নারী ও শিশু কোথায় নিরাপদ?

../news_img/shahabuddin shuvo.jpg

শাহাবুদ্দিন শুভ ::
 স্কুল-কলেজ-বিশ^বিদ্যালয়, বাসা-বাড়ি, মহাসড়ক কিংবা গ্রামের মেঠো পথ থেকে নারী বা শিশু তুলে নিয়ে ধর্ষণ এর ঘটনা অনেকে ঘটেছে। তাই বলে হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা কেউ ধর্ষণের শিকার হবেন তা হয়তো কেউ ভাবেননি কিংবা চিন্তায় ও আসেনি কোনদিন। সে রকমই একটি ঘটনা ঘটেছে দেশে। উখিয়া’য় ‘‘ডাক্তার, নার্স, আয়া, নাইট গার্ড সবাই মিলে ১২/১৩ জন দায়িত্বে নিয়োজিত ছিল। এর মধ্যেই চার দুর্বৃত্ত অস্ত্রের মুখে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন মায়ের পাশ থেকে ৭ম শ্রেণীর এক স্কুলছাত্রীকে তুলে নিয়ে গণ ধর্ষণ করেছে।’’ এ যেন আরও একটি কলঙ্ক, আরও একটি লজ্জা যোগ হল জাতী হিসেবে আমাদের কপালে। হাসপাতালে ডায়রিয়া আক্রান্ত মায়ের সেবা করতে আসা কিশোরী হল ধর্ষিতা ।
হয়তো বা জীবনে কখনও মৌলিক অধিকারের অন্যতম চিকিৎসা সেবা নিতে হাসপাতালে আসতেই ভয় পাবে কিশোরীটি। মেডিকেল রিলেটেড কোন কিছু যখন দেখবে। অথবা কোন কথা শুনবে ঠিক তখনই দানবের মত দুঃস্বপ্ন তারিয়ে বেড়াবে। সে কখনও কি কারো সাথে হাসপাতালে যাবে অথবা নিজে চিকিৎসার জন্য যেতে সাহস পাবে?
২.

নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জে আসামিকে রিমান্ডে নির্যাতনের হুমকি দিয়ে প্রথমে ঘুষ দাবি, পরে তা না পেয়ে তার দুই স্ত্রীকে ধর্ষণ করা হয়েছে। পুলিশের এক কর্মকর্তা ও তার দুই সোর্স রাতে তাদের ধর্ষণ করে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে (সমকাল ০৩.০৯.২০১৬)। সিদ্ধিরগঞ্জের একটি ডাকাতি মামলায় মিজমিজি দক্ষিণপাড়া এলাকার ঐ ব্যক্তিকে ২৯ আগস্ট গ্রেফতার করে পুলিশ। ওই তরকারি ব্যবসায়ীর দুই স্ত্রী জানায়, রিমান্ডে নেওয়ার পর রাতেই এসআই আতাউর রহমানের সোর্স নজরুল ইসলাম ও শুভ তাদের ফোন করে। ফোন জানানো হয়, তাদের স্বামীকে রিমান্ডে মারধর করা হবে না। এ জন্য ২৫ হাজার টাকা নিয়ে স্যারের সঙ্গে দেখা করার জন্য বলা হয়। তাদের কথামতো রাত সাড়ে ১০টায় সিদ্ধিরগঞ্জ থানার অদূরে নজরুল ও শুভর সঙ্গে তারা দেখা করেন। তখন তাদের থানার পাশের একটি ফ্ল্যাটে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে দেন দরবারের এক পর্যায়ে দুই সোর্সের হাতে তারা ছয় হাজার টাকা দেন। কিন্তু বাকি টাকা দিতে ব্যর্থ হওয়ায় দুই সোর্স ব্যবসায়ীর দুই স্ত্রীকে তাদের সঙ্গে রাত কাটানোর প্রস্তাব দেয়। রাজি না হওয়ায় বাকি ১৯ হাজার টাকার জন্য চাপ দেয় নজরুল ও শুভ। টাকা দিতে না পারায় মারধর করা হবে বলে ভয় দেখিয়ে দুটি পৃথক কক্ষে দুই সতিনকে তারা ধর্ষণ করে। রাত সাড়ে ১২টায় ওই ফ্ল্যাটে আসেন এসআই আতাউর। তখন তিনি অস্বাভাবিক ছিলেন। এসআই আতাউর এসেই ছোট সতিনের রুমে গিয়ে তাকে ধর্ষণ করেন।

মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলার ছাতকছড়া গ্রামের নুরজাহানের কথা সবার মনে আছে নিশ্চয়ই? ১৯৯৩ সালের ১০ জানুয়ারি নুরজাহানের বিরুদ্ধে দেয়া একটি ফতোয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে মৌলভীবাজার জেলার কমলগঞ্জ উপজেলার সীমান্তবর্তী নিভৃত পাহাড়ি গ্রাম ‘ছাতকছড়া’ দেশব্যাপী আলোচিত হয়ে উঠে। দেশের নারী নির্যাতন প্রতিরোধ আন্দোলনের নেত্রী মালেকা বেগম, বেবী মওদুদ, এডভোকেট আয়েশা খানম, বুদ্ধিজীবি মহল, জাতীয় দৈনিক পত্রিকার সম্পাদক, কলামিষ্টরা ছুটে আসেন অখ্যাত নিভৃত পাহাড়ি এলাকা ছাতকছড়ায়। সালিশে গ্রামের কথিত সর্দার দীন মোহাম্মদ, নিয়ামত উল্লা ও মাওলানা মান্নান আব্দুল মোতালিবের সাথে নুরজাহানের বিয়ে সম্পূর্ণ অবৈধভাবে হয়েছে বলে রায় প্রদান করে আব্দুল মোতালিব ও নুরজাহানকে গলা পর্যন্ত মাটিতে পুতে ১০১টি পাথর নিক্ষেপ ও ১০১টি দোররা (লাঠির আঘাত) মারার ফতোয়া জারি করে। এছাড়া বিয়েতে উপস্থিত থাকার জন্য নুরজাহান (লক্ষি)’র মা সায়েরা বানু ও বাবা আশ্রব উল্লাকে দোরার মারার ফতোয়া দেয়া হয়। এছাড়া বিয়েতে যারা উপস্থিত ছিলেন তাদের সবাইকে কান ধরে উঠবস করতে হবে। শালিসে উপস্থিত আব্দুল মোতালিবের পিতা মতিউল্লা শালিসে ফতোয়ার শাস্তি লাগবের জন্য আবেদন করলে নুরজাহান ও মোতালিবকে লঘু দণ্ড অর্থাৎ কোমর পর্যন্ত মাটিতে পুতে পাথর ছুড়ে মারা হয় এবং প্রত্যেককে ১০১টি দোররা মারার বদলে ৫১টি দোররা মারা হয়। শালিসে বসেই মনির মিয়া নুরজাহানকে উদ্দেশ্য করে বলে, ‘এত কিছুর পর তর বেচে থাকা উচিত নয়, বিষ খেয়ে তর মরা উচিত’। বিচারের নামে প্রহসন এবং কথিত গ্রাম্য সর্দার মনির মিয়ার উক্তি সহ্য করতে না পেরে নুরজাহান (লক্ষি) রাগে-দুঃখে সাথে সাথেই বিষপান করে আত্মহত্যার পথ বেচে নেয়। যেভাবে প্রতিবাদ শুরু হয় সারাদেশে

‘‘প্রেম করার অভিযোগে হাত বেঁধে গ্রাম ঘুরানো ও সালিশে মারধরের অপমান সইতে না পেরে কিশোরী আফরোজা আত্মহত্যা করেছে। আর তাদের বেঁধে গ্রাম ঘুরিয়ে ছিলেন স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান ও মাতব্বররা। শুক্রবার এ সালিশের ঘটনার পর শনিবার বিকালে ওই কিশোরী নিজ ঘরে গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করে। এ ঘটনায় শনিবার রাতে কলারোয়া থানায় মামলা হয়েছে। আত্মহত্যায় প্ররোচনার অভিযোগে উপজেলার সোনাবাড়িয়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যান এসএম মনিরুল ইসলামসহ তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এসএম মনিরুল ইসলাম সোনাবাড়িয়া ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক’ (১৩.১২.২০১৬ মানবজমিন)।

ঠিক নুরজাহানের মত হয়তো  আফরোজা কে এই তথ্য প্রযুক্তির যুগে দুররা‘ মেরে বিচার করা যাবে না। তাই এ যুগের সমাজ প্রতিরা কিন্তু থেমে নেই। তারা বিকল্প ব্যবস্থা বের করে নেন।  তাই নুরজাহানের আত্মহত্যার ২৪ বছর পর এই ২০১৬ সালে এসে আমাদের আবারও দেখতে হল বিকল্প পন্থায় আফরোজাকে আত্ম হত্যার প্ররোচনা করার। বরং আগের চেয়ে এখন আরও ভয়াবহ আগে শুধু গ্রামের মধ্যে বা অত্র এলাকায় একথা থাকত আর এখন কোন শাস্তি বা গ্রাম্য বিচারে কোন সিদ্ধান্ত নিলে তা এক মুহুর্তে  ছড়িয়ে পরে দেশব্যাপি স্যোশাল মিডিয়ার কল্যানে। আর এত কওে যদিও ঘটানকে চাপা দেওয়া সম্ভব হয় না কিন্তু তা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ায় আত্মহত্যার পথ বেঁচে নিচ্ছেন অনেকে। আর সমাজপতিরা তাকেই হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে। আর সেই আত্মহত্যার ফাঁদে পা দিচ্ছেন ২৪ বছর আগে যে ভাবে করেছেন নুরজাহান আর সেই পথেই হাটলেন আফরোজা।

৩.
‘১৯ মে ঢাকা রিপোটার্স ইউনিটির সাগর-রুনি মিলনায়তনে শিশুদের নিয়ে কাজ করা এনজিওদের ফোরাম বিএসএএফ ২০১৫ সালের জানুয়ারি থেকে ২০১৬ সালের এপ্রিল পর্যন্ত শিশু অধিকার পরিস্থিতির প্রতিবেদন প্রকাশ করে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৫ সালে ধর্ষণের শিকার হয়েছে ৫২১ শিশু, এদের মধ্যে গণধর্ষণের শিকার হয়েছে ৯৯ জন আর ধর্ষণের পর হত্যার শিকার হয়েছে ৩০ শিশু। যা ২০১৪ সালে সংঘটিত শিশু ধর্ষণের তুলনায় ১৬১ শতাংশ বেশি এবং গণ ধর্ষণ হয়েছে ৩৫০ শতাংশ বেশি।’ অনেক ক্ষেত্রেই দেশ এগিয়ে যাচ্ছে। তা দেখে দেশের সবারই ভাল লাগার কথা।  পরক্ষণেই যখন দেশের নারী ও শিশুদের নিরাপত্তা কিংবা সুরক্ষার কথা আসে তখন পরিংখ্যান দেখলে গা শিউরে উঠার মত অবস্থা। যেখানে ২০১৪ সালের তুলনায় ধর্ষণ ১৬১ শতাংশ এবং গনধর্ষণ ৩৫০ শতাংশ বেশি তাতে করে বলার অপেক্ষা রাখেন জাতি হিসেবে আমরা কতটুকু এগিয়ে যাচ্ছি ?

বাংলাদেশ মানবাধিকার বাস্তবায়ন সংস্থার তথ্য অনুযায়ী চলতি বছর অক্টোবরে মোট ধর্ষণের শিকার হয়েছে ৪৪ জন নারী ও শিশু। এদের মধ্যে শিশু ১৯ জন। ১৪ জন নারী। ১০ জন নারী গণধর্ষণের শিকার হন। ধর্ষণের পর হত্যা করা হয় একজনকে। হবিগঞ্জের বাহুবলে চতুর্থ শ্রেণির এক ছাত্রীকে অপহরণ করে জোড়পূর্বক রাতভর গণ ধর্ষণ করে একদল দুর্বৃত্ত। দিনাজপুরে ৫ বছরের শিশুকে ধর্ষণের ঘটনা সারাদেশে নিন্দার ঝড় তোলে। দিনাজপুরে ৫ বছরের শিশুকে যে ভাবে ধর্ষণ করেছে সাইফুল ইসলাম (৪২) ও আফজাল হোসেন কবিরাজ (৪৮) তা কোন দেশের সভ্য সমাজে চিন্তা করা যায় না।  তাছাড়া ১৪ জন নারী যৌন হয়রানির শিকার হয়েছে এ মাসে।

দেশের চলমান নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা ও পরিসংখ্যান থেকে সহজেই অনুমান করা যায় দেশের নারী ও শিশুর কোথাও নিরাপদ নন।

ahmedshuvo@gmail.com