসনীম ::
সুয়েজের সাথে শুশুস্রামন্ডিত সুলতান সাহেবের মিলের চেয়ে অমিল বেশি হলেও কিভাবে সে তাঁর পরমাত্মীয় - তা রহস্যজনক বলে অনেকের বদ্ধমূল ধারণা। চাকরি থেকে অবসর গ্রহণ করলেও সেই চিরাচরিত অভ্যাসগুলো আজও ছাড়তে পারেননি- পাতলা নেটের শাড়িতে জড়ানো আবছা দেহাবয়বের মত ধুসর ভোরে ঘুম থেকে উঠে প্রার্থনা সেরে, চা খেয়ে হাঁটতে বের হওয়া, এরপর বাসায় এসে গোসল করে অফিসে দৌড়।

নাসির আলির নাস্তা ছাড়া তাঁর সকাল যে বিশেষ জমে না- তা নতুন করে বলার অবকাশ রাখে না কারণ তাঁর মত দইচিড়ার কারিগর পাওয়া আজকের ধরানায় প্রায় দুষ্কর। নাসির আলির মনের কথা তাঁর হাতের ভাষায় হয়ে ওঠে পরিপূর্ণ। কিন্তু বাঁধ সাধল বয়সের সংখ্যা। হায়- সংখ্যা ‘দারিদ্র্যের দুষ্টচক্রের’ মত মানুষের গোটা জীবনচক্রই শাসন করছে কিনা! যা হোক, তিনি এরকম এক ভোরে বেরিয়েছেন হাঁটতে। কিছুদূর যাওয়ার পর দেখলেন, এক ছেলে পথের ঠিক মাঝখানে মড়ার মত লম্বা হয়ে শুয়ে আছে। তিনি যাবেন কি যাবেন না চিন্তা করছিলেন- যদি ফেঁসে যান কোন কেসে?

তখন পুলিশি ঝামেলা থেকে শুরু থেকে মুক্তি পাওয়া হবে আরেল তেলেসমাতি ব্যাপার। এসব ভাবনার ছেদ পড়ল যখন দেখলেন ছেলেটা তিড়িং করে লাফ দিয়ে উঠলো, গায়ের ধুলো ঝাড়ল, পকেটে হাতড়ে ছোট্ট টর্চলাইট বের করে আকাশের দিকে আলো ছুঁড়ে মারল। তিনি অবাক হয়ে দেখলেন তার কাণ্ডকারখানা। এরপর নিজে নিজে কিছুক্ষণ কথা বলে কয়েক লাফ দিয়ে পা মেপে ফুটপাথে হাঁটা শুরু করলো। সুলতান সাহেব ভাবলেন ‘হয়তো কোন পাগলা-প্রকৃতির’ মানুষ।

তিনি সেটা নিয়ে তেমন মাথা ঘামালেন না।তারপর সব আবার আগের মত স্বাভাবিক। সেই ঘটনাটি  প্রায় বিস্মৃত। হঠাৎ মাস দুয়েক পর আবার ঐ একই কায়দায় শুয়ে থাকতে দেখলেন ঐ ছেলেটাকে। একই ভাবে ধুয়ে আছে, এবার তার মাথাটা রাস্তার এক গর্তে ঢোকানো। গর্তে বরফের ছোট চাক রাখা, বরফ গলে পানি পড়ে রাস্তার ‘ছোট গোসল’ সম্পন্ন হচ্ছে।

‘আরে এই ছেলে করছ কি’ বলে যখন প্রায় দৌড়ে এসে দেখলেন, সে দিব্যি ঘুমোচ্ছে! কোমরে ব্যথা সত্ত্বেও নিচু হয়ে ডাকতে লাগলেন, ‘এই যে, এই ছেলে? ঠাণ্ডা লাগিয়ে মরতে চাও নাকি? কুম্ভকর্ণের ঘুম দেখছি!’ বলে হাত স্পর্শ করে দেখলেন, বেশ ঠাণ্ডা। ততক্ষণে তার ঘুমও ভেঙ্গে গেছে।

জড়ানো গলায় তার প্রথম প্রশ্ন, ‘কি হয়েছে?’ সুলতান সাহেবও জিজ্ঞাসা করলেন, ‘ব্যাপার কি? তুমি বরফের উপর ঘুমচ্ছিলে কি করে? পাগল হয়ে গেছ নাকি? তোমার কোন ঠিকানা নেই?’ প্রায় ধমকের সুরে প্রশ্নবাণ নিক্ষেপ করেই যাচ্ছেন কিন্তু ছেলেটি নির্বিকার ভঙ্গিতে একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে। কোন উত্তর না পেয়ে এবার বিরক্ত হলেন তিনি, ‘কি হল, প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছ না কেন?’ এরপর সময়ের নীরবতা। হঠাৎ ছেলেটি বলল, ‘তেমন কিছু না। আমি একটা পরীক্ষণ করছিলাম আসলে’।
ঃ কীসের পরীক্ষা?
ঃ আমি জানি আপনি বিশ্বাস করবেন না। থাক ব্যাপারটা বাদ দিন।
ঃ বিশ্বাস না করার কোন কারণ নেই।    
ঃ আমি এর আগেও বলেছি অনেককে কিন্তু কেউ বিশ্বাস করেনি, কৌতুক বলে উড়িয়ে দিয়েছে। তাই আম-
ঃ দেখো ছোকরা, তোমার সাথে আমি তর্ক করতে আসিনি।বুঝতে পারছি নিশ্চয়ই কোন অযৌক্তিক কথা বল যার দরুন কেউ বিশ্বাস করে না। আর করবেই বা কেন?
ঃ (হেসে) আবার দেখা হবে। চলি।
বলে বরফগলা পানিতে আঙুল ডুবিয়ে মুচকি হেসে চলে গেল।সুলতান সাহেব হতভম্ব হয়ে তার যাওয়ার পথে তাকিয়ে থাকলেন।
এরপর কেটে গেল প্রায় এক বছর, একবারের জন্যও তাকে তিনি দেখেননি। মাঝে মাঝে মনে মনে খুঁজতেন কিন্তু তার কোন দর্শন পাওয়া যায়না। সেপ্টেম্বরের এক মেঘলা সকালে দেখলেন তাকে- এবারও সে শুয়ে আছে, রাস্তার ধারে। মনের গহিন কোণে একটু আনন্দ, একটু উত্তেজনা, মৌমাছির মৌচাকের চারপাশে হাজার মৌমাছির মত প্রশ্ন চক্কর দিচ্ছে। কি করছে সেটা দেখার জন্য সামনে এগিয়ে যাচ্ছেন। মনের জোর যেন পায়ে স্থানান্তরিত হয়ে গেছে। তাঁকে জানতেই হবে সে কি, কেন, কোথায় তার ঠিকানা।
এসব ভাবতে ভাবতে তার পায়ের গতি বেড়ে গেল, হৃদকম্পের প্রতিটি স্পন্দন নিজ কর্ণকুহরে বাড়ি মারছে। এগিয়ে যেতে যেতে একটু দূরত্বে খেয়াল করলেন, তার মুখ সাদা, সারা শরীর যেন ইটের তলায় চাপা পড়া ঘাসের মত ফ্যাকাসে হয়ে আছে।নাকের কাছে রক্তের ধারা শুকিয়ে শক্ত হয়ে আছে। কাছে এসে নিচু হয়ে যেই আঙ্গুল স্পর্শ করলেন, তার মনে হল কেউ তার হৃদপিণ্ডকে কয়েক সেকেন্ডের জন্য থামিয়ে দিলো। চমকের রেশ কাটতেই তিনি চটজলদি নাড়ি পরীক্ষা করে কাঁপা হাতে বাসায় ফোন দিলেন এ্যাম্বুলেন্স ডাকার জন্য। গাছের পাতায় জমা শিশিরের পানির মত গড়িয়ে পড়লো কয়েক ফোঁটা অশ্রু...
ডাক্তারের রিপোর্ট অনুযায়ী সে পরলোকগমন করেছে প্রায় গভীর রাতে। কোনভাবে মাথায় প্রচণ্ড আঘাত থেকে মস্তিস্কের রক্তক্ষরণ মৃত্যুর কারণ।ডাক্তার যখন ছেলেটির অভিভাবক খুঁজছিলেন, তিনি সাড়া দেন। তিনি বিস্তারিত বলার পর তাঁর তত্ত্বাবধায়নে ছেলেটির দাফন সম্পন্ন হয়। তিনি তাঁর নাম রাখেন- সুয়েজ। চলে যাবার সময় ডাক্তার সাহেব একটি চিঠি সুলতান সাহেবকে দেন যেটা ছেলেটির পকেটে প্যান্টের পকেটে পাওয়া যায়। তিনি সেটা বাসায় নিয়ে খুললেন যাতে লেখা ছিল তার অজানা রহস্যভাণ্ডারের উত্তর-
শ্রদ্ধেয় সুলতান আনোয়ার,
শুরুতেই আপনার নাম কিভাবে জানলাম, সেটা নিয়ে আপনি নিশ্চয়ই অবাক হয়েছেন। মনে আছে, আমি বরফের চাক নিয়ে শুয়ে থাকার পর আপনি আমায় বকেছিলেন? আপনার কথা শুনে আমার হঠাৎ বাবার কথা মনে পড়ে গেল। তিনিও আমাকে মমতাভরা স্বরে বকতেন। আপনি চলে যাওয়ার পর আমি রাস্তায় গাছের আড়ালে আপনার আসার অপেক্ষা করি। এরপর আপনার পিছু নিয়ে আপনার বাসা পর্যন্ত গিয়ে আপনার সম্পর্কে জানতে পারি।আপনি আমাকে খুঁজেছিলেন, সেটাও আমি জানি। আমি আপনাকে বলেছিলাম যে আমি যা বলব আপনি তা বিশ্বাস করবেন না;এরপর মনে হল, আমার সময় প্রায় শেষ হয়ে এসেছে, কিছু কথা কাউকে বলে যাই যে আমার সাক্ষী হয়ে থাকবে :-
আমি যখন বেশ ছোট, তখন প্রায়শ দুঃস্বপ্ন দেখতাম। এবং দুর্ঘটনাক্রমে সব আমার চোখের সামনেই ঘটতো। আমার পরিবার অনেক ডাক্তারের কাছে নিয়ে অনেকবার চিকিৎসা করিয়েছে কিন্তু কিছুতেই কোন লাভ হচ্ছিল না। একসময় আমার সব আশ্রয়দাতারা একজন একজন করে মারা যেতে থাকে। প্রতিবেশী ও আত্মীয়স্বজনরা আমাকে বাসা থেকে বের করে দেয়- আমি ‘অভিশপ্ত’ – উক্ত অনুমানের উপর। রাখালহীন গরুরা যেভাবে মাঠে চরে বেড়ায়, নিরুদ্দেশের পথে হাঁটে,আমিও অনেকটা সেরকম হয়ে গেলাম।
আমি দেখতে পেতাম- কে কবে অদৃশ্য হয়ে উড়াল দেবে। আপনাদের ভাষায়- খাঁচার পাখি। তবে এখানে একটু বলে রাখছি, সেই পাখি আপনার আড়ালে ঘুরে বেড়ায় অন্য পাখিদের খাঁচায়। প্রায় সব পাখি কালো, কিন্তু আপনারটা ধূসর। এই পাখির খোঁজ আমি করছিলাম, আমি দেখেছিলাম। তাই সকালে আপনি হাঁটতে যাওয়ার সময় পাখির সন্ধান পাই, টর্চ জ্বেলে দেখি এটাই সেই পাখি কিনা। সে ধরা দেয়না তবে দেখা পেয়েছি- আমি ধন্য। আমি মাঝে অনেকদিন ছিলাম না, আপনি খুঁজেছেন। কেউ আমাকে খুঁজলে আমি কোনভাবে টের পাই। কিন্তু কি করবো- আমি যে দূরে ছিলাম! আমার দোলনা হঠাৎ মনে হল যেন নড়ছে, যা অশুভ আমার কাছে। আপনি হয়তো ভাবছেন এখানে দোলনা আসলো কোত্থেকে?
বলা হয় নি- আমার বাড়ির পিছনে একটা দোলনা ছিল, যেটায় আমি চড়তাম ছোটবেলায়। একদিন রাতে ঘুমে স্বপ্ন দেখি, দোলনাটা নড়ছে, আমাকে বারবার ফেলে দিচ্ছে। আমি বারবার ওঠার চেষ্টা করছি কিন্তু পারছি না। এরপর দেখি, সেই দোলনায় বাবার মত কে যেন বসেছে, উপরে একটি সাদা পাখি চিকচিক করে ডাকছে। আমি খুব অবাক হয়ে তাকিয়ে ছিলাম তাঁর দিকে। তিনি তিনবার দোল খেলেন, এরপর উঠে চলে গেলেন। আমার ঘুম ভেঙ্গে যায়। ঠিক তিন দিন পর বাবা মারা গেলেন।

একইভাবে আমার ছোট বোন, চাচা, চাচাতো ভাই ও আরও কিছু পরিচিত মানুষজন ওপারে পাড়ি জমালেন। আমি ভয় পেয়ে গেলাম, চেষ্টা করলাম থামাতে। পারিনি।

এরপর অনেকের কাছে ধরনা দিলাম, কেউ আমায় বিশ্বাস করেনি। অবশেষে এক সাধক আমাকে কাছে টেনে নিলেন, তিনি মুক্তির পথ দেখাতে চাইলেন। আমি তাঁর কাছে সব শিখে নিয়েছিলাম, পরিস্থিতি নিজের নিয়ন্ত্রণে আনার জন্য আমি সবই করতে পারতাম। একদিন আবার দেখলাম, দোলনাটা নড়ছে, উপরে মা বসা। মাথায় আঘাতের চিহ্ন।গুরুর কাছে ছুটে গেলাম আবার। তাঁর আদেশানু্যায়ী আমি রাত্রি তৃতীয় প্রহর হতে বরফ মাথায় দিয়ে শুয়ে থাকি গর্তে, যাতে কাটাতে পারি। হ্যাঁ আমি পেরেছিলাম। আমি বের হয়ে যাওয়ার সময় মা খুব কেঁদেছিলেন, আমার মন এতো বছর পর হঠাৎ আঁকুপাঁকু করে উঠলো। আমি ছদ্মবেশে গিয়ে দেখে আসলাম তাঁকে। তিনি বেশ ভালো আছেন।

সাধনার প্রায় শেষের পথে আপনার সাথে দেখা। নিজের অজান্তে আপনার প্রতি এক আকর্ষণ কাজ করছিল। কিন্তু কি করবো- আমার যে অনেক কাজ বাকি?

হয়তো ভাবছেন এমন কি কাজ আছে আমার? আমি ভবঘুরে জীবন বেছে নিয়েছি। আমি দেখলাম, মানুষ কলুষিত প্রাণী,তার বিষ সে অন্যদের মাঝে ঢালতে ভীষণ পছন্দ করে।এবার হয়তো বুঝতে পারছেন কেন আমার অনেক কাজ। একদিন ভীষণ ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে গিয়েছিলাম এক সাধকের ডেরায়। স্বপ্নে আপনার চেহারার এক ছেলেকে দেখলাম সেই দোলনায় বসে দোল খেতে। আমি পরের দিনই ছুটলাম। সাথে কিছু বনৌষধি নিয়ে এসেছিলাম। আপনাদের অজান্তে আমার সাথে তাকেও খাইয়েছি।এরপরও যখন কাজ হচ্ছিল না, আমি সাধনা করে জানতে পারলাম, একটা জীবন লাগবে আরেকটি জীবন বাঁচাতে। আমার চোখে ভেসে উঠলো সেই দুঃসহ দিনগুলো। আমি আমার সিদ্ধান্ত নিয়ে নিলাম।
আমি এখন হয়তো অনেক দূরে, কিন্তু আপনার কাছাকাছি থাকতে চাই। আপনার দেয়া নামটা খুব পছন্দ হয়েছে। আমি আবার আসব। বর্তমানের জন্য বিদায়।
ইতি-
‘নির্বাণ’।
চিঠিটি পড়ার শেষ পর্যায়ে ছেলের গলা শুনতে পেলেন- আনন্দে আত্মহারা। তিনি মনে মনে সৃষ্টিকর্তাকে ধন্যবাদ দিলেন, ঐ ছেলেটির জন্য ছিল মুক্তোদানার অশ্রুবিন্দু। খুব সযত্নে রাখলেন চিঠিটি তার টেবিলের ড্রয়ারে। এগিয়ে গেলেন ছেলেকে জড়িয়ে ধরতে, কিন্তু তাকে দেখে প্রথমে প্রচণ্ড মানসিক ধাক্কা খেলেও সেটা সামলে উঠে কাছে টেনে নিলেন।
তাকির সাথে সুয়েজের হাসির বেশ মিল ছিল।