৪৫ বছর ধরে ভূল তথ্য : বীরশ্রেষ্ট হামিদুর রহমানের শাহাদাৎবরণ এলাকা নিয়ে অবিলম্বে সংশোধনের দাবী

../news_img/38586 mri nu i k k.jpg

বিশ্বজিৎ রায়, কমলগঞ্জ(মৌলভীবাজার) প্রতিনিধি :: ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে শাহাদাৎবরণকারী বীর শ্রেষ্ট সিপাহী হামিদুর রহমান এর মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন শহিদ হওয়া স্থান সম্পর্কে দীর্ঘ ৪৫ বছর ধরে ভূল  ধারনা নিয়ে জাতি অতিবাহিত করছে। প্রাথমিক শ্রেণীর পাঠ্য বই ও মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রনালয়ে ওয়েব সাইটে শাহাদাৎবরণের সঠিক উপজেলা কমলগঞ্জে নাম ব্যবহার না করে পার্শ্ববর্তী উপজেলা শ্রীমঙ্গল উপজেলার নাম উল্লেখ থাকায় কোমলমতি শিশুসহ সমগ্র দেশবাসী সঠিক ইতিহাস হতে বঞ্চিত। বীরশ্রেষ্ট হামিদুর রহমানের ৪৫তম মৃত্যুবার্ষিকীর আলোচনা সভায় ২৮ অক্টোবর শুক্রবার কমলগঞ্জে মুক্তিযুদ্ধা,সুশীল সমাজ, সাংবাদিকগন পাঠ্য বইয়ে ভুল সংশোধনের দাবী জানিয়েছেন।

১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধে বীরত্বের জন্য দেশের সাত বীরশ্রেষ্ট একজন সিপাহী হামিদুর রহমান। ১৯৭১ সালের অক্টোবর ২৮ অক্টোবর মৌলভীবাজার জেলার কমলগঞ্জ উপজেলার সীমান্তবর্তী ধলই বিওপি এলাকায় প্রানপন লড়াই করে সম্মুখ সমরে দেশের জন্য শহীদ হন সিপাহী হামিদুর রহমান। চারদিকে চা বাগান, মাঝখানে ধলই সীমান্ত চৌকি। ধলই সীমান্ত চৌকি থেকে দক্ষিণপূর্ব দিকে ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের কমলপুর শহরে ছিল মুক্তিবাহিনীর সাব-সেক্টর ক্যাম্প। সব প্রস্তুতি নিয়ে ২৮ অক্টোবর ভোর রাতে লেফটেন্যান্ট কাইয়ুমের নেতৃত্বে একটি দল পাক সেনাদের উপর চতুর্দিক থেকে সাঁড়াশি আক্রমন চালায়। ব্যাপক গোলাবর্ষনে পাক সেনাদের ক্যাম্পে আগুন ধরে যায়। প্রচন্ড গুলিবর্ষন ও পাকবাহিনীর পুঁতে রাখা মাইন বিষ্ফোরণে বেশ কিছু মুক্তিযোদ্ধা হতাহত হন। সিপাহী হামিদুর রহমান সাহসিকতার সাথে সীমান্ত চৌকি দখলের উদ্দেশ্যে মৃত্যুকে তুচ্ছ ভেবে মেশিনগান নিয়ে বিক্ষিপ্ত গোলাগুলির মধ্যে হামাগুড়ি দিয়ে শত্রু পক্ষের ৫০ গজের মধ্যে ঢুকে পড়েন। গর্জে উঠে তার হাতের মেশিনগান। শক্রুদলের অধিনায়কসহ বেশ কয়েকজন সৈন্য এতে প্রাণ হারায়। এমন সময় শত্রুসৈন্যের একটি বুলেট হামিদুর রহমানের কপালে বিদ্ধ হয়। কিছুক্ষনের মধ্যে কমলগঞ্জ উপজেলার ধলই সীমান্তের তৎকালীন ইপিআর (বর্তমান বিজিবি ক্যাম্প) এর সামনে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন তিনি। স্বাধীনতা পরবর্তী দীর্ঘ দিন পর ১৯৯২ সালে তৎকালীন বাংলাদেশ সীমান্ত রক্ষী বাহিনী(বিডিআর) এর উদ্যোগে সর্বপ্রথম কমলগঞ্জ উপজেলার ধলাই সীমান্ত চৌকির পাশে নির্মাণ করা হয় বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমানের স্মৃতিফলক।
 
২০০৬ সালে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অর্থায়নে ১০ শতাংশ জায়গার উপর সাড়ে ১৪ লক্ষ টাকা ব্যয়ে গণপূর্ত
বিভাগ বীরশ্রেষ্ঠ শহীদ সিপাহী হামিদুর রহমান স্মরণে স্মৃতিস্তম্ভ নির্ম্মাণ করে। সাথে সাথে কমলগঞ্জ পৌরসভার ভানুগাছ-মাধবপুর সড়কটিকে বীরশ্রেষ্ঠ সিপাহী হামিদুর রহমানের নামে নামকরণ করা হয়।

 কিন্তু বিগত ৪৫ বছর ধরে বীরশ্রেষ্ট হামিদুর রহমানের মুক্তিযুদ্ধের জীবনীতে শাহাদাৎবরণের স্থান বিকৃত ভাবে সরকারী স্কুল কলেজের পাঠ্যপুস্তক ও মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রনালয়ের ওয়েব সাইটে উপস্থাপন করা হচ্ছে। এতে কোটি কোটি কোমলমতি শিশু সহ গোটাজাতি বিভ্রান্তিতে পড়ছেন। কোমলমতি শিশুরা বীরশ্রেষ্ট সিপাহী হামিদুর রহমানের শাহাদাৎবরণের স্থান ভুল ভাবে শিখছে। মুক্তিযুদ্ধ ওয়েব সাইটে সাত বীর শ্রেষ্ট জীবনী শিরোনামে যে তথ্য সংযোজিত আছে তাতে বীর শ্রেষ্ট হামিদুর রহমানের মৃত্যুবরনের কোন এলাকায় বা কোন জেলা ও উপজেলায় হয়েছে তা নেই। শুধু মাত্র বাংলদেশের দলই নাম লিখা। এছাড়া ৪র্থ শ্রেণীর আমার বাংলা বই এর বীরশ্রেষ্টের বীরত্বের গাঁথা পাঠে উল্লেখ রয়েছে মৌলভীবাজার জেলার শ্রীমঙ্গল থানার ধলই সীমান্তে। একই অবস্থা মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরেও। স্বাধীনতা পরবর্তী দীর্ঘ্য ৪৫ বছর ধরে জাতি ভুল তথ্য জেনে যাচ্ছে। এটা সংশোধনের কেউ নেই। প্রকৃত সত্য হল্ োযেখানে হামিদুর রহমান শহীদ হয়েছিলেন সে এলাকাটি হলো মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলার ৮নং মাবধপুর ইউনিয়নের ধলই সীমান্ত এলাকা। শ্রীমঙ্গল উপজেলা নয়। কমলগঞ্জ উপজেলা থেকে শ্রীমঙ্গল উপজেলার দুরত্ব প্রায় ১৭ কিলোমিটার আর সেখানে শহীদ হয়েছিলেন সেই জায়গা থেকে দুরত্ব প্রায় ১০ কিলোমিটার। শুধু পাঠ্য বইয়ে নয় মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রনালয়ের ওয়েবসাইটে ভুল রয়েছে। তাদের ওয়েব সাইটে বীরশ্রেষ্ট হামিদুর রহমানের মৃত্যুবরণের স্থান সঠিক ভাবে তুলে ধরা হয়নি। শুধুমাত্র লিখা হয়েছে সেখানে শহীদ হয়েছিলেন সেই জায়গার নাম দলই। কিন্তু দলই কোন এলাকায় অবস্থিত তা চিহিৃত নেই।

ওয়েব সাইটে অবশ্য জেলা বা উপজেলায় নাম থাকা প্রয়োজন। কারন জেলা/উপজেলা লিখা না থাকলে জাতি এটা জানবে কি ভাবে যে সিপাহী হামিদুর রহমান কোন জেলা বা উপজেলায় শাহাদাতবরণ করেছিলেন? কমলগঞ্জ উপজেলাবাসীর সুশীল সমাজ, বীর মুক্তিযোদ্ধারা, সাংবাদিকমহল এক বাক্যে দাবী জানিয়েছেন সরকারের কাছে বিষয়টি গুরুত্বসহকারে নিয়ে সংশোধন করার জন্য।

কমলগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. মাহমুদুল হক বলেন, এটা দুঃখজনক। জাতির ৪৫ বছর ধরে ভুল জেনে আসছে। সংশোধনের জন্য তিনি উপর মহলে চিঠি পাঠাবনে।