গণতান্ত্রিক পদ্ধতিকে যৌক্তিক ও ত্রুটিমুক্ত করতে হবে

../news_img/41359 m mrinu n i k.jpg

ড. সা’দত হুসাইন :: ব্রেক্সিট ও মার্কিন নির্বাচনের পর গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার উপযোগিতা সম্পর্কে নানারূপ প্রশ্ন উঠছে। বিশ্বের যে কয়টি শাসনব্যবস্থা প্রচলিত রয়েছে তার মধ্যে গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা, বিশেষ করে বিশুদ্ধ উদার গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থাকে (Pristine Liberal Democracy) সর্বোত্তম শাসনব্যবস্থা মনে করা হয়। অন্য কোনো শাসনব্যবস্থায় যেমন- সমাজতন্ত্র, রাজতন্ত্র, ধর্মীয় অভিজাততন্ত্রে জনগণের ইচ্ছার প্রতিফলন ঘটানোর অবকাশ থাকে না। একমাত্র গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাতেই জনগণের পছন্দ অনুসারে শাসক (দল) নির্বাচিত হয়।
ধরে নেয়া হয় নির্বাচিত শাসক (দল) জনগণের ইচ্ছার প্রতিফলন ঘটিয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে এবং শাসনকার্য পরিচালনা করবে। তারা এমন কোনো কাজ করবে না যা জনস্বার্থের পরিপন্থী। অথবা যার ফলে জনগণের মধ্যে বিক্ষোভ সৃষ্টি হতে পারে। জনগণ বলতে দেশের সামগ্রিক জনগণকে বোঝায়। ধর্ম, বর্ণ, গোত্র, লিঙ্গ, রাজনৈতিক বিশ্বাস যে কোনো বিবেচনায় যারা সংখ্যালঘু তারাও জনগণের অবিচ্ছেদ্য অংশ। তাদের অখণ্ডিত নাগরিক অধিকার রয়েছে। এ অধিকার প্রয়োগের ক্ষেত্রে কোনো রকম বৈষম্য করা যাবে না। সমাজতন্ত্র কিংবা একনায়কতন্ত্রে জনগণের অধিকার রক্ষার সুযোগ সীমিত। বিশ্বের অধিকাংশ দেশ গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থায় বিশ্বাসী এবং এসব দেশে গণতান্ত্রিক পদ্ধতি প্রচলিত রয়েছে।

জনগণের ইচ্ছার পরিমাপ করার মোক্ষম হাতিয়ার হচ্ছে গোপন ব্যালটে নির্বাচন। এটি কোনো সংগঠনের জন্য যেমন সত্য, তেমনি দেশের জন্যও সত্য। যদি কোনো বিষয়ে মতানৈক্য দেখা দেয় বা মতানৈক্যের আশংকা থাকে, তবে অধিকাংশ সদস্য বা নাগরিক (ভোটার) যে সিদ্ধান্তকে পছন্দ করবে তাকেই জনগণের সিদ্ধান্ত বলে ধরে নেয়া যাবে। বিশুদ্ধ উদার গণতন্ত্রে অবশ্য সংখ্যালঘু ভোটারদের মতামতকেও যতদূর সম্ভব গুরুত্ব দেয়ার ব্যবস্থা করা হয়, যাতে পুরো পদ্ধতিতে সবাই অংশগ্রহণ করেছে এ রকম একটি ধারণা ও অনুভূতির সৃষ্টি হতে পারে, বলা যায় সামগ্রিকভাবে দেশের শাসনকার্য ঐকমত্যের ভিত্তিতে চলে। এতে নাগরিকদের মধ্যে চলমান কর্মধারা থেকে ছিটকে পড়ার আশংকা এবং হতাশা লক্ষণীয়ভাবে কমে যায়। তাদের মধ্যে একটি স্বস্তির ভাব সৃষ্টি হয়। সংসদীয় শাসন পদ্ধতিতে শাসনকার্যে সংখ্যালঘু বিরোধী দল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। দেশের সব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সরকারের পাশাপাশি তারাও অবদান রাখতে পারে।

নির্বাচন পদ্ধতি বা প্রক্রিয়া গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ। ধরে নেয়া হয় এর মাধ্যমেই শাসনকার্যে জনগণের ইচ্ছা ও প্রভাব যথাগুরুত্ব পেয়ে থাকে। তাই নির্বাচন পদ্ধতি-প্রক্রিয়া যৌক্তিক ও ত্রুটিমুক্ত হওয়া অপরিহার্য। যদি নির্বাচন পদ্ধতিতে অযৌক্তিক কিছু ঢুকে পড়ে অথবা পুরো পদ্ধতি দুর্নীতি ও ত্রুটিযুক্ত হয়ে পড়ে তাহলে গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা ধসে পড়ার উপক্রম হয়।

আমরা নির্বাচনে যে কয়টি মূলধারা দেখতে পাই তার বেশিরভাগই প্রকৃতপক্ষে পরোক্ষ পদ্ধতির নির্বাচন। মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচন কিংবা ওয়েস্টমিনস্টার পদ্ধতির সংসদীয় নির্বাচন কোনোটিই জনগণের সরাসরি ভোট দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয় না। মার্কিন নির্বাচনে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয় কৃত্রিমভাবে সৃষ্ট ইলেক্টোরাল কলেজের মাধ্যমে। ফলে যিনি বেশি ইলেক্টোরাল কলেজ জয়ী হবেন তিনিই হবেন প্রেসিডেন্ট। পরাজিত প্রার্থী জনতার সংখ্যাধিক্য (Popular) ভোট পেলেও তার কোনো লাভ হবে না, তিনি শূন্যে পরিণত হয়ে যাবেন। সংখ্যাধিক জনগণের ভোট অকার্যকারিতার অতল গহ্বরে হারিয়ে যাবে। সংখ্যালঘু জনগণের সমর্থন নিয়ে শুধু ‘ফর্মুলার বদৌলতে’ জনতার ভোটে পরাজিত প্রার্থী দেশের প্রেসিডেন্ট বনে যান। একে বলা যায় অধিকাংশ জনতার ইচ্ছার প্রতি বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শন। গাণিতিক বিবেচনায় প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের এ পদ্ধতি অযৌক্তিক ও অসঙ্গতিপূর্ণ। ওয়েস্টমিনস্টার ধারার সংসদীয় পদ্ধতিতেও এরূপ অযৌক্তিক ব্যবস্থা বিদ্যমান রয়েছে। এখানে এলাকাভিত্তিক নির্বাচনে যে দলের সদস্যরা সর্বাধিকসংখ্যক এলাকায় জয়ী হবেন সে দলই সরকার গঠন করবে এবং সে দলের নেতাই প্রধানমন্ত্রী হবেন। বাস্তবে দেখা গেছে, অনেক সময় অধিকসংখ্যক সংসদ সদস্য বা এমপি থাকার বদৌলতে যে দল সরকার গঠন করেছে, জনতার ভোটে তারা আসলে পিছিয়ে আছে। অর্থাৎ সামগ্রিক জনতার অধিকাংশই তাদের বিপক্ষে ভোট দিয়েছে। সুতরাং শাসক দল জনতার ভোটে নির্বাচিত হয়েছে এমনটি বলা যাবে না। তারা একটি ফর্মুলার বদৌলতে শাসনক্ষমতা পেয়েছে। দেখা যাচ্ছে আমেরিকার নির্বাচন বা ওয়েস্টমিনস্টার নির্বাচনে জয়ী প্রার্থীরা উভয়েই পরোক্ষ নির্বাচনের উপকারভোগী। আইয়ুব খানের বুনিয়াদি গণতন্ত্রের সঙ্গে এরূপ ব্যবস্থার অবস্থান অনেক দূরে নয়।

ওয়েস্টমিনস্টার পদ্ধতির সরকারের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হল নাগরিকরা ভোট দিয়ে আইনপ্রণেতা (Lwa maker) নির্বাচন করে। প্রচলিত বিশ্বাস হচ্ছে, তারা সংসদে আইন প্রণয়নের ব্যাপারেই ব্যস্ত থাকেন। রাষ্ট্রের অন্যান্য কাজে তাদের অংশগ্রহণ থাকবে নিতান্তই আনুষ্ঠানিক ধরনের। সেসব ক্ষেত্রে মূল কর্মকাণ্ড বা সিদ্ধান্ত গ্রহণে তাদের তেমন কোনো ভূমিকা থাকবে না। কিন্তু দেখা যায়, নির্বাচিত আইনপ্রণেতাদের নেতা-নেত্রী সরকারের প্রধান নির্বাহী অর্থাৎ প্রধানমন্ত্রী ও আইনপ্রণেতাদের একাংশ মন্ত্রণালয়ের প্রধান নির্বাহী অর্থাৎ মন্ত্রী পদে অধিষ্ঠিত হন। এটি ভোটারের আশা-আকাক্সক্ষার সঙ্গে পুরো মাত্রায় সঙ্গতিপূর্ণ নয়। কারণ আইনপ্রণেতার যোগ্যতা এবং নির্বাহীর যোগ্যতা এক নয়। যেসব আইনপ্রণেতা নির্বাহী ক্ষমতা পান না, তাদের অনেকেই অসন্তুষ্ট থাকেন। তারা সংসদের সহকর্মী মন্ত্রীদের ওপর চাপ সৃষ্টি করেন যেন স্থানীয় পর্যায়ে তাদের মন্ত্রণালয়ের কাজে আইনপ্রণেতাদের ক্ষমতা দেয়া হয়। মন্ত্রীরাও চাপের মুখে অনেকটা নিরুপায় হয়ে সহকর্মী আইনপ্রণেতাদের স্থানীয় পর্যায়ে উল্লেখযোগ্য নির্বাহী ক্ষমতা প্রদান করেন। এভাবে সরকারি প্রশাসনে বড় রকমের বিকৃতি আসে। আইনপ্রণেতাদের সঙ্গে সরকারের নির্বাহী কর্মকর্তা অথবা স্থানীয় পর্যায়ের নির্বাচিত নির্বাহীদের ক্ষমতার দ্বন্দ্ব শুরু হয়। উন্নত দেশগুলোয় এ সমস্যা এখনও জটিলাকার ধারণ করেনি। ভবিষ্যতে সমস্যাটি জটিল হবে না এমন কথা বলা যায় না। যেখানে পদ্ধতিগত বা কাঠামোগত অসঙ্গতি থাকবে, সেখানে আজ হোক কাল হোক সমস্যা মাথাচাড়া দিয়ে উঠবে।

গণতান্ত্রিক পদ্ধতির নানা অসঙ্গতি উল্লেখ করে আরও অনেক উদাহরণ দেয়া যায়, যা দৈনিকের কলামের জন্য বিশাল আকৃতির হয়ে যেতে পারে, যে কারণে বক্তব্য সংক্ষিপ্ত করছি। শুধু এটুকু বলতে চাই, আমরা গতানুগতিকভাবে যে শাসনব্যবস্থা প্রচলিত দেখছি, তা সাহসের সঙ্গে অনুপুঙ্খ পর্যালোচনার সময় এসেছে। প্রযুক্তিগত উন্নয়নের এত উঁচু স্তরে উঠেও আমরা কেন সরাসরি ভোটে নেতা-নেত্রী নির্বাচন করছি না, তা সহজে বোধগম্য নয়। স্বীকার করি, ফেডারেল শাসনব্যবস্থায় প্রতিটি প্রদেশ বা স্টেটের গুরুত্ব সমুন্নত রাখার স্বার্থে কোনো কোনো ক্ষেত্রে বুনিয়াদি গণতন্ত্রের ধাঁচে পরোক্ষ ভোটে নির্বাচনের প্রয়োজন হয়। কিন্তু এককেন্দ্রিক বা Unitary শাসনব্যবস্থায় বেসিক ডেমোক্রেসিধর্মী পরোক্ষ নির্বাচনের কোনো প্রয়োজন আছে বলে মনে হয় না। আমরা সরাসরি ভোটে প্রধান নির্বাহী নির্বাচন করতে পারি। আবার প্রত্যেক নির্বাচনী এলাকার পরিবর্তে আমরা আনুপাতিক প্রতিনিধিত্বের (Proportional representation) ব্যবস্থা করতে পারি। সেটি হবে গণতান্ত্রিক দিক থেকে সঙ্গতিপূর্ণ। শুরুতে সংসদীয় আসনের একাংশ নির্বাচনী এলাকাভিত্তিক ভোটের মাধ্যমে এবং অপর অংশ আনুপাতিক ভোটের ভিত্তিতে পূরণ করতে পারি। আমাদের পার্শ্ববর্তী রাষ্ট্র নেপালে এ ধরনের ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে। দ্বিকক্ষবিশিষ্ট প্রতিনিধিসভাও আলোচনার দাবি রাখে। নির্বাচন উত্তরকালে যদি কোনো নির্বাচিত সংসদ সদস্য তার আচার-আচরণ ও কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে অপাঙ্ক্তেয় বিবেচিত হন, তবে তাকে সংসদ থেকে ফিরিয়ে (Recall) নেয়ারও আনুষ্ঠানিক ব্যবস্থা করার প্রয়োজন রয়েছে। আমার জানামতে, ভারতেও এ ধরনের ব্যবস্থা প্রয়োগ করা হয়েছে।

বারাক ওবামা সম্প্রতি বলেছেন, ‘এ রকমের ধারণা করা সমীচীন হবে না যে, আমাদের প্রচলিত শাসনব্যবস্থা একটি চিরস্থায়ী প্রতিষ্ঠান।’ আসলে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে দুর্নীতি ও ত্রুটিমুক্ত করে একে টেকসই ব্যবস্থায় সমুন্নত করতে হলে এর দোষ-গুণ নিরন্তর পর্যালোচনা করতে হবে এবং যেখানে মেরামত ও সংস্কারের প্রয়োজন, সেখানে সংস্কারমুক্ত মন নিয়ে যথাপ্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। আমরা পাবলিক পরীক্ষা ও নিয়োগ পরীক্ষার পদ্ধতি প্রক্রিয়া নিয়ে বহু আলাপ-আলোচনা করে এবং সংশোধনমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করে এগুলোকে ত্রুটিমুক্ত করার ব্যবস্থা করেছি যাতে বিভিন্ন সংগঠনে ভালো নির্বাহীরা নিয়োগ পান। নির্বাচনও কিন্তু একটি নিয়োগ প্রক্রিয়া বটে। জনগণের প্রতিনিধি হিসেবে যদি অযোগ্য বা ভুল লোক সরকারের উঁচু স্তরে কাজ করার জন্য নির্বাচিত হয়ে যান, তবে তা হবে দেশের জন্য অকল্যাণকর। বারবার আলোচনা এবং সংশোধনমূলক পদক্ষেপ নিয়ে নির্বাচন এবং গণতান্ত্রিক পদ্ধতিকে আমাদের নিজেদের স্বার্থে দুর্নীতি ও ত্রুটিমুক্ত করতে হবে। এখানে থমকে দাঁড়ালে, পিছপা হলে আমাদের বড় রকমের ক্ষতি হবে।

ড. সা’দত হুসাইন : সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব; সাবেক চেয়ারম্যান, সরকারি কর্মকমিশন