বীরবিক্রম জগৎজ্যোতি দাস একটি নাম, একটি ইতিহাস

../news_img/39658  mri nu i i o.jpg

সৈয়দ মছরুর আহমদ :: ‘আমি যাইগ্যা’ কথাটি ছিল বীরবিক্রম জগৎজ্যোতির জীবনে শেষ উক্তি। বিকেলের শেষ সূর্যটা লাল হয়ে ঢলে পড়েছে পশ্চিম আকাশে ঠিক যেমনটি ঢলে পড়েছে জগৎজ্যোতির জীবনের সময়টাও শেষ সন্ধ্যায়। এক সাহসী বীরযোদ্ধা জীবনের ক্রান্তি লগ্নে দাড়িয়ে জীবনের শেষ উক্তিটি করে গেলেন।

১৯৭১ সালের মুক্তিযোদ্ধ বাঙালি জাতির এক গৌরব উজ্জ্বল ইতিহাস। এই ইতিহাসের স্মৃতিগাঁথায় অনেকের নাম জরিয়ে আছে। তাদের মধ্যে একজন জগৎজ্যোতি দাস। হবিগঞ্জ জেলার আজমিরীগঞ্জ উপজেলার প্রত্যন্ত অালোর ছায়া সুনিভীড় ছোট্ট একটি গ্রাম জলসুখা। সেই গামে ১৯৪৯ সালের ২৬ এপ্রিল জন্ম গ্রহণ করেন বাংলাদেশের প্রথম বীরবিক্রম জগৎজ্যোতি দাস। তিনি ছিলেন জিতেন্দ্র চন্দ্র দাস ও হরিমতি দাসের কনিষ্ঠ পুত্র। বাবা ও বড় ভাই রাজমিস্ত্রীর কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করতেন। ছোট বেলা থেকে দারিদ্রার সংঙ্গে লড়াই করে বড় হয়েছেন। শৈশব থেকে তিনি ছিলেন প্রতিবাদি ও সাহসী। স্কুল জীবনেই জগৎজ্যোতি দাস আয়ূব বিরোধী আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। শত কষ্ঠের মাঝেও তিনি ১৯৬৮ সালে দ্বিতীয় বিভাগে মেট্রিক পাশ করেন। মেট্রিক পাশ করার পর সুনামগঞ্জ কলেজে ভর্তি হয়ে ছাত্র ইউনিয়নে যোগদেন। তিনি ছিলেন সুনামগঞ্জ ছাত্র ইউনিয়নের ১ম সারির কর্মী। পরে তিনি ভারতের গৌহাটির নওপং কলেজে ভর্তি হন।

১৯৭১ সালে পাকসেনাদের অত্যাচার নিপীড়ন দেখে সহ্য করতে না পেড়ে তিনি পাকিস্থান সেনাদের বিরোদ্ধে যুদ্ধে অংশ গ্রহণ করার সিদ্ধান্ত নেন। তিনি বিভিন্ন গ্রাম ঘুরে কিছু লোক সংগ্রহ করে  ভারতের মেঘালয় রাজ্যের শিলংয়ে ইকো-১ ট্রেনিং ক্যাম্পে যোগদান করেন। ট্রেনিং শেষে দেশে ফিরে শুরুর দিকে টেকেরঘাট সাব সেক্টরের দায়িত্ব প্রাপ্ত সুরঞ্জিত সেন গুপ্তের অধীনে জগৎজ্যোতি যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। নেতৃত্বগুণ সম্পন্ন, নেতৃত্¦ের প্রতি সংবেদনশীলতা, কঠোর পরিশ্রমি এবং বিভিন্ন ভাষার অপর দক্ষতা থাকার কারণে সে দলে নেতা মনোনীত হন জগৎজ্যোতি দাস।

পরবর্তীতে তার নেতৃত্বে প্রশিক্ষিত চৌকস যোদ্ধাদের নিয়ে গঠিত হয় গেরিলা দল যার নাম দেওয়া হয় ‘ফায়ারিং স্কোয়াড’। পরবর্তীতে তার এই দলটি ‘দাস পার্টি’ নামে পরিচিত লাভ করে। মুক্তিযোদ্ধকালে পাকিস্থানী ও রাজাকারদের কাছে দাস পার্টি ছিল মূর্তিমান আতঙ্কের নাম আর মুক্তিযোদ্ধাদের ছিল সাফ্যলের প্রতীক। মুক্তিযুদ্ধে সাব সেক্টরের অধীনে বিস্তৃর্ণ ভাটি অ ল শত্রু মুক্ত রাখার দায়িত্ব পড়ে জগৎজ্যোতি দাসের উপর। তিনি দিরাই, শাল্লা, ছাতক, আজমিরীগঞ্জ, বানিয়াচং, জামালগঞ্জ, তাহির পূর, কিশোরগঞ্জ ও নেত্রকোণার নৌপথ পাকসেনাদের দখল মুক্ত করতে ঝাঁপিয়ে পড়েন তাঁর ‘দাস পার্টি’ নিয়ে। দাস পার্টির একের পর এক বুদ্ধিদীপ্ত চৌকস আক্রমনের কাছে পরাজিত হতে তাকে পাক সেনার দল। এক পযার্য়ে পাকিস্থান সরকার রেডিওতে ঘোষনা দিতে বাধ্য হয় যে, এই রুটে চলাচল কারি জনগণের জানমালের দায়িত্ব সরকার নেবে না। মাত্র ১৩ জন যোদ্ধা নিয়ে বানিয়াচঙ্গে প্রায় ২৫০ জন পাক বাহিনী ও তাদের দোসরদের ঠেকিয়ে দেন জগৎজ্যোতি দাস। ১৭ ই আগষ্ঠ পাহাড়পুরে জগৎজ্যোতির বুদ্ধিমত্তা ও বীরত্বে রক্ষা পায় অসংখ্যা নিরীহ বাঙালীর প্রাণ ও নারীর সম্ভ্রম। তার বুদ্ধিমত্তা এত প্রখর ছিল যে, কোনরূপ গুলি ব্যয় না করেই দিরাই, শাল্লায় অভিযান চালিয়ে আটক করেন ১০জন রাজাকারের একটি দলকে। একই ভাবে তিনি রাণীগঞ্জ ও কাদিরগঞ্জে অভিযান চালিয়ে আটক করেন রাজাকারদের।

 জগৎজ্যোতি এতটাই সাহসী ছিলেন যে, একাই মাত্র একটি এল.এম.জি নিয়ে শত্রুর কাছ থেকে দখল মুক্ত করেন জামালগঞ্জ থানা ভবন। তিনি মাত্র দশ বারো জন মুক্তিযোদ্ধা নিয়ে শ্রীপুর ও খালিয়াজুরি শত্রুমুক্ত করেন।

১৯৭১ সালের ১৬ নভেম্বর সূর্য ওঠার সাথে সাথেই দাস পার্টির ৪২ সদস্য নিয়ে নৌকাযোগে রওনা দেন বাহুবলের উদ্দেশ্যে। পথিমধ্যে বদলপুরে পৌছে জগৎজ্যোতি লক্ষ করেন রাজাকারদের একটি দল ব্যবসায়ীদের নৌকা আটক করে চাঁদা আদায় করছে। তিনি তখন রাজাকারদের ধরে আনার নিদের্শদেন। মুক্তিযোদ্ধাদের দেখেই পিছু হঠতে থাকে রাজাকাররা। মুক্তিযোদ্ধারা তাদের পিছুনেন। অদূরেই লোকিয়ে ছিল প্রচুর গুলাবারুদ নিয়ে পাকসেনাদের বিশাল বহর। মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে ছিল সামান্য গুলাবারুদ। তা নিয়েই শুরু হয় বিশাল যুদ্ধ। এক পর্যায়ে গুলাবারুদ কমে আসায় দাস পার্টি নিয়ে বেকায়দায় পড়ে যান জগৎজ্যোতি। সঙ্গীদের জীবন বাঁচাতে তাদের স্থান ত্যাগের নির্দেশ দেন তিনি। তাদের পলায়নের সুযোগ করে  দিয়ে মরণ পণ লড়াই চালিয়ে যেতে থাকেন জগৎজ্যোতি ও তার সহযোদ্ধা ইলিয়াস আলী সহ কয়েকজন। পর্যায়ক্রমে দুজনই গুলি বিদ্ধ হলে নিজের মাথার গামছা খোলে ভাল করে বেঁেধ রক্ত পড়া বন্ধ করেন। জগৎজ্যোতি ও ইলিয়াস এই অবস্থায়ই ক্রমাগত গুলি ছুড়তে থাকেন। বিকাল পৌনে পাচঁটা, জগৎজ্যোতির অস্ত্র ভান্ডার প্রায় শূন্য! ম্যাগজিন লোড করে শত্রুর অবস্থান দেখতে জগৎজ্যোতি মাথা উচু করতেই আরেকটা মরণ ঘাতক বুলেট তাঁর শরীরে বিদ্ধ হয়। তিনি শেষ বারের মতো চিৎকার করে ওঠেন ‘আমি যাইগ্যা’। মেশিনগান হাতে ধীরে ধীরে নিশ্চল হয়ে উপুর হয়ে পাশের বিলে ঢলে পড়েন। রাজাকারেরা জগৎজ্যোতির লাশ খোজে পেয়ে পাকবাহিনীকে খবর দেয় তারা এসে জগৎজ্যোতির নিথর দেহটি নিয়ে যায় আজমিরীগঞ্জ গরুর বাজারে একটি খুটির সঙ্গে ঝুলিয়ে প্রকাশ্যে অমানুষিক ভাবে নির্যাতন চালায়। তারা ধারালো অস্ত্র দিয়ে খুঁচিয়ে জগৎজ্যোতির দেহটা কে ক্ষতবিক্ষত করে। এমন কি তারা তাঁর দেহটাকে বিবস্ত্র করে জগৎজ্যোতির মা-বাবাকে নিয়ে তাঁর বিভৎস লাশ দেখিয়ে উপহাস করে। তাঁর পরিবার যখন শোকাহত তখন রাজাকারেরা তাঁর বাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেয়। কোন প্রকার সৎকার ছাড়াই জগৎজ্যোতিকে বাসিয়ে দেওয়া হয় নদীর জলে।


যুদ্ধে ক্ষেত্রে জগৎজ্যোতির শহীদ হওয়ার সংবাদ স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র, অল ইন্ডিয়া রেডিও সহ বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রচারিত ও প্রকাশিত হয়। সেই সাথে তাঁর বীরত্বগাঁথা তোলে ধরা হয়। অস্থায়ী বাংলাদেশ সরকার তাঁকে সর্বোচ্চ মরণোত্তর পদক প্রদানের ঘোষনা করেন, স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে তা প্রচারিত হয়। কিন্তু অজ্ঞাত কারনে সে প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করেনি সরকার। পরবর্তীতে ১৯৭২ সালে ‘বীরবিক্রম’ খেতাবে ভূষিত করা হয়। মুক্তিযোদ্ধে বিশেষ অবদানের জন্য এদেশে অনেক মুক্তিযোদ্ধাকে মরণোত্তর বিভিন্ন রাষ্ট্রিয় পুরুস্কার প্রদান করা হলেও এই বীরকে আজও কোন পুরুস্কার প্রদান করা হয়নি। ঠিক যতটুকু সম্মান তার প্রাপ্য আমরা তাকে দিতে পারিনি আজও!