প্রাচীন দুর্গ ভিতরগড় নিয়ে সেমিনার ও চিত্র প্রর্দশনীর শনিবার

../news_img/39640 mri nu i.jpg

মৃদুভাষণ রির্পোট :: বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরে সুফিয়া কামাল মিলনায়তনে  প্রাচীন দুর্গ ভিতরগড় নিয়ে সেমিনার ও চিত্র প্রর্দশনীর আয়োজন করা হয়েছে শনিবার। সকাল ১০ টায় শুরু হয়ে চলবে দুপুর পর্যন্ত ।

সুহেল আহমেদ চৌধুরীরর সভাপতিত্বে সেমিনারের প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত, বিশেষ অতিথি  সংস্কৃতিক মন্ত্রী আসাদুজ্জামান নুর ও সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের ভারপ্রাপ্ত সচিব আকতারী মমতাজ।
 
অনুষ্ঠানে ভিতরগড় নিয়ে মুল প্রবান্ধ পাঠ করবেন সুহেল আহমদ চৌধুরী।  সেমিনার শেষ হওয়ার পর পরই অতিথি বৃন্দ ও দর্শক ভিতরগড়ের আলোকচিত্র অবলোকন করবেন।

 

ভিতরগড়ের ইতিহাস :
 পঞ্চগড় জেলা শহর হতে ১৬ কিমি উত্তর পূর্বে পঞ্চগড় জেলার সদর থানার অর্ন্তগত অমরখানা ইউনিয়নে ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী এলাকায় ২৫ বর্গ কিমি জায়গা জুড়ে অবস্থিত। এটি বাংলাদেশের সর্ববৃহৎ দুর্গনগরী। ভিতরগড়ের বাইরের আবেষ্টনীর উত্তর দেয়াল এবং পূর্ব ও পশ্চিম দেয়ালের উত্তরাংশ বর্তমানে ভারতের জলপাইগুড়ি জেলার অর্ন্তগত।

পুরাতন হিমালয় পর্বতমালার পাদদেশীয় সমতল ভূমিতে তরাই অঞ্চলে অবস্থিত ভিতরগড়ের উপরিভাগে রয়েছে গাঢ় ধূসর বা কালো রঙের বেলে দোয়াশ মাটি- যা তরাই কালো মাটি হিসেবে পরিচিত। ভারতের জলপাইগুড়ি হতে উৎপন্ন তালমা ও কুড়ুম নদী দুটিই ছিল ভিতরগড়ে পানি সরবরাহের প্রধান উৎস।



স্থানীয় জনশ্রুতি মতে, পৃথু রাজা কিচক নামে অসাধু ও নিম্নবর্ণের জনগোষ্ঠী দ্বারা আক্রান্ত হলে নিজ পবিত্রতা ও মর্যাদা রক্ষার্থে পরিবার পরিজনসহ দিঘির জলে আত্নহত্যা করেন। তাঁর রক্ষীবাহিনীও তাঁকে অনুসরণ করে। এর ফলে পৃথু রাজার রাজত্বের অবসান ঘটে।




বাংলার ইতিহাসে পৃথু রাজা কিংবা তার রাজ্য ভিতরগড় সম্বন্ধে খুব কমই উল্লেখ রয়েছে। ষোলো শতকে সম্ভবত ভিতরগড় ছিল কামতা-কোচ রাজ্যের অংশ যা বিশ্বসিংহ কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত। এর পূর্বে ১৪৫৮ খ্রিস্টাব্দে হোসেন শাহ কর্তৃক কামরূপ রাজ্য অধিকৃত হলে সম্ভবত এ অঞ্চল সুলতানী বাংলার অন্তর্গত হয়। আরও পূর্বে ১২৫৭ খ্রিস্টাব্দে সুলতান মুঘিসউদ্দীন কর্তৃক কামরূপ অভিযানের সময়ে এ অঞ্চল বোড়ো, কোচ ও মেচ গোষ্ঠীর বারো ভূঁইয়াদের শাসনের অন্তর্গত ছিল। বানগড় স্তম্ভলিপি ও ইরদা তাম্রলিপিতে বর্ণিত দশম শতকে আগত কম্বোজগণ যখন স্বল্প সময়ের জন্য গৌড়ে রাজত্ব করেন তখন সম্ভবত ভিতরগড় তাদের রাজত্বের অংশ ছিল। আর চার শতকের পূর্বে ভিতরগড় ছিল সম্ভবত প্রাগয্যোতিশপুরের অংশ।
মহারাজার দিঘি

স্থানীয় জনশ্রুতি মতে, ভিতরগড় ছিল পৃথু রাজার রাজধানী। স্থানীয় আধিবাসীদের নিকট তিনি মহারাজা হিসাবে পরিচিত। ১৮০৯ সালে ফ্রান্সিস বুকানন ভিতরগড় জরিপ করেন। তাঁর মতে, পৃথু রাজার রাজত্ব তৎকালীন বৈকণ্ঠপুর পরগণার অর্ধেক ও বোদা চাকলার অর্ধেক অংশ নিয়ে গঠিত ছিল। ছয় শতকের শেষদিকে এক পৃথুরাজা কামরূপে পরাজিত হয়ে ভিতরগড়ে রাজ্য স্থাপন করেন। আবার তেরো শতকের কামরূপের ইতিহাসে এক রাজার নাম পৃথু। কেউ কেউ মনে করেন পৃথু রাজা ও রাজা তৃতীয় জল্পেশ অভিন্ন ব্যক্তি এবং আনুমানিক প্রথম শতকে তিনি ভিতরগড়ে রাজধানী স্থাপন করে এ অঞ্চলে রাজত্ব করেছিলেন। আবার অনেকে জলপাইগুড়ির জল্পেশে নয় শতকে নির্মিত শিব মন্দিরের নির্মাতা জল্পেশ্বর বা রাজা তৃতীয় জল্পেশকে নয় শতকের শাসক মনে করেন। বুকানন ভিতরগড় জরিপকালে একজন স্থানীয় বৃদ্ধের নিকট হতে জানতে পারেন যে, ধর্মপালের রাজত্বের আগে পৃথুরাজা এ অঞ্চলে রাজত্ব করেছিলেন। কোটালীপাড়ায় প্রাপ্ত স্বর্ণমুদ্রা হতে আমরা জানতে পারি আরেক জন রাজার নাম পৃথুবালা। এই পৃথুবালা সম্ভবত সাত শতকের শেষার্ধে অথবা আট শতকের শুরুতেই সমতটের শাসক ছিলেন। অপর একটি সুত্র অনুযায়ী নয় বা দশ শতকে কম্বোজ বা তিববতীয়গণের আক্রমণ থেকে রক্ষার জন্য পালবংশীয় রাজাগণ ভিতরগড় দুর্গটি নির্মাণ করেন।

পৃথুরাজা কে ছিলেন? কোথা হতে তিনি এসেছিলেন? কারা এই ভিতরগড়ে বসবাস করত? ভিতরগড় নগরীর উৎপত্তি কিংবা বিলুপ্তির কারণই বা কি ছিল? প্রশ্নগুলির উত্তর এ মূহুর্তে বলা সম্ভব নয়। তবে উৎখননের ফলে প্রাপ্ত নিদর্শনসমূহের আলোকে অনুমান করা যায় যে, ছয় শতকের শেষে কিংবা সাত শতকের শুরুতে ভিতরগড় একটি স্বাধীন রাজ্য হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। প্রাচীন বাণিজ্য সড়ক ও নদীপথের উপর অবস্থিত হওয়ায় ভিতরগড় এলাকার অধিবাসী সম্ভবত নেপাল, ভুটান, সিকিম, আসাম, কোচবিহার  তিববত, চীন, বিহার এবং পশ্চিম ও দক্ষিণ বাংলার সঙ্গে বাণিজ্যিক ও সাংস্কৃতিক যোগাযোগ বজায় রেখেছিল।